শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:০০
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নরেন্দ্রনাথের জীবনে সঙ্গীত : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী / ৪৭১ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

শ্রীম বা মাস্টারমশাই নরেন্দ্রনাথকে দেখেন সম্ভবত ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর তৃতীয়বার দর্শনের সময়, ৫ই মার্চ, রবিবার, বেলা তিনটের সময়। তিনি বর্ণনা দিচ্ছেন এভাবে — ‘ভক্তসঙ্গে সহাস্যবদনে ঠাকুর কথা কহিতেছেন। একটি ঊনবিংশতিবর্ষ বয়স্ক ছোকরাকে উদ্দেশ করিয়া ও তাঁহার দিকে তাকাইয়া ঠাকুর যেন কত আনন্দিত হইয়া অনেক কথা বলিতেছিলেন। ছেলেটির নাম নরেন্দ্র, কলেজে পড়েন ও সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াত করেন। কথাগুলি তেজঃপরিপূর্ণ। চক্ষু দুটি উজ্জ্বল। ঠাকুর নরেন্দ্রের পরিচয় দিচ্ছেন এইভাবে — “দ্যাখো, নরেন্দ্র গাইতে, বাজাতে, পড়া-শুনায়, সব তাতেই ভাল।” ‘অর্থাৎ ঠাকুর শ্রীমকে নরেন্দ্রনাথ সম্বন্ধে প্রারম্ভিক তথ্য দিয়ে রাখছেন, যাতে পরবর্তীতে শ্রীম’র নরেন্দ্রনাথের সম্বন্ধে লিখতে গেলে অসুবিধা না হয়।

এই আলাপচারিতার পরেই শুরু হল নরেন্দ্রনাথের গান। যে সঙ্গীত নরেন্দ্রনাথ এবং তাঁর গুরুর মধ্যে সবসময় গঙ্গানদীর মতো অবিরত প্রবাহিত হয়েছে। “নরেন্দ্র গান করিতেছেন, দুই চারিজন ভক্ত দাঁড়াইয়া আছেন।… ঠাকুরের গান ছাড়া এমন মধুর গান তিনি কখনও কোথাও শুনেন নাই। হঠাৎ ঠাকুরের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া অবাক হইয়া রহিলেন। ঠাকুর দাঁড়াইয়া নিস্পন্দ, চক্ষুর পাতা পড়িতেছে না।… জিজ্ঞাসা করাতে একজন ভক্ত বলিলেন , এর নাম সমাধি!” নরেন্দ্রনাথের গানটি ছিল এই —

“চিন্ময় মম মানস হরি চিদ্ঘন নিরঞ্জন।

কিবা, অনুপমভাতি, মোহনমূরতি ভকত-হৃদয়-রঞ্জন।

নবরাগে রঞ্জিত, কোটি শশী-বিনিন্দিত

কিবা বিজলি চমকে সে রূপ আলোকে, পুলকে শিহরে জীবন।”

গানের এই চরণে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ শিহরিতে লাগিলেন। তার পরের গান “হৃদি কমলাসনে, ভজ তাঁর চরণ, দেখ শান্ত মনে, প্রেম নয়নে, অপরূপ প্রিয় দর্শন।”

এই গান শুনেও ঠাকুরের শরীর নিস্পন্দ। স্তিমিত লোচন। শেষ গানটি “প্রেমানন্দরসে হও রে চিরগমন”।

ঠাকুর নরেন্দ্রনাথের বর্ণনা দিয়েছেন নানাভাবে। শরৎ মহারাজকে নরেনের কাছে পাঠাচ্ছেন যখন তখন বলছেন, “নরেন কায়েতের ছেলে, বাপ উকিল, বাড়ি সিমলে।” এইটুকু শুনেই শরৎ যখন কলেজ ফেরত ১৮৮৫ সালে জ্যৈষ্ঠ মাসে গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে যাচ্ছেন তখন কি দেখছেন? দেখছেন – কেবল একখানি ভাঙ্গা তক্তাপোষের ওপর তুলা বের করা একটা গদি, দু’একটা ছেঁড়া বালিশ আর পশ্চিমদিকে একটা কালো মশারি পেরেকের উপর গুটানো। নরেনের শিরঃপীড়া হয়েছে, নাকে কর্পূরের ন্যাস নিতে হচ্ছে। এই নরেন্দ্রনাথের সম্বন্ধে পাড়ায় রিপোর্টও ভাল নয়। এক প্রতিবেশী শরৎচন্দ্রকে (পরে স্বামী সারদানন্দ) বলেন, এই বাড়িতে একটা ছেলে আছে, তার মতো ত্রিপন্ড ছেলে কখনও তিনি দেখেন নি। বি.এ. পাশ করেছে বলে যেন ধরাকে সরা দেখে। বাপখুড়োর সামনেই তবলায় চাঁটি মেরে গান ধরে, আর পাড়ায় সকল বয়োজ্যেষ্ঠদের সামনে দিয়ে চুরুট খেতে খেতে হাঁটে।

উকিল ব্যারিস্টারের পুত্র নরেন্দ্রনাথ শৈশবেই ধ্রুপদী ভারতীয় সঙ্গীতে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন। তাঁর পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ঠিক করেছিলেন যে পুত্রেরা যেটি শিখবে সেটি ভালোভাবে শিখবে এবং সেরা প্রশিক্ষণ পাবে। বেণী গুপ্ত (বেণী ওস্তাদি) নরেন্দ্রনাথকে কন্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীত শেখান, আহমেদ খান তাঁকে তবলা ও পাখোয়াজে পারদর্শী করে তোলেন, কানাইলাল ঢেঙ্কি ও জগন্নাথ মিশ্র তাঁকে ধ্রুপদী সঙ্গীতে পারদর্শী করে তোলেন। নরেন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য ছিল আধ্যাত্মিক গানে, যে গান গভীর ভাবে ভক্তিমার্গে উত্তরণ ঘটায়। তাঁর কাছে সঙ্গীত ছিল মহাজাগতিক স্পন্দনের সঙ্গে নিজেকে একত্রিত করার একটি মাধ্যম। যার মাধ্যমে নিজেকে ঈশ্বরে লীন করা যায়।

ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের অবক্ষয়ের দিকটি নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতকে আধ্যাত্মিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করতেন। তিনি সঙ্গীতের অতিরিক্ত অলংকরণে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন অতিরিক্ত অলংকার সঙ্গীতের মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতা হ্রাস করে। নরেন্দ্রনাথ যখন বিবেকানন্দে পরিণত তখন তিনি বারবার একটি কথাই তুলে ধরেছেন – কঠোর অনুশীলন। কঠোর অনুশীলন ছাড়া কোনো শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও ভাসাভাসা শিক্ষা বা শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য সঙ্গীতের প্রয়োজন নেই — এ কথা তিনি কঠোর ভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ভারতের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য ভারতের ধ্রুপদী সঙ্গীতের ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা অপরিহার্য।

ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের ঐতিহ্যের উপর নরেন্দ্রনাথের গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তাঁর কাছে এটি একটি শৃঙ্খলা, যা আত্মাকে উন্নীত করতে সক্ষম। তিনি ভারতীয় সঙ্গীতের বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা, শ্রুতি, রাগ (সুর) ও তালের (ছন্দ) জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া — প্রতিক্রিয়ার প্রশংসা করতেন। অতিরিক্ত অলংকরণে সঙ্গীত আধ্যাত্মিক দিক থেকে সরে যাচ্ছে একথা বলে দুঃখ পেয়েছেন। স্বামী বিবেকানন্দের কাছে সঙ্গীত ছিল সর্বোচ্চ শিল্প এবং যাঁরা বোঝেন তাঁদের কাছে সর্বোচ্চ উপাসনা। তাঁর কাছে সঙ্গীত বিনোদন নয়, বরং এটি এক মহৎ উপাসনা যা শ্রোতাকে চেতনার উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন সঙ্গীতের মাধ্যমে মনকে একাগ্র করা সহজ। ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সহজ পথ হচ্ছে সঙ্গীত। নাদ ব্রহ্মের উপর স্বামী বিবেকানন্দের গবেষণা, সঙ্গীত সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সঙ্গীত মহাবিশ্বের কম্পনকে মূর্ত করে তোলে। তিনি বলতেন ভাব ভক্তি ও নিবিষ্টতা সঙ্গীতকে আধ্যাত্মিক করে তোলে।

সঙ্গীত কাছে এনেছিল গুরু শিষ্যকে। শিষ্যের সঙ্গীতের অমোঘ আকর্ষণে বারবার দেখা গেছে গুরু সমাধিস্থ হচ্ছেন। আবার বয়োজ্যেষ্ঠদের না মানা, চুরুট খাওয়া নরেন্দ্রনাথ কী এক অমোঘ টানে বারংবার দক্ষিণেশ্বরে আসছেন ঠাকুরের কাছে। যাঁকে মুখে তিনি বলছেন — ‘পাগলা ঠাকুর’, ‘মূর্খ বামুন’, সেই পাগলা ঠাকুরের কাছে এসেই নিত্য গান শোনাচ্ছেন কলেজে পড়া নরেন্দ্রনাথ। একই গানে গুরু এবং শিষ্য হারিয়ে যাচ্ছেন কোন অচেনা জগতে — যে জগৎ সাধারণ মানুষের কাছে চিরকাল অধরা।

১৮৮১ সালের নভেম্বর মাসে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে নরেন্দ্রনাথের প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণ দর্শন হয়। তারপর থেকেই তাঁর সান্নিধ্যে আসা ও আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ। গুরু এবং শিষ্য দুজনেই সঙ্গীতপ্রিয়। নরেন্দ্রনাথ তাই ঠাকুরের কাছে এলেই গান শোনাতেন। ঠাকুরও তাঁকে আদেশ করতেন গান শোনাবার জন্য। ১৮৮৩ সালে ৭ই এপ্রিল ঠাকুরের পদপ্রান্তে ঠাকুরের লরেন শুনিয়েছিলেন রবি ঠাকুরের গান।

“গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে,

তারকামণ্ডল চমকে মোতি রে।।”

১৮৮৪ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর নরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গেয়েছিলেন — “দিবানিশি করিয়া যতন”

আর ১৮৮৫ সালের ১৪ই জুলাই শুনিয়েছিলেন সেই গান, যা নরেন্দ্রনাথের অন্তরের কথা — “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা”

রবীন্দ্রসঙ্গীত যে স্বামী বিবেকানন্দর বিশেষ প্রিয় ছিল তা বোঝা যায়। আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন বলেছেন যে তিনি কাশীতে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দর কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছিলেন।

সন্ন্যাস গ্রহণের আগে নরেন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধু বৈষ্ণবচরণ বসাকের সঙ্গে ‘সঙ্গীত কল্পতরু’ নামে একটি সঙ্গীত সংকলন গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন, মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা থেকে জানা যায়। এই সংকলনে কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গৃহীত হয়। কলকাতার সিমলের বাড়িতে প্রতি শনি ও রবিবার গানের আসর বসত। দেশ বিদেশের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞরা এসে আসর অলংকৃত করতেন। নরেন্দ্রনাথের মাতা ভুবনেশ্বরী দেবীর সুমধুর কন্ঠস্বর ছিল। পিতামহ দুর্গাপ্রসাদ দত্তও ছিলেন সুকন্ঠের অধিকারী। সঙ্গীত ছিল দত্ত পরিবারের রক্তে।

শৈশব থেকেই নরেন্দ্রনাথের গানের প্রতি অসাধারণ দক্ষতা দেখা যায়। শোনা মাত্র যে কোনো গান তিনি তুলে ফেলতে পারতেন। পিতা বিশ্বনাথ দত্ত তাঁকে টপ্পা, ঠুমরী, গজল গান শেখার তালিম দেন। নরেন্দ্রনাথ শ্রুতিধর ছিলেন। রায়পুরে যখন ছিলেন তখন থেকে তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা শুরু হয়। পরে কলেজ জীবনে প্রবেশের সময়ও বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে তালিম নেন। নরেন্দ্রনাথের সঙ্গীত প্রতিভার বিকাশ ঘটে ব্রাহ্মসমাজে যোগদানের পর। সেখানে উপাসনার দিন ব্রহ্মসঙ্গীত ও ধ্রুপদ পরিবেশন করতে হত। নরেন্দ্রনাথের গানের গভীরতা ও আবেগ সমস্ত শ্রোতাদের মুগ্ধ করত।

প্রথম যেদিন গুরু এবং শিষ্যের সাক্ষাত ঘটে প্রতিবেশী সুরেন্দ্র নাথ মিত্রের বাড়ি, সেদিন নরেন্দ্রনাথের কন্ঠে ছিল দুটি গান — “মন চলো নিজ নিকেতনে” ও “যাবে কি হে দিন আমার বিফলে চালিয়ে”। গানের শেষে ঠাকুর অভিভূত হয়ে গেলেন। সঙ্গীতের মাধ্যমে অন্তরে অন্তরে যোগসূত্র তৈরি হল। নরেন্দ্রনাথের কন্ঠে শ্যামাসঙ্গীত, ভজন ও ধ্রুপদ শুনে সকল শ্রোতা মুগ্ধ হতেন। গিরিশ চন্দ্র ঘোষের রচিত ও নরেন্দ্রনাথের সুরারোপিত ‘জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই’ গানটিও নরেন্দ্রনাথ গাইতেন।

ঠাকুরের ‘লরেন’ শুধু সঙ্গীত পরিবেশন করতেন না, সঙ্গীতের রচয়িতা ও সুরকার ছিলেন। তাঁর রচিত ছয়টি গান আজও স্মরণীয়। ‘খন্ডন ভব-বন্ধন জগ’, ‘তাথৈয়া তাথৈয়া নাচে ভোলা’, ‘নাহি সূর্য নাহি চন্দ্র’, ‘মুঝে বারি বনোয়ারি সঁইয়া’, ‘একরূপ অরূপ নাম বরণ’, ‘হর হর হর ভূতনাথ’। এগুলির মধ্যে “খন্ডন ভব-বন্ধন জগ” গানটি বিশেষ ভাবে রচনা করেছিলেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ মন্দিরে গাওয়ার জন্য। তিনি নিজে পাখোয়াজ বাজিয়ে এই গান গেয়েছিলেন। আজও সেই গান আরাত্রিকা সঙ্গীত রূপে গীত হয় প্রতিদিন।

সঙ্গীত নিয়ে লিখতে গেলে যেখানে বিবেকানন্দ আছেন সেখানে রবীন্দ্রনাথও থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১, নরেন্দ্রনাথের ১৮৬৩। রবীন্দ্র ছিলেন ব্রাহ্মসমাজভুক্ত আর নরেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজে নিয়মিত যেতেন। রবীন্দ্র রচিত ২৫ টির বেশি গান নরেন্দ্রনাথ বিভিন্ন সময়ে গেয়েছিলেন। নরেন্দ্রনাথের ‘সঙ্গীত কল্পতরু’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের ৮টি গান সংকলিত হয়েছে। তবু এই দুজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি সাক্ষাত বা কথোপকথন সম্বন্ধে কিছুই প্রায় জানা যায় না। ১৮৯৯ সালের ২৮শে জানুয়ারি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে নিবেদিতা আয়োজিত এক চা-পানের আসরে এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি সাক্ষাত হয়েছিল। কিন্তু সে বিষয়েও সেরকম বিশেষ কিছু জানা যায় না।

বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। যদিও নিবেদিতা এই আদেশ পুরোপুরি পালন করেছিলেন তা নয়। আবার রবীন্দ্রনাথও বিবেকানন্দ সম্বন্ধে ভীষণই নীরব। তবে দুজনে দুজনের প্রতি উদাসীন থাকলেও একে অপরের প্রতিভার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা রাখতেন। জাপানের বিখ্যাত কবি ওকাকুরা ভারতবর্ষকে বুঝতে বিবেকানন্দর কাছে গেলে তিনি বলেছিলেন, “এখানে আমার সঙ্গে আপনার কিছুই করণীয় নেই। এখানে তো সর্বস্ব ত্যাগ। রবীন্দ্রনাথের সন্ধানে যান। তিনি এখনও জীবনের মধ্যে আছেন।” এই উক্তির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি কর্মকে সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ স্বামী বিবেকানন্দের সম্বন্ধে অনেক সভায় অনেক কথা বলেছেন। তবে তাঁর রোমারোলাঁকে বলা একটি কথাই স্বামীজী সম্বন্ধে যথেষ্ট। কবিগুরুর বিখ্যাত সেই উক্তি হল — “যদি তুমি ভারতকে জানতে চাও তবে বিবেকানন্দকে জানো। তাঁর মধ্যে সবকিছুই ইতিবাচক, নেতিবাচক কিছুই নেই।”


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন