বদলে যাওয়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতির নমুনা যদি আমাদের খুঁজতে হয় তাহলে চলুন ঘুরে আসি আমাদেরই রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রামনগর-২ ব্লকের সটিলাপুর গ্রামে। সারাবছর অখ্যাত এই গ্রাম থেকে উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, অসমের বাজারে রফতানি হয় কোটি কোটি টাকার পান। পানের দৌলতেই বদলে যাওয়া গ্রামীণ অর্থ নীতির জেরে গ্রামের প্রতিটি ঘরে সন্ধ্যার সময় বাড়ির রঙিন টিভির সামনে বসে বিনোদনে সময় কাটান বাড়ির মহিলা থেকে বয়স্ক মানুষজনেরা।
নানান হ্যাঁপা আর জটিলতা আর চাষের আয়ের পরিমাণ কমতে থাকায় ধান চাষের কদরও বর্তমানে দ্রুত হারে কমতে থাকায় গ্রামের কৃষকরা আজ চিরাচরিত ধান চাষের বদলে আঁকড়ে ধরেছেন পানচাষকে।

রাজ্যের সৈকত সুন্দরী দীঘা যাওয়ার ১১৬বি জাতীয় সড়কে রামনগরের দেউলি বাংলো বাসস্টপে নেমে কিছুটা এগিয়ে ডানদিকের মোরাম রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই পাওয়া যাবে পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগর-২ ব্লকের সটিলাপুর গ্রাম। গ্রামের নাম মাহাত্ম্য বিশেষ নেই। খোলা চোখে আর দশটা গ্রামের মত সটিলাপুরকে একই রকম মনে হলেও তা দিয়ে আসল চেহারা বোঝা যায় না। বরং বহু ক্ষেত্রে ও বহু সময়েই স্বতন্ত্র।
দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম লবণ সত্যাগ্রহ ও ভারত ছাড় আন্দোলনে বিপ্লবতীর্থ মেদিনীপুরের সটিলাপুর গ্রামের এক বিশেষ ভূমিকা ছিল।গ্রামের ঝাটুচরণ জানা, নেত্র পাত্র, কৃষ্ণপ্রসাদ সামন্ত, নেত্র কুমার মাইতি, রূপাধর রাউত, শিবপ্রসাদ দাস, অদ্বৈত মান্না, রমেশ ঘণ্টি, রজনী সামন্ত এবং ঈশ্বরচন্দ্র মান্না প্রমুখ ১০ জন প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন বলে সরকারী নথি সূত্র জানান দিচ্ছে। এঁদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র মান্না ১৯৭২-এ ভারত সরকারের তাম্র পদকও পেয়েছিলেন।

সটিলাপুর গ্রামে দু’টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দু’টি শিশু শিক্ষা কেন্দ্র এবং পাঁচটি আইসিডি এসকেন্দ্র আছে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সটিলাপুর রূপেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জানা না গেলেও এটি সটিলাপুরের ‘রূপেশ্বর’ শিব মন্দিরের জায়গায় অবস্থিত। ১৯৫৪ সালে গ্রামের দ্বিতীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষক বিজয় কৃষ্ণ পাত্র। শিক্ষানুরাগী ব্রজেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ভূমিদানে গড়ে ওঠে সটিলাপুর কৈলাসচন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। সটিলাপুর গ্রামে ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিস পরিষেবা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। ১৯৮০ সালেই গ্রামে প্রথম বিদ্যুৎ আসে। বর্তমানে গ্রামের প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। গ্রামের ৯৫ শতাংশের বেশি রাস্তা কংক্রিটের ঢালাই। ২০১৫ সালে গ্রামের বাসিন্দা পেশায় উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক নন্দগোপাল পাত্র তাঁর প্রয়াত পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সাড়ে সাত ডেসিমল জমি দান করেন। ২০১৭ সালে দেউলি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি নব নির্মিত ভবনে স্থায়ী ভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজ শুরু করে। সটিলাপুর গ্রামে ধান চাষ হয় ৩২৫ একর জমিতে। পান চাষ হয়ে থাকে ২৪০ একর জমিতে। অর্থাৎ শতাংশের হিসেবে সটিলাপুরের ৫৭.৫২ শতাংশ জমিতে ধান আর পান চাষ ৪২.৪৭ শতাংশ জমিতে।

অন্যভাবে বললে পান চাষ প্রায় ধরে ফেলেছে ধান চাষকে। ভারতীয় সমাজে দু-হাজার বছর আগেও পানের প্রচলন ছিল বলে পালি ভাষায় লেখা ‘মহাভষ্ম’ গ্রন্থে উল্লেখ থাকা ছাড়াও বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিক ও পর্যটক ইবনবতুতার লেখাতেও ভারতে পানগাছ ও পান চাষের কথা উল্লেখ করে গেছেন যে পান গাছ দেখতে আঙুরের লতার মত। পানের লতাকে ধারণ করার জন্য চাষিরা মাচান তৈরি করে থাকেন। তা সম্ভব না হলে নারকেল গাছের পাশেই চাষ করেন, যাতে পানগাছ লতার মত নারকেল গাছ বেয়ে উঠতে পারে।পানের বৈজ্ঞানিক নাম পাইপর বিটল বা পাইপর বেৎলে (Piper Bettle)। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা পানকে ‘বিটেলভাইন’ (Betelvine) বলেও সম্বোধন করে থাকেন। সারা বিশ্বে প্রায় ৮কোটি বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পানের চাষ হয়। ভারতে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে পান চাষ করে ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ পরিবার ও প্রায় দু’কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
ভারতের মোট চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পানের উৎপাদন হয় কেবলমাত্র আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের প্রায় দশ হাজার হেক্টর জমিতে। এরাজ্যের দক্ষিণবঙ্গে বিশেষ করে মেদিনীপুর, হাওড়া,হুগলি, দুই চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলায় পানের চাষ ব্যাপক হারে ওব্যবসায়িক ভিত্তিতে দেখা যায়। পূর্ব মেদিনীপুর ও হাওড়া জেলার ‘ মিঠা’ ও ‘বাংলা’ পান খুব সুস্বাদু ও বিখ্যাতও। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় সোয়া চার হাজারেরও বেশি জমিতে প্রায় ষোলো লক্ষের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে পান চাষের সঙ্গে জড়িত।

সটিলাপুর গ্রামের বাসিন্দা হাইস্কুলের শিক্ষক নন্দগোপাল পাত্রের কথায়, “ধান চাষ এখন আর লাভজনক না হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ মানুষই পানচাষে ঝুঁকছেন। সটিলাপুর গ্রামে মোট পরিবারের সংখ্যা ন’শোর কাছাকাছি।এদের মধ্যে পান চাষ করেন প্রায় সাতশোটি পরিবার। অর্থাৎ গ্রামে পান বরজের সংখ্যা কমবেশি ৭০০-র কাছাকাছি।” গ্রামের ভেতর নিজের পান বরজে কাজ করছিলেন সুবিমল ঘন্টি। তাঁর বরজের আয়তন ২৫কাঠার মতন।ফসল তোলেন বছরে পাঁচ বার। সুবিমল বাবুর কথায়, “সটিলাপুর গ্রামে বাংলা পান চাষের প্রচলন বেশি। এরমধ্যে আয়মান, বেনারসি,চাকুলা, বোরঘাই, কালীঢল, ভবানী, মনগেটে, বীরকুলি, রামনগর ও কড়ে পানের চাহিদা সবসময়ই বেশি।” সুবিমল বাবু আরও জানালেন, “উত্তম ফলনশীল জাতের মধ্যে লতার বৃদ্ধি,পাতার উৎপাদন ও আকার বিচারে বোরঘাই হল সবচেয়ে উন্নত মানের পান। বরজ পরিচর্যায় সারা বছর খরচ পড়ে প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকার মত।
পানচাষে আয় কতো? জিজ্ঞাসার কোন সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, “তেমন ফলন হলে আর বাজারে দাম থাকলে লাখ টাকা আয় কিছুই নয়।” গ্রামের আর এক পানচাষি মনোরঞ্জন পয়ড়্যার কথায়, “পানচাষে লাভ ও আয় থাকলেও সটিলাপুরের পানচাষিদের লাভের গুড় খায় দালাল আর ফড়েরা। ফি বছর কয়েক কোটি টাকার পান রফতানি হলেও তা করতে হয় দালালদের মারফৎ। এছাড়াও হিমঘরের অভাবে বড় সমস্যা। হিমঘর থাকলে পড়তি বাজারে পান মজুত করার সুযোগ থাকত। এখন তো ফড়েরা অনেক সময় জলের দরে পান কিনে নিয়ে যায়। পানচাষি অবন্তী রাউত, উদয় পাত্রদের অভিযোগ, এই চাষের জন্য সরকারি ভাবে কোন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। থাকলে ফলন আরও বাড়ত বলে অভিমত গ্রামের পানচাষিদের। সেজন্য অবশ্য থেমে নেই সটিলাপুর। বদলে যাওয়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ফি বছর গ্রামের পানচাষিরা পানবরজ থেকে লাভের টাকা ঘরে তোলার পাশাপাশি সটিলাপুর সুখ খুঁজে পেয়েছে পানচাষে।