নিপা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। রাজ্যের সীমান্তের জেলাগুলোতে অবিলম্বে নিপা পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া গ্ৰাম থেকেই ছড়িয়েছে নিপা সংক্রমণ। রাজ্যে নিপা আক্রান্ত নার্সের সংস্পর্শে ৪৮ জন। সবাইকেই ঘরবন্দি থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অযথা আতঙ্কিত হবেন না। সচেতন থাকতে হবে।
প্রসঙ্গত, নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জে ভারত-বাংলাদেশের সীমানাঘেঁষা গ্রাম থেকে ছড়িয়েছে নিপা। আক্রান্ত ২৫ বছরের ওই নার্স পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ১৫ ও ১৭ ডিসেম্বর ওই গ্রামে যান। সেখানকার মানুষের কাঁচা খেজুরের রস ও গুড় খাওয়ার অভ্যাস আছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেখানে গিয়েই তরুণী সংক্রামিত হন। এবারের নিপা সংক্রমণ নিয়ে কল্যাণী এইমসের পাঠানো রিপোর্টে এ কথারই উল্লেখ রয়েছে। তরুণ-তরুণীর দেহরসের নমুনা পরীক্ষা করে সেখানকার বিশেষজ্ঞরা ১১ পাতার রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ফলখেকো বাদুড়ের (ফ্রুট ইটিং ব্যাট) অন্যতম প্রিয় খাদ্য খেজুরের রস। অনেক ক্ষেত্রে রস খাওয়ার সময় সেখানে বর্জ্য ত্যাগ করে সে। সেই রস থেকে মানবদেহে সংক্রমণ হতে পারে। প্রতিবেশী দেশ সংলগ্ন (ঠিক উলটোদিকে বাংলাদেশের চুয়াডাঙা, একটু দূরে কুষ্টিয়া) বিস্তীর্ণ এলাকায় এভাবেই নিপা সংক্রমণ হচ্ছে এক যুগ ধরে। ইনফ্রারেড ক্যামেরায় বাদুড়ের ওই কীর্তিকলাপ ধরা পড়েছে। হু জানিয়েছে, ২০০১ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৪৭ জন নিপায় সংক্রামিত হয়েছেন। ফি বছর সংক্রমণ হচ্ছে। মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ। এদিকে, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নাড্ডা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কলকাতায় এসেছেন এনআইভি পুনের বিজ্ঞানীরা। পুরো বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখছেন। বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে তৈরি হয়েছে নিপা ওয়ার্ড।
এদিকে বর্ধমান জেলার মুখ্যস্বাস্থ্য আধিকারিক জয়রাম হেমব্রম বলেছেন, ‘সব মিলিয়ে মোট ৪৮ জনকে কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। টানা ২১ দিন তাঁদের ঘরবন্দি থাকতে হবে। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। গোটা ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বর্ধমান মেডিকেলে চারটি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। কারও উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা শুরু হবে। প্রয়োজন মতো বেডের সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে। এপর্যন্ত রাজ্যে একজন নার্স সহ দু’জনের শরীরে নিপা ভাইরাসের সন্ধান মিলেছে। নার্সের পরিবার সূত্রে খবর, গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁর জ্বরের উপসর্গ দেখা দেয়। তিনি বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মরত। ৩১ ডিসেম্বর জ্বর গায়েই তিনি কাজ করেন সেখানে। ২ জানুয়ারি তাঁর বাবা হাওড়া স্টেশন থেকে মঙ্গলকোটের বাড়িতে নিয়ে আসেন। ওই দিনই কাটোয়া শহরের সার্কাস ময়দানের এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। ভোর রাতে তিনি বাড়িতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ৩ জানুয়ারি গ্রামেরই একটি গাড়ি করে নার্সকে তড়িঘড়ি কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দু-ঘন্টা থাকার পরেই তাঁকে বর্ধমান মেডিকেলে স্থানান্তরিত করা হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে
বাংলাদেশে ৬৪টি জেলা আছে। তার মধ্যে ৩৪টি জেলাতেই নিপা ভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত। ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের ইতিহাস অন্তত তাই বলছে। এই ৩৪টি জেলার মধ্যে বাংলাদেশের এক ডজনের বেশি জেলার সীমানা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। সীমানার এপারে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ৯টি জেলা। দুই ২৪ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার। ভাষা, খাওয়াদাওয়া, রীতিনীতিতে দু’পারের মধ্যে মিল থাকাটাই স্বাভাবিক ।
নীলরতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডা. পীতবরণ চক্রবর্তী জানান, প্রত্যেক মানুষকে এই ভাইরাস সম্পর্কে সর্তক থাকতে হবে। ভাইরাসের কারণ ও নির্মূল করার বিষয়টি ওয়াকিবহাল হলে অযথা ভয় পাবার কিছু নেই। কিছু নিয়মনীতি মেনে চলতে হবে। আরামবাগ প্রফুল্ল চন্দ্র সেন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সুব্রত ঘোষ জানান, শিশুদের নিয়ে মায়েদের সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে খাবারের বিষয়ে। তবে আতঙ্কের কিছু নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভাইরাসের উৎস মূলত বাদুড়। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল ভাল ফলের সঙ্গে মিশে থাকলে সেখান থেকেও ছড়াতে পারে এই ভাইরাস। আক্রান্তের ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক বা অন্যান্য জিনিসপত্র থেকেও সংক্রমণের ক্ষমতা রাখে নিপা ভাইরাস। সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো উপসর্গ হলেও নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার ৫০-৬০ শতাংশ। আক্রান্তের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাই তাঁকে সুস্থ করতে পারে। সে জন্য দ্রুত রোগ ধরা পড়া অত্যন্ত জরুরি। নিপাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘জুনটিক ভাইরাস’। অর্থাৎ পশুর শরীর থেকে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢোকে। আক্রান্ত পশুদের দেহের অবশিষ্টাংশ, বা মলমূত্র থেকে সংক্রমণ ঘটতে পারে।রোগ নির্ণয় কীভাবে করবেন? সাধারণ পরীক্ষায় নিপার সংক্রমণ ধরা পড়ে না। বায়ো-সেফটি লেভেল-থ্রি স্তরের কোনও ল্যাবরেটরিতেই নিপা ভাইরাসের পরীক্ষা করা সম্ভব। কারণ, এই স্তরের ল্যাবরেটরি না হলে যিনি পরীক্ষা করবেন তাঁরও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আক্রান্তের থুতু-লালা, মূত্রের নমুনা বা সেরিব্রাল স্পাইনাল ফ্লুইড থেকেই নিপা ভাইরাস চিহ্নিত করা সম্ভব।
বিপজ্জনক এই ভাইরাসের মোকাবিলা করতে টিকাই একমাত্র উপায় হতে পারে। জেনোভার প্রতিষেধক কাজ করলে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচবে বলেই আশা করছেন গবেষকেরা। চিকিৎসক পীতবরণ চক্রবর্তী বলেন, “নিপা ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে আগে আমাদের সচেতন হতে হবে। বাজার থেকে ফল নেওয়ার সময় ভাল করে দেখে কিনতে হবে। মাঠেঘাটে পড়ে থাকা ফল না খেলেই ভাল। মাংস বেশি সময় ধরে রান্না করলে, আগুনের তাপে জীবাণু মরে যায়। ফলে জীবাণু বা ভাইরাস ঘটিত রোগের হাত থেকে সহজেই রেহাই পাওয়া যায়। নিপা ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে ৭৫ শতাংশ বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই আগে থেকে আমাদের সতর্ক হতে হবে।”
রোগ ঠেকাতে কী করবেন? যেখানে রোগ হয়নি সেখানে সাধারণ ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে যে সব নিয়ম মেনে চলতে বলা হয়, যেমন, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর ভাবে থাকা, নাকে-মুখে হাত দেওয়ার আগে বা খাবার খাওয়ার আগে হাত ভাল করে ধুয়ে নেওয়া ইত্যাদি। সেটুকু মানলেই চলে। তবে যেখানে রোগ হচ্ছে সেখানে তার সঙ্গে আরও কয়েকটি নিয়ম মানা জরুরি৷ যেমন, শুয়োরের থেকে সব রকম দূরত্ব বজায় রাখা, সমস্যা না মেটা পর্যন্ত ফল খাওয়া বন্ধ করা, ঘরে পরিচ্ছন্ন ভাবে বানানো সুসিদ্ধ খাবার খাওয়া, রাস্তাঘাটে বেরোনোর সময় মাস্ক পরে নেওয়া। এন ৯৫ মাস্ক পরে নিলে বিপদের আশঙ্কা কম থাকে। রোগীর সেবা যাঁরা করেন তাঁদের মাস্ক পরা ও হাত ধোয়ার ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। তাহলেই আমরা সকলে সুস্থ থাকব। তবে নিপা বা যে কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন। কিম্বা কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে যান।