শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:০০
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (দ্বিতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত

সুব্রত দত্ত / ৩২৬ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কলকাতা থেকে মালদহ। বাহন তেভাগা এক্সপ্রেস। আগে থেকেই হোটেল বুকিং আছে। এই শীতের রাতে কে ছোটাছুটি করে! ছ ঘন্টার যাত্রা। সহযাত্রীদের সঙ্গে গল্প করে সময় কেটে গেল। ট্রেনে পর আপন হয় খুব সহজেই। বিশেষত মেয়েরা। একটু আলাপ জমলে পেটের কথা আর পেটে থাকে না। আমার সঙ্গী গৃহিণী। ওর ইতিহাসে রুচি নেই। আমার জন্যই আসা। সংসারের চলমান যুদ্ধ ছেড়ে অন্যের যুদ্ধ বিগ্রহের আগ্রহ নেই! ঘরের ন্যাওটা নাতিটা মন জুড়ে। তার গল্প জুড়েছে সহযাত্রিণীদের সঙ্গে। এ কদিন কি খাবে,কি করবে তাই ভাবনা।

সহযাত্রী দলে নাতির মতই একটা বাচ্ছা। ওকে দেখেই মন হু হু করছে। আমি তাকিয়ে আছি বাইরে। পাশে ছুটে যাচ্ছে গ্রাম শহর নদী, দৈনন্দিন জীবনে ব্যাস্ত মানুষ। এ পথে পাহাড় জঙ্গল নেই। তবুও ঋতু বদলে বাংলার অন্য রূপ। শীতের মাঠে হলুদ ঢেউ। আঁকা বাঁকা নদী কাঁদর সাপের মতো শুয়ে। ক্রমেই অন্ধকার নেমে আসছে। প্রকৃতি কুয়াশার চাদর গায়ে এবার ঘুমের দেশে যাবে। তাই মুখ ফিরিয়ে মন দিলাম কামরায় কথায়। আমাদের সহযাত্রীরা যাচ্ছেন বালুরঘাট। বাপ মা এক বিটিকে নিয়ে মেয়েকে শশুর বাড়ি রাখতে যাচ্ছেন। বাচ্ছাটি প্রথম যাচ্ছে বাপের বাড়ি। সকলের মন ভার। হয়ত এ ভাবেই যেত। কিন্তু নানান গল্পে আপাতত ভুলে গেছেন সব। এরমধ্যে দল ভারী হল।মালদহের একটি মেয়ে সকন্যা হাজির। তার বসার সিট ছিল অন্যত্র। সেখানে সব পুরুষ। মেয়ে হয়ে কতক্ষণ চুপ থাকবে। তাই এখানে আসা। মেয়েটি মুসলিম। তবে বোরখা নিকাব নেই। শিক্ষিত, বেশ স্মার্ট। সহজেই দলে মিশে গেল। একাই আসছে জামশেদপুর থেকে। হাওড়া স্টেশনে এক আত্মীয় ছিলেন সাহায্যের জন্য। ভোর তিনটেয় জামশেদপুরে ট্রেনে তুলে দিয়েছেন কর্তা। সে ট্রেন লেট। হাওড়া থেকে ট্রেনে বর্ধমান এসে এই ট্রেন ধরেছে। গল্প করে ভার নামল মনের। জীবন মানেই যন্ত্রনা। আমাদের ভারাক্রান্ত জীবনে তাই ইতিহাস নেই! এই ট্রেন যেন সেই চলন্ত জীবন। বোঝা নামিয়ে নিজের গন্তব্যে নেমে যাবে সবাই। মাঝের মেলামেশা বন্ধুত্ব ক্ষণিকের। চলমান জীবনে জাত ধর্ম নেই। সম্পর্কে বাধা নেই। তবুও মানুষ এক নয়। আমাদের ইতিহাসও এক নয়! স্বার্থের সঙ্ঘাতে সব আলাদা।

গল্পে গল্পে কখন গন্তব্য এসেছে খেয়াল নেই। মালদহের মেয়েটার প্রস্তুতি দেখে সজাগ হলাম। হাতের তালুতে হোটেলের ঠিকানা লিখে নিয়েছি। দূরত্ব বেশি নয়। স্টেশনে ঠিকানা বলে একটা টোটোয় উঠে বসলাম। যেন পরিচিত যাত্রী। পর্যটক দেখেই ওদের ভাড়া বাড়ে। কিন্তু পথে হুক্কা হুয়া শুনেই শেয়াল চিনেছিল টোটো ওয়ালা। তারপর টাকার ফন্দিতে আঁকা বাঁকা পথ ধরেছিল। হোটেলের কাছে নামিয়ে বলে একশ টাকা ভাড়া। ওর চালাকি সহ্য হল না। আমি ৬০ টাকা দিতে রাজি। ও নিতে রাজি না। বাকযুদ্ধ দেখতে দর্শক জুটেছে বেশ। তাদের কাছে জানতে চাই, স্টেশন থেকে এখানের সঠিক ভাড়া কত? জানা গেল মাথা পিছু ১৫ টাকা। টোটোওয়ালা বলে আমি নাকি সঠিক ঠিকানা বলিনি। তাই অনেক ঘুরতে হয়েছে ওকে। আমি হাতে লেখা ঠিকানা দেখাই দর্শকদের। ক্রমেই পাল্লা ভারী হল আমার। এবার আমার পক্ষে সওয়াল জুড়েছে স্থানীয় লোক। টোটো ওয়ালার এবার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি হাল। ৬০ টাকা নিয়ে পিছুটান দিল। স্থানীয় লোকজন বেশ ভদ্র ও উপকারী। তারাই পথ দেখিয়ে হোটেলে পৌঁছে দিলেন। বাংলার বাইরে এমন সহযোগিতা পেতাম কিনা জানি না! ভ্রমণে এমন অভিজ্ঞতা নতুন নয়। আবারও হবে জানি। যাইহোক ওর নির্বুদ্ধিতায় অবাক হলাম। পরদিনে ৫০০ টাকার খরিদ্দার ছিলাম ওর। একেই বলে অতি লোভে তাঁতি ডোবে।

মালদহ ফোয়ারা মোড়ের MMG লজ। তিন রাতের ডেরা। ভ্রমণ সূচীতে প্রথম গৌড় নগরী। হোটেল থেকে গাড়ির ব্যবস্থা হল না। ওদের পরামর্শে সকালে প্রস্তুত হয়ে রথবাড়ী মোড়ে যাচ্ছি। এ দিকে সূর্যি মামার দেখা নেই। ভীষণ ঠান্ডা। সঙ্গে কনকনে বাতাস। জবুথুবু অবস্থা। কোই পরোয়া নেহী। রথবাড়ী মোড়ে হাজার গাড়ির ভীড়। প্রাইভেট গাড়ি গলা কাটতে চায় তাই একটা ট্রেকারে উঠে বসলাম। দূরত্ব সামান্যই। ছাগল গাদা করে গাড়ি ছাড়ল। গিন্নি একটু ঘিনঘিনে মানুষ। আফটার এফেক্ট হবে বুঝতে পারছি কিন্তু কিছু করার নেই। নতুন জায়গায় হালচাল জানি না। দূরত্ব বেশি নয় ভেবেই উঠে পড়েছি। তাছাড়া স্থানীয় মানুষের হালচাল রীতিনীতির খবর মেলে এ সব গাড়িতে। বেড়াতে এসেছি শুনে সহযাত্রীরা অনেক খবর দিলেন।

জানলাম বাংলাদেশ বর্ডার কাছেই। আমাদের পিয়াসবাড়ি মোড়ে নামার কথা ছিল। কিন্তু ওদের কথা শুনে চললাম বাংলাদেশ দেখতে। সীমান্ত পেরিয়ে ও দেশে যাওয়ার ইচ্ছে পূরণ এ জীবনে আর হবে না। দুধের স্বাদ ঘোলে মিটুক। মেহেদীপুর চেকপোস্টে গিয়ে দেখি আলু পেঁয়াজ বোঝাই ট্রাকের সাড়ি দাঁড়িয়ে। পাশেই ইমিগ্রেশন অফিস, বিএসএফ অফিস। ছাড়পত্র নিয়ে ট্রাক ওপিঠে যাচ্ছে। ও পারের অনেক যাত্রীও আছেন। অবাক হলাম। ওপারে ভারত বিদ্বেষের ঢেউ কিন্তু দু-দেশের ব্যবসা বন্ধ নেই। বিদ্বেষের বিষেই একদিন যে দাগ টানা হয়েছিল জমির উপর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি এখন। ওপারটা দেখার জন্যেও অনুমতি নিতে হচ্ছে। সেজন্য আধার কার্ড চাই। ভুল করে কার্ড সঙ্গে আনি নাই তাই সে স্বপ্ন অধরাই থাকল। গৌড় নগরীর একাংশ আজ সীমান্তের ওপারে। দেশ ভাগের সঙ্গে দেশের ইতিহাসও ভাগ হয়ে গেছে। অবশ্য ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় মালদহ জেলা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ১২-১৫ আগস্ট মালদহ জেলা পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়েছিল। কিন্তু ১৭ আগস্ট র‍্যাডক্লিফ পুরস্কারের চূড়ান্ত ঘোষণায় জেলাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে নবাবগঞ্জ মহকুমা পাকিস্তানের ভাগে যায়। এখন বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলায় ঐতিহাসিক স্থান হয়ে আছে খণ্ডিত গৌড়। সেখানে গৌড়ের ধ্বংসাবশেষের বেশ কয়েকটি মসজিদ, মাদ্রাসা (ইসলামিক স্কুল), প্রবেশদ্বার এবং দুর্গ প্রাচীর রয়েছে। দেশ ভাগের যন্ত্রণার প্রতীক হয়ে আছে এখন গৌড়। সে যন্ত্রণা পিছনে রেখে মুখ ফেরালাম নিজের দেশের দিকে।

পিয়াসবাড়ির পথে স্থানীয় এক টোটো চালককে পাকড়াও করেছি। ৩০০ টাকার বিনিময়ে সব দেখাবে। মৌখিক চুক্তির দাম রেখেছিল ও। পর্যটকদের ঠকানোই এখন দস্তুর। যেখানেই গেছি সেখানেই ঠকেছি। তবে সবাই সমান নয়। এই লোকটা যেমন। সহজ সরল। ওপার বাংলা ছেড়ে এপারে এসেছে। আপাতত পর্যটকদের ইতিহাস দেখায় কিন্তু ইতিহাসের খবর রাখে না। রাখার সময় মেলেনি। ছিন্নমূল জীবনে সে সময় কোথা! হয়ত আমাদের এই ছুটে আসা ওদের অবাক করে! অথচ এই ইতিহাস ওদের তৈরি। ওরাই ছিল এ দেশের কৃষক কারিগর যোদ্ধা। ওদের মেহনতে তৈরি কৃষি পণ্য, শিল্প সামগ্রী গঙ্গা মহানন্দার বুক বেয়ে যেত দেশ দেশান্তরে। ওরা দাঁড় বাইত। ওদের গড়া সৌধ প্রাসাদে আমোদ প্রমোদের বাসর ছিল শাসক শ্রেষ্ঠীর। ওরাই মন্দির গড়েছে, মসজিদ গড়েছে, শিল্প সৌন্দর্য মণ্ডিত করেছে সব। ওদের কারিগরি শিল্প সুষমা দেখে অবাক হয় মানুষ। কিন্তু সেখানে ওদের নাম নেই। সে সব শাসক শ্রেণীর কীর্তি গৌরবের সাক্ষী এখন। ওদের সৃষ্টি সম্পদের লোভেই এদেশে ছুটে এসেছিল বিদেশী লুঠেরা। শক, হূন, আফগান, তুর্কী, পাঠান, মুঘল, ইংরেজ। কেউ লুঠে নিয়ে গেছে,,কেউ এদেশেই সাম্রাজ্য গড়েছে। শাসন করেছে, শোষণ করেছে,,ভোগ করেছে এ দেশের সম্পদ। নিচের তলার মানুষ নিচেই থেকে গেছে। সেই অভিমানেই হয়ত ওরা ইতিহাসের খবর রাখে না। এখানে ঘোরার পথে ছোট ছোট গ্রামে দেখছিলাম ওদের নিস্পৃহ জীবন সংগ্রাম। হয়ত নতুন যুগের ইতিহাস রচনা করছে ওরা। রবীন্দ্রনাথের কথায় —

“ওরা কাজ করে

দেশে দেশান্তরে,

অঙ্গ-বঙ্গ কলিঙ্গের সমুদ্র নদীর ঘাটে ঘাটে,

পঞ্জাবে বোশ্বাই-গুজরাটে।”

গৌড় ভ্রমণে আজ আর পর্যটক জোটে না তেমন কারন সে কালের কঙ্কাল। রূপ রস গন্ধ হীন! বিস্তীর্ণ একটা শহরের শায়িত শ্মশান ভূমি! ভারতীয় অংশে এই নগরের বর্তমান অবস্থান মালদা শহরের দক্ষিণে গঙ্গা ও মহানন্দা নদীর মধ্যবর্তী ভূখন্ডের পূর্বাংশে ২৪৫২ উত্তর অক্ষাংশে এবং ৮৮১০ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩২.১৮ কিমি এবং প্রস্থে প্রায় ৬.৪৪ কিমি ভারত বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে শবদেহ। কত রাজ বংশের উত্থান পতন, কত সুলতানের মসনদ দখলের রক্তাক্ত লড়াই, জিগীষা জিঘাংসা, প্রেম বিরহের গল্প চুপ করে আছে এই প্রান্তরের নিচে। এখানে ঘুরে ঘুরে খুঁজছিলাম সেই সময়ের প্রাণ স্পন্দন। বড়ই জটিল খোঁজ। লিখিত ইতিহাস প্রায় নিখোঁজ। কিছু মুসলিম ঐতিহাসিকের লেখা আর বিদেশী পর্যটকদের বর্ণনায় যা আছে। প্রত্নক্ষেত্রের সাক্ষ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। কেমন করে হারিয়ে গেল সমৃদ্ধ একটা শহর সে এক বিষ্ময়! তবে একদিনে যায়নি। কালের নিয়ম মেনেই পতন হয়েছিল তার। কখনও প্রকৃতি কখনও মানুষ দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছিল তার। প্রকৃতি তাকে জরাগ্রস্ত করেছিল, বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছিল আর মানুষ লুন্ঠন করছিল ধন সম্পদ। মানুষের লোভ লালসায় চুরি হয়ে গেছে ইতিহাস। গৌড়ের ইট কাঠ পাথরে তৈরি হয়েছে অন্য নগর, সৌধ, রাস্তা ঘাট। মালদহের অনেক অফিস আদালত, ইংরেজবাজার কুঠি থেকে মূর্শিদাবাদ-সহ বাংলার বিভিন্ন জায়গার নানান নির্মাণকার্য হয়েছে।

গৌড়ের স্থাপত্য থেকে খুলে আনা ইট-পাথরে। কলকাতার সেন্টজনস গির্জা কিংবা নিয়ামাতুল্পা ঘাট মসজিদের মতো আরও অনেক সৌধেই রয়েছে তার প্রমাণ। শুধু গৌড় নয়় প্রাচীন স্থাপত্য কীর্তি থেকে পাথর খুলে নেওযার মত অপকীর্তি এ দেশে অবাধে চলে এসেছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া পর্যন্ত। আসলে অতীতে এ দেশে ইতিহাস চেতনা বলে কিছু ছিল না। পরিত্যক্ত পুরাকীর্তি তাই বেওয়ারিস সম্পত্তির মত লুঠের মাল হয়ে ছিল। এই ইতিহাস লুণ্ঠন বন্ধে উদ্যোগী হন ইংরেজ শাসক লর্ড কার্জন। এজন্য ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে ‘দ্যঅ্যানসিয়়েন্ট মনুমেন্ট প্রিজার্ভেশন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করেন। কিন্তু কি লাভ হয়েছে! ইতিহাস রক্ষায় আমাদের ভূমিকা এখনও মধ্যযুগীয়। এ ব্যাপারে সরকারের ভূমিকাও নিয়ম রক্ষায় সীমিত। গৌড়ের রাস্তা ঘাট পুরাকীর্তি গুলোর দৈনদশা দেখে তাই মনে হল। এ বিষয়ে অনেক কিছুই করার ছিল। পর্যটন এখন অর্থনীতির অঙ্গ। এ বিষয়ে রাজ্যের পর্যটন বিভাগকে একটু নজর দিতে অনুরোধ জানাই।

অধিকাংশ পন্ডিত মনে করেন যে, পশ্চিম দিকে নদীর গতিপথ সরে যাওয়ায় গৌড় নগরীর পতন ঘটে। তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়। এ বিষয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে কয়েক শতকে ভারত তথা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদল কেমন ভাবে ভাগ্য বদল হয়েছিল একটা জনপদের সেটা আমাদের জানা উচিত। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাচীন কোনো এক সময়ে গঙ্গা নদী মহানন্দার উপর দিয়ে প্রবাহিত হত। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি মহানন্দা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পশ্চিম দিকে সরে যায়। জৈমস রেনেল আঠারো শতকের শেষের দিকে গঙ্গা নদীর পশ্চিমমুখী প্রবাহের কথা লিপিবদ্ধ করেন। কারণ, তিনি গৌড়ের ধ্বংসাবশেষের প্রায় দশ মাইল পশ্চিম দিকে এটিকে প্রবহমান দেখেন। পুরানো খাতসমূহের অস্তিত্ব এধরনের গতি পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। সেক্ষেত্রে বলা যায় যে, গঙ্গা-মহানন্দা প্রবাহের পশ্চিম পার্শ্বে লক্ষ্মণাবতী অবস্থিত ছিল। এর স্মৃতি সম্ভবত লোপো হোম্স (১৫১৯) এবং গ্যাস্টন্ডি’র (১৫৪৮) স্কেচে মূর্ত হয়ে রয়েছে। দীর্ঘ এলাকা জুড়ে পুরনো খাতসমূহে পরিত্যক্ত বালুময় মাটি এখনও দেখা যায়। প্রাক-মুসলিম যুগের অস্ত্রশস্ত্র, পুরাবস্তু (বৌদ্ধ ও হিন্দু উভয়েরই),মধ্যযুগীয় দুর্গ গৌড়ের দক্ষিণে অবস্থিত উঁচু ভূমিতেই শুধু দেখা যায়।

জেমস রেনেল দেখেন যে, আঠারো শতকের শেষে নদীটি গৌড়ের পশ্চিম দিকে প্রায় দশ মাইল সরে যায়। দুজন ইউরোপীয় পরিব্রাজক সৈবা’’বয় ম্যানরিক (১৬৪৮) ও রবার্ট হেজেজ (১৬৮৭) নদী সরে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন নি এবং প্রাসাদের সামনে নৌকাসমূহের নোঙ্গরের কথা স্পষ্টভাবেই বর্ণনা করেছেন। রবার্ট হেজেজ জন স্থানটিকে রোমের কনস্ট্যান্টিনোপল শহরের থেকেও বড় বলেছেন। এ ছাড়া এক দশক পর সুলেমান কররানী অথবা মুঘল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পশ্চিমে নদী যে দিকে সরে যাচ্ছিল সে দিকে তান্ডায় রাজধানী স্থানান্তর করার কোনো যুক্তিই ছিল না। ষোল শতকের শেষের দিকে রালফ ফিচ-এর বর্ণনা ধারণা দেয় যে, নদী পশ্চিম দিকে সরে যেতে শুরু করেছিল। সম্ভবত এ কারণে মুঘল সেনাপতি মানসিংহ নদীর পূর্ব তীরে রাজমহলে রাজধানী স্থানান্তরের কথা ভাবেন।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা গৌড় নগরীর অবক্ষয়ের অন্য এক প্রধান কারণ ছিল। যখন চট্টগ্রামকে নিয়ে আরাকান, ত্রিপুরা ও বাংলা এবং পরে পর্তুগিজ ভাগ্যান্বেষীদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়, তখন শেরশাহ কর্তৃক গৌড় বিজয় ও লুণ্ঠনের ফলে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভাগীরথী অঞ্চল বিশেষ করে এর উপরের অংশ অস্থিতিহীন হয়ে পড়ে। গৌড়ে তিনমাস স্থায়ী আনন্দময় জীবনযাপন করে হুমায়ুন এ নগরীকে জান্নাতাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এসময়ে হোসেনশাহী বংশের বিলুপ্তি ঘটে। অতঃপর উড়িষ্যা থেকে আক্রমণ আসে এবং উড়িষ্যার শাসক সপ্তগ্রাম অবরোধ করেন। এদিকে যখন পর্তুগিজ ব্যবসায়ীগণ প্রথমে সপ্তগ্রামে ও পরে হুগলিতে বসতি স্থাপন করে, তখন তাদের এক দল উপকূলীয় অঞ্চলে লুঠপাট চালাচ্ছিল। এতে বাংলার বহিঃবাণিজ্য বিঘ্নিত হয়। মুগল-পাঠানদের লড়াইয়ের অব্যবহিত পরে আসে চূড়ান্ত আক্রমণ। এতে কার্যত বাংলার উত্তরাংশ বিধ্বস্ত হয়ে যায়।

সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ গৌড় থেকে পান্ডুয়াতে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন পনেরো শতকের শুরুর দিকে। এর কারণ সম্ভবত জনসংখ্যা। এ সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলমান নৈরাজ্যের কারণে সমুদ্র বন্দর হিসেবে সপ্তগ্রাম/সাতগাঁও-এর উত্থান হয় ও গৌড় নগরে অভিবাসন দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। ভাগীরথী তীরের অন্যান্য শহরগুলিও এজন্যই বিকশিত হচ্ছিল দ্রুত ও সপ্তগ্রাম এবং গৌড়ে বস্ত্র সরবরাহকারী হয়েছিল। জনস্ফীতিতে তখনই গৌড় নগরী দেওয়ালের পেছনে দক্ষিণ দিকেও বিস্তার লাভ করেছিল।

সুলতান রুকনউদ্দীন বারবক শাহের (১৪৫৯-১৪৭৪) সমযেও নগরায়ন দ্রুতগতিতে চলতে থাকে এবং ষোল শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। এর ফলে উদ্ভূত নানান সমস্যা লক্ষ্য করেছিলেন এক পর্তুগিজ দোভাষী। ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি শীতের সকালে নগরীর পথে অনেক মানুষকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। সে সময়ে কোনো বিশেষ উপলক্ষে সুলতানকে নগরে নিরামিষ ও আমিষ খাদ্য বিতরণ করতেও দেখেছিলেন। যা তখন গৌড়ে বাস্ত্তহারা ও বেকার লোকদের উপস্থিতির প্রমাণ করে।

এভাবে অবিরাম জনস্ফীতিতে নগরকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে। অবহেলিত হয় অগভীর খাড়ি ও গঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযোগস্থাপনকারী এবং নগরের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত নালা গুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ। যার উল্লেখ দেখি ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে ভিনসেন্ট ল্য বঁলা’র নগর বিবরণে। এর ফলেই প্লেগ রোগ মহামারী রূপে নগরে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিদিন শতশত লোকের মৃত্যু ঘটে। এমনকি মুনিম খানও প্রাণ হারান। সম্ভবত গঙ্গা নদীর গতিপথ পশ্চিমদিকে সরে যাওয়ায় মহানন্দা ও গঙ্গার সঙ্গে যুক্ত খালসমূহের প্রবাহে অবরোধ নগরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছিল।

ষোল শতকের শুরুতে পর্তুগিজরা মালাক্কা দখল করলে গৌড়-সপ্তগ্রাম এবং দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় মুসলিম বণিকদের পণ্য পরিবহণে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এমনও হতে পারে পারে যে, ভাগীরথী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগ পর্তুগিজদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বাংলা অঞ্চলে রৌপ্যের আমদানি ব্যাহত হয়। এভাবে দু দিকের নৈরাজ্য এবং রাজনৈতিক ডামাডোল গৌড় নগরীর বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বিলীন হতে থাকে। মুগল বিজয় এবং নদীর পূর্বতীরে তান্ডা থেকে রাজমহলে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ায় একটি নতুন সঙ্কট সৃষ্টি হয় যা গৌড় নগরীর পতনকে নিশ্চিত করে।

যাইহোক, প্লেগ রোগে মুনিম খানের মৃত্যুর পর ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে গৌড় থেকে রাজধানী চূড়ান্তভাবে তান্ডায় স্থানান্তরিত হওয়ার পরেও গৌড় পুরোপুরি অস্তিত্ব হারায়নি। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর রচনায় তার আভাস মেলে। ষোল শতকের শেষেও আনন্দময় নগর হিসেবেই টিকে ছিল গৌড়। তার পর কোন এক সময়ে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয় এ নগরী। তার পর অন্ধকারে হারিয়ে যায়। চুরি হতে থাকে ইট কাঠ পাথরের ইতিহাস।

সেই সব হারানো গৌড়কে খুঁজছি পথে পথে। কি পেলাম জানি না! তবে মন ভরে গেল। বল্লাল ভিটা, সুলতানী ভগ্ন সৌধ মসজিদ, ইট কাঠ পাথরে চুপিচুপি সুখ দুঃখের কত কথা শোনাল কানে।

সে কথা বলার নয় অনুভবের। গৌড় আজ হীন দীন, পথের ফকির। তার কথা কে শোনে! সবাই ছোটে দেশ বিদেশের শিল্প স্থাপত্যের ঐশ্বর্য, সমুদ্র নদী পাহাড় দেখতে। দেখে চক্ষু চরিতার্থ হয় কিন্তু মন ভরে কি? পরের ধনে কি ধনী হওয়া যায়! তাই কবির কথায় বলি।

“মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই

দীন দু:খিনী মা যে তোদের তার বেশী আর সাধ্য নাই।

ঐ মোটা সুতোর সঙ্গে মায়ের অপার স্নেহ দেখতে পাই

আমরা এমনি পাষাণ তাই ফেলে ঐ পরের দোরে ভিক্ষে চাই।”

এ আমার ভ্রমণ নয়। নিজেদের আত্ম পরিচয় ফিরে পাওয়ার পরিক্রমা। পাঠ্য ইতিহাসে যা মেলে না। বাঙালি আজ আত্ম বিস্মৃত জাতি। আমার পরিক্রমা সেই অতীত গৌরবের শ্মশানভূমি গৌড় ও পান্ডুয়া নগরের মাটি ছুঁয়ে তাকে নতুন করে আবিষ্কার করা। আমাদের অতীত আর বর্তমানের বিচ্ছিন্ন যোগসূত্র এক হলে ভবিষ্যত হয়ত অন্য রকম হবে। এই ভেবে কাহিনী বিস্তার করেছি। এরপর লিখব এক অনুসন্ধান পর্ব তারপর দেখাবো বর্তমানের বাস্তব ছবি। এ লেখা হয়ত দিশা দেবে পর্যটকদের গৌড় ভ্রমণে। গৌড়ের অতীত না জেনে গেলে খালি হাতে ফিরতে হবে। না গিয়েও যারা জানতে চান গৌড়কে, আশা করি তাদেরও পিপাসা মেটাবে এই কাহিনী। তবে একটু অপেক্ষা আর ধৈর্য চাই। আপাতত এটুকুই।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন