ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নাম করে নির্বাচন কমিশনের অমানবিক, অন্যায্য, অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের প্রতিবাদে সরব হল দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ। গণমঞ্চের পক্ষ থেকে পূর্ণেন্দু বসু জানান, এই পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ৮০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসআইআরের নামে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে, যেভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাঁরা, এই ৮০ জন মানুষের মৃত্যুর কারণ সেটাই। এর ভিতর কেউ আতঙ্কিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। কেউ অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন। এই মৃত এবং অসুস্থ মানুষদের ভিতর ৮০ বছরের বৃদ্ধ যেমন আছেন, তেমনই মধ্য তিরিশের যুবকও রয়েছেন। রয়েছেন পুরুষ এবং মহিলা, হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই। সামগ্রিকভাবে এই রাজ্যে বসবাসকারী প্রতিটি বৈধ ভোটারকে আজ এক ঘোর অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর আশঙ্কার ভিতর ঠেলে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নাগরিকদের জীবন নিয়ে তারা ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছে। নাগরিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাঙালির লাশের উপর দাঁড়িয়ে নিজেদের উল্লাস প্রকাশ করছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশন। তিনি বলেন, আশার কথা কমিশনের তুঘলকি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ প্রতিরোধ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়ে গেছে। তার ব্যাপকতা বাড়ছে। নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের এই বিরুদ্ধতা ফ্যাসিস্ট সরকারের মুখোশ খুলে দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন নিত্যনতুন যেসব ফরমান জারি করছেন, সেগুলি সর্বশ্রেণির নাগরিককে যেমন বিস্মিত করেছে, ক্ষুব্ধ করেছে, তেমনই নির্বাচন কমিশন নিয়োজিত বিএলও-রাও কমিশনের এই কার্যকলাপকে মেনে নিতে পারছেন না। কমিশনের অগণতান্ত্রিক, জনবিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদে তাঁরাও গণইস্তফা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁরাও মনে করছেন, এসআইআরের নামে সাধারণ মানুষের হেনস্থা ছাড়া আর কিছুই করছে না নির্বাচন কমিশন।
এই বিএলওদের উপরেও কমিশন প্রতিদিন মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। কারণে অকারণে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আরও গাঢ় হচ্ছে। এটা এখন বেশ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, মানুষের সংবিধান স্বীকৃত ভোটাধিকার রক্ষা করা বা স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়। নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই কাজ করতে নেমেছে। আর সেই কাজে পশ্চিমবঙ্গ তাদের আসল টার্গেট। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার স্বীকৃত যেসব পরিচয়পত্রকে এতদিন সরকারিভাবে নাগরিকত্বের পরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলি কোনোটিকেই নির্বাচন কমিশন মানছে না। আধার কার্ডকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে সুপ্রিম কোর্ট গণ্য করতে বললেও নির্বাচন কমিশন তাকে মান্যতা দিতে নারাজ। এমনকি এই রাজ্যের তিনবারের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ছ’বার ক্ষোভপ্রকাশ করে চিঠি পাঠালেও কোনো চিঠির উত্তর দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখায়নি কমিশন। এর ওপরে এই রাজ্যের জন্য নতুন নতুন অযৌক্তিক ফরমান আনছে নির্বাচন কমিশন।

গণমঞ্চের প্রতিনিধিরা জানান, সম্প্রতি কমিশন জানিয়েছে, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে জন্ম তারিখের প্রমাণপত্র হিসাবে গণ্য করা হবে না। অথচ এতদিন এই রাজ্যের গরিষ্ঠাংশ বাসিন্দা এই অ্যাডমিট কার্ডকেই তাদের জন্মতারিখের প্রমাণপত্র হিসাবে ব্যবহার করতেন। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারও একেই এতদিন মান্যতা দিয়ে এসেছে। রাজ্য সরকারের দেওয়া জাতিগত শংসাপত্রকেও মান্যতা দিতে চাইছে না নির্বাচন কমিশন। যেসব শংসাপত্রকে এতদিন কেন্দ্র রাজ্য উভয় সরকারই মান্যতা দিয়ে এসেছে, তাকে কেন এখন নির্বাচন কমিশন অস্বীকার করছে, তার কোনো সদুত্তর কিছু নেই।
রাজ্য সরকারের দেওয়া শংসাপত্রগুলিও কেন তারা গ্রহণ করবে না তা-ও নির্বাচন কমিশন কোনো যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারছে না। তার চেয়েও যেটা বিস্ময়ের ব্যাপার তা হল এসআইআরের ক্ষেত্রে সব রাজ্যে যখন এক নিয়ম, তখন এই রাজ্যের জন্য রোজ ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম উদ্ভাবন করতে হচ্ছে কেন নির্বাচন কমিশনকে? বেছে বেছে বাংলা এবং বাঙালিকে হেনস্থা করাই কি তাদের লক্ষ্য! আসলে নির্বাচন কমিশন যা করছে, তা পুরোটাই একটা পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। এই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মূল হোতা বিজেপি এবং আরএস এস। এসআইআরের একটি মূল উদ্দেশ্যই ছিল, এই রাজ্যকে টার্গেট করে এক বিশাল সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বিজেপির বাংলা দখলের রাস্তা সুগম করে দেওয়া। এই অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে এই রাজ্যের বিজেপি নেতারা এক কোটি অনুপ্রবেশকারী আর রোহিঙ্গাদের গল্প দীর্ঘদিন ধরে শুনিয়ে আসছেন। গত শনি এবং রবিবার এই রাজ্যে দুটি নির্বাচনি প্রচারসভায় প্রধানমন্ত্রী সেই পুরনো গল্পই আবার নতুন করে শুনিয়ে গিয়েছেন।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের অমানবিক কার্যকলাপের ফলে এখন পর্যন্ত যে আশিজন বাঙালি প্রাণ হারিয়েছেন, প্রতিদিন বিজেপি শাসিত রাজ্যে কর্মরত যে বাঙালি শ্রমিকরা আক্রান্ত হচ্ছেন, খুন হচ্ছেন তাঁদের সম্পর্কে একটু সহানুভূতিও কেন তিনি দেখাতে পারছেন না? আসলে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দল বিজেপি বাঙালির লাশের উপর দিয়ে চোরাপথে বাংলা দখল করতে চায়। তাঁরা যতই মুখে ‘সোনার বাংলা’ বলুন না কেন, এসআইআরের নামে বাঙালিকে বিপন্ন করে তুলে তাঁরা এই সোনার বাংলাকে শ্মশান বানাতে চাইছেন। দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের তরফ থেকে এর আগে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের কাছে ডেপুটেশন দিয়ে দাবি করা হয়েছিল, অবিলম্বে এইসব অমানবিক অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ বন্ধ করা হোক। মানুষকে হেনস্থা না করে বৈধ ভোটারদের নাম তালিকায় তোলার দাবিও জানানো হয়েছিল।
দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ পরিষ্কার জানায়, বাংলার প্রতিটি বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার রক্ষায় শেষ দিন পর্যন্ত দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ লড়াই আন্দোলন চালিয়ে যাবে। এসআইআরকে সামনে রেখে বিজেপি আরএসএসের বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে আক্রমণকে প্রতিহত করবে।