একটি কিংবদন্তি অনুসারে, দক্ষযজ্ঞে সতী দেহত্যাগ করার পর ভগবান শিব ব্যথিত হয়ে যজ্ঞের ভস্ম গায়ে মেখে দারুক বনের ঘন অরণ্যে দীর্ঘকাল ধ্যান করেছিলেন। তাই এই স্থানটিকে শিবের বাসস্থান বলা হয়। এই বনেই বশিষ্ঠ ও সাতজন ঋষি তাঁদের স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে কুঁড়েঘর বানিয়ে তপস্যা করতেন।
একদিন শিব ও বিষ্ণু, দুই জগৎপালক লক্ষ্য করে দেখলেন ঋষিরা তপস্যা করছেন বটে কিন্তু তারা নিজ সংসারের মঙ্গল কামনাতেই সর্বদা ব্যস্ত থাকেন। এমনকি সংসার মঙ্গলের জন্য তারা নানাবিধ যজ্ঞাদিও করেন।
দারুক বনের ঋষিদের এহেন ব্যবহার দেখে মহাদেব অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। কারণ তিনি এই ঋষিদের সম্মুখে একদা প্রকট হয়ে বলেছিলেন, ‘এই রমণীয় তীর্থে সর্বদা তোমরা আমার ধ্যানে মগ্ন হয়ে থাকবে। এই তীর্থে বসে আরাধনা করলেই তোমরা সিদ্ধিলাভ করতে পারবে। এই তীর্থে মৃত্যু হলে পুনর্জন্ম হবে না। হে সন্ন্যাসীগণ, মনে রেখো শুধু আমি নই আমার সঙ্গে স্বয়ং নারায়ণও এই তীর্থে বাস করবেন’। শিবের মুখে এহেন কথা শুনে ঋষিরা লোভাতুর হয়ে পড়লেন এবং এই বনে বসবাস করতে শুরু করলেন।
এদিকে শিব ও বিষ্ণু লোভাতুর মুনিদের আচরণ দেখে ঠিক করলেন এদের উচিত শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তখন মহাদেব ১৯ বছরের বালকের বেশ ধরে দারুক বনে প্রবেশ করলেন। শাশ্বত কৈশোর ও যৌবনের প্রতীক শরীর কর্পূরের মতো শ্বেতশুভ্র, সৌম্য ও সুঠাম দেহের অলস বাহু দুটি জানু স্পর্শ করেছে, চোখে এক অলৌকিক প্রশান্তি ও তেজ বিদ্যমান, মুখে মৃদু হাসি। মহাদেব এভাবে পুরুষরূপ ধারণ করলেন এবং নারায়ণ স্ত্রীরূপ।নারায়ণ হয়ে উঠলেন মোহময়ী। লীলা চঞ্চল, ভঙ্গিমা রাজহংসের মত। নূপুরে ঝংকার তুলে উপস্থিত হলেন দারুক বনে।
এই রূপে দুজনে যখন দারুক বনে প্রবেশ করলে ঋষিরা বিষ্ণুর মোহিনী মায়ায় মুগ্ধ হলেন এবং তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলেন। ঋষিদের মনে হলো নিশ্চয়ই এই নারী ও পুরুষ পরস্পর স্বামী ও স্ত্রীর সম্বন্ধে আবদ্ধ। মায়া মোহিত হয়ে তারা নানা প্রকার উপভোগের বিষয়কে যেন অনুভব করতে লাগলেন।

কিন্তু এই অবস্থা বেশি কোন স্থায়ী হলো না। কারণ ঋষিরা তপস্বী ছিলেন তাই তারা আগে সচেতন হয়ে উঠলেন এবং পুরুষরূপী হরের দিকে তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো বেশি।
এদিকে শিব দিগম্বর হয়ে ঘন অরণ্যে ধ্যানে মগ্ন হলেন। সেই সময় এই সাত ঋষির স্ত্রীরা শেকড়, ফল এবং কাঠ ইত্যাদি সংগ্রহের জন্য বনে গেলেন। তাদের দৃষ্টি দিগম্বর শিবের উপর পড়ল। ভগবান শিবের সুগঠিত দেহ দেখে ঋষিদের স্ত্রীরা ভগবান শঙ্করের প্রতি মুগ্ধ হলেন। ভগবান শঙ্কর তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। তিনি তাদের উপেক্ষা করেন এবং তখন ঋষিদের স্ত্রীরা লালসায় অন্ধ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন সেই স্থানে।
সারারাত যখন তারা তাদের কুঁড়েঘরে ফিরলোনা, তখন সকালে ঋষিরা তাদের খুঁজতে বের হন। খুঁজতে খুঁজতে সেই স্থানে পৌঁছে সপ্তর্ষিরা দেখলেন যে, শিব সমাধিতে নিমগ্ন এবং তাঁদের স্ত্রীরা অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছেন। এই অবস্থায় দেখে ঋষিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ভাবলেন তাদের পতিব্রতা স্ত্রীদের আকর্ষণ করেছে এই পুরুষ। তারা ক্রুদ্ধ হয়ে শিবকে কটু বাক্য বলতে লাগলেন। কিন্তু এতেও কোন বিকার হলো না শিবের। তখন তারা শিবকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘যুবক তোমার পরিচয় কি?’
শিব বললেন, ‘আমি তপস্বী, তপস্যার জন্য উপস্থিত হয়েছি এই বনে।আমার সঙ্গে যাকে দেখছেন তিনি আমার স্ত্রী।’
ঋষিরা শুনে বললেন, ‘তপস্যার জন্য দিগম্বর হতে হবে কেন? আর স্ত্রীকে নিয়ে তপস্যা করা হয় না’।
শিব বললেন, ‘কেন? আপনারা তো নিজের স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্যই সর্বদাই ব্যস্ত, তাহলে অন্যকে স্ত্রী ত্যাগের কথা কেন বলছেন?’
তপস্বী মুনিগন থমকে গেলেন। ভাবলেন, তাইতো আমরা এটা কি করছি। যদিও তারা বললেন, ‘আমাদের স্ত্রীরা ব্যভিচারী নয়। তাই আমরা তাদের ত্যাগ করতে অক্ষম।’
শিব বললেন, ‘আমার স্ত্রীও পতিব্রতা। আমি তাকে ত্যাগ করতে অক্ষম’।
ঋষিরা যেন বুঝেও সব কথা বুঝলেন না।তাঁদের মনে হল ভগবান শিব তাঁদের স্ত্রীদের সঙ্গে ব্যভিচার করেছেন এবং এই আশঙ্কায় তাঁরা ভগবান শঙ্করকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, ‘আপনি আমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ব্যভিচার করেছেন, তাই আপনার লিঙ্গ অবিলম্বে আপনার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া উচিত।’
ভগবান শিব চোখ খুলে বললেন, ‘তোমরা আমাকে সন্দেহজনক অবস্থায় দেখে অজ্ঞতার কারণে এমনটি করেছ। কিন্তু আমি এই অভিশাপের বিরোধিতা করব না। আমার লিঙ্গ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পড়ে যাবে এবং এই স্থানে প্রতিষ্ঠিত হবে।’
শিবের থেকে লিঙ্গ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথে সারা বিশ্বে হৈচৈ পড়ে যায়। ব্রহ্মদেব ঋষিদেরকে মা পার্বতীর আরাধনা করতে বললেন পৃথিবীকে এর ক্রোধ থেকে বাঁচাতে। ব্রহ্মদেব জানতেন যে শুধুমাত্র পার্বতীই শিবের এই মহিমা ধারণ করতে পারেন। ঋষিরা মা পার্বতীর পূজা করতে শুরু করলেন। পার্বতী যোনিরূপে আবির্ভূত হয়ে শিবলিঙ্গকে ধারণ করলেন। সেই থেকেই জগতে লিঙ্গপূজা শুরু হল।এরপর সাতজন ঋষিও অনন্তকাল ধরে নক্ষত্রের সাথে আকাশে থেকে গেলেন।
মহাশিবরাত্রি — শিব-পাবর্তীর বিবাহ ও মহাদেবের জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে প্রকট হওয়া উপলক্ষে এই তিথি পালিত হয়। মহাশিবরাত্রিতে শিব পুজো করলে বিশেষ ফলাফল লাভ করা যায়।
২০২৬ সালের মহা শিবরাত্রি অত্যন্ত শুভ হতে চলেছে। প্রায় ৩০০ বছর পর এমন বিরল গ্রহের সংযোগ ঘটছে। এই দিনে ত্রিগ্রহী যোগ, শ্রাবণ নক্ষত্র এবং আরও ৮টি শুভ যোগ তৈরি হচ্ছে।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, ফাল্গুনে কৃষ্ণ চতুর্দশী তিথি শুরু হচ্ছে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি রবিবার বিকেল ৫টা ০৪ মিনিটে এবং শেষ হচ্ছে ১৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার বিকেল ৫টা ৩৪ মিনিটে। যেহেতু প্রদোষ কাল ও নিশীথ কাল শিবপুজোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই এই বছর মহাশিবরাত্রি পালিত হবে ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার।

শিবরাত্রিতে দুধ, দই, মধু, ঘি এবং গঙ্গাজল দিয়ে শিবলিঙ্গকে স্নান করানো হয়, যা শিবের উগ্র রূপকে শান্ত করে এবং ভক্তের জীবনে শান্তি ও সুখ নিয়ে আসে। বিশ্বাস করা হয়, এই রাতে মহাজাগতিক শক্তি (cosmic energy) বৃদ্ধি পায়, যা অভিষেকের মাধ্যমে ভক্তের মন ও মস্তিষ্কে প্রবাহিত হয়ে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ প্রশস্ত করে।
ভক্তরা বিশ্বাস করেন, নিষ্ঠার সাথে এই অভিষেকের মাধ্যমে অতীত পাপ ধুয়ে যায় এবং মোক্ষ লাভ করা যায়। দধি দ্বারা অভিষেক করলে সুসন্তান, দুধ দ্বারা দীর্ঘায়ু, এবং মধু দ্বারা মিষ্টি কন্ঠস্বর পাওয়া যায় বলে পৌরাণিক বিশ্বাস রয়েছে।
“ওঁ নমঃ শিবায়” জপ করতে করতে শিবলিঙ্গের উপর এই নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। ভক্তি ও বিশ্বাসে শিবের পূজা করলে ভক্তবৎসল শিব দ্রুত তুষ্ট হয়ে ভক্তের মানসিক ও শারীরিক কষ্ট দূর করেন, ধনবৃদ্ধি ঘটান এবং মোক্ষ প্রদান করেন। মহাশিবরাত্রি ছাড়াও সোমবারে বা প্রতিদিন গঙ্গাজল, দুধ, বেলপাতা, চন্দন ও ফুল দিয়ে শিবলিঙ্গে আরাধনা করলে দেবাদিদেব সন্তুষ্ট হন। “ওঁ নমঃ শিবায়” মন্ত্র জপ এবং শিব পুরাণ পাঠ করা অত্যন্ত মঙ্গলজনক।
ভক্তের ভগবান দেবাদিদেব মহাদেব। আত্ম উপলব্ধির পথ দেখান তিনি। তাঁর জীবন দর্শন আমাদের নিজেকে চিনতে সাহায্য করে। পবিত্র মহাশিবরাত্রির এই পুণ্য তিথিতে মহাদেব ও মাতা পার্বতীর আশীর্বাদে সকলের জীবন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক, এই কামনা করি।
হর হর মহাদেব।।