কৃষ্ণপুর হল হাওড়া-বর্ধমান শাখার ব্যান্ডেল এবং আদি সপ্তগ্রাম স্টেশনের মাঝামাঝি একটি গ্রাম। ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূর, আর আদি সপ্তগ্রাম স্টেশন থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার।
এই কৃষ্ণপুর হল শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীর জন্মস্থান। শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামী ছিলেন ছয় গোস্বামীর এক গোস্বামী। এই ছয়জন গোস্বামী হলেন রূপ, সনাতন, শ্রীজীব, গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ ভট্ট ও রঘুনাথ দাস। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে এই ষড়গোস্বামীর গুরুত্ব বিরাট। চৈতন্য মহাপ্রভুর আদেশে এই ছয়জন বৈষ্ণব সাধক বৃন্দাবনে থেকে, শাস্ত্র প্রণয়ন, লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার এবং বৈষ্ণব আচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই ছয় গোঁসাই বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করে, তা থেকে ভাগবত প্রসঙ্গ সংগ্রহ করে একের পর এক পুথি রচনা করে গেছেন। যা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে ভীষণ কাজে এসেছে। চৈতন্য মহাপ্রভুর ধর্ম প্রচারের মূল ভাবনা ছিল কৃষ্ণপ্রেম। আর বৃন্দাবন ছিল শ্রীকৃষ্ণের প্রধান লীলাভূমি। দীর্ঘ মুসলিম শাসনে বৃন্দাবন হয়ে গিয়ে ছিল লুপ্তপ্রায়। সেই লুপ্ত তীর্থ তাঁরা উদ্ধার করেছিলেন। ষড়গোস্বামীর নিরন্তন প্রচেষ্টায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম একটি বিশিষ্ট ধর্মীয় মতামত রূপে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

ষড় গোস্বামীগণ – বাঁদিক থেকে শ্রী গোপাল ভট্ট, শ্রী রঘুনাথ গোস্বামী, শ্রী সনাতন গোস্বামী, শ্রী রূপ গোস্বামী, শ্রীজীব গোস্বামী এবং শ্রী রঘুনাথ দাস
আমরা কৃষ্ণপুরের প্রসঙ্গে ফিরি। এই কৃষ্ণপুর গ্রামে পয়লা মাঘে বসে মাছের মেলা। এই মেলা হল বাংলার অন্যতম প্রাচীন এবং জনপ্রিয় বৈষ্ণব মেলা। মাছের মেলা অথচ বৈষ্ণব মেলা; অদ্ভুত বৈপরীত্য তাই না! কেন এটা মাছের মেলা, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। এই মেলা আসলে ‘উত্তরায়ণ’ মেলা। অতীতের ‘ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী মকর সংক্রান্তির দিন থেকে সূর্যের ‘উত্তরায়ণ’ শুরু হত। সেই উপলক্ষ্যে এখনও সারা ভারতবর্ষে মকর সংক্রান্তি বা পয়লা মাঘ নানা স্থানে উৎসব হয়, মেলা বসে। কৃষ্ণপুরের উত্তরায়ণ মেলা শুরুর একটি ইতিহাস আছে। সেটা শোনার আগে কৃষ্ণপুরের ইতিহাস একটু জেনে নিই।
কৃষ্ণপুর ছিল অতীত সপ্তগ্রামের একটি গ্রাম। বাকি ছটি গ্রাম হল–বাসুদেবপুর, বংশবাটি, খামারপাড়া, দেবানন্দপুর, শিবপুর ও ত্রিশবিঘা। সপ্তগ্রাম ছিল সরস্বতী নদীর তীরে এক বর্ধিষ্ণু বন্দর। আর সাতগাঁও ছিল মোগল আমলে একটি সরকার। সপ্তগ্রাম সরকারের অধীনে ছিল ৫৩টি পরগণা, যার সীমানা ছিল বঙ্গোপসাগরের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত। পর্তুগীজদের আগমনের সময় সপ্তগ্রাম ছিল চট্টগ্রামের থেকেও ধনী বন্দর।


শ্রীরঘুনাথ দাসের মূর্তি, তাঁরই একটি ছবি এবং একটি বিশেষ তাম্রদণ্ড যা পাঠান শাসকরা হরিনাম সংকীর্তনের ছাড়পত্র হিসাবে প্রদান করেছিলেন।
এই অঞ্চলে কুড়ি লক্ষ টাকার জমিদার ছিলেন দুই ভাই–হিরণ্য দাস ও গোবর্ধন দাস। গোবর্ধন দাসের পুত্র ছিলেন রঘুনাথ দাস। সে অর্থে রঘুনাথ ছিলেন রাজপুত্র। কিন্তু রঘুনাথের ছেলেবেলা থেকে সংসারে মন ছিল না। তাঁর হৃদয় ছিল ভাগবত প্রেমে আচ্ছন্ন। রঘুনাথ বাল্যকালে প্রথমবার চৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখেছিলেন শান্তিপুরে; অদ্বৈত আচার্যের গৃহে।
মহাপ্রভুর সঙ্গে দেখা করে আসার পর চৈতন্যদেবের সঙ্গে দেখা করার জন্য অনেকবার ঘর ছেড়ে পালিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পিতা প্রতিবারই মাঝ পথে পাইক পাঠিয়ে তাঁকে ধরে গৃহে ফেরত নিয়ে আসেন। চৈতন্য মহাপ্রভু আবার শান্তিপুরে আসলে রঘুনাথ পিতার অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয়বার মহাপ্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অদ্বৈত আচার্যের ঘরে সাত দিন মহাপ্রভুর কাছে রঘুনাথ ছিলেন। মহাপ্রভু তাকে বলেন, “অযথা উতলা হয়োনা, লোক দেখানো বৈরাগ্য দেখিও না, অনাসক্ত হয়ে বিষয় সম্পত্তি ভোগ কর।”
সেই মতো রঘুনাথ দাস সংসারে অবস্থান করতে থাকলেন এবং পিতা-মাতার ইচ্ছানুসারে বিবাহ করলেন।
একবার পানিহাটিতে নিত্যানন্দ প্রভু এসেছেন শুনে, তাঁর সঙ্গে রঘুনাথ দেখা করতে গেলেন। নিত্যানন্দ প্রভু রঘুনাথকে ‘চিঁড়ে মহোৎসব’-এর দণ্ড দিয়েছিলেন। অর্থাৎ রঘুনাথকে সেদিন নিত্যানন্দ প্রভুর পরিজনদের দই-চিঁড়া খাওয়াতে হয়েছিল। সেই থেকে পানিহাটিতে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে ‘দণ্ডমহোৎসব’ হয়। চিঁড়ে-দই দণ্ড দেওয়ার পর রঘুনাথ হ্রস্বতর পথ দিয়ে নীলাচলে পৌঁছান। সেখানে মহাপ্রভুর কাছে ১৬ বছর কাটান।

রঘুনাথের সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীচৈতন্যদেব রঘুনাথ তার দুটি প্রিয় বস্তু গোবর্ধন শিলা ও গুঞ্জামালা দান করেন। ১৫৩৩ সালে শ্রীচৈতন্য অপ্রকট হলে তিনি বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। পথে তিনি তাঁর জন্মস্থান কৃষ্ণপুরে পদার্পণ করেছিলেন। ততদিনে বৈষ্ণব হিসাবে রঘুনাথ দাসের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তখন কৃষ্ণপুর জুড়ে উৎসব শুরু হয়ে যায়। প্রচুর ভক্তবৃন্দ দেখা করতে আসেন।
পয়লা মাঘ উত্তরায়ণের দিন রঘুনাথ করলেন মহোৎসব। কথিত আছে সেদিন তাঁর ভক্তির পরীক্ষা করার জন্য ৭০০ বৈষ্ণব উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা আবদার করছিলেন ইলিশ মাছের ঝোল ও আমের টক দিয়ে অন্নভোগ গ্রহণ করবেন। কিন্তু অসময়ে একদিনের মধ্যে ইলিশ মাছ জোগাড় করা সে যুগে ছিল প্রায় অসম্ভব। আবার শীতকালে কাঁচা আম পাওয়া ছিল আরও দুষ্কর। কিন্তু ভক্তের সম্মান রক্ষার্থে রঘুনাথের জমিদার বাড়ির পুকুরেই ধরা পড়েছিল দুটি ইলিশ মাছ এবং মাঘের শীতেও বাগানের গাছে মিলে ছিল দুটি কাঁচা আম। তাই দিয়ে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। সেই ঘটনার স্মৃতিতে মেলায় মাছ বিক্রি চলে আসছে এখন পর্যন্ত।
এরকম মাহাত্ম্যপূর্ণ ঐতিহাসিক মেলা দেখতে ১৪৩২ সালে মাঘ মাসের পয়লা সকাল সাতটা পঁয়ত্রিশের ব্যান্ডেল লোকাল ধরলাম। হাওড়া থেকে পৌনে ন’টার মধ্যে ব্যান্ডেল জংশন। টোটোতে দেবানন্দপুর পেরিয়ে কৃষ্ণপুর। দেবানন্দপুর হল কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থান।

পানিহাটির গঙ্গার ধারে রঘুনাথ দাসের স্মৃতি-বিজড়িত স্থান
মেলায় ঢুকেই প্রথমে খেলাম পিঠে। এক প্রকার ভাপা পিঠে, চালের গুঁড়ো, নারকেল ও গুড় দিয়ে তৈরি। এরকম ভাপা পিঠে আগে কখনও খাইনি।ফুটন্ত জলের হাড়ির ঢাকনার ছিদ্র থেকে নির্গত বাষ্পে ভাপানো হচ্ছে পিঠে। পরবর্তীকালে অনেক জায়গায়, এমনকি সুদূর উত্তরে কোচবিহারে গিয়েও এই পিঠে খেয়েছি। এখন প্রায় সব মেলাতে এই পিঠে দেখতে পাই। আর খেলাম পাটিসাপটা।
অন্যান্য মেলার মতো মনিহারি দ্রব্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালীর জিনিস, খাবার জিনিসের দোকান প্রচুর। কিন্তু মাছের দেখা পাচ্ছি না। মাইকে ভেসে আসছে কীর্তনের আওয়াজ। রঘুনাথ দাসের শ্রীপাট থেকে আসছে সে আওয়াজ। একবার মাত্র উঁকি মেরে দেখলাম, কারণ তাড়াতাড়ি ফিরে অফিস ধরতে হবে। ফুল-মালা, কলাগাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে শ্রীপাট। পিছনে মজে যাওয়া সরস্বতী নদী। একসময় গঙ্গার মূল স্রোত এই সরস্বতী নদী দিয়ে বইত। তাই এখানেই গড়ে উঠেছিল বিখ্যাত সপ্তগ্রাম বন্দর।
শ্রীপাটের প্রবেশপথে একটি ‘পোস্টার’ টাঙানো হয়েছে। তাতে লেখা ‘শ্রীশ্রীমদ্ রঘুনাথ দাস গোস্বামী স্মরণে উত্তরায়ণ মেলা’। ঠিকানার জায়গায় লেখা আছে–কৃষ্ণপুর ঠাকুর বাটি, দেবানন্দপুর, হুগলী। বর্তমানে কৃষ্ণপুর চুঁচুড়া থানার অধীন দেবানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত। ‘পোস্টার’-এ উল্লেখ আছে ৫১৯তম বর্ষের মেলা।

বাঁশতলাতে দেখা মিলল মাছের মেলা
প্রবেশদ্বার পেরিয়ে দেখলাম দালান মন্দির। সেখানে রাধাকৃষ্ণ, গোপাল, নিত্যানন্দ ও গৌরাঙ্গের বিগ্ৰহ নিত্য পূজিত হয়। পূজা করেন চক্রবর্তী পদবীর ব্রাহ্মণ। দুই পুরুষ আগে এখানকার বাবাজীরা তাঁদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। মেলার আয়োজন করে গ্রাম ষোলআনা ও মন্দির কর্তৃপক্ষ। যেখানে বসে রঘুনাথ সাধনা করতেন তা ভজন কুটির বলে সংরক্ষিত আছে। সেখানে রঘুনাথ দাসের একটি বিগ্রহ আছে। ভজন কুটিরে তাঁর একপাটি খড়ম আছে । আরেকপাটি খড়ম চুরি হয়ে গেছে।
অবশেষে মেলার শেষ দিকে বাঁশতলাতে দেখা মিলল মাছের মেলা। দেশি মাছ থেকে বিদেশি মাছ বেশি। সামুদ্রিক মাছের সংখ্যা বেশি। চাহিদা বেশি ভেটকি মাছের। শংকর মাছও দেখলাম। অনেক বিচিত্র বিচিত্র মাছ, তাদের নাম জানি না। ইলিশও এসেছে। কিছু মাছের গলায় ফুলের মালা দেওয়া হয়েছে। মাছ কেটে, আঁশ ছাড়িয়েও দেওয়া হচ্ছে। মাছ ভাজা বা মাছের চপও বিক্রি হচ্ছে। মেলাটাকে আমার বড় মাছ বাজারের মতো লাগছিল। ‘মাছ মেলা’ থেকে মাছ মেলার অনুষঙ্গটাকে ভারি মিষ্টি লাগল। লোকেরা এসে মাছ কিনে রান্না করে পিকনিক করে খাচ্ছে।
মেলায় মাত্র এক ঘন্টা কাটালাম। মেলার শেষ প্রান্তে এসে শুনি টোটোওয়ালা হাঁকছে–স্টেশন, স্টেশন। আমরা মহানন্দে চেপে বসলাম। অল্পক্ষণের মধ্যে স্টেশন চলে এল। এত তাড়াতাড়ি! ওমা এসে দেখি আদি সপ্তগ্রাম স্টেশন! আমরা তো যাব ব্যান্ডেল স্টেশন। মহা কেলেঙ্কারি। ডাউন বর্ধমান লোকাল এর দেরি আছে। আসলে মেলার শেষ প্রান্ত থেকে আদি সপ্তগ্রাম কাছে। আবার একটা টোটো ধরে ব্যান্ডেল। ভাগ্যক্রমে ১০:৩০-এর ব্যান্ডেল লোকালটা পেলাম। যাক অফিসের বারোটার মিটিংটা ধরতে পারব।
তথ্য ঋণ :
১) শ্রীশ্রীগৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান: শ্রীহরিদাস দাস কর্তৃক সংকলিত [সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, ২০১৪]
২) বৃন্দাবনের ছয় গোস্বামী – শ্রীনরেশচন্দ্র জানা [তথাগত, ২০২৪]
৩) বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম – রমাকান্ত চক্রবর্তী [আনন্দ, ২০১৭]
৪) হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গ সমাজ (দ্বিতীয় খণ্ড)- সুধীরকুমার মিত্র [দে’জ, ২০১৩]
৫) কৃষ্ণদাস বিরচিত শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত – সম্পাদনা সুকুমার সেন ও তারাপদ মুখোপাধ্যায়। [আনন্দ, ১৪২৬]
৬) ক্ষেত্র সমীক্ষা।