ফ্রান্স ভারতের সঙ্গে সামরিক অংশীদারত্ব বিস্তৃত করতে চায়। সেই উপলক্ষেই ফরাসি প্রেসিডেন্টের ভারত সফর। চতুর্থবার ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ভারত সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১১৪টি ফরাসি যুদ্ধবিমান রাফায়েল বিক্রির চুক্তি, যে চুক্তির মূল্য প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ভারত-ফ্রান্স দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করা। ২০১৬ সালে কেনা হয়েছিল ৩৬টি রাফায়েল, পাশাপাশি, নৌবাহিনীর জন্য আগেই অর্ডার দেওয়া হয় ২৬টি রাফায়েল। ম্যাক্রোঁর সফরে ভারতের প্রথম হেলিকপ্টার ফাইনাল অ্যাসেম্বলি লাইন উদ্বোধন হয়। এটি ভারতের টাটা গ্রুপ ও ফ্রান্সের এয়ারবাসের যৌথ উদ্যোগ। কর্ণাটকের ভেমাগালের কারখানায় এয়ারবাসের জনপ্রিয় এইচ১২৫ হেলিকপ্টার তৈরি হবে। গত দশ বছরে ফ্রান্স ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, আর ফ্রান্সের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও বিশেষঙ্গেরা বলেন, অত্যাধিক যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করার চেয়ে সেই বিপুল টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা পরিকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করলে সাধারণ মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন বেশি হয়। অস্ত্র রফতানি ক্রমশ বাড়লে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংঘাত বাড়ার পরোক্ষ ভূমিকা হতে পারে।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদী যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে আত্মনির্ভর হওয়ার স্লোগান তোলেন। অস্ত্র রফতানির উপরেও জোর দেওয়ার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রায়ই ‘মেড ইন ইন্ডিয়া ওয়েপন’ বা দেশের মাটিতে তৈরি হাতিয়ারের কথা বলেন। কিন্তু, দেশের মাটিতে তৈরি অস্ত্র কী সেভাবে কোনো যুদ্ধে যেমন ব্যবহৃত হয়নি তেমনি বিশ্ব বাজারে তার কদরের প্রশ্ন অবান্তর। তবে ছবিটা অনেকটাই বদলেছে। সরকারি তথ্য জানাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ভারত ২,৫৩৯ কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র রফতানি করেছে আর ২০২৪-২৫ সেই অঙ্ক বেড়ে ২৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা হয়। চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে কারণ রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল দেশগুলি ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিকল্প খুঁজতে শুরু করে। রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্রের কারখানাগুলি তখন নিজেদের যুদ্ধের চাহিদা মেটাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে অনেক দেশের নজর পড়ে ভারতের দিকে। মোদী সরকারের লক্ষ্য, ২০২৯ সালের মধ্যে যুদ্ধাস্ত্র রফতানির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। কিছুদিন আগে পর্যন্ত ভারতের রফতানি ছিল মূলত গোলাবারুদ, ছোট অস্ত্র ও কিছু উপাদানভিত্তিক, এখন হেলিকপ্টার, যুদ্ধজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রিও করতে উৎসাহী। আলজেরিয়া, মরক্কো, গায়ানা, তাঞ্জানিয়া, আর্জেন্টিনা, ইথিওপিয়া ও কম্বোডিয়া সহ অন্তত ২০টি নতুন দেশে ভারত ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে প্রতিরক্ষা সংযুক্তি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
প্রশ্ন অস্ত্র ব্যবসাই কি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্যবসা? হ্যাঁ, একসময় বন্য জন্তু মেরে নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য মানুষের হাতিয়ারের প্রয়োজন হত। কিন্তু পরবর্তীতে সভ্য যুগে যে অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে তা কী মানুষ নিজেদের ধ্বংস করতে বেছে নিয়েছে? যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবসা এখন পৃথিবীতে জমজমাট। প্রতিরক্ষা খাতের দোহাই দিয়ে পৃথিবীর সব বড় বড় দেশই এখন অস্ত্রের ব্যাপারী। মানবাধিকার নিয়ে সরব আমেরিকা থেকে শুরু করে রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন এবং জার্মানি অস্ত্র বিক্রি করে আর অস্ত্র কেনার তালিকায় প্রথমে আছে ভারত, তারপরেই আছে সৌদি আরব, কাতার, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য। ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে অস্ত্র বিক্রির ১১ শতাংশের যোগান আসে ফ্রান্স থেকে, তারপর জার্মানি ৪.২ শতাংশ এবং ইতালি ৩.৮ শতাংশ. আমেরিকা অস্ত্র বিক্রি করে বিশ্বের ১০৩টি দেশে। তার সবচেয়ে বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্য। অস্ত্র কেনাবেচার বিজ্ঞাপন না হলেও পৃথিবীতে সবচেয়ে লাভজনক হলো অস্ত্র ব্যবসা। ক্রমে ভারতীয় বৃহৎ পুঁজিমালিকদের অন্যতম ব্যবসা হয়ে উঠছে যুদ্ধাস্ত্র। বর্তমানে ভারতীয় কোম্পানিগুলি ৭৫টি দেশে প্রতিরক্ষা সামগ্রী রপ্তানি করছে এর জন্য কেন্দ্র সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। কেন্দ্র প্রতিরক্ষা শিল্পে ৭৪ শতাংশ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং সরকার প্রতিরক্ষা কারখানাগুলিতে ভারতীয় মালিকদের ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগে ছাড়পত্র দিচ্ছে। যে কারণে ৩০টি ভারতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানি অস্ত্র ও সরঞ্জাম রপ্তানি করছে ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার নানা দেশে।
প্রশ্ন, এই বিপুল পরিমান বিনিয়োগ সাধারণ মানুষের কোন কাজে লাগবে? মোদী যে ‘আত্মনির্ভরতা’র কথা বলেন, এর মধ্য দিয়ে কি দেশের জনসাধারণের কী কোনো সমৃদ্ধি ঘটবে? দেশের জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা তো প্রায় শূন্য যদিও একচেটিয়া পুঁজি ক্রমাগত ফুলে ফেঁপে উঠছে কারণ, একচেটিয়া মালিকরা সরকারের সাহায্যে প্রতিরক্ষা এবং সামরিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে। ক্রয় মানুষের ক্ষমতা না থাকায় দেশে যখন কোনো শিল্পেরই বাজার নেই তখনও সরকার ব্যায় বাড়িয়ে চলেছে সামরিক খাতে। দেশের মানুষের দেওয়া করের টাকায় গড়া সরকারি কোষাগারের প্রায় সবটাই সরকার সামরিক খাতে ঢেলে খরচ বাড়াচ্ছে, যাতে একচেটিয়া মালিকদের মুনাফা বাড়ে। ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজিপতিরা বেশ কিছু দিন থেকেই বিশ্বের নানা দেশে পুঁজি রপ্তানি করছে। নিজেদের মুনাফা অটুট রাখতে এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে ছাপিয়ে নিজেরাই অস্ত্র উৎপাদনে নামতে চাইছে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারই এর ক্রেতা, তাই ব্যবসায় লোকসানের কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে তারা তো একইসঙ্গে রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়ানোর কাজে চালাচ্ছে। অতএব যুদ্ধাস্ত্র ব্যবসায় বিপুল বিনিয়োগ এখন অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিই হয়ে উঠেছে। যাকে বলা হয় অর্থনীতির সামরিকীকরণ। সেই কারণেই যুদ্ধ বাধানো অথবা যুদ্ধের উত্তেজনা তৈরি খুব প্রয়োজন। না হলে যুদ্ধাস্ত্র ব্যবসা জমবে না।
মোদী ও তাঁর সরকার প্রতিরক্ষা শিল্পে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখান। কিন্তু সেটি ডাহা মিথ্যা। কারণ প্রতিরক্ষা শিল্প এখন এতটাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর যে সেখানে কর্মসংস্থান বিশেষ কিছু হওয়ার নেই, এতে একমাত্র একচেটিয়া মালিকদের বিপুল মুনাফা হচ্ছে দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য লবডঙ্কা। মোদী সরকার একচেটিয়া মালিকদের স্বার্থে যে পথ বেছে নিয়েছে তা আত্মনির্ভর নয়, যুদ্ধ-নির্ভর, যেখানে ক্ষুধার্ত অপুষ্ট শিশু থেকে শুরু করে বেকার যুবক হা করে দেখবে যুদ্ধাস্ত্র আর যুদ্ধ বিমান কিন্তু পেট রয়ে যাবে খালি।