ফাগরাঙ্গা পিরিতির উৎসব এই দোল। শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার যৌবন রঙে রাঙ্গায়িত প্রকৃতি। প্রেমের দোত্যক কৃষ্ণচূড়ার সঙ্গে যেমন রাধাকৃষ্ণের সম্পর্ক, তেমন সম্পর্ক কদমফুলের সঙ্গেও। কদম্বতলে রাধাকৃষ্ণের যুগলমিলনের ছবি মর্তবাসীর মনের মুকুরে চিরঅম্লান। রাধাভাবে ভাবিত শ্রী গৌরাঙ্গ বিকশিত কদমফুল দেখলেই কৃষ্ণ প্রেমে বিভোর হয়ে যেতেন। এই কদম ফুল ফোটার সময় বর্ষা। অথচ প্রতি বছর বসন্তে দোল পূর্ণিমার ঠিক চারদিন পর চাঁচরের দিন রাধাবল্লভজিউর মন্দির সংলগ্ন কদম গাছে দুটি বা একটি কদম ফুল ফুটবেই ফুটবে। ৩০০ বছরের পুরনো এই মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এই ঘটনার আজও কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের রাধাবল্লবতলায় দোল পূর্ণিমার পাঁচ দিন পর পঞ্চমী তিথিতে পঞ্চম দোল উৎসব পালিত হয়। আজ বলবো সেই পঞ্চম দোলের কথা।
চতুর্থীতে চাঁচরের দিন ভোরবেলা থেকে মানুষজনের ভিড় লেগে থাকে স্বর্গীয় এই ফুলের আকর্ষণে। নয়ন ভরে কদম ফুল দেখে ভক্তরা এগিয়ে যান মূল মন্দিরের দিকে। মন্দিরের সামনে রয়েছে সুদৃশ্য নাটমন্দির আর সামনের মাঠে সুবিশাল দোলমঞ্চ। খুব ভোর থেকেই পুরানো নিয়ম নীতি মেনে মন্দিরে বিগ্রহের মহাস্নান ও অঙ্গরাগপর্ব শুরু হয়। নতুন বাসন্তী কাপড় পড়ানো হয় কৃষ্ণকে আর লাল শাড়িতে সুশোভিতা হয়ে ওঠেন শ্রীরাধিকা। এরপর বিভিন্ন আচার-আচরণ পালন করা হয়। রাতে হয় চাঁচরের বিশেষ পুজো এবং বাজি পোড়ানো।

প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠিত মূর্তি
পরের দিন অর্থাৎ ফাল্গুনের শুক্লপক্ষের পঞ্চমীর দিন এখানে ষোড়শোপচারে পালিত হয় পঞ্চমদোল। সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। প্রাচীন ঐতিহ্য ও পরম্পরা মেনে সকাল থেকে নাম সংকীর্তন সহযোগে শুদ্ধাচারে ওই কদমফুল তুলে এনে শ্রীকৃষ্ণের কর্ণমূলে গেঁথে দিয়ে যুগল-বিগ্রহকে দোল মঞ্চে আনা হয়। এরপর দেবদোলে বিগ্রহ নিয়ে যাওয়া হয় দোলমঞ্চে। সেখানে ফুলদোলনায় বিগ্রহ স্থাপন করে দুদিন ধরে প্রত্যেক প্রহরে ঠাকুরকে দোল দিয়ে ময়ূর পুচ্ছের ব্যজন দিয়ে আরাধনা করা হয়। পরে ভোগ বিতরণ শেষে শুরু হয় দোল খেলা। আবীর গুলাল আর নাম সংকীর্তনের সুরে আনন্দঘন হয়ে ওঠে উৎসব প্রাঙ্গণ। এই দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত চার প্রহরে বিভিন্ন রূপে রাধাবল্লবজিউর পুজো করা হয় দোলমঞ্চে। রাতে বিগ্রহ আবার মূল মন্দিরে শয়নারতির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এবছর পঞ্চমী তিথি থাকবে ৮ই মার্চ (২৩ শে ফাল্গুন) রবিবার রাত ৮ টা ৩০ অব্দি।

বর্তমান প্রতিমা
রাধাকৃষ্ণের পঞ্চমদোল উপলক্ষে আশ্চর্যজনকভাবে অসময় ফোটা এই কদমফুলের রহস্য উন্মোচন করতে বহু মানুষ ছুটে এসেছেন। বিখ্যাত আয়ুর্বেদাচার্য ও উদ্ভিদ বিশারদ শিবকালী ভট্টাচার্য এর যথার্থ ব্যাখ্যা না দিতে পেরে বলেছেন, “where science ends, there the spirituality starts.” তাহলে সত্যি কি এর সঙ্গে রয়েছে কোন দৈবী মাহাত্ম্য!! বহু বিজ্ঞানী, লেখক, গবেষক ছুঁয়ে পরখ করে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু দৈবী মাহাত্ম্যর আবরণ ভেদ করে তা আজও সম্ভব হয়নি।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার আদি গঙ্গার তীরে অবস্থিত মজিলপুর এবং জয়নগর পাশাপাশি অবস্থিত দুটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহর। মজিলপুরের বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ কালিদাস দত্তের মতে, এই বিগ্রহ রাজা প্রতাপাদিত্য নন, তার কাকা রাজা বসন্ত রায়ের গৃহ দেবতা। তার মৃত্যুর পর সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মুঘলদের সঙ্গে যুদ্ধে রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে উঠলে বসন্ত রায়ের আত্মীয় তথা সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের নায়েব মিত্র জমিদাররা এই বিগ্রহ জয়নগরে নিয়ে আসেন।

পাল আমলের মূর্তি
নবাব হোসেন শাহের শাসনকালে নবদ্বীপ থেকে শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর পারিষদদের নিয়ে আদি গঙ্গার তীর বরাবর পদপ্রজে নীলাচল যাত্রা করেছিলেন। সেই সময় প্রাচীন বাংলার উল্লেখযোগ্য বন্দর ছত্রভোগের জায়গিরদার ছিলেন রামচন্দ্র খাঁ লস্কর। নবাবের নির্দেশ মতো তার বাড়িতেই শ্রী চৈতন্যদেবের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। এই ছত্রভোগ বন্দর থেকে নৌকায় নদী পেরিয়ে মেদিনীপুর হয়ে নীলাচলের পথে যান চৈতন্যদেব। রামচন্দ্র খাঁর গৃহ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় শ্রীচৈতন্যদেব রামচন্দ্রকে পরম স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং শ্রীকৃষ্ণ চরণে প্রাণমন সঁপে দেওয়ার কথা বলে যান।
এই ঘটনা মনের মধ্যে এক অলৌকিক ভাবান্তর ঘটায় বিষয়ী পরাক্রমী রাজা রামচন্দ্রের। তারপর থেকেই সর্বদা মানস চক্ষে তিনি যেন শ্রীচৈতন্যদেবের ভাব বিগ্রহ দেখতে পান আর মনের মধ্যে কৃষ্ণকথা ঘোরাফেরা করতে থাকে। এই ঘটনার কিছুদিন পর রাজা তার গৃহে ঠাকুরের কথা মত রাধাকৃষ্ণের যুগলদারু মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

দোলমঞ্চ
রাজা রামচন্দ্র খাঁর গোমস্তা ছিলেন বসন্ত রায়। রামচন্দ্রর মৃত্যুর পর বসন্ত রায় তার বিশ্বস্ত গোমস্তা হওয়ার সুবাদে প্রচুর সম্পত্তির মালিকানা পেয়ে যান। বসন্ত রায় যেহেতু পরম বৈষ্ণব ছিলেন তাই রাজা রামচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত গৃহদেবতা রাধাবল্লবজীউর দেখভালের দায়িত্ব তিনি নেন।
যশোহরাজ প্রতাপাদিত্যের নৌবহর তখন দক্ষিণবঙ্গের আদিগঙ্গা ধরে টহল দিত কিন্তু সুযোগ সন্ধানী মগ বোম্বের দল চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে গ্রামে গ্রামে সন্ত্রাস আল লুটপাট চালাত। এই দল একবার আক্রমণ করলো প্রতাপাদিত্যর কাকা বসন্ত রায়ের খাড়ির কাশীনগরের বসত বাড়িতে। সেখানে ছিল তাদের গৃহ দেবতার রাধাবল্লভজিউ। সেকালের সুন্দরবনের দারু শিল্পীদের তৈরি কাঠের এই অনিন্দ্য সুন্দর রাধাগোবিন্দ যুগল মূর্তি ছিল সত্যি অনন্য। জলদস্যুর দল অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর সঙ্গে মানুষ প্রমাণ উঁচু এই বিগ্রহটি সঙ্গে নিয়ে চলে যায়। পথে নদীর ধারে জঙ্গলে বিগ্রহটিকে তারা ফেলে দেয়। বনে শৃগালের দল রক্তমাংসের মানুষ মনে করে টানতে টানতে নিয়ে চলে যায় বনের গভীরে কিন্তু নীরস কাষ্ঠ বুঝে তারাও শেষমেষ ফেলে রেখে চলে যায়।

দোলমঞ্চ
এরপর বিগ্রহের খোঁজ করতে গিয়ে গভীর বনের মধ্যে থেকে পাওয়া যায়। সেই সময়ে জয়নগরের প্রখ্যাত জমিদার ছিলেন মিত্ররা। এই মিত্র বংশের তৃতীয় পুরুষ মধুসূদন মিত্র উদ্যোগী হয়ে খাড়ি গ্রামের বসন্ত রায়ের কুলোপুরোহিত চট্টোপাধ্যায়দের (যারা পরে সরখেল উপাধি পান) নিজ বাসভবনের চন্ডী মন্ডপে রেখে দেন। পরে সুন্দর একটি টেরাকোটা মন্দির নির্মাণ করে এই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। একসময় এক প্রবল ঝড়ে এই মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরে দক্ষিণ বারাসাতের জমিদার বসু চৌধুরীরা এই মন্দির পুনঃনির্মাণ করে দেন। সময়ের সাথে সাথে টেরাকোটার কাজ লুপ্ত। তার বদলে দখল নিয়েছে টাইলস। যুগলমূর্তির ডান দিকের কৃষ্ণের পায়ে যেখানে শৃগালের দল কামড়ে বনের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ায় ক্ষতসৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে রুপোর পেটিকা দিয়ে বাধানো রয়েছে। রাধাবল্লভজীউ মন্দিরের নিম কাঠের তৈরি রাধা ও বল্লভের (যথাক্রমে ৩ ও ৪ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন) দারুমূর্তি দুটি বিশেষ অভিনিবেশযোগ্য। রাধা কৃষ্ণের এমন অনিন্দ্য সুন্দর বিগ্রহ সারা বাংলায় সত্যি বিরল।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের পঞ্চম দোল মূলত পৌরাণিক কাহিনী এবং বৈষ্ণবীয় প্রেমতত্ত্বের কারণে বিশেষ জনপ্রিয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, দোল পূর্ণিমার দিন বিশাখা, ললিতা, শ্রীচিত্রা, চম্পকলতা, শ্রীরঙ্গ, তুঙ্গবিদ্যা, ইন্দুরেখা প্রভৃতি রাধার অন্তরঙ্গ সখিদের অনেকেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁদের প্রিয়সখা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে রঙ খেলতে পারেননি। তাই ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু কৃষ্ণ দ্বিতীয়া থেকে দ্বাদশী এই তিথিগুলিতে পুনরায় দোল খেলেছিলেন তার প্রিয় গোপিনীদের সঙ্গে। পৌরাণিক এই আখ্যানে বিশ্বাস করে বহুস্থানে এই তিথিগুলোতে দোল খেলা হয়। আর এই নীতি মেনেই জয়নগরে ফাল্গুনী পূর্ণিমার প্রতিপদ থেকে পঞ্চমী এই পাঁচদিন দোল খেলা হয়।

ক্ষেত্র মোহন মিত্র জমিদার বাড়ি
এছাড়া, গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে রাধাকৃষ্ণের দোলের দিন মহাপ্রভুর দোল হওয়া উচিত নয় বলে মনে করা হয়, তাই মহাপ্রভুর জন্য এই পঞ্চম দোল পালন করা হয়।
মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ — এই চার পুরুষার্থের ঊর্ধ্বে ‘প্রেম’-কে পঞ্চম পুরুষার্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, যা এই দিনের উৎসবের প্রতীক।
তথ্যঋণ : সাগর চট্টোপাধ্যায়ের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার পুরাকীর্তি, প্রকাশনা প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহালয় অধিকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার; গবেষক দেবপ্রসাদ পিয়াদার লেখা।