পৃথিবীর ভাষিক চরিত্র বিশ্লেষণ করলে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না ‘ভাষা’ — রাজনীতির এক শক্তিশালী হাতিয়ার — যে হাতিয়ার ক্ষমতা এনে দেয়, আর ক্ষমতা এনে দেয় অর্থ। আবার ভাষা প্রাথমিকভাবে একটি জাতির জাতিসত্তার পরিচয়ও বটে। এবার এই জাতিসত্তার পরিচয়ের সাথে রাজনীতির মিশেল হলেই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। একপক্ষ যদি জাতিসত্তাকে মূল্য দিয়ে রাজনীতি করতে চায় ওমনি আরেক পক্ষ তার বিরোধিতা আরম্ভ করে। আর তার ফলে জাতিসত্তার পরিচয় পিছনের সারিতে চলে যায়। সামনে চলে আসে কেবলই দলীয় রাজনীতির খেলা। পৃথিবীর সব দেশেই এমনটি হয় বলছি না। এমনকি আমাদের দেশেও দক্ষিণ ভারতে এমনটি ঘটে না — সেখানে জাতিসত্তার পরিচয় কে সম্মান জানিয়ে তারপর দলীয় রাজনীতি করা হয়। কিন্তু আমাদের বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বাঙালির সার্বিক জাতিসত্তার পরিচয়কে বোধ হয় কখনোই প্রাথমিক শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়নি। যারা এই চেষ্টা করেছেন তাদের কপালে কেবলই অপমান ও বিদ্রূপ জুটেছে। আজ এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদেরই এই কৃতকর্মের ফলাফল আমাদের সমগ্র বাঙালি জাতির জাতিসত্তাকে কীভাবে অপমান করছে, অবহেলা করছে তারই কিছু কথা বলব।
১৯৩৭। প্রথম বাংলা সরকার তৈরি হলো। তখন থেকেই আইনসভাতে বাংলায় বক্তব্য রাখার প্রবণতা দেখা গেল। তবে সেই বাংলা বক্তব্যকে বাংলা ভাষায় ও হরফে ধারাবিবরণীতে রাখা হতো না। ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে হতো। ১৯৩৮ এর মার্চ মাস থেকে বাংলা ভাষায় প্রশ্ন করলে বাংলা ভাষায় ও হরফে কেবল সেই প্রশ্নগুলিকেই রাখা হতো, উত্তর থাকতো ইংরেজি ভাষাতেই। তবে এখানেও শর্ত রয়েছে। কি সেই শর্ত? ৫ আগস্ট ১৯৩৮ — এ মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয় জানিয়ে দিলেন — তিনি যদি সন্তুষ্ট হন যে বক্তা সত্যি সত্যি ইংরেজি জানেন না তবেই তিনি বাংলা ভাষায় বলতে পারবেন। যেমন ওইদিন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় বাংলায় প্রশ্ন করতে গেলে অধ্যক্ষ মহাশয়ের পরিষ্কার বলে দেন যে তিনি জানেন যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভালো ইংরেজি জানেন অতএব — “মিস্টার দত্ত ইউ মাস্ট স্পিক ইন ইংলিশ”। সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয় যে তখন বাংলায় বলতে গেলে ধমক খেতে হতো।আবার ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একটু হোঁচট খেলেই সভাকক্ষে উপস্থিত সভ্যরাই তাকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে ছাড়তেন না। ৮ জুলাই ১৯৪৩ এ বাংলায় বলতে না দেবার আরেকটা কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল। আপনারা সবাই জানেন সেই কারণটা হচ্ছে— বাংলা শর্টহ্যান্ড জানা কর্মীর অভাব। সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার এই নতুন সরকারের আমলে প্রচুর পরিমাণে বেড়েছে — এটা সত্যি ।তবে এখনো — ৮৩ বছর পরেও– সর্বস্তরে সর্বতোভাবে সরকারি কাজে,আমাদের জীবন- জীবিকার কাজে বাংলা ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফাঁক থেকেই যাচ্ছে।
দেশ স্বাধীন হলো। ২১ নভেম্বর, শুক্রবার, ১৯৪৭। দুপুর দুটো। স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবাংলায় প্রথম অধিবেশনে মাননীয় প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ মহাশয় বাংলা ভাষায় প্রস্তাব পাঠ করলেন। অনেকেই ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন— কেউ কেউ বাংলায় আবার কেউ কেউ ইংরেজিতে। তারপরেই কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ হল। জ্যোতি বসু,পরবর্তীকালে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ২১নভেম্বর এবং ২৫ নভেম্বর বাদে, আগা গোড়াই ইংরেজিতে বিভিন্ন আলোচনায় যোগদান করেছিলেন। তবে তখন থেকেই অনেকেই বাংলায় বক্তব্য রাখতে আরম্ভ করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তো বাংলা বুঝতে পারেনা। তাহলে? তাহলে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হবে। কিন্তু ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় পরিষ্কার জানিয়ে দেন (৯ মার্চ ১৯৪৮) — “উই হ্যাভ নো ফান্ডস টু ট্রান্সলেট দ্যাট”। বুঝতেই পারছেন খুবই গোলমেলে ব্যাপার — বাজেটে টাকা রাখলে তো টাকা থাকবে না রাখলে আর কি করে থাকবে! এই গোলমেলে ব্যাপার চলতেই থাকে পরবর্তী নানান সরকারের আমলে নানান কারণ ও ব্যাখ্যা দিয়ে। যার
ফলস্বরূপ সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা নিয়ে অনেকটাই উদাসীন।
ইতিহাসকে আমরা দলীয় রাজনীতির স্বার্থে বারবার বিকৃত হতে দেখেছি। বারে বারে পাঠক্রমও পাল্টে পাল্টে দিয়েছি। তবুও থেকে যায়। যেমন “বিচিত্রা” পত্রিকার আষাঢ় ১৩৪১ (১৯৩৪) সংখ্যার শ্রী সুশীল কুমার বসুর “ভারতের সাধারণ ভাষা” শীর্ষক নিবন্ধটি।সেখানে এক জায়গায় তিনি লিখছেন— “ভারতবর্ষের কোনো এক প্রদেশের ভাষাকে যদি রাষ্ট্রিক ভাষা করা হয় তাহা হইলে সেই প্রদেশের লোকেরা সহজেই অন্যপ্রদেশের লোকদের উপর কতকটা সুবিধা লইতে পারিবেন।…. বক্তৃতা, তর্ক, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা প্রভৃতিতে তাহাদের অপেক্ষাকৃত সুবিধা হইবে। তদ্ব্যতীত নিজেদের ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা বলিয়া অন্যান্য প্রদেশের ভাষা ও সাহিত্যকে কতটা অবজ্ঞার চক্ষে দেখা ইহাদের পক্ষে কতকটা স্বাভাবিক হইবে।”
— বুঝতেই পারছেন দেশ স্বাধীন হতে তখনও ১৩ বছর বাকি, আর হিন্দির পক্ষে জনমত গঠনের কাজ হিন্দি বলের রাজনীতিবিদেরা আরম্ভ করে দিয়েছে। একজন রাজনীতিবিদ তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তার সব গ্রন্থ দেবনাগরিতে ছাপাবার অনুরোধ পর্যন্ত করে এসেছিলেন। আর আমরা — আমাদের মুখ্যমন্ত্রীরা — ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়, সিদ্ধার্থ শংকর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য — সবাই বিভিন্ন সময়ে নানান ঘোষনা করেছেন। কখনও বলেছেন— ১লা বৈশাখ থেকে সরকারি কাজকর্ম সব বাংলায় হবে, কখনও বলেছেন —পঁচিশে বৈশাখ থেকে হবে। কিন্তু কেন হলো না প্রশ্ন করলেই উত্তর পেয়েছেন — কখনও টাইপ রাইটার পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কখনও টাইপ রাইটার কেনার বাজেট নেই, অথবা টাইপিস্ট-স্টেনোগ্রাফার নেই অথবা পরিভাষা নেই — এরকম বিচিত্র সব উত্তর।
আজকের দিনে এই কথাগুলো বললাম এই জন্য যে এই নতুন সরকারের আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার প্রতি উদাসীনতা আর উল্টোদিকে হিন্দির প্রসার প্রচারের ক্ষেত্রে, স্বাধীনতার আগে, রাজনৈতিকভাবে এবং স্বাধীনতার পরে তো সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের সক্রিয় লাগাতার উদ্যোগ নেওয়া চলেছিল এবং চলছে। হিন্দি বলয়ের নানান নেতাদের মুখে আজ যে বাংলা ভাষার প্রতি অপমানসূচক কথা শোনা যাচ্ছে, বাংলার মনীষীদের নাম পর্যন্ত বিকৃত করা হচ্ছে, অসম্মান করা হচ্ছে বাংলার ইতিহাসকে গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে — সেগুলো সবই এতকাল ধরে চলে আসা আমাদেরই উদাসীনতার ফল। আর এখনও বর্তমান সরকার যখন মাটি কামড়ে দাঁতে দাঁত চেপে সেই সম্মান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন তখন কিছু বাঙালি রাজনৈতিক নেতারা তার বিরোধিতা করছেন।
লোভ বড় ভয়াবহ জিনিস। এতে কোন নীতি বা আদর্শ থাকে না — মা, বাবা, ভাই, বোন, প্রতিবেশী, রাজ্য, দেশ সবকিছুই যখন বিকিয়ে যাচ্ছে, তখন বাঙালির সংস্কৃতি, সাহিত্য, কৃষ্টি এগুলোই বা বাদ যাবে কেন? কেউ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে ফেলছে — ফেলুক না, বাংলা বলে কোন ভাষাই ভারতবর্ষে নেই বলছে — বলুক না, বাংলা বললেই বাংলাদেশী তাই তাদের হেনস্থা করে বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দিচ্ছে — দিক না, বঙ্কিম বাবু বলছে, রবীন্দ্রনাথ সান্যাল বলছে — বলুক না, কেউ রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে কটুক্তি করছে — করুক না — আমরা টু শব্দটি করব না। এরা পরিষ্কার বুঝতে পারছেন যে হিন্দি বলয়ের নেতারা তাদেরও অপমান করছে, তাদের জাতিসত্তাকে অবহেলা করছে, তবুও “চুপ” — কেননা সেই “লোভ” — একটা টিকিট চাই, একটা পদ চাই, ক্ষমতা চাই — তা সে আমাদের সার্বিক জাতিসত্তার বিনিময়ে হলেও।
তাই এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে — যারা বাংলার, বাঙালির অপমান করছে,ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করার অপচেষ্টা করছে, তাদের বাংলার বুক থেকে সমূলে উৎপাটিত করতেই হবে, বাঙালির জাতিসত্তার পরিচয়কে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে আনতেই হবে। “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” — এই সংগীত কেবল গাইলেই চলবে না, প্রমাণ করতে হবে। আর সেই প্রমাণ করার দায়িত্ব এবার এপার বাংলার বাঙালিদেরই নিতে হবে — অন্য কেউ এসে, আমাদের হয়ে, এই কাজ করে দিতে পারবে না।