সারা বিশ্বের তাবড় রাষ্ট্রপ্রধান, প্রযুক্তি কোম্পানির বড় কর্তা, নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে আলোচকদের উপস্থিতিতে সদ্য শেষ হল এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে শীর্ষ সম্মেলন। এর আগে ব্রিটেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফ্রান্সে এ ধরনের সম্মেলন হলেও ভারতে এই প্রথম। যদিও আমেরিকা কিংবা চীন যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চলছে, সেখানে ভারত অনেক পিছিয়ে কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য হার্ডওয়্যার এবং কম্পিউটার সিস্টেম বা কম্পিউটিংয়ের যে পরিকাঠামো তার থেকে ভারত অনেকটা পিছিয়ে, ভারতের কাছে এই প্রযুক্তির মালিকানা নেই, তথ্যের উপর একছত্র অধিকার নেই, এই প্রযুক্তি চালাবার জন্য যে ডেটা সেন্টার বা ভিত্তিমূলক মডেল তাও নেই, প্রযুক্তিটির জন্য যে যন্ত্রপাতি ও রসদ দরকার তার জন্যও ভারতকে বিদেশের উপর নির্ভর করতে হয়। প্রশ্ন তাহলে আর সেই সম্মেলন করে লাভ কী? তা কী কেবল ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদর্শন, নাকি রাজনৈতিক ইমেজ গড়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা? কিন্তু না, ভারতের কাছে প্রযুক্তির মালিকানা কিংবা তথ্যের একছত্র অধিকার না থাকলেও ভারতের কাছে মেধা রয়েছে। তার মানে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত মেশিনগুলিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য যে ধরনের প্রশিক্ষিত লোক বা ইঞ্জিনিয়ার দরকার তারা আছেন। বিশ্বের মোট এআই মেধার ১৬% এ দেশেই আছে। তা স্বত্বেও কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, এআই ব্যবহার করে কাজ করার যদি দশটি সুযোগ থাকে তাহলে দক্ষ লোক পাওয়া যায় মাত্র একজন। অথচ এই দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারীদের বিশাল বাজার। এ দেশের কয়েক কোটি মানুষ চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। তবে তা কেবল কয়েকটি ছবি বা ভিডিও বানানো নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার হতে পারে প্রতিটি শিল্পেই। সেই ব্যবহার ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে, স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে এআই সকলের চাকরি খেয়ে নেবে নাতো।
এই আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে এআই ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি প্রায় প্রতিদিনই উৎসাহিত করছে। হয়ত যতখানি প্রয়োজন তার থেকেও বেশি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। তার মানে আমরা ধীরে হলেও অভ্যস্ত হয়ে উঠছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর আমাদের নির্ভরতা বাড়ছে। ক্রমে এটি আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। তাহলে আর এই প্রশ্ন থাকবে না যে আমাদের দেশ কেবল এআই কোম্পানিগুলির ব্যবহারকারী ও ক্রেতা হিসাবেই থেকে যাবে। বরং বলা যেতে পারে আমরা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর আত্মনির্ভরতা খুঁজে পাবো। পেতে হবেই কারণ এই প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে কাজের জায়গাগুলিতে তার উপস্থিতি ইতিমধ্যেই সুতীব্রভাবে জানান দিচ্ছে, অর্থাৎ এআইকে আর দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না। তবে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশ কী এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে পারবে? সদ্য সমাপ্ত এআই ইমপ্যাক্ট সামিট সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটি তো সব নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কীভাবে কৌশলে দেশের উন্নয়নের কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে যথেষ্টভাবে সক্রিয়তা প্রয়োজন। যাতে সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষ এর অংশ হতে পারে এবং অগ্রগতির পথে এগোয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার।
এআই পরিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে ভারত কতটা কী করছে? জানা গিয়েছে এআই মিশনে ভারত ১০,০০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করেছে। এআই-দক্ষ কর্মী তৈরির জন্যও কাজ শুরু হয়েছে। এআই প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য যে চিপ বা সেমি-কন্ডাক্টরের দরকার হয়, ভারত সরকার সেগুলি বানানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। আমাদের সরকার। চিপ বানানোর কারখানা তৈরি হচ্ছে গুজরাট, আসাম ও ওড়িশাতে। ভারতীয় ডেটা সেন্টার বানানোর কাজও শুরু হয়েছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ গুজরাটের জামনগরে গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার বানাচ্ছে। আদানি গোষ্ঠী ও গুগল মিলে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে এআই হাব বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে সম্প্রতি। হায়দরাবাদে এআই ক্যাম্পাস তৈরি করছে। কিন্তু প্রশ্ন, এআই পরিকাঠামো তৈরির জন্য যে প্রযুক্তি ও কাঁচামালের প্রয়োজন এবং বিদ্যুৎ ও জল দরকার, তা কী মিলবে? এআই প্রযুক্তির জন্য সেমি-কন্ডাক্টর চিপ, রাসায়নিক, গ্যাস, সিলিকন ওয়েফারস— প্রায় সবই এখনও পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ভারত শীর্ষস্থানীয় হয়ে উঠতে পারবে কিনা প্রশ্ন উঠছে।
তাই এই ধরনের শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে ভারত নিজেকে মূলধন সমৃদ্ধ প্রযুক্তি উৎপাদনকারী এবং তথ্য সমৃদ্ধ উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিটি সম্ভবনার ক্ষেত্রেই ঝুঁকি হল অটোমেশন। এআই ধীরে হলেও, শ্রমবাজারকে অস্থির করে তোলে আর ভারতের মতো দেশে কর্মসংস্থান একটি বিরাট প্রশ্ন। তাছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্র সহ বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রযুক্তি গবেষণায় পর্যাপ্ত ব্যয়-বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে না হলে এক্ষেত্রে এগনো যায় না। বিপুল অর্থ ব্যয় করে এমন সম্মেলন করে আত্ম প্রচার করা গেলেও এআই সক্ষমতা বাড়ে না। অনেক টাকা লগ্নি যদি আসেও তা দিয়ে যদি কাজের কাজ না হয় তাহলে? তাছাড়া এআই প্রযুক্তি যদি নিজেরা উদ্ভাবন করতে সক্ষম না হয় তবে ধার করা প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রযুক্তি পণ্য তৈরি করা গেলেও দুনিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। অন্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হবে।