অরিদ্রা নক্ষত্রের রাতে শিব স্বয়ং জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এঁরা তাই প্রত্যেকেই স্বয়ম্ভু। কখনো গঙ্গা-গোদাবরী, নর্মদা-শিপ্রা, কখনো সমুদ্রতটে অথবা হিমালয়ের কোলে তাঁর অবস্থান।

“সৌরাষ্ট্রে সোমনাথং চ শ্রীশৈলে মল্লিকার্জুনম্।
উজ্জয়িন্যাং মহাকালং ওঙ্কারেশ্বরমামলম্বরম্ ॥
পর্ল্যাং বৈদ্যনাথং চ ডাকিন্যাং ভীমশঙ্করম্।
সেতুবন্ধে তু রামেশং নাগেশং দারুকাবনে ॥
বারাণস্যাং তু বিশ্বেশং ত্র্যম্বকং গৌতমীতটে।
হিমালয়ে তু কেদারং ঘৃষ্ণেশং চ শিবালয়ে ॥
এতানি জ্যোতির্লিঙ্গানি সায়ং প্রাতঃ পঠেন্নরঃ।
সপ্তজন্মকৃতং পাপং স্মরণেন বিনশ্যতি ॥”
ধর্মপ্রাণ মানুষের সবার পক্ষে আসমুদ্র হিমাচলে প্রতিষ্ঠিত এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের দর্শন সম্ভব হয় না। তাই তাঁরা অনেকেই স্বগৃহে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গকে স্নান করিয়ে এই মন্ত্রটি প্রত্যহ উচ্চারণ করেন।

সাধারণভাবে তিনি সংহার বা প্রলয়ের দেবতা হলেও তাঁর ঐকান্তিক ভক্তরা মনে করেন তিনি ব্রহ্মার কাজ সৃষ্টি এবং বিষ্ণুর কাজ জগৎপালন দুটিই করতে পারেন।যেখানে আলো আছে, সেখানেই শিব — আর সেই আলোই জ্যোতির্লিঙ্গ।এটি সৃষ্টির আদিশক্তির প্রতীক।লিঙ্গ মানে চিহ্ন—যে চিহ্নে নিহিত আছে উৎপত্তি, ধারাবাহিকতা ও পুনর্জন্মের বোধ।শিবলিঙ্গ ও যোনি একসঙ্গে বোঝায়
পুরুষ ও প্রকৃতি,
চেতনা ও শক্তির মিলন—
যেখান থেকে জন্ম নেয় জীবন,
যেখানেই উর্বরতা, সেখানেই শিব।

ভারতের পুণ্যভূমিতে এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের উৎপত্তি, মাহাত্ম্য, অবস্থান নিয়ে প্রায় একটি গবেষণা গ্রন্থ লিখেছেন শ্রীমতী রিঙ্কি সামন্ত। আজ ৪৯তম কোলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হল তাঁর লেখা দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ। বইটি মুদ্রণ এবং প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছেন, সৌম্যা রায়চৌধুরী অনুপমা প্রকাশনীর পক্ষ থেকে। প্রচ্ছদের ছবি এঁকেছেন শ্রী শুভম সিনহা।
শিব উমাপতি হয়েও সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। তাঁর গৈরিক বসনের রঙ এই বইকে এক অন্যমাত্রা দিয়েছে। সর্বোপরি এই বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন ভারতীয় মহাকাব্য ও পুরাণ বিশেষজ্ঞ পন্ডিতপ্রবর শ্রী নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী। তাঁর কথায়, “শিবলিঙ্গের প্রতিষ্ঠা এবং পুজার বিষয়ে উল্লেখ্য ভারতবর্ষে লিঙ্গপুজার ভাবনাটাই সবথেকে আদিম এবং প্রাচীন। শুধু ভারতবর্ষে নয়, পৃথিবীর সবকয়টি সভ্যতার ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য। তবে আর্য সংস্কৃতির শিষ্টবোধী মানুষেরা লিঙ্গপূজা বা শিশ্নদেবতার প্রচারে রীতিমতো ঘৃণা পোষণ করেছেন। হয়তো সেই কারণেই ভারতভূমির আদিদেবতা রুদ্রশিব বৈদিক যজ্ঞভাগে ব্রাত্য ছিলেন প্রথমে। কিন্তু নিজের শক্তিতে, গুণে সেই আদিদেব যখন যজ্ঞভাগ পেলেন, তখন লিঙ্গপূজাও রুদ্রশিবের একাত্মকতায় সিদ্ধ হয়েছে, আর্য ভাবনায় গৃহীত হয়েছে।”

এই বইটি ধর্মপ্রাণ মানুষ তো বটেই জিজ্ঞাসু মনের অনেক কৌতুহল নিরসন করবে। রিঙ্কি নিজে এই দ্বাদশ তীর্থস্থান ভ্রমণ করেছেন। শৈব আশীর্বাদে বড় যত্নে, ভক্তিতে বইটি লিখতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর এই বইটি পাঠ করলে পুণ্যপিয়াসী মানুষ এই তীর্থযাত্রার পুণ্যের ফল নিশ্চিত রূপে কিছুটা লাভ করবেন।
“নমঃ শিবায় শান্তায় কারুণাত্রায় হেতবে”।
শান্ত, করুণাময় এবং সৃষ্টি-স্থিতি-লয় এই তিন কারণের আধার (কারণত্রয় হেতবে) পরমেশ্বর শিবকে নমস্কার।