সেদিনটা ছিল দু’হাজার পঁচিশের পাঁচ আগস্ট। উত্তরাখন্ডের উত্তরকাশীর ধরালী বাজারের সোমেশ্বর মন্দিরে তখন দুধমেলা পুজোর আয়োজন চলছে। নববৎসা গাভীর প্রথম দুধধারায় হবে মহাদেবের অভিষেক। গ্রামের প্রায় দু’শ গো পালক ভক্ত সেই দুধ নিয়ে মন্দিরে অপেক্ষারত।
ধরালীর উপরেই মুখওয়া গ্রাম। সেই গ্রামের কিছু মানুষের কানে এল একটা গোঙানির আওয়াজ। এ কিসের আওয়াজ! কোথা থেকে আসছে!
সেই গোঙানির আওয়াজে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ঙ্কর বিপদ! সে যে প্রচন্ড গতিতে পাহাড়ভাঙা, হড়পা বানের আগমনের সংকেত! কোনো কোনো অভিজ্ঞ গ্রামবাসীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানিয়েছিল এটি কোনো বিপদের পূর্বাভাস। বিপদের প্রথম আভাসটি টের পেতেই মুখওয়া গ্রামের মানুষজন পাহাড়ের নীচের গ্রাম ধরালীর লোকজনকে আওয়াজ দিয়ে সতর্ক করে। ধরালীর ভীত, সন্ত্রস্ত কিছু গ্রামবাসী তাই তড়িঘড়ি নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পেরেছিল। কিন্তু তাও শেষরক্ষা হয়নি। ক্ষীরগঙ্গার মেঘভাঙা বৃষ্টিতে, জলপ্লাবনে ভেসে গিয়েছিল মানুষ, তাদের ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, হোটেল, দোকান আরও কত কি! ভয়ার্ত মানুষের আর্তনাদ চাপা পড়ে গেছিল জল আর পাথরের কলরোলে।

এ ঘটনার কিছুদিন আগে নেপাল থেকে রাস্তা তৈরির কাজ করতে এসেছিল অস্থায়ী কর্মী কালী আর বিজয় সিংহ। তারা সেদিন ধরালীর ছাউনি ছেড়ে দূরের ভাটোয়ারিতে কাজ করতে গেছে। ছেলে রয়ে গেছে ধরালীতে। হঠাৎ তাদের ছেলের আর্তকণ্ঠে ফোন “বাবা আমার খুব ভয় করছে। নালায় খুব জল।” ব্যস ঐটুকুই! তারপরেই বাবা-মায়ের সঙ্গে ছেলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অসহায় কান্নার সঙ্গে সেদিন জলের তোড়ে তলিয়ে গিয়েছিল তাদের ছেলে। এছাড়াও আরো কত সন্তান-সহ গরীবের অস্থায়ী ছাউনি। কালী আর বিজয় সেদিন আস্তানা ছেড়ে ভাটোয়ারিতে কাজ করতে যাওয়ার সময় ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি আর কয়েকঘন্টার মধ্যে তাদের জীবনে এমন সর্বনাশ নেমে আসবে!
নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেদিনের অসহায় মানুষগুলোকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল সেনাবাহিনীর জওয়ানরা। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যেও অনেকেই নিজেদের জীবন রক্ষা করতে পারে নি। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে ছ’বার ধেয়ে আসা হড়পা বানে ভেসে গিয়েছিল হেলিকপ্টারের হেলিপ্যাড, তাদের তাঁবু। তবে সোমেশ্বর মন্দিরের উচ্চতা সেদিন ভক্তদের প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিল।
উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার হরশিলের সেই সর্বনাশী উপত্যকাটি এখন দেখে মনে হবে যেন বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাটির নিচে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ধরালী গ্রামের বেশ খানিকটা। ইতস্তত কোথাও স্মৃতি হয়ে জেগে আছে বাড়ির টিনের চাল, ঝুলন্ত বারান্দা, আধভাঙা দরজা। বিপদের সংকেত নিয়ে পতপত করে উড়ছে লাল পতাকা।
এই প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বদলে গেছে এখানকার প্রাকৃতিক মানচিত্র। আশ্চর্য ভাবে সব ভাঙাচোরার মধ্যেই গড়ে উঠেছে চোখকে আরাম দেওয়া টলটলে একটি সবুজ জলের হ্রদ। এই হ্রদের একধারে পাইনের ছায়া মেখে নীল পাহাড়েরা নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। বরফমুকুট পরা পর্বতশ্রেণিও আগলে রেখেছে হঠাৎ জন্ম নেওয়া প্রকৃতির এই পাগলামোকে। এই হ্রদের জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে ভূতত্ত্ববিদদের মনে বহু সংশয়, জিজ্ঞাসা। আমরা সাধারণ মানুষ কেবল বিস্মিত চোখে দেখি — প্রকৃতির এই রহস্যময়, অদ্ভুত লীলাখেলা।

ধ্বংসস্তূপের পাশের পথ দিয়েই পৌঁছনো যায় গঙ্গোত্রী ধাম। গাড়োয়াল হিমালয়ের সে পথ কখনো ভয়ঙ্কর, কখনো সুন্দর। গঙ্গা সেখানে কখনো চলেছে পাশে পাশে পথের সঙ্গী হয়ে। ছোটো ছোটো পাথরে ধাক্কা খেয়ে সে নাচের ঘূর্ণি তুলেছে। কখনো আবার কঠিন পাথরের খাঁজে গিরিখাত তৈরি করে অনেক নিচে দিয়ে বইছে। সে দিকে তাকালে প্রকৃতির অসীম ক্ষমতা আর নিজের ক্ষুদ্রতাকে অনুভব করা যায়!
গঙ্গোত্রীতে অবশ্য মকরবাহিনীর যাত্রাপথের সৌন্দর্য বাধিত হয়েছে সভ্যতার করাল গ্রাসে। সেখানে এখন সারি সারি মূলীপরান্ঠা-গোভী মাঞ্চুরিয়ানের রেস্তোরাঁ, দশকর্মা ভান্ডার, যাত্রীদের বিশ্রাম নেবার জন্যে তৈরি করা হোটেল বা হোম স্টে।
জনশ্রুতি, বস্তুবাদী ঋষি চার্বাকের আশ্রম ছিল এই গঙ্গোত্রীতেই। তাঁর দর্শন ছিল, “অর্থ-কামৌ এব পুরুষার্থৌ” অর্থাৎ অর্থ ও কামই জীবনের প্রধান লক্ষ্য। চার্বাক দর্শন অনুসরণ করেই কি এখানে ব্যবসাপত্তরের এমন রমরমা!
যদিও একটি দুটি ছাড়া সব দোকানের ঝাঁপ এখন বন্ধ। এপ্রিলের মাঝামাঝি পুণ্যার্থীদের চারধাম যাত্রার সঙ্গে এদের ব্যবসা আবার চালু হবে। ছ’মাসের ব্যবসায় লাভ করে এঁরা বাকি ছ’মাস শীতঘুমে যান বা অন্য কাজে মন দেন।

শীতকালে মা গঙ্গাও ভক্তদের কাঁধে চেপে গঙ্গোত্রীর মন্দির থেকে উত্তরকাশীর হরশিল উপত্যকার মুখওয়া গ্রামে পৌঁছে যান। সেটি নাকি তাঁর মাঈকা বা পীহর। মেয়েদের বড় আবেগের বাপের বাড়ি?! সেই সময়টাতে বরফছাওয়া গঙ্গোত্রীতে তাঁর মন্দিরের কপাট বন্ধ। অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যতিথিতে ভক্তজনকে দর্শন দিতে দেবী আবার ফিরবেন গঙ্গোত্রীতে। প্রায় পনেরো জন পুরোহিতের কাঁধে চেপে, ডোলী বা পাল্কিতে দুলতে দুলতে, বাদ্যি বাজিয়ে দেবীর গ্রীষ্মকালীন যাত্রা। সাতাশ কিলোমিটার পাহাড়ি পথে তিনি রাতে বিশ্রাম নেন ভৈরবনাথ মন্দিরে। সেখানে আবার একতরফা পুজোপাঠ। ভক্তদের হর্ষোল্লাস। তখন এই গোটা পথ পুণ্যার্থীদের ভিড়ে, দোকানদার হাঁকাহাঁকিতে, গাড়ির হর্ণে সরগরম। পান্ডাদের দমফেলার ফুরসত নেই। তবু তারি মাঝে কোনো পূজারি ভক্তদের শোনাবে হরশিলের নামমাহাত্ম্য কথা। কোনো এক সময় জালন্ধরী আর ভাগিরথী নদী ক্ষমতার আস্ফালনে ঝগড়ায় মেতে উঠেছিল। সে অশান্তি ছড়িয়ে গিয়েছিল এই সুন্দর উপত্যকায়। ঝগড়া থামাতে তখন স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু এই দুই নদীর সংগমস্থলে নিজেকে শিলা রূপে স্থাপন করলেন। অশান্তি দূর হল। হরির সে শিলাস্থান পরিচিত হল হরশিল নামে।
হরশিলের বাগোরীতে মাউন্টেন ভিউ রিসর্টের ম্যানেজার লছ্মী নারায়ণ সিং অবশ্য ধর্মাধর্মের এত কথা জানে না। সে শুধু জানে এমন পাহাড়ভাঙা বৃষ্টি আর ধ্বংস নিয়েই গাড়োয়াল হিমালয়ে পাহাড়ি মানুষদের জীবন। রিসর্টের পেছনেই কাঠের খুঁটি দিয়ে কোনোরকমে ঠেকানো একটা ঘর আছে তার। শীতে প্রায় এক হাঁটু বরফ জমে যায় গ্রামে। তখন ঐ কাঠকুটোই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। বনের কাঠ জ্বেলে আগুনের তাপ নেওয়া আর রাগী দিয়ে তৈরি কাচ্চী শরাবে শীত নিবারণ। বরফের দিন পার হলেই রিসর্টে ট্যুরিস্টরা আসতে থাকে। তখন বরফচূড়ায় সেজে ওঠে রাজাধিরাজ হিমালয়। পাইন গাছে ফল ধরে। মরশুমী ফুলে সাজানো হয় রিসর্ট। পাখিরা গান গায়। শুকিয়ে পড়ে থাকা কঙ্কালসার আপেল বাগানেও নতুন পাতা আর ফুল। ম্যানেজার সিংয়ের সেসময় কি একটা কাজ! ছোটুকে সঙ্গে নিয়ে ঝাড়ু দেওয়া, ঘরদোর পরিষ্কার করা, কোন গেস্ট কোন ঘরে জায়গা পেল তার হিসেব রাখা, গেস্টদের খাবার পরিবেশন আরো কত কি!

লছ্মী নারায়ণের বৌ ছেলেমেয়েকে নিয়ে দেহরাদুনে থাকে। মেয়ে তার সেখানকার কলেজে পড়ে। ছেলে যে কি পরীক্ষার তৈয়ারি করছে তা তার জানা নেই। আগে তীজ-তিওহারে বিবি ছেলেমেয়েকে হরশিল আসত। এখন নাকি তাদের শহর ছেড়ে এখানে আসতে মন লাগে না!
তাদের বাগোরী গ্রাম এখন প্রায় শুনশান। জীবিকার তাড়নায়, ধ্বংসের আশঙ্কায় গ্রামবাসীরা শহর অভিমুখী। কতকালের পুরনো কাঠের ঘর বা ‘ছানি’গুলো বেশির ভাগই তালাবন্ধ। যাত্রা শুরু হলে কিছু কিছু ঘরে অবশ্য হোমস্টে চালু হয়। লছ্মী নারায়ণের পড়োশন পূরণ দেবীও হোমস্টের ব্যবসা চালায়। হাসিখুশি পূরণের একটা ছোটো দোকানও আছে। সেখানে সে উলের তৈরি সোয়েটার-টুপি বিক্রি করে। পূরণ জাতিতে বৌদ্ধ। তাদের তুষারঢাকা উপত্যকায় লোসার বা নববর্ষের দিনটিতে যেন নতুন সূর্যের আগমন। প্রার্থনা, নাচ আর হাসিতে ভরে ওঠে পাহাড়ি জনপদ। উৎসবের দিনে পূরণ লছ্মী নারায়ণকে একলা থাকতে দেয় না। ডেকে নেয় তাদের উৎসবে। একসঙ্গে নাচে, গায়। ফুরসত পেলে তারা দুটিতে সুখদুঃখের দুটো কথা বলে। রিসোর্টে ভালোমন্দ খাবার কিছু বাঁচলে ম্যানেজার লছ্মীনারায়ণ লুকিয়ে লুকিয়ে পূরণকে এনে খাওয়ায়। গ্রামের লোক অবশ্য তাদের নিয়ে মন্দকথা বলে! তা বলে বলুক! সে তোয়াক্কা করে না। লছ্মী নারায়ণের এই একলা, কঠিন জীবনে পূরণ যে একফালি রোদ্দুর! শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় বুদ্ধের মন্দির থেকে ভেসে আসা ঘন্টাধ্বনির মতই পূরণের ভালোবাসা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।