নাগরিকদের হয়রানি ও বাংলার মানুষদের মৃত্যুমিছিলের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রতিবাদে নির্বাচন কমিশনে বুধবার দুপুরে স্মারকলিপি জমা দিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের প্রতিনিধিরা। এদিন রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখাও করেন। পূর্ণেন্দু বসু জানান, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে জাতীয় নির্বাচন কমিশন যা করছে, তা এককথায় উন্মাদের কার্যক্রম। যেখানে শুনানির নামে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মানবিক মুখ না দেখিয়ে, দিশাহীন খামখেয়ালি কর্মকাণ্ড চালিয়েযাচ্ছে। এত হুড়োহুড়ির প্রয়োজন ছিল না। এসআইআর পর্বের প্রথম থেকেই নির্বাচন কমিশন, সাধারণ মানুষকে, বিশেষত, গরিব ও প্রান্তিক খেটেখাওয়া মানুষকে নিত্য নতুন ফতোয়া জারি করে দুভাগে ফেলছে। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন যে আগে হয়নি তা নয়। পূর্বতন নির্বাচন কমিশনারদের নেতৃত্বে ভোটার তালিকার সংশোধনের কাজ আগেও হয়েছে। কাজেই এমন মনে করার কারণ নেই যে, জ্ঞানেশ কুমার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হয়েই এই রকম সংশোধনের কাজ প্রথম শুরু করলেন। এর আগের ভোটার তালিকায় সংশোধনের কাজ থেকে এবারের পার্থক্য এই যে, এর আগে নির্বাচন কমিশন একটি দীর্ঘ সময় নিয়ে এই সংশোধনের কাজ চালিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ভিতর কোনো বিভ্রান্তি হয়নি। সংশোধনের নাম করে সাধারণ মানুষকে কোনো দুর্ভোগেও ফেলা হয়নি। এবার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন ধর তক্তা মার পেরেকের মতো করে দেড় বছরের কাজ দেড় মাসের মধ্যে সেরে ফেলতে আসরে নেমেছে। ফলে মানুষ আতঙ্কিত হয়েছে, প্রতিদিন মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে।
এরই প্রতিবাদে কমিশনের দপ্তরে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হল। বিশিষ্ট সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বলেন, এসআইআরের প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষার নাম করে কিভাবে মানুষের হয়রানি বাড়ানো হয়েছে। গরিব-প্রান্তিক সাধারণ মানুষের কাছে এমন অনেক সরকারি শংসাপত্র পাঠানো হয়েছে, যেসব সাধারণভাবে গরিব-প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের কাছে থাকে। শুধু গরিব-প্রান্তিক শ্রেণির মানুষই নয়, সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও হয়রানির শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে এই রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপি রটিয়ে দিয়েছে ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে তিনি এদেশের নাগরিক নন বলেই গণ্য হবেন। ভোটার তালিকায় এককোটি অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গা আছে বলেও রটানো হয়েছে। এই ধরনের রটনা এবং নির্বাচন কমিশনের অমানবিক কার্যকলাপের ফলে বহু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শিল্পী সৈকত মিত্র জানান, নির্বাচন কমিশনের নিত্যনতুন ফতোয়া জারির ফলে বিএলও-রাও আতঙ্কিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের অন্যায্য চাপের কারণে কয়েকজন বিএলও মারাও গিয়েছেন। কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এইসব দুঃখজনক ঘটনার জন্য কোনোরকম ক্ষমাপ্রার্থনা তো দূরের কথা, সামান্য শোকটুকুও প্রকাশ করেনি। এবার শুরু হয়েছে এসআইআরের দ্বিতীয় পর্ব শুনানি। এই পর্বের শুরুতেই দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষকে এবারও নানাবিধ ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে, ২০০২ এর ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও খসড়া তালিকায় বহু ভোটারের নাম নেই। এমনকি এই রাজ্য থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যদের নামও খসড়া তালিকায় তোলা হয়নি। অথচ নির্বাচন কমিশনই ২০০২-এর তালিকাকে ভিত্তি হিসাবে গণ্য করা হবে বলেছিল। এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে গণমঞ্চের প্রতিনিধিরা আরও বলেন, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত ভোটারদের তথ্যে অনেক গরমিল করা হয়েছে এই তালিকায়। এরকম নানা বয়সী মানুষকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে। এদের ভিতর একটি বিরাট সংখ্যক মানুষ দরিদ্র ও প্রান্তিক খেটে খাওয়া শ্রেণির। শুনানির প্রথম দিনেই দুর্ভোগ নজরে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন বলেছিল, বয়স্ক প্রবীণ নাগরিকদের বাড়ি গিয়ে তাদের শুনানি করা হবে। তাদের শুনানি কেন্দ্রে এসে লাইন লাগাতে হবে না।
কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল সেসব কিছুই হয়নি। প্রথম দিনই বহু প্রবীণ বয়স্ক অসুস্থ মানুষকে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হল। এমনকি কেউ কেউ কারওকে কারগুকে অ্যাম্বুলেন্সে চেপেও শুনানি কেন্দ্রে এসেছেন। এমনকী এতটাই বাস্তবজ্ঞান রহিত এই নির্বাচন কমিশন যে, তারা বলেছে পরিযায়ী শ্রমিক ও প্রবাসীদেরও সশরীরে শুনানিতে হাজির থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনের তলব পেয়ে নিজের কর্মক্ষেত্র ছেড়ে ছুটে আসা শুধুমাত্র যে দরিদ্র পরিযায়ী শ্রমিকদের পক্ষেই সম্ভব নয়, মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর পক্ষেও তা অসম্ভব এটুকু বোঝার মতো মানবিকতাও নির্বাচন কমিশন দেখাচ্ছে না। তাছাড়া ভারতীয় নারীরা বিয়ের পর সাধারণত স্বামীর ঘর করতে চলে যান। তাদের পদবি পরিবর্তিত হয়, ঠিকানাও বদলে যায়। সেই সত্যটিও নির্বাচন কমিশন বুঝতে চায় না। ফলে মহিলা ভোটারদের একটা বড় অংশ হেনস্থার শিকার হচ্ছেন।
প্রসঙ্গত, দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ প্রথম থেকেই নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যে কাজটি দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ সেই কাজটি এরকম তাড়াহুড়ো করে করার কারণ কী। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো এরকম একটি ভোটমুখী রাজ্যে। পার্থ ব্যানার্জী ও ডাঃ ভাস্কর চক্রবর্তী-রা জানান, কমিশনে এ প্রশ্নও তুলেছিলাম মাত্র দেড়বছর আগে যে ভোটার তালিকায় দেশে লোকসভা নির্বাচন হয়েছিল, তাকে মান্যতা না দিয়ে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে ভিত্তি হিসাবে ধরার কারণ কী? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নির্বাচন কমিশন কখনো দেয়নি। এমনকী গণমঞ্চ প্রথম থেকেই বলে আসছে, জানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নয়। তারা বিজেপির স্বার্থরক্ষাকারী একটি সংস্থা মাত্র।
জ্ঞানেশকুমারের আমলে নির্বাচন কমিশন তার বিশ্বাসযোগাতা পুরোপুরি হারিয়েছে। এসআইআরের নাম করে নির্বাচন কমিশন যা করছে তাতে তাদের এই পক্ষপাতমূলক আচরণ আরও প্রকট হয়েছে। এবার বাংলার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্যে আসরে নেমেছেন জ্ঞানেশ কুমার অ্যান্ড কোম্পানি। নির্বাচন কমিশনের অমানবিক, খামখেয়ালি, স্বৈরতান্ত্রিক কার্য কলাপের তীব্র বিরোধিতা করছে দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ। দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের দাবি, অবিলম্বে নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষের ওপর এই হয়রানি বন্ধ করুন। তাড়াহুড়ো না করে সময় নিয়ে ভোটার তালিকার সংশোধন করুন। ভোটার তালিকা থেকে প্রকৃত ভোটারের নাম যাতে বাদ না পড়ে সেটা দেখাই নির্বাচন কমিশনের কর্তব্য।