১৯১. জমিদারদের নামে সরকারের কাছে যেসব অভিযোগ-নিবেদন পেশ হয়, তার অর্ধেকই হয় আমি আগে যা বলেছি (যেমন রাজস্ব আদায়ের ফাঁকফোকর তৈরি), সেই কৌশলে করা হয়, অথবা জমিদারদের অজান্তেই তাদের নিজস্ব কর্মচারী (গোমস্তা, নায়েব, দেওয়ান) তৈরি করে ফেলে। বাংলার রীতিনীতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির মনে এই অভিযোগগুলো দেখার পরে হয় বাংলা জুড়ে ব্যাপক নিপীড়নের ধারণা তৈরি হয়, আর উপযুক্ত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি এগুলোয় ষড়যন্ত্রের আভাস পান। সরকারের উচিত প্রতিটি ক্ষেত্রেই সত্য উদ্ঘাটন করা; কিন্তু সেই পথে হাঁটা সব সময়েই অত্যন্ত কঠিন আর জটিল কাজ বলে প্রমাণিত।” [১৮৮]
১৯২. যাঁরা, জমিদারদের পদ ও কর্তব্যের সমস্ত কাজের দক্ষতা, তাঁদের প্রজাদের গভীরভাবে জানা এবং তাঁদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রাখেন, তাঁদের, নিজেদের জমিদারির সমৃদ্ধির প্রতি যত্নশীল এবং সরকারি কর্তব্যের বিশ্বস্ত নির্বাহক বলে মনে করতে অভ্যস্ত, তাঁদের কাছে আমার এই মন্তব্য অস্বাভাবিক বলে মনে হবে। কিন্তু এই মন্তব্য আমার নিজের অভিজ্ঞতা ও অন্যদের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে। আমি নিঃসংকোচে বলতে পারি, যদি সেগুলি ন্যায্য দৃষ্টিতে পরীক্ষা করা হয় এবং স্থানীয় তথ্য ও সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করা যায়, তবে সেই তথ্য খণ্ডন সম্ভব নয়।
১৯৩. ভবিষ্যতের শাসন-নীতির ভিত্তি আবিষ্কারের জন্য, যদি সম্ভব হয়, তাহলে জমিদারদের মধ্যে যে ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলি স্বাভাবিক, এবং অন্যগুলি যা তাদের শাসকদের আচরণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে — এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো স্বৈরাচারী বা পরিবর্তনশীল শাসনব্যবস্থা তার প্রজাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে পারে না। যদি তারা ক্রমবর্ধমান বা ওঠাপড়া করা [রাজস্ব/খাজনা] দাবির মুখোমুখি হয়, তবে তারা উন্নতির দিকে মনোযোগ দেবে না; অথবা যদি তারা উন্নতির চেষ্টা করে, তবে তারা সেগুলি লুকিয়ে রাখতে সজাগ থাকবে। যদি তারা তাদের জমিদারি পরিচালনার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তবে তারা তা পরিচালনার অভ্যাস অর্জনের জন্য উদ্বিগ্ন হবে না, এবং ভবিষ্যতের পরিণতি উপেক্ষা করে বর্তমান সুযোগগুলির দিকে তাকাবে। এইরকম পরিস্থিতিতে, তারা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়; এবং তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হয় একজন প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক বা আপাত-রক্ষক সুরক্ষিত করা। একবার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যা অর্জিত হয়েছে, তারা ধরে নেয় যে, ভবিষ্যতেও একইভাবে, একই রাস্তায় সফল হওয়া সম্ভব; এবং এই অভ্যাসগত নীতির ওপর নির্ভর করে, তারা জমিদারি থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা না নিয়েই, নিজেদের মৌলিক স্বার্থের প্রতি একই উদাসীনতা ও অবহেলা নিয়ে আবারও জমি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
১৯৪. জমিদারদের এই অভ্যাস বা পরিস্থিতির জন্য আমি কোনোভাবেই আমাদের প্রশাসনিক কাজকর্মকে দায়ী করছি না; বরং এই সমস্যার শিকড় অনেক আগেই রোপন করা হয়েছিল জাফর খানের হাতে। সে সময়ে ব্যাপকভাবে জমিদারি কেড়ে নেওয়া, উত্তরসূরিদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো এবং দেশীয় শাসনব্যবস্থায় বিদ্যমান কুখ্যাত দুর্নীতি — যা আমার বিশ্বাস যেখানেই মুসলিম স্বৈরতন্ত্র বা নিরঙ্কুশ শাসন বিদ্যমান সেখানেই দেখা যায় — এসবই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট কারণ।
১৯৫. আমাদের রাজনৈতিক নিয়মকানুন ও নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন এই ত্রুটিগুলো সংশোধনের জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিল না। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা মূলত সমস্যার মূল কারণ উপড়ে ফেলার পরিবর্তে কেবল বাহ্যিক লক্ষণগুলো সংশোধনের কাজেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছিল। তাছাড়া, অভিজ্ঞতা-লব্ধ জ্ঞান থেকেই কেবল যেসব কর্মপন্থা গড়ে ওঠে, আমরা রাতারাতি সেগুলো যে আদৌ গ্রহণ করতে পারব — এমনটা ভাবাও সমীচীন না। স্বৈরতন্ত্রের প্রভাবে গড়ে ওঠা জনগণের স্বভাব — যার মধ্যে সরলতা, প্রতারণা, দাসসুলভ মনোভাব ও নিষ্ঠুরতার অদ্ভুত মিশ্রণ বিদ্যমান — তা এতটাই বদ্ধমূল বলে মনে হতো যে, কেবল নতুন কিছু নিয়মকানুন দিয়ে তা সংশোধন করা সম্ভব ছিল না। সহনশীলতাকে কেউ কেউ অজ্ঞতা বলে ভুল করতে পারত, আবার অন্যদের মনে ভয়ের কারণে এমন সন্দেহের উদ্রেক হতে পারত যে এই নমনীয়তা কেবল সাময়িক; এমতাবস্থায় সরকার আর প্রজারা একে অপরকে ভুল বুঝত; এবং যেখানে প্রথম পক্ষ সেই নীতিগুলো মেনে চলতে দ্বিধা বোধ করছিল — যে নীতিগুলো মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের তাগিদে তারা গ্রহণ করেছিল, মূলত সেগুলোর প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অপব্যবহার বা ত্রুটি প্রত্যক্ষ করার পর — সেখানে দ্বিতীয় পক্ষটি তাদের পুরনো অভ্যাস ও নীতি অনুযায়ীই কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।
কিস্তি ৩৫ টিকা
১৯১ স্তবকের টিকা -শোরর বক্তব্য ছড়িয়ে লেখা গেল “জমিদারদের নামে সরকারের দরবারে যে সব অভিযোগ ও আবেদন জমা পড়ে, তার প্রায় অর্ধেকই আমার পূর্বে বর্ণিত প্রশাসনিক কৌশলগুলির দ্বারা প্রভাবিত — অর্থাৎ, রাজস্ব আদায়ের অসম্ভব চাপ, শাস্তির ভয়, ও প্রশাসনিক জটিলতার ফলে সৃষ্ট বিকৃতি। বাকি অর্ধেকের মধ্যে অনেকগুলিআবার জমিদারদের নিজস্ব কর্মচারীরা — গোমস্তা, নায়েব, দেওয়ান — তাদের মনিবের অজান্তেই তৈরি করে ফেলে, কারণ নিজেদের দোষ ঢাকতে বা রাজস্বের ফাঁক পূরণ করতে তাদের এই জালিয়াতি করতেই হত। যাঁরা বাংলার ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক ও প্রশাসনিক জটিলতা সম্পর্কে অপরিচিত, তাঁরা এই অভিযোগগুলো দেখেই মনে করেন যে জমিদাররা সার্বিক অত্যাচার চালাচ্ছে — কারণ তাঁরা জানেন না যে এই অভিযোগগুলির অর্ধেকই বানোয়াট বা বিকৃত। কিন্তু যাঁদের কিছু অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরা বুঝতে পারেন যে এগুলোর অধিকাংশই প্রশাসনিক জটিলতা, কর্মচারীদের স্বার্থান্বেষী চক্রান্ত, অথবা জমিদারদের নিজেদের মধ্যে বিরোধের ফল। সরকারের উচিত প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা; কিন্তু বাস্তবে তা অত্যন্ত কঠিন ও জটিল — কারণ সরকার নিজেই সেই জটিলতার অংশ, যার অপরিকল্পিত রাজস্ব নীতি ও অদক্ষ প্রশাসন এই বিশৃঙ্খলার মূল কারণ, কিন্তু সেই দায় কখনো সরকার নিজের কাঁধে নেয় না, বরং তা চাপিয়ে দেয় জমিদার বা তাদের কর্মচারীদের ওপর।” শোর এখানে শুধু পর্যবেক্ষক নন; তিনি শাসক। তাই তাঁর বক্তব্য সরকারি স্বীকারোক্তি — তিনি জানেন প্রশাসনিক রেকর্ড কতটা অবিশ্বস্ত। বলেছেন অর্ধেক জাল — কেন? রাজস্ব আদায়ের অসম্ভব চাপ; শাস্তির ভয়; প্রশাসনিক জটিলতা; কর্মচারীদের স্বার্থান্বেষী চক্রান্ত। এই টিকায় সেই স্বীকারোক্তির গুরুত্বকে সামনে আনছি। জন শোরের মিনিটের এই ১৯১ স্তবক শুধু প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ নয় – উপনিবেশিক শাসনের ভণ্ডামির নথি। তিনি জানতেন রেকর্ড অর্ধেক জাল, তবুও তিনি সেই রেকর্ডের ভিত্তিতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি জানতেন যে সরকারই এই জটিলতার মূল কারণ, কিন্তু উচ্চপদে কাজ করা আমলা হিশেবে তিনি কখনো সেই দায় স্বীকার করেননি; বরং সেই দায় চাপিয়েছেন কিছুটা জমিদার, কিছুটা নিজের অধীনস্থ কর্মচারীদের ওপর। অর্থাৎ শোর জানতেন উপনিবেশের অর্ধেক অভিযোগই জাল বা বিকৃত — অর্থাৎ সরকারি কাগজপত্র কখনো নিরপেক্ষ সত্য নয়। এবং বলছেন, বলছেন কর্মচারীরা জালিয়াতি করে; কিন্তু তিনি বলেন না যে সরকারের অপরিকল্পনা এই জালিয়াতির মূল কারণ। শোরের বক্তব্য প্রমাণ করে অভিযোগগুলো জাল হলে, সেই জাল অভিযোগ নারী জমিদারদের বিরুদ্ধে আরও সহজে ব্যবহার করে — তাদের ‘অক্ষম’ প্রমাণ করে জমিদারি দখল করা হত। শোরের এই স্বীকারোক্তিই প্রমাণ, উপনিবেশিক রেকর্ডের ভিত্তিতে লেখা ইতিহাস (যেমন রণজিৎ গুহ-র কাজ) সেই রেকর্ডের বিকৃতিকে প্রশ্ন করে না — বরং তাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করে।
আমরা যেন মাথায় রাখি শোরের বক্তব্য শাসকের স্বীকারোক্তি — আর সেই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই আমাদের উপনিবেশিক ইতিহাসকে পুনর্লিখন করতে হবে।
১৯৩ স্তবকের টিকা
এই স্তবককে আমি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ‘মুখড়া’ (Preamble) হিশেবে দেখতে চাইছি — আমি এই স্তবককে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ‘মুখড়া’ হিশেবে গণ্য করছি কারন এই স্তবক শুধুই নির্দোষ পর্যবেক্ষণ না, বরং আইনের দার্শনিক, নৈতিক ভিত্তি — যা দিয়ে পুরো আইনকে যুক্তিযুক্ত, প্রয়োজনীয় এবং মানবিক বলে প্রচার করা হয়। কেন শোরের এই স্তবক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অলিখিত ‘মুখড়া’ হিসেবে কাজ করে? আমার তুলে আনা বাক্যবন্ধগুলো পড়ুন — বর্তমান জমিদারি ব্যবস্থা অস্থির, অনিশ্চিত ও ষড়যন্ত্রপূর্ণ; জমিদাররা দক্ষ নয়, কারণ তারা সব সময় জমিদারি হারানোর ভয়ে থাকে; রাজস্বের অনিশ্চয়তা উন্নতিকে বাধা দেয়; তাই একটি স্থায়ী, অনিশ্চয়তামুক্ত ব্যবস্থা প্রয়োজন — যেখানে রাজস্ব ও মালিকানা চিরস্থায়ী হবে।
শোর এই মুখড়ায় তিনটে কাজ করেছেন — সমস্যা চিহ্নিত করে বলেছেন। জমিদারি ব্যবস্থার ত্রুটিকে তিনি ‘ষড়যন্ত্র’, ‘অদক্ষতা’, ‘স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ’ বলছেন। কারণ নির্ণয় করেছেন। দাবি ত্রুটির কারণ শাসনব্যবস্থার অনিশ্চয়তা — যাকে হয়ত তিনি ব্রিটিশ বা মুঘল-উত্তর ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখাচ্ছেন। সমাধান প্রস্তাব হলো খাজনা-রাজস্ব-জমিদারির অধিকারের স্থায়িত্ব — অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
কিন্তু মাথায় রাখতে হবে শোর কখনো বলেন না এই অনিশ্চয়তা তৈরিতে ব্রিটিশ প্রশাসন নিজেই দায়ী — অসম্ভব রাজস্ব লক্ষ্য, নিলাম প্রথা, আইনি জটিলতা, কর্মকর্তাদের ইচ্ছাশক্তি। তিনি সেই দায় এড়ান এবং সমস্যাকে জমিদারি প্রথার ‘প্রাকৃতিক’ দুর্বলতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। তারপর সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে ব্রিটিশ-নির্মিত আইন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিশেবে পেশ করেন — যেন এটি ‘উপকারী সংস্কার’।
‘মুখড়া’ আত ভূমিকার পার্থক্য: মুখোশ (আবরণ) : কিছু লুকানোর জন্য। ভূমিকা (প্রস্তাবনা): কিছু ব্যাখ্যা ও যুক্তি দেওয়ার জন্য, যা দিয়ে পুরো আইনটিকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ ও ‘প্রয়োজনীয়’ বলে প্রমাণ করা হয়। শোরের স্তবক আসলে মুখোশও, কারণ তিনি ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থান্বেষী উদ্দেশ্য লুকোন; আবার এটা ভূমিকাও, কারণ এটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পক্ষে যুক্তি তৈরি করে, যা পরে আইনের প্রস্তাবনা বা প্রাককথনে পরিণত হয়। এর আগের স্তবকে আমরা দেখেছি শোরের মিনিটে রাজস্ব কাঠামো পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, অপরিকল্পনা, ভুল পরিকল্পনার পুরো দায় সরকার নিজের কাঁধে নিচ্ছে না। চাপিয়ে দিচ্ছে হয় নিম্নপদস্থ কর্মীদের বা জমিদারদের।”
শোরের ১৯৩ স্তবক এই কৌশলের মুখড়া — তিনি পুরো আইনের ভিত্তি তৈরি করছেন এই চক্রাকার যুক্তিতে — ‘জমিদাররা অস্থির, তাই তারা অদক্ষ’; ‘অস্থিরতার কারণ অনিশ্চয়তা’; ‘অনিশ্চয়তা দূর করতে চাই স্থায়িত্ব’; ‘স্থায়িত্ব দিতে চাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’। কিন্তু এই যুক্তির মূল ফাঁক হলো: অনিশ্চয়তা তৈরির শক্তি ব্রিটিশ প্রশাসন নিজেই, কিন্তু শোর সেই দায় স্বীকার করেন না। তিনি বরং ‘জমিদারি প্রথা’ বা ‘জমিদারদের অভ্যাস’-কে দোষী করেন। পরের স্তবকগুলো পড়লে শোরের অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে।
কেন এই মুখড়া আলোচনা এখনও গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, এই ধরনের ‘ভূমিকা’ বা ‘প্রস্তাবনা’ পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক আর জাতীয়তাবাদী উভয় ঐতিহাসিকই গ্রহণ করেছেন। এমন কি রণজিৎ গুহর মতো পণ্ডিতেরা শোরের যুক্তি থেকেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করেছেন — কিন্তু শোরের ‘মুখড়া’র মধ্যে থাকা দায় এড়ানোর কৌশল আর নারীর প্রতি অবিচার দেখেননি। ইন্দ্রাণী চট্টোপাধ্যায় সেই ফাঁক পূরণ করেছেন।
১৯৪ স্তবকের টিকা
শোর মুসলিম স্বৈরতন্ত্রর কথা বলছেন – সে সব নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হবে – কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা দেখব ব্রিটিশ দুর্নীতিতন্ত্র; পলাশী চক্রান্ত সফল করার মাত্র ৭ বছর ক্ষমতা না পেয়েও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলারা যে দুর্নীতি আর অনাচারের উদাহরণ তৈরি করবেন – যে দুর্নীতি আর অনাচার বাখান লিখে লন্ডনে হইচই ফেলে দিয়েছেন স্বয়ং পদচ্যুত শাসক ভ্যান্সিটার্ট আর আমলা লুস স্ক্রাফটন, সেই ফিয়াস্কো সামলাতে অগিয়ান স্টেবল নামক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা প্রশাসনের ক্লেদ দূর করতে দ্বিতীয়বার পাঠানো হবে ক্লাইভকে এবং দুর্নীতি এতটাই শেকড় গজিয়ে গিয়েছিল যে ক্লাইভ বাংলায় প্রত্যেক আমলাকে সাথে করে সমান্তরাল একচেটিয়া কোম্পানি খুলে বসেবেন আর বন্ধুদের দিয়ে লন্ডনের শেয়ার বাজারকে রিগ করাবেন। তারা আবার অন্য শাসনকে বুক বাজয়ে স্বৈরতন্ত্র আখ্যা দেন।
শোরের মুসলিম স্বৈরতন্ত্র নিয়ে আগামী কিস্তিতে বড়ভাবে আলোচনা করব ঈটন সূত্রে।
১৯৫ টিকা
শোর বর্ণিত প্রথম পক্ষ অনুসৃত মানবিকতা ও ন্যায়বিচার অর্থাৎ বাংলায় বিশ্বের সর্বপ্রথম স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট নীতি প্রয়োগ করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গুণগান গেয়েছেন আর তাঁরই বয়ানে দ্বিতীয় পক্ষই কার্যত দুর্নীতির ধারক-বাহক – তারা বাংলার মুঘল আমলের জমিদারবর্গ।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ