দিনটা ছিল মাঘমাসের ৫ তারিখ। গুরুদেবের প্রকোষ্ঠে গিয়ে উমাচরণ মুখোপাধ্যায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সত্য সত্যই কি ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া যায়?’
গুরুদেব বললেন, ‘সাধনা আর গুরুর কৃপাতে সব পাওয়া যায়।তুমি কি দেখতে চাও?’
মাথা নাড়লেন উমাচরণ।
বাকসিদ্ধির ফলে যোগী যা বলেন তাই অনির্বচনীয়ভাবে কার্যে পরিণত হয়। প্রকৃতি তখন সেই মহেশ্বররূপী যোগীর কাছে দাসবৎ আচরণ করে। যোগবিভূতির মধ্যে দিয়ে নানারকম অলৌকিক ঘটনা ঘটানোর ক্ষমতা কাশীর জীবন্ত শিব মহাযোগী শ্রীশ্রীত্রৈলঙ্গস্বামীর জীবনে কর্মে পরিণত হয়েছিল। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের নবম জ্যোতির্লিঙ্গ কাশী বিশ্বনাথের প্রসঙ্গ তুললে কাশীর জীবন্ত শিব মহাযোগী শ্রীশ্রীত্রৈলঙ্গস্বামীর কথা না বললে হয়তো মাহাত্ম্যের মহাভূমির কথা অসম্পূর্ণ থাকে। তাকে বলা হয় কাশীর জীবন্ত শিব।
সেদিন সন্ধ্যায় সেই অলৌকিক ক্ষমতা অনুভব করেছিলেন উমাচরণ। উমাচরণ মুখোপাধ্যায় পেশায় একজন শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। ১৮৭১ সালে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. পাস করে কুইন্স কলেজ ও আগ্রা কলেজে কিছুকাল অধ্যাপনা করেন। পরে ঢোলপুর রাজ্যের নাবালক রাজার গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন এবং ক্রমে মন্ত্রী ও রাজার প্রাইভেট সেক্রেটারীর পদ লাভ করেন (১৮৯৮) এবং রাজা কর্তৃক প্রকাশ্য দরবারে ‘সর্দার’ উপাধিতে ভূষিত হন। ইংরেজী এবং ভারতীয় ভাষা ছাড়া ফরাসী ও জার্মান ভাষায়ও তার বুৎপত্তি ছিল। গণিতশাস্ত্ৰ, দর্শন, জ্যোতিষ, ইতিহাস, আইন প্রভৃতি বিষয়েও পারদর্শী ছিলেন।উমাচরণ গৃহস্থ ছিলেন বটে কিন্তু তীর্থে তীর্থে ঘুরে সাধু মাহাত্মাদের সঙ্গ করে তিনি জানতে চাইতেন জন্মান্তর কর্মফল বলে আদৌ কিছু হয় কিনা?
তার জিজ্ঞাসা তাকে পৌঁছে দিয়েছিলে কাশীতে কারণ সেই সময় কাশীতে ছিলেন ধর্ম ও আধ্যাত্মিক জগতের সাধক শিরোমনি ত্রৈলঙ্গ স্বামী। সন্ন্যাস নিয়ে বহু তীর্থ পর্যটন করলেও তার জীবনে বেশিরভাগ সময়ই বারানসিতে কেটেছিল মণিকর্ণিকা শ্মশানে। ধুনী জ্বালিয়ে তিনি সর্বদা সাধন ভজনে মগ্ন থাকতেন।
একবার উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ানোর অপরাধে যোগীবরকে ধরে নিয়ে গিয়ে গারদে পুড়ে দিয়েছিল এক ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু সকালবেলায় থানায় গিয়ে ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে দেখতে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট অবাক বিস্ময়ে দেখেন তিনি গারদের বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনই ছিল তার ইচ্ছাশক্তি। গীতার মতে, তিনি ছিলেন গুনাতীত সন্ন্যাসী।তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, স্বামী ভাস্করানন্দ প্রমুখের। এই মহাযোগী সম্পর্কে বহু অলৌকিক ঘটনা সে সময় শোনা যেত।
উমাচরণ কাশিতে এসে কাশির সমস্ত দেব দেবী দর্শন করে পঞ্চগঙ্গা ঘাটের উপর অবস্থিত বিন্দুমাধব ও ত্রৈলঙ্গ স্বামীজিকেও দর্শন করে এলেন। তারপরের দিন সকালে মণিকর্ণিকা ঘাটে স্নান করে মৌনি স্বামীকে দর্শন করে এলেন। মনের বাসনা ছিল তার প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করবেন কিন্তু সেবক মঙ্গলদাস ঠাকুর স্বামীজীর কাছে বসামাত্র আঙ্গুলের সংকেত করে তাকে চলে যেতে বললেন। পরের দিন ওই একই আচরণ করলেন।
উমাচরণ শুধু একা নয় তার সঙ্গে দু-একজন বাবুও গলাধাক্কা খেয়ে অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরলেন। বাবার অনুমতি ছাড়া যে সেখানে বসে থাকা শক্ত আর বাবার আদেশ পালন করতেই হবে। টানা এগারো দিন একইভাবে চললো। ১২ দিনের দিন অনেক চেষ্টার পর বসার অনুমতি চেয়ে কেঁদে ফেলেন উমাচরণ। মঙ্গল ঠাকুরকে ইঙ্গিতে নির্দেশ দিলেন স্বামীজি, আজ চলে যাক কাল সকালবেলা আসতে বল। স্বামীজীর নির্দেশে পরের দিন ভোরবেলায় স্নান করে উমাচরণ হাজির হলেন।স্বামীজীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন।
সেবক গেরিমাটি আর একলোটা জল এনে দিয়ে বললেন বাবা আপনাকে গেরিমাটি ঘষতে বলেছেন। উমাচরণ সকাল-সন্ধ্যা আশ্রমে যান গেরিমাটি ঘষেন আর চলে আসেন। এভাবে কাটলো ১৫ দিন। কাশীতে কষ্ট দুঃখ নিয়ে মোট ২৮ দিন কাটাতে হলো। ২৯ দিনের দিন স্বামীজি তার বসার বেদীর তলা থেকে দেবনাগরী ভাষায় একতারা শ্লোক বের করে বললেন পড়তে। চলতে থাকলো উমাচরণের শ্লোকপাঠ।
ত্রিশ দিনের দিন সাধন প্রকোষ্ঠ উমাচরণকে ডাকলেন স্বামীজি, মৌনী ভঙ্গ করে বললেন, ‘তুমি যে বিষয় মনে নিয়ে আমার কাছে এসেছো তাতে কোন সংশয় নেই। মানুষ পুনর্জন্ম বর্তমান ভবিষ্যৎ — এই তিনের সংবাদ মানুষ সহজেই পেতে পারে সাধনার দ্বারা’।
উমাচরণ অবাক হলেন! কি করে টের পেলেন স্বামীজি তার সংশয়ের কথা! এরপর স্বামীজি গড়গড়িয়ে বলে চললেন তাঁর ঠিকুজি। বললেন, ‘পূর্বজন্মের সুকৃতিগুণে তুমি কাশিতে এসেছ। কাল তোমার দীক্ষার ব্যবস্থা হবে।’
মাঘ মাসের ৫ তারিখ।উমাচরণকে একটি ছোট্ট প্রকোষ্ঠে ঢুকিয়ে নিয়ে গুরুদেব বললেন,‘ঘরের মধ্যে যে কালীমূর্তিটি আছে, সেখানেই তিনি বিরাজমান কি না দেখে এসো?’
উমাচরণ দেখে এসে বললেন, ‘পাষাণময়ী মা অচলা’।
গুরুদেব উচ্চস্বরে হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মা-কে কি এখানে দেখতে চাও?’ বলেই গুরুদেব ধ্যানস্থ হলেন একঘন্টার জন্য। গুরুদেবের আদেশে স্থির হয়ে আসনে বসে আছেন উমাচরণ। ধ্যান ভঙ্গ হল স্বামীজির, বললেন ‘দেখো’। অস্পষ্ট প্রদীপের আলোয় উমাচরণ দেখলেন এক কুমারী বালিকা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন। আলোতে চৈতন্যময়ী রূপের ছটা থেকে তিনি ভীত ও চমৎকৃত হলেন। মনে মনে ভাবলেন একবার যদি মা বলে ডেকে প্রণাম করতে পারতাম। আনন্দে ভয়ে গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোলো না।
স্বামীজি বললেন, ‘তুমি গিয়ে দেখে এসো মায়ের মূর্তি যেখানে ছিল সেখানে আছে কিনা!’ মনে ভয় ও শিহরন নিয়ে উমাচরণ গিয়ে দেখলেন মায়ের বেদীতে পাষাণময়ী নেই। ভয় পেয়ে উমাচরণ তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন। স্বামীজি অট্টহাস্য করলেন। তার সামনে বসে মাকে ফের দেখতে বললেন। উমাচরণ দেখলেন বেদীর মূর্তির মতো হুবহু রূপ, শুধু তার জিভটা বের করা নেই আর পায়ের নিচে মহাদেব নেই। গুরুদেবের অনুমতি পেয়ে মাকে প্রণাম করলেন উমাচরণ।
স্বামীজি বললেন, ‘বেশ করে দেখে নাও, পরে আক্ষেপ করতে যেন আর না হয়।’ উমাচরণ মায়ের পায়ে হাত দিয়ে অনুভব করলেন রক্তমাংসের পেলবতা। স্থির হয়ে দেখছেন মাকে। কিছুক্ষণ পর গুরুদেব মাকে আসনে যেতে নির্দেশ দিলেন।
উমাচরণ স্পষ্ট দেখলেন, মা ধীর পায়ে বেদির দিকে চলে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গুরুদেব পাষাণ কি প্রকারে চলতে পারে? যা দেখলাম তা তো অসম্ভব!’ ত্রৈলঙ্গস্বামী বলেন, তোমার জড় দেহটা কেমন করে চলে?
উমাচরণ বললেন, ‘দেহে আত্মা ও চৈতন্য আছে সেজন্য সে চলতে পারে। ‘তার উত্তর শুনে স্বামীজি বললেন, ‘সিদ্ধ সাধকের গুনে যখন মাটি, পাষাণ, ধাতুতে আত্মা ও চৈতন্যের সঞ্চার হয় তখন সে মূর্তি চলতে কথা বলতে, শুনতে ও কাজ করতে পারে।’ শিহরিত উমাচরণ। রাত হচ্ছে। স্বামীজি বেদি ঘরে চলে গেলেন, যাওয়ার আগে বলেন কাল সকালে একসঙ্গে মণিকর্ণিকায় স্নান করতে যাব।
পরবর্তীকালে উমাচরণ মুখোপাধ্যায় ত্রৈলঙ্গ স্বামীর আরো সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা ও আধ্যাত্মিক দর্শনে মুগ্ধ হয়ে তাঁর জীবনী লিপিবদ্ধ করেন। উমাচরণের লেখা বইটি শুধুমাত্র নিজের অভিজ্ঞতা নয়, বরং কালিচরণ স্বামীসহ অন্যান্য শিষ্যদের মুখে শোনা ঘটনা ও তথ্য নিয়ে গঠিত, যা একে খুব নির্ভরযোগ্য করেছে।
উমাচরণের বর্ণনা অনুযায়ী, তৈলঙ্গ স্বামী ছিলেন নির্বিকার, নির্লোভ এবং আসক্তিহীন এক যোগী, যিনি জগতকে ঈশ্বরের রূপ হিসেবে দেখতেন। উমাচরণ স্বামীর অদ্ভুত ক্ষমতার বর্ণনা দিলেও, তাঁর উপদেশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, যেমন — ইন্দ্রিয় সংযম, কাম-কাঞ্চন ত্যাগ এবং আত্মজ্ঞান লাভ।
এক কথায় দারুন। অভিভূত। 🙏🌹
থ্যাঙ্ক ইউ
খুব সুন্দর হয়েছে। ধন্যবাদ।
প্রাপ্তি