| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘টেবিলের নিচে একটি দেশ’ বানভাসি এলাকায় মানুষ ও সাপের সহাবস্থান, দংশনে বাড়ছে মৃত্যু : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সংকোচ’ পাখণ্ডী শব্দটির অর্থ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ লাইন অব প্যাসেজ — সংগ্রামী জীবনের দর্পণ : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কেন উত্তম মহানায়ক : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হড়পা বানের হাড়হিম করা দৃশ্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উত্তম কুমার : বাঙালির সমাজভাষ্য, মূল্যবোধ ও মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় গৈরিক নয়, ‘গৈরেয়’ শব্দটি থেকেই এসেছে ‘গেরুয়া’ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাঙালিয়ানা ও উত্তম কুমার: সংস্কৃতির দর্পণে এক অনন্য মহাকাব্য : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিচিত্র লোক সংস্কৃতি — নন্দোৎসবে নারকেল কাড়াকাড়ি : সুব্রত দত্ত গড়িয়াহাট কি ছিল অলস, অকর্মণ্য বলদের হাট : অসিত দাস চলচ্চিত্র অভিনয়ের সংজ্ঞা ছিলেন উত্তম : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার প্রিয় গল্পগুলো : নুসরাত সুলতানা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কবিদের লেখনীতে শরৎ ঋতু : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিঝুম রাতের পাড়ি : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ রাখি পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইতিহাস গড়ে নারী, ইতিহাস ধরা থাকে অক্ষরে : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়

Reporter
বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় / ২০৫ Views জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

পর্দা জুড়ে একটা প্রকাণ্ড বাড়ি। রাস্তার সামনে। গাড়ি থেকে এসে নামলেন দুজন মহিলা। ঢুকে গেলেন বাড়িটির মধ্যে। ঘরে শুরু হল মিটিং। একটা বই লেখা হবে।এক সাথে।

ক্যামেরা প্যান করে বদ্ধ ঘরটা দেখিয়ে তুলে ধরে তখন মেয়েদের অবস্থা। একে একে জুম করে মুখগুলো দেখায়। সকলেই যেন অদৃশ্য শিকলে বন্দি।

তারপর, জাম্প কাট।

খোলা ময়দানে প্রচুর লোক। সরকার বিরোধী জমায়েত…

সালটা ১৯৭২! পর্তুগালে চলছে ফ্যাসিস্ট শাসন।

পরিচালক ঢুকছেন ছবির ভিতর, দেশের ভিতর, বইয়ের ভিতর। চরিত্রের ভিতর। পর্দায় ভেসে ওঠে সিনেমার নাম : What words can do

সম্প্রতি ছবিটি প্রদর্শিত হল নন্দনে। পর্তুগিজ ভাষায় অন্য ধারার একগুচ্ছ সেরা ছবি নিয়ে সিনে সেন্ট্রালের আয়োজিত লুসফোন চলচ্চিত্র উৎসবে গুটি কয়েক ভাগ্যবান দেখতে পেলেন এক অসামান্য তথ্যচিত্র যা শুধু ইতিহাস খুঁড়ে অতীতকে দেখায় না, নারী সত্তার খোঁজে দেশ কাল পেরিয়ে ইতিহাস নির্মাণের ধারা তুলে রাখে।

সত্যি তো, শব্দ কি করতে পারে? ইতিহাস লিখতে পারে।

শব্দ কি করতে পারে? ইতিহাস গড়তে পারে।

শব্দ কি করতে পারে? ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে।

পরিচালক লুইসা মারিনহো এবং লুইসা সেকেইরা পর্তুগালের ইতিহাস লিখেছেন, বিশ্ব নারী আন্দোলনে ইতিহাস গড়েছেন, অন্য আধারে নিজেই ইতিহাস হয়ে উঠেছেন। তিন নারী এক স্বর হয়ে লিখছেন, আরও দুই নারী তার চিত্রায়ন ঘটিয়ে বিশ্বসমাজকে চিনতে শেখাচ্ছে নারীকেই।একটি সাড়াজাগানো বই (“New Portuguese Letters” (Novas Cartas Portuguesas) নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র। এইটি সেই ছবি —

What Words Can Do সিনেমা। ওই বইয়ের আলোয় দেখা নারী চেতনা, নারী স্বাধীনতার বিমূর্ত আকাঙ্ক্ষা।

তিন লেখিকার সাক্ষাৎকার তাই শুধু ইতিহাসের কোনো বিক্ষিপ্ত কাল খণ্ডের গল্প বলে না, বরং কাল সীমা পেরিয়ে চেতনায় ধাক্কা দেয়। বলে, নারীকে দেখার ব্যকরণটা বদলাও। সমাজের মুখের সামনে ধরে একটা আয়না। ছবির নায়িকা তিন জন প্রতিবাদী লেখিকা যাঁরা সমাজের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চায়। নারীকে নিয়ে সমস্ত ধরনের হিপোক্রেসিই তাঁদের চোখে চরম অশ্লীলতা।

সিনেমা যত এগিয়ে চলে, তাদের ঘ্রাণ তত গ্রাস করে মুক্তচিন্তাকে। সিনেমাটি শেষ হয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে — নারীকে নারীর চোখে দেখতে। লড়াইটা সেখানেই। সারাক্ষণ যে নারীকে বাঁচতে বাধ্য করা হয় পুরুষের নৈতিকতায়, সেটাই তো একধরনের অশ্লীলতা। একুশ শতকের শেষেও বিজ্ঞানের এত শত শত আবিষ্কার আর প্রগতির পরেও নারীকে বাঁচতে হয় কারুর স্ত্রী কিংবা মা হয়ে। নারীর পরিচিতি কেন শুধু নারীর সত্তার আকাঙ্ক্ষা দিয়েই হবে না। কেন সম্পর্কের আধারে তাঁর বেঁচে থাকা? কেন সমাজে তার অবস্থান নিয়েই রাজনীতি চলে অনাদিকাল থেকে, শত প্রগতি সত্বেও নারীর স্বরূপ নির্মাণ তাই অধরা থেকে যায়। মেয়েদের বিয়ের পর বদলে ফেলতে হয় পদবী, ডিভোর্সের পর লিখতে হয় ‘ডিভোর্সি’। আর কতটা পথ শিকল ভেঙে পেরোতে পারলে একজন মহিলা “সম্পূর্ণ নারী” হয়ে উঠতে পারে? তার মনের কথা, তার শরীরের কথা বলতে পারে নির্দ্বিধায় উচ্চকিত কণ্ঠে! সগৌরবে বলতে পারে তার গোপন ইচ্ছে? নারী চেতনা বলে কেন আলাদা কিছু তুলে ধরা হবে? এটাও কি সেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বুর্জোয়া ফসল। আদৌ আলাদা কিছু হয়? নাকি সেটাও নারীকে মানুষ হিসেবে না দেখার পুরুষের রাজনীতি! সিল মারা খণ্ডিত চেতনা বোধ দিয়ে নারীকে তুলে ধরা! লিঙ্গ রাজনীতির এও আরেক রূপ। অথচ নারী পুরুষ নির্বিশেষে সভ্যতার ইতিহাস রচনা করে চলেছে হাজার হাজার বছর। কিন্তু সেতো কেবল জীবনানন্দের হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা নয়, বরং বোধের কাছে নতজানু হয়ে প্রশ্ন করার: আদৌ কি আমরা মানবিক হয়ে উঠতে পেরেছি? নারীকে মানুষ হিসেবে দেখেছি? নাকি তাকে শুধুই নারী করেই রাখতে চেয়েছি? নাকি নারী মানুষ হয়ে ওঠাই আজকের নারীর সংগ্রাম।

এমনই অসংখ্য ভাবনা নিয়ে পর্তুগালের তিন লেখিকা ঠিক করলেন একসঙ্গে একটি বই লিখবেন।যে বইটি হবে না কোনো নারী লেখকের গল্প বা কবিতা, বরং হবে সৃজনের নানা রূপে নারী ভাবনার কোলাজ। সেটা হতে পারে নারীর গল্প, নারী আন্দোলনের নিয়ে প্রবন্ধ, নারী সমাজ রাষ্ট্রের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে অন্বেষণ — আমি কে? আমরা কারা? এই অন্বেষণ ভেঙে ফেলেছে পুরোনো ভাবনার অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তির বুনিয়াদি ধারণার গোড়ায় করছে আঘাত। তৈরি করেছে নতুন পথ। সেটা নিয়েই — এই তিন মারিয়া লিখে চলেছেন একটা একটা করে শব্দ — আগামীতে নারী মুক্তির দিশা।

তিন লেখিকা তাই ঠিক করলেন তারা খুঁজবেন নিজেদের সত্তা। নিজের অস্তিত্ব। মুখোমুখি হলেন সমাজ ও রাষ্ট্রের, নারী শরীরের কথা বলতে চাইলেন। সেটা সমাজের কানে মনে হল অশ্লীলতা। তাদের অস্তিত্বের কথা বলতে চাইলেন। সেটা রাষ্ট্রের মনে হল ঔদ্ধত্য।পুরুষরা বলল,অসভ্যতা। তাহলে নারীর নিজের অস্তিত্ব? তাঁর নিজের ভাষা কোথায়? স্বাধীনতা কোন নিরিখে? তিন মারিয়া আত্ম অন্বেষণের পথ ধরে লিখে চলেন নব যুগ সৃষ্টিকারী বই : New Partugese Letters (পর্তুগিজ ভাষায় লিখিত মূল গ্রন্থ : As Novas কার্টেসি Portuguesas):

Letters মানে কি? ‘অক্ষর’। অন্য অর্থে ‘বার্তা’।

এমএম

স্বাধীনতার অক্ষরে নারী চেতনার বইটি তিন নারী লেখিকা লিখলেন জগতকে নতুন বার্তা দিতে। তৎকালীন পর্তুগালের কঠোর সেন্সরশিপকে তোয়াক্কা না করে একনায়ক আন্তোনিও সালাজারের প্রতিষ্ঠিত ‘এস্তাদো নোভো’ শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরেন।পর্তুগিজ সরকারের রাজনৈতিক পুলিশের নির্ধারিত নৈতিক মানদণ্ডে বইটি ঘোষিত হল “নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী” বলে। নারীর নিজের ভাষায় লেখা প্রথম, যে ভাষা জন্ম নেয় মেয়েদের নিজস্ব চেতনার গর্ভে, শত চক্রান্ত করেও পুরুষ সমাজ তাকে মেয়েলি বলে উপেক্ষা করতে পারে না। বইয়ের তোলা প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে সমাজ দাঁড়ায় খাদের কিনারায়, তিন মারিয়া বদলে দিতে চায় রাষ্ট্রের ভাষা। ফ্যাসিস্ট পর্তুগিজ সরকার প্রমাদ গুনল। বইটির চাইতেও রীতিমত বিপজ্জনক হয়ে উঠল তাঁদের কাছে এই তিন নারী। তারা “অশ্লীল” বলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। সরকারের বক্তব্য, লেখিকাদের প্রতিটা অক্ষর বার্তা দিয়েছে বিপথগামিতার, তারা বই লেখে নি, তৈরি করেছে আগামী প্রজন্মের মানসিক ও নৈতিক দূষণের আধার। তাই শুধু বই নিষিদ্ধ নয়, শুরু হল তাদের বিরুদ্ধে মামলা। দোষী সাব্যস্ত হলে লেখিকাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড! সোচ্চার হলেন সমাজ প্রভুরাও — এত বড় স্পর্ধা যে তিনটি মেয়ে চার্চের বিধান নিয়ে প্রশ্ন তোলে? শাসকের নৈতিকতার ভিত্তিতে আঘাত হানে? স্বাধিকারের প্রশ্ন তুলে এমন স্বেচ্ছাচারিতা ?

সব দেশের ফ্যাসিস্ট সরকার গড়ে ওঠে কট্টর সমাজের গর্ভে। তিন লেখিকাকে নিশ্চিহ্ন করাই হয়ে উঠল সমাজ ও রাষ্ট্রের পবিত্র কর্ম।

অদম্য সংগ্রামী তিন লেখিকা গোপনে তাঁদের বইটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রগতিশীল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেষ্টা চালালেন। যেমন ভাবনা তেমন ঝুঁকি। তবু বহু চেষ্টায় বন্ধুদের হাত দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে দিলেন নারী আন্দোলনের প্রখ্যাত নেত্রী মার্গারেট ডুরাস এবং কিংবদন্তি ফরাসী লেখিকা ও চিন্তাবিদ সিমন দ্য বোভোয়ার কাছে। বইটি পড়ে তাঁরা শিহরিত হলেন। তিন লেখিকার তোলা প্রশ্ন নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার নানা দেশের রাজপথে নামল মুক্তচিন্তার নারীরা। তিন লেখিকার মুক্তির দাবিতে ফ্যাসিস্ট পর্তুগাল সরকারের উপর তৈরি করতে থাকলো আন্তর্জাতিক চাপ। ইউরোপ আমেরিকার নারী আন্দোলনের পোস্টার গার্ল হয়ে উঠলেন তিন মারিয়া। এদিকে মামলা চলাকালীন অবস্থাতেই ১৯৭৪ সালের ২৫শে এপ্রিল পর্তুগালে ঐতিহাসিক ‘কার্নেশন রেভল্যুশন’ (Carnation Revolution) বা লবঙ্গ বিপ্লব ঘটে, যার ফলে ৪৮ বছরের একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের পতন হয়। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত আইনি অভিযোগ খারিজ করে দেয়। এই সবই ছবির পটভূমি, যদিও বিষয় দেশ কাল সীমানা পেরিয়ে নারীর আপন সত্তা। আসলে এই লড়াই অনিবার্য ছিল। কারণ উত্তর উপনিবেশ যুগে রাষ্ট্র যখন নিজের জনগণকেই মুঠোয় রেখে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তখন তিন মারিয়া চেয়েছে তাদের মুষ্টি আলগা করতে। তাই সংঘাত ছিল, সেটাই অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

এমন এক ঐতিহাসিক সংগ্রামের তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করেছেন সাংবাদিক গবেষক পরিচালক লুইসা মারিনহো এবং লুইসা সেকেইরা। ছবি জুড়ে ১৯৭২ সালে পর্তুগালের লিজারভ একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার (Estado Novo) পটভূমিতে তিন নারী লেখক — মারিয়া ইসাবেল বারেনো, মারিয়া তেরেসা হোর্তা এবং মারিয়া ভেলহো দা কস্তা (যাঁদের একত্রে ‘Three Marias’ বলা হতো) — কর্তৃক রচিত “New Portuguese Letters” (Novas Cartas Portuguesas) বইটি এবং লেখিকা তিন মারিয়ার সাক্ষাৎকার। মাঝে মাঝে আসছে নানা ঘটনার ফ্ল্যাশ ব্যাক। তবে এই ছবির ট্রিটমেন্ট খুব গতানুগতিক। ক্যামেরা ছবিটিকে স্লো করে দিয়েছে। ছবিটি সংলাপ ভারাক্রান্ত। পরিচালনায় অনেক পরিসর ও সুযোগ ছিল একটা গতিময় ইতিহাসের সংগ্রাম উপস্থাপনার। সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে পটভূমির দৃশ্য বুনে ছবিটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট পরিসর ছিল। কিন্তু পরিচালক সচেতনভাবে তার বদলে চাইলেন তিন মারিয়ার ব্যক্তিত্বের প্রতিষ্ঠা। তাদের মননের অনুপুঙ্খ চিত্রায়ন। ক্যামেরা তাই তিন মারিয়ার মুখ থেকে সরে না। মাঝে মধ্যে কেবল বিগ ক্লোজ আপে ধরে হাতের সিগারেট। এমনকি তাদের অন্তর্বাস।আসলে এটাও তো তাঁদের ব্যক্তিত্ব নির্মাণে নারীবাদী মন্তাজ।তথ্যচিত্রটিকে খুব সহজেই ওই সময়কার উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ধরা যেত,সামান্য কয়েকটি দৃশ্যে সেটা পেলাম, কিন্তু সব শেষে ওই বই ও বইয়ের বক্তব্য ত্যাগ করে লেখিকাদের ভাবনা ও চিন্তাকে তুলে ধরাই দুই পরিচালকের উদ্দেশ্য বলে মনে হয়েছে। নারীবাদ পেরিয়ে নারী মননের অন্তর্দ্বন্দ্বে নারী চেতনার বিকাশের সংগ্রাম তুলে ধরা এই ছবির উদ্দেশ্য। তাই সংলাপ কেন্দ্রিক, স্থির চিত্র, তথ্য নথি বিশ্লেষণের গবেষণার ঠাসবুনোটে সিনেমার এগিয়ে চলা। পুরোনো চিঠিপত্র, আইনি নথিপত্র, সংবাদপত্রের কাটিং এবং তৎকালীন ফুটেজের পরিমিত ব্যবহার ছবির প্রামাণ্য রূপটিকে আরও জোরালো করে। শেষ দৃশ্যে একটাই প্রশ্ন গলার মধ্যে দলা পাকিয়ে উঠে আসে : নারীকে যাঁরা বিচার করে, তাঁরা (স্ত্রী/পুরুষ) মানুষ হয়েছে তো?

What Words Can Do! সিনেমাটি নারীকে দেখবার চোখ বদলে দেয়। দুই পরিচালক বুঝিয়ে দেন, মানুষ নিজে না বদলালে সমাজের রাজনীতিও বদলায় না। রাজনীতি দিয়ে সমাজ বদল একটা মিথ! বদল চাই প্রথমে শিক্ষায়, চিন্তায়, সংস্কৃতিতে তবেই একটা বিপ্লবের পটভূমি তৈরি হতে পারে, সমাজকে এগিয়ে দিতে পারে। পথ আর যুক্তি যাই হোক, মানুষকে স্বাধীন ও প্রকৃত মুক্ত করতে হলে সমাজকে মানবতায় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে নিত্য অনুশীলনে। তবেই শুদ্ধ হবে রাজনীতিও। তাই লড়াই শুধু ক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, লড়াই আমাদের নিজেদের মন-মানসিকতা-চেতনার বিরুদ্ধে, একই সঙ্গে চেতনার সংকীর্ণতার বিরুদ্ধেও। What Words Can Do! এর চাইতে আর বেশি কী চায় নারীরা?

ফ্যাসিস্ট সরকার নিজের শক্তি গড়ে তোলে জনচেতনতার সংকীর্ণতাকে উপজীব্য করে। তারপর সেই জনচেতনা ভেঙে চুরে দুমড়ে মুচড়ে নিজের জন্য ক্ষমতার অনুসারী একটা ন্যারেটিভ তৈরি করে। সেই জন্যই নারীকে প্রতীক ও দুর্বল করে উপেক্ষা করার রাজনীতি চালিয়ে যেতে হয়। অথচ ইতিহাসের শিক্ষা এটাই যে সেই নারীই এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, প্রতিস্পর্ধী প্রাচীর গড়ে স্বাধীনতা ও স্বাধিকার রক্ষার লড়াই করে। আদ্যন্ত নারীবাদী এই ছবি দুই পরিচালক লুইসা মারিনহো (Luísa Marinho) লুইসা সেকেইরা (Luísa Marinho) র গুণে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অনুসন্ধানের কষ্টিপাথর, যা একাধারে প্রতিহত করতে পারে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি,অন্যদিকে বিনির্মাণ করে দক্ষিণপন্থী শক্তির মোকাবিলায় পথ। ছবিতে পরিচালক তাই প্রতিষ্ঠা করেন নতুন সত্য।

তিন মারিয়ার সংলাপে শোনা যায় :

“আমি বলি: আমেরিকায়, অন্যান্য বহু দেশের মতোই, আইন পরোক্ষভাবে নারীদের ওপর এক অদ্ভুত ধরনের ‘মৃত্যুদণ্ড’ প্রয়োগকে সুরক্ষা দেয়, যা তাদের নিজেদের শরীরের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ’ থেকে বঞ্চিত করে এবং ফলস্বরূপ তাদের অবৈধ গর্ভপাতের দিকে ঠেলে দেয়; ‘অনুমান করা হয় যে আমেরিকায় প্রতি বছর এই কারণে দুই থেকে পাঁচ হাজার নারী মারা যায়’।” (Barreno, Horta, & Costa, 2020, p. 247)

তাই কি শব্দ আর ধারণা নিয়ে গোটা ছবিতে দুই পরিচালক রেখেছেন একটার পর একটা প্রশ্ন: শেষে দর্শকের মনে লিখে গেলেন: what women can do!

ইতিহাস মনে রাখবে এই ছবি নারীকে একটুও চিনতে না পারার জন্য, কলমকে হাতিয়ার করা নারীকে নতুন করে বোঝার জন্য।

সিনেমায় ভেঙে যাচ্ছে সেই প্রতিবিম্ব: “নারী, অর্ধেক সৃষ্টি নরের, অর্ধেক বিধাতার!” — প্রতিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যাচ্ছেন তিন মারিয়া: “এই সবকিছু আমি তাদের জবাবে বলছি, যারা বলে যে নারীর সমস্যা ক্ষুদ্র-বুর্জোয়া, বুর্জোয়া উৎস থেকে উদ্ভূত, অথচ তারা ভুলে যায় যে বুর্জোয়া শ্রেণি নারীদের ঘামে গড়া ভূমির উপরেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে; এবং আপনার উদ্দেশ্যেও, যখন আপনি বলেন ‘উরুর মাঝখানে আলতোভাবে ও উঁচুতে স্থাপিত চিহ্নটি যেন কোনো কিছুর বিরুদ্ধে মাথা তুলে না দাঁড়ায়’। শব্দ আর ধারণা নিয়ে খেলা করতে বেশ ভালো লাগে — আর সেখানেই, হ্যাঁ, সেখানেই বুর্জোয়া নারী হিসেবে আমাদের আশ্রয়।” (Barreno, Horta, & Costa, 2020, p. 81)।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev