গত ৩০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী এবং প্রধান আর্থিক উপদেষ্টা সংসদে যে আর্থিক সমীক্ষার রিপোর্টে পেশ করেছেন তাতে দেশের মানুষের শোচনীয় আর্থিক পরিস্থিতির জন্য বিদেশের সংকটকেই দায়ী করা হয়েছে। সাধারণত দেশের সব ধরনের সমস্যা এবং দুর্দশার জন্য আগের সরকারকেই দায়ী করা হয় কিন্তু এবার তাঁরা বিদেশকে দায়ী করেছেন! দেশে পণ্য উৎপাদনে সংকট কেন, মানুষের কেন রোজগার নেই, কেনই বা টাকার দাম সর্বকালীন কম হওয়ার রেকর্ড ভেঙে ফেলছে? এই সব প্রসঙ্গ একরকম এড়িয়ে গিয়ে তাঁদের সমীক্ষা জানাচ্ছে, বিশ্বের আর্থিক পরিস্থিতি যত খারাপই থাকুক না কেন, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং আর্থিক বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.২ শতাংশ হতে পারে। অথচ আর্থিক সমীক্ষকরা দেশের উৎপাদন ক্ষেত্রে সংকটের কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেননি। তাঁরা বিদেশে পরিষেবা রপ্তানির বদলে পণ্য উৎপাদন ও তা রপ্তানির উপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, দেশের বিপুল শ্রমশক্তি এবং সম্পদকে পুঁজি হিসাবে উৎপাদনে কাজে লাগাতে হবে এবং এই দুটি সম্পদকে ‘দক্ষ পরিচালনায়’ উৎপাদনের কাজে লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে! স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে শিল্প উৎপাদনের সমস্যা কি নিছক দক্ষ পরিচালনার অভাব? নাকি আসল সমস্যা দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারের তীব্র সংকট?
কিন্তু আর্থিক উপদেষ্টা থেকে শুরু করে মন্ত্রী-আমলা কেউই এই সত্যটা স্বীকার করেন না, আসলে সেটা স্বীকার করার উপায় কারও নেই। আর সেই কারণেই এই তথাকথিত দক্ষ পরিচালনার জন্য তাঁরা কয়েকটি নিদান দিয়েছেন। প্রথমত, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সংজ্ঞা বদলে দিয়ে এই সমস্ত সংস্থায় সরকারি শেয়ার ২৬ শতাংশের নিচে নিয়ে যাওয়া এবং যে সংস্থাগুলি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে সেগুলি থেকে সরকারের পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়া। তাঁরা এমনও বলেছেন, শ্রম আইন সংশোধন করে ‘শ্রম কোড’ চালু হওয়ার ফলে উৎপাদনের পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে। এবার তাকে কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ, তাঁরা সরাসরি এটাই বলতে চাইছেন, শ্রমিককে যেমন ভাবে পারো খাটাও এবং সবরকম সুযোগ সুবিধা থেকে তাদের বঞ্চিত করে রাখলেই উৎপাদন ক্ষেত্র লাফিয়ে লাফিয়ে উপরের দিকে উঠবে! কেবল তাই নয়, তাঁরা তাঁদের নিদান, গ্রামীণ বা শহরের রোজগার গ্যারান্টি প্রকল্পগুলিকে মানুষকে কাজ দেওয়ার প্রকল্পের পরিবর্তে উৎপাদনের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের প্রকল্পে পরিণত করা। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ‘ভিবিজি রামজি’ বিল এনে গ্রামীণ মানুষের রোজগার যোজনায় গ্যারান্টি তুলে দেওয়ার যে কাজটি করতে চেয়েছে আর্থিক সমীক্ষার সুপারিশ সেই দিকেই। সরকার এখন শহরের পরিকাঠামো শুধু নয়, গ্রামীণ পরিকাঠামো, পানীয় জল, সেচ সমস্ত কিছুই ধীরে ধীরে বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দিতে চাইছে।
অর্থাৎ আর্থিক সমীক্ষা স্পষ্ট ভাবেই গ্রামীণ মানুষের কাজের বিষয়টা পুঁজিপতিদের মুনাফার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার সুপারিশই করল। প্রসঙ্গত, আমেরিকার শুল্ক আক্রমণের চাপে ভারতের বস্ত্র, জুতো, চামড়ার নানা দ্রব্য, রত্ন ও গয়না ইত্যাদি শ্রমনিবিড় শিল্প ইতিমধ্যেই সংকটের মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে এই ক্ষেত্রে লগ্নি করা পুঁজি মালিকদের বাঁচাতে এবং দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যাকে সামাল দিতে মোদি সরকার সম্প্রতি এই উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলির জন্য ইউরোপীয় বাজারের বরাত পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই বরাত যদি জোটে তাহলেও তীব্র বাজার সংকট এবং আরও তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোপ পড়বে শ্রমিকের সংখ্যা এবং তার মজুরিতেই। ফলে কর্মসংস্থানের আশা তো থাকবেই না বরং তৈরি হবে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা।
অন্যদিকে আর্থিক সমীক্ষকরা স্কুলছুট নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেও একেবারে নিচু ক্লাস থেকে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার সুপারিশ করেছেন, এতে নাকি নিচু ক্লাস থেকেই তাদের শিল্প জগতের উপযোগী করে তোলা হবে এবং তাতে তারা রোজগার করবে, ফলে আর স্কুলছুট হবে না। এমন ধারণাকে আর যাই বলা যাক না কেন, এটুকু বলাই যায় যে এটা একটা অগভীর সমাধানের পথ বাতলানো। কেন ছাত্র-ছাত্রীরা বেশিরভাগই মাঝ পথে পড়া বন্ধ করে? কোথায় যায় তারা? এসব প্রশ্নের অনুসন্ধান নেই। এই ছাত্র-ছাত্রীদের কারিগরি বিদ্যা শিখিয়ে দিলেই তারা কাজে না গিয়ে সব স্কুলে ভিড় করবে? না কি যেটুকু পড়াশোনা করছিল তাও ছেড়ে কাজের সন্ধানে দেশ বিদেশে ছুটবে? মূল কারণ যেখানে পরিবারের দারিদ্র সেটা দূর করার চেষ্টা না করে, পরিবারের উপযুক্ত রোজগারের ব্যবস্থা না করে এ ধরণের সমাধান বাতলে দেওয়ার কারণ পুঁজি মালিকদের জন্য সস্তার মজুর সরবরাহ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাহলে বিশেষজ্ঞদের আর্থিক সমীক্ষা থেকে কী কোনো দিশা পাওয়া গেল? এটা অন্তত বোঝা গেল যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশের আগামী দিন মোটেই সুখকর নয়। সমীক্ষায় দেশের কৃষিকাজে জলবায়ু পরিবর্তন ও জল সঙ্কটের করাল গ্রাস থেকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আগামী দিনে অর্থনীতিকে দুর্যোগের মুখে ফেলতে পারে বলে ইঙ্গিত করছে।
মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরণ যে রিপোর্টে পেশ করেছেন তাতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে দেশের কৃষিক্ষেত্রের সমস্যা। মোদি সরকার ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’-এর যে স্বপ্ন দেখাচ্ছে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে কৃষি হবে অন্যতম ক্ষেত্র, যদিও সেই ক্ষেত্রের বৃদ্ধি প্রচার করা হচ্ছে কিন্তু রিপোর্ট জানাচ্ছে কৃষি উৎপাদন নানা সমস্যায় জর্জরিত। এছাড়াও ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির গতি কমবে বলেই জানাচ্ছে আর্থিক সমীক্ষা।