চট্টগ্রাম।
ইতিমধ্যেই আমরা উল্লেখ করেছি যে, চট্টগ্রামকে আইন-ই-আকবরীতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক অংশ হিসেবে দেখানোটা আইনানুগ ছিল না (বিমস চট্টগ্রাম সরকার সম্বন্ধে লিখছেন: “এই সরকার ১৬৬৫-র আওরঙ্গজেবের রাজত্বকাল পর্যন্ত বিজিত হয়নি [মীর জুমলার মৃত্যুর পরে বাঙলার নবাব হয়ে আসেন শায়েস্তা খান, মির্জা আবু তালিব; তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান চট্টগ্রাম বিজয় করে সেখানকার প্রথম ফৌজদার নিযুক্ত হন। ১৬৬৬-তে মগ আর পর্তুগিজ জলদস্যুদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের মুঘল পুনরুদ্ধারের অভিযানে শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান, প্রধান সেনাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; শিহাবুদ্দিন তালিশের ফাতিহাইব্রিহা বইতে এই অভিযান বিশদে উল্লিখত হয়েছে – অনুবাদক]। পরগনাগুলোর বর্তমান নাম বঙ্গ বিজয়ের সময় থেকেই চালু ছিল, আইন-ই-আকবরীতে উল্লিখিত নামের সাথে এই অঞ্চলের সংযুক্তি কোনোভাবেই মেলে না, এবং আমার মতো যারা এই জেলার সাথে অনেকটা বেশিই পরিচিত, তাদের কাছেও এটি এখনকার প্রচলিত কোনো স্থানীয় নামের কথা মনে করিয়ে দেয় না।” জার্নাল অফ দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৮৯৬, পৃষ্ঠা ১৩৪-৩৫) ত্রিপুরার সুবিস্তৃত হিন্দু রাজ্যের একটা অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম কিছু সময়ের জন্য বাংলার আফগান রাজাদের অধিকারে এসেছিল বলে মনে করা হয়। মুঘল শক্তি এবং আফগান রাজাদের মধ্যে সংগ্রামের যুগে চট্টগ্রাম আরাকানের রাজাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং ষোড়শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এই চট্টগ্রাম অঞ্চল মগেদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ ছিল। কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ কিংবদন্তী অনুসারে, ১৬৩৮-এ আরাকানের রাজার পক্ষে চট্টগ্রাম শাসনকরা মগ সর্দার ঢাকার দরবারে পৌঁছে, এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ভার তৎকালীন সুবাদার ইসলাম খানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, এবং বলা হয় এই ঘটনার মধ্যে দিয়েই চট্টগ্রামের, ইসলামাবাদ নামকরণের ব্যাখ্যা করা যায়। তবে নথিপত্র সূত্রে নিশ্চিতভাবে করে বলা যায় ১৬৬৬-তে সুবাদার শায়েস্তা খান বিশাল নৌবহর এবং পদাতিক সেনাবাহিনী পাঠান এবং চট্টগ্রাম অবরোধ করে দখল নেওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম বাংলার মুঘল প্রদেশের অন্যতম সীমান্ত অঞ্চলে পরিণত হয়। এখানেও একসময় পর্তুগিজদের বড় বসতি ছিল; চট্টগ্রাম ছিল তাদের ‘পোর্তো গ্রান্দে’, ঠিক যেমন ছিল উত্তর-পশ্চিম দিকের নদী বন্দর সাতগাঁও। হুগলি ছিল তাদের পোর্তো পিকেনো। (দেখুন হ্যাকলুইটের ভয়েজেস-এ সিজার ফ্রেডেরিকের ভ্রমণকাহিনী (১৫৬৩-৮১ খ্রিস্টাব্দ) (এভরিমান’স লাইব্রেরি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৩৬ ও ২৩৭। বেঙ্গল: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮৩-৮৪ এবং খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৮)
১৭৬০-এর ডিসেম্বরে, নবাব মীর কাসিম, চট্টগ্রামের প্রশাসনিক অধিকার ইংরেজ কোম্পানিকে সমর্পণ করার পর, ফোর্ট উইলিয়ামের কাউন্সিল হ্যারি ভেরেলস্ট এস্কোয়ারকে (ভেরেলস্ট ১৭৪৯-এর ১৬ই জুলাই বাংলায় এসেছিলেন, এবং ১৭৫৬-তে তিনি জুগদিয়া কুঠিতে দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে কর্মকাল কাটান, এবং সেখান থেকে ফলতার আশ্রয়প্রার্থীদের সাথে যোগ দেন। রামবোল্ডের [টমাস রামবোল্ড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌবাহিনীর কর্মকর্তা উইলিয়াম রাম্বোল্ডের তৃতীয় পুত্র। ১৬ বছর বয়সে কোম্পানির চাকরিতে রাইটার হিসেবে যোগদেন। তারপর কোম্পানির সামরিক চাকরি। ১৭৫৭-য় ক্যাপ্টেন হয়ে পলাশীর যুদ্ধে ক্লাইভের সহকারী। পরবর্তীতে আবার সিভিল সার্ভিস। ১৭৬৩-তে পাটনার প্রধান এবং ১৭৬৬ থেকে ১৭৬৯ পর্যন্ত বেঙ্গল কাউন্সিলের সদস্য; ১৭৭১-এ বাংলার সম্ভাব্য গভর্নর হিসেবে তার নাম উঠে এলেও সেই পদে ওয়ারেন হেস্টিংসকে পাঠানো হয়। ১৭৬৯-তে রাম্বোল্ড প্রচুর সম্পদ নিয়ে ব্রিটেনে ফিরে ১৭৭০-এ কুখ্যাত দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ব্যয়বহুল বরো [তাচ্ছিল্যের নাম পকেট বরো] নিউ শোরহ্যামের এমপি হিসেবে সংসদে নির্বাচিত হন – অনুবাদক] পরবর্তী বছরগুলিতে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির গভর্নর হয়েছিলেন; তাকে ব্যারন উপাধিও দেওয়া হয়। ত্রিপুরা অভিযানে কিছুটা সাফল্য পাওয়া আর. ম্যারিয়ট কাউন্সিলে প্রথম মীর জাফরকে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দেন। তিনি বেনারসের টাঁকশাল নিয়ে ব্যাপক সমস্যায় ভুগেছেন এবং লর্ড ক্লাইভেরও রোষানলে পড়েছেন। পরবর্তী বছরগুলোয় তিনি বালেশ্বর কুঠির কুঠিয়াল ছিলেন) চট্টগ্রামের প্রধান, টমাস রামবোল্ড এবং র্যান্ডলফ ম্যারিয়টকে তাঁর কাউন্সিলের সদস্য, ওয়াল্টার উইলকিন্সকে কুঠির সহকারী এবং গোকুল চাঁদ ঘোষালকে (ঘোষাল পরিবার সম্পর্কে তথ্যের জন্য দেখুন কটন, মেমোর্যান্ডাম অন দ্য রেভিনিউ হিস্টোরি অব চিটাগং; বেভারিজ, দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব বাকেরগঞ্জ) দেওয়ান নিযুক্ত করেন। এই দল ১৭৬১-র ৩রা জানুয়ারি সীতাকুণ্ড থেকে আসার কথা জানায় এবং দু’দিন পর তারা মুহাম্মদ রেজা খানের থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২২শে মে, তারা লেখে, “অশেষ ঝামেলা শেষ করে আমরা অবশেষে এই প্রদেশের রাজস্বের সম্পূর্ণ এবং বিস্তারিত বিবরণ পেয়েছি। যে ব্যক্তিরা এর আগে এখানকার রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল, তাদের জঘন্য উদ্দেশ্য ছিল সব তথ্য গোপন করা এবং যতটা সম্ভব জটিল করে তোলা, যার ফলে আমাদের প্রতিবেদন তৈরি করতে এত বিলম্বিত হয়েছে।” ইংল্যান্ডে পাঠানোর জন্য ভেরেলস্ট আর তার কাউন্সিলের ১৬ই ফেব্রুয়ারির চিঠিতে নতুন অধিগ্রহণকৃত অঞ্চল চট্টগ্রামের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে –
চট্টগ্রাম প্রদেশ রাজধানী (ইসলামাবাদ) থেকে দক্ষিণে প্রায় পঞ্চাশ মাইল ক্রুজ কলি নামে একটা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং এই দক্ষিণাংশ সমুদ্রের সীমানায় গিয়ে শেষ হয়েছে। ওই নদী থেকে পশ্চিমে একটা পর্বতমালা রয়েছে যা দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব দিকে প্রসারিত এবং চট্টগ্রাম জেলাকে আরাকান রাজ্য থেকে আলাদা করেছে; উত্তর-পূর্ব এবং উত্তরে পর্বতমালা আরও বিস্তৃত হয়ে প্রদেশ আর ত্রিপুরার মধ্যে সীমান্ত হিসেবে কাজ করছে; উত্তর, উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিমে বুরা ফেনী নদীতে ঘেরা, এটা গিরিপথের সামান্য নিচে সমুদ্রে গিয়েপড়েছে; ঐ নদী থেকে রাজধানী দিয়ে প্রবাহিত নদীটি, যা সাধারণত চট্টগ্রাম নদী নামে পরিচিত, পর্যন্ত আমরা উপকূলরেখাকে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত বলে অনুমান করেছি, ফলে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রদেশের অংশের সীমান্ত বঙ্গোপসাগর। আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৪,০০,০০০ কানি; কিন্তু এর একটা উল্লেখযোগ্য অংশে খাজনা নেওয়া হয় না, কারণ এই জমিগুলো দান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। এক কানি জমির পরিমাপ হলো বারো নল, এবং প্রতিটি নল আট কবিদ (অর্থাৎ হাত)। এখানকার মাটি সাধারণত খুবই উর্বর, বিশেষ করে সমভূমি ও উপত্যকাগুলোয়, তবে মাঝে মাঝে বালু পাহাড় এবং কিছু পাথুরে পর্বতও আছে; এ সব উঁচু গাছপালায় ঢাকা, এবং এর সীমানার কাছাকাছি অনেক পাহাড়ে বিভিন্ন ধরনের ভালো কাঠ পাওয়া যায়। এই জমিতে প্রচুর পরিমাণে গম আর চাল এবং অন্য সব ধরনের শস্য, তুলা, মোম, তেল, বিভিন্ন প্রকার কাঠ এবং কিছু হাতির দাঁতও পাওয়া যেতে পারে। এখানকার শিল্প দ্রব্য বর্তমানে খুব উন্নত মানের নয়, তবে এর ব্যাপক উন্নতির সুযোগ রয়েছে। এই প্রদেশ এবং অন্য সকল প্রদেশেও মুঘলদের শাসন বিদ্যমান ছিল।
এই চিঠিতে, চট্টগ্রাম কাউন্সিল রিপোর্ট করেছে যে তারা ইতিমধ্যেই আরাকান দরবারে বন্ধুত্বপূর্ণ ভাষায় চিঠি পাঠিয়েছে, এবং তারা আরও লিখেছে টিপ্পেরার দখল নেওয়ার জন্য একটা সনদ ‘মুকসাদাবাদের নবোবের’ কাছে অসম্মানজনক হবে, যা রাজধানী থেকে সেই প্রদেশের বিশাল দূরত্ব ‘যা বেশ কয়েক বছর ধরে উল্লেখ করার মতো কোনও রাজস্ব প্রদানের ক্ষেত্রে এর বাসিন্দাদের খারাপ মনোভাবকে আড়াল করে রেখেছিল।’ ‘তাদের ‘বিশ্বাস করার কারণ ছিল যে এই ধরনের অধিগ্রহণ ‘ইকোঙ্কোর পাহাড়ের মধ্য দিয়ে তিব্বত এবং চীনের উত্তর অংশে প্রবেশের অনুমতি দেবে।’
৫ জুন, ১৭৬১রর প্রতিবেদনে রাজস্বের ইতিহাস এবং বিদ্যমান অবস্থার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
“বুজুগ ওমেদ কাউন, (বুজুর্গ উমেদ খান) শায়েস্তাহ কাউনের পুত্র (বুজুর্গ উমেদ খান বিষয়ে বিশদ জানার জন্য দেখুন স্যার আর. সি. টেম্পলের ডায়েরি অফ স্ট্রেনশাম মাস্টারের সংস্করণ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০১, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮০), আওরঙ্গজেবের চাচা, ১০৭২ বঙ্গ যুগে (১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ) মগদের থেকে দেশটা জয় করেছিলেন। তখন খাজনা আদায় হত না, প্রদেশ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ঢাকা থেকে পরিশোধ করা হত; এবং এই অবস্থায় এটি বহু বছর ধরে ছিল, যতক্ষণ না বাসিন্দারা জমির ব্যাপক বৃদ্ধি এবং উন্নতি করে, দেশের সুরক্ষার জন্য একটি বাহিনী বজায় রাখার জন্য জমিদারদের এই ধরনের চাষাবাদ হস্তান্তর করা হয়। তারা এই কাজটা করার জন্য আরও সক্ষম হয়ে ওঠার সাথে সাথে, ঢাকা থেকে পাঠানো অর্থ ক্রমশ কমতে থাকে; এবং সময়ের সাথে সাথে, এখানকার প্রশাসকেরা জমি থেকে উদ্ভূত সুবিধাগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে খুঁজে পেতে শুরু করেন।” জমিদারদের তাদের সেনাবাহিনীর ভরণপোষণের জন্য জমির সম্পূর্ণ অংশ দেওয়ার পরিবর্তে, এখন কেবল সেই উদ্দেশ্যে একটা অংশ মঞ্জুর করা হল, এবং অবশিষ্ট অংশের জন্য খাজনা আদায় করা হত, এবং ভবিষ্যতে তাদের সরকারে বসতি স্থাপনকারী সমস্ত নতুন বাসিন্দাদের কাছ থেকেও একই কাজ করা হল।” (এইচ.জে.এস. কটন: মেমোর্যান্ডাম অন দ্য রেভিনিউ হস্ট্রি অব চিটাগঙ্গ, কলকাতা, ১৮৮০। মূল ছেঁড়াখঁড়া, বিকৃত দলিল বর্তমান লেখক ১৯০৯-তে দেখেছেন)
প্রতিবেদন থেকে মনে হয় ১১২০ বঙ্গাব্দে (১৭১৩ খ্রিস্টাব্দ) গভর্নর মীর হাদী চট্টগ্রাম জেলার ৬৮,৪২২-১০-৭ টাকা রাজস্ব মুর্শিদাবাদ কর্তৃপক্ষকে জমা দিয়েছেন এবং এটাই আসলি জমা। বাস্তবে গভর্নর আদায় করেছিলেন ১,৭৫,৪৫৮-০-২.৫ টাকা।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ