১৯৫৩ সালের ২০ শে ফেব্রুয়ারি, বাংলা চলচ্চিত্রের কালজয়ী সিনেমা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ মুক্তি পেয়েছিল কলকাতার প্রধান তিনটি সিনেমা হল উত্তরা, পূরবী এবং উজ্জ্বলাতে। উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রথম সিনেমা হিসেবে এটি বাঙালির রোম্যান্টিক আবেগের এক অবিস্মরণীয় দলিল। কলকাতার একটি মেসবাড়ির (অন্নপূর্ণা বোর্ডিং হাউজের) হাসিখুশি পরিবেশ, চরিত্রদের খুনসুটির নানান ঘটনা, হাস্যরস, এবং তুলসী চক্রবর্তীর অনবদ্য অভিনয় সিনেমাটিকে আজও দর্শকদের কাছে আবেগের জায়গায় রাখে। এই সিনেমাতেই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত সংলাপ ‘মাসিমা মালপো খামু’ তো প্রবাদ হয়ে গেছে। আজকের দ্রুতগতির যুগেও ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমাটি তার সরলতা, কমেডি এবং রোম্যান্সের জন্য দর্শকদের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক ও আরামদায়ক।
‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছিল বাবার অল্প বয়সের প্রচন্ড হিট সিনেমা। বাবার থেকে শুনেছি, মফস্বলে তখন কোন ছবি মুক্তি পাচ্ছে তা সিনেমাপ্রেমীদের সবসময় জানা সম্ভবত না। সেইসময় সাইকেল রিকশায় মাইক লাগিয়ে ছবির প্রচার চলত। রিকশর দু’ধারে বাঁশের চাটাইযের গায়ে সিনেমার পোস্টার সাটা থাকতো। ছবি ও শিল্পীদের নাম রঙিন কাগজে ছাপিয়ে লিফলেটগুলো বিলি করা হতো। সেরকম লিফলেট পাওয়ার আশায় বাবাও কখনো কখনো চলন্ত রিক্সার পেছনে দৌড়াতো।

বাবা রিকশার পিছনে দৌড়ালেও আমার ছোটবেলায় টিভিতে সিনেমা দেখার পারমিশন ছিল না। কারণ বাবার কড়া নির্দেশ ছিল, বড়দের ছবি বাড়ির ছোটরা যেন না দেখে। অতঃপর মায়ের কৃপায় সিনেমাটা দেখেছিলাম। আজও মনে পড়ে ‘সাড়ে ৭৪’ দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিলাম। দারুন লেগেছিল মেস বাড়ির মালিক রজনী বাবু ও তার স্ত্রীর অভিনয় দেখে। ওইটুকু বয়সে ছবির গুনাগুন বিচার করার ক্ষমতা আমার ছিল না। তবে ওরকম হাসি মজার ছবি যে আমার আগে কখনো দেখার সুযোগ হয়নি, সেটুকু হলপ করে বলতে পারি। অবশ্য পরে আবার ছবিটা দেখেছি, ভালো লাগার মাত্রা বেড়েছে বৈকি কমেনি।
এমপি প্রোডাকশনসের সাদাকালো এই ছবির কাহিনীকার ছিলেন বিজন ভট্টাচার্য। চিত্রনাট্য ও পরিচালক নির্মল দে। নির্মলবাবু তখন থাকতেন দক্ষিণ কলকাতার এক মেস বাড়িতে। সেই মেসেই থাকাকালীন তিনি সেখানে কিছু বিচিত্র স্বভাবধারী লোকজনদের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বারান্দায় এসে নাক ঝাড়তেন, তো কেউ কেউ কথায় কথায় ‘বোম কালি’ বলে হেঁকে উঠতেন। সেই মেস জীবনের আড্ডা, প্রেম এবং বোর্ডারদের নিত্যদিনের সমস্যা ও কমেডিকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি কাহিনীটি সাজিয়ে ফেললেন।
এমপি স্টুডিওতে যে অন্নপূর্ণা বোর্ডিং হাউজের সেট বানানো হয়েছিল সেটাও ওই মেসবাড়ির আদলেই তৈরি হয়েছিল। তাই সিনেমাটি দেখলেই পুরনো কলকাতার মেসবাড়ির নস্টালজিয়া ফিরে আসে। পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্যেও যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছিলেন নির্মল দে, নয়তো ছবিটি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার এতোখানি পছন্দের হয়ে উঠতো না।

এক ঝাঁক স্ট্রাগলার তরুণ-তরুণী অভিনেতা ছিলেন এই ছবিতে। এই কমেডি-রোম্যান্টিক ছবি দিয়েই উত্তম-সুচিত্রা জুটির জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। রজনী বাবু এবং তার স্ত্রী ভূমিকায় যথাক্রমে অভিনয় করেন তুলসী চক্রবর্তী এবং মলিনা দেবী। তখন তারাও ছিলেন স্ট্রাগলার। সত্যজিৎ রায়ের আগে তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয়ের দক্ষতাকে নির্মল বাবুই ব্যাপ্তি দিয়েছিলেন সাড়ে চুয়াত্তরে। নির্মল হাস্যরসের অভিনয়েও যে মলিনা দেবী কতখানি সাবলীল ছিলেন তার পরিচয় সাড়ে চুয়াত্তর। এই ছবির অন্য অভিনেতা অভিনেত্রীদের মধ্যে ছিলেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ভানু বন্দোপাধ্যায়, পদ্মা দেবী, নবদ্বীপ হালদার, জহর রায়, শ্যামা লাহা, হরিধন মুখোপাধ্যায় শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। এই সিনেমাতেই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম ফ্লিম পাড়াতে সাড়া ফেলে দেন। রোগা চেহারার ভানুর দিশি স্টাইলের কথাবার্তা, এক ঝাঁক জাত শিল্পীর মাঝেও নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছিল।
দুজন জনপ্রিয় গায়কও যে কমেডি অভিনয়ে কতটা সচ্ছন্দ সেই পরিচয়ও দর্শকরা পেয়েছিলেন।আমার এ যৌবন” (সমবেত কণ্ঠ), “এ মায়া প্রপঞ্চময়” (ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য), এবং “দিও গো বাসিতে ভালো” (সুপ্রভা সরকার) গানগুলি অন্যতম। ‘আমার এ যৌবন’ গানে শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য এবং সনৎ সিংহ যৌথভাবে কণ্ঠ দিয়েছিলেন। জানলে অবাক হবেন, জনপ্রিয় ‘আমার এ যৌবন’ গানটি-সহ দুটি গান মাত্র ২০ মিনিটে তৈরি করা হয়েছিল। সেইসময় পরিচালকের বাড়িতে উঠতি গায়কদের আনাগোনা লেগেই থাকতো। শোনা যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রতি রবিবার নির্মল দের দুই মেয়েকে গান শেখাতেন। শুটিংয়ে অভিনেতার দরকার পড়লে তাদের দিয়েও কাজ চালাতেন পরিচালক।
গল্পে এক সুন্দরী তরুণীর (সুচিত্রা সেন) মেসবাড়িতে আগমনে পুরুষ বোর্ডারদের চঞ্চলতা এবং শেষে রমা-রামপ্রীতির প্রেম প্রাধান্য পায়। মূলতঃ উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেন জুটির সূত্রপাত কিন্তু ঘটল এই ছবিকে কেন্দ্র করে।সিনেমার যখন তৈরি করছিলেন নির্মল দে উত্তম কুমারের বিপরীতে মালা সিনহাকে নায়িকা হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। মালা তখন কলকাতা শহরে জলসায় গান গেয়ে উঠতি গায়িকা। অভিনয়ের প্রস্তাব মালা সিনহাদের বাড়ির লোকেরা মেনে নিতে পারলেন না, নির্মল দে পড়লেন মহাফ্যাসাদে। খোঁজ পড়লো নায়িকার। অবশেষে প্রস্তাব যায় শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্রবধূ রমার কাছে। ততদিনে রমার নাম সুচিত্রা হয়েছে সবেমাত্র। সুচিত্রা সেন রাজি হয়ে গেলেন এই ছবি করার। ছবি সুপারহিট হলো। উত্তম-সুচিত্রা জুটির এক নতুন যাত্রা শুরু হল।

এবার বলি, সিনেমার টাইটেল কেন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ রাখা হলো। অনেকেই বলেন, যে বাড়িটিতে অন্নপূর্ণা বোর্ডিং হাউজ নামের মেসটি ছিল তার ঠিকানা ছিল ৭৪/১/২। আবার অন্যমতে, সেই আমলে ব্যক্তিগত চিঠির উপরে ৭৪।।০ (সাড়ে চুয়াত্তর) লেখার প্রচলন ছিলো। এটি মূলত গোপনীয়তা ও কঠোর সতর্কবার্তা বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, যার মূল প্রোথিত আছে এক ঐতিহাসিক জনশ্রুতিতে। এই সংখ্যাটি দ্বারা বোঝানো হতো, প্রাপক ছাড়া অন্য কেউ চিঠিটি খুললে বা পড়লে তার সাড়ে ৭৪ মন ওজনের যজ্ঞোপবীতধারী নরহত্যা বা একই ওজনের গয়নার অধিকারী নারীহত্যার সমান মহাপাপ হবে!
জনশ্রুতি অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর হাত থেকে বাঁচতে রানী পদ্মিনী ও অন্যান্য রাজপুত নারীদের জওহর ব্রত (আগুনে আত্মাহুতি) পালনের পর তাঁদের পরিত্যক্ত অলঙ্কারের মোট ওজন ছিল এই সাড়ে ৭৪ মন। পরবর্তীতে, এই ঐতিহাসিক ঘটনার রেফারেন্স থেকেই সম্ভবত ব্যক্তিগত বা প্রেমের চিঠির গোপনীয়তা রক্ষায় এই সাংকেতিক চিহ্নটি ব্যবহারের প্রথা চালু হয়েছিল। মনে আছে তো, অন্যের চিঠি পাঠ করে রজনীবাবুর স্ত্রীর (মলিনা দেবী) কি বিরম্বনাই না হয়েছিল।
আসলে “সাড়ে চুয়াত্তর” এর সফলতা টিমওয়ার্কের গুণেই এতটা বিনোদনমূলক হয়ে উঠতে পেরেছিল। আজ থেকে ৭৩ বছর পুরনো এই সিনেমা তৎকালীন কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিফলন, যা আজও বাঙালিয়ানার প্রতীক হিসেবে দর্শকদের কাছে টানে।
খুব সুন্দর লিখেছেন।