মহকুমা শহর কাঁথি থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে জুনপুট উপকূল। জুনপুটের কথা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক ক্যানভাস। যে প্রাকৃতিক ক্যানভাসে নীল-সাদা মেঘের নিচে দিগন্ত প্রসারিত ঘন নীল জলরাশির সফেন সমুদ্র। এই সমুদ্র সফেন নীল জলরাশির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অসংখ্য অভাবী শুকনো মুখ। সেই অভাবী শুকনো মুখের মিছিলে নারী পুরুষ সকলেই সামিল।
যে সমুদ্রে একসময় অফুরান মাছের জোগান দিয়ে মৎস্যজীবী ও মৎস্যশ্রমিকদের সুখের চাদরে জড়িয়ে রেখেছিল সেই সমুদ্রও আজ কার্যত বন্ধ্যা। মাছ ধরে, মাছ বাছাই আর বিক্রি করে সমুদ্র নির্ভরশীল মৎস্যজীবী আর মৎস্য শ্রমিকদের এক সময় সুখের চাদরে থাকার দিন আজ অতীত। গত এক দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জুনপুট মৎস্যক্ষেত্রের ক্যানভাসে এটাই বাস্তব স্বাভাবিক ছবির আলপনা হয়ে চিত্রিত হয়ে আছে। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে চলে লড়াই অভাব আর মানুষে। দারিদ্র্য এখানে জন্ম দিয়েছে লড়াইয়ের। আর সেই লড়াই প্রতিনিয়ত জন্ম দিয়ে চলেছে নতুন নতুন জীবন যোদ্ধার।

পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি-১ ব্লকের মাজিলাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরামপুট গ্রামের লক্ষ্মী, রুনা, সঙ্গীতা, আনোয়ারা বিবি মিনতিরা তেমনই এক একজন হার না মানা জীবন যোদ্ধা।
এই মহিলারা সকলেই দারিদ্র্য সীমার নীচে থাকা পরিবারের সদস্যা। কারো স্বামী দিন মজুর, কারো স্বামী ভ্যান চালক, কারো স্বামী মৎস্য আড়তের সামান্য কর্মচারী। স্বামীদের একার রোজগারে সংসারে হাঁড়ি উনুনে চড়ত না বলে হেঁসেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল তাঁদের। কিন্তু তাতেও সংসারের সারা বছরের অভাব মিটত না। সংসারের অভাব-অনটন আর ঋণের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার অসম যুদ্ধে মরিয়া এমন দশজন মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ হল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজলা জনকল্যাণ সমিতির সঙ্গে। কাজলা জনকল্যাণ সমিতির মহিলা ক্ষমতায়ন বিভাগের কো-অর্ডিনেটর ও সমাজসেবী নীলিমা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে তাদের মনে হয়েছিল কাজলা জনকল্যাণ সমিতির তত্ত্বাবধানে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠন আর ক্ষুদ্র ঋণ-ই তাদের স্বনির্ভর করে তুলতে ও বিকল্প আয়ের পথ হতে পারে।

সেই শুরু। জীবন যুদ্ধে হার না মানা দশ মহিলাকে নিয়ে কাজলাজনকল্যাণ সমিতির তত্ত্বাবধানে মাতঙ্গিনী স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা দল গঠন করে ২০০২ সালে পথ চলা শুরু। মূল জীবিকা হল মাছ ঝাড়াই বাছাই করা ও মাছ শুকনো করা। এভাবে ছ’মাস চলার পর মাতঙ্গিনী স্বনির্ভর গোষ্ঠী কাজলা জনকল্যাণ সমিতি থেকে ঋন নিয়ে মাছ কিনে ছোট করে ব্যবসা করে আয়ের পথ তৈরির পথ তৈরী করে। পাশাপাশি দলের মাধ্যমে এলাকার পারিবারিক সমস্যার সমাধান, শিশু শ্রমিক থেকে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করা নিয় সচেতনতামূলক বৈঠক ও সভা করে এলাকার গ্রামীণ সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতন করার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে আসচ্ছেন।
সমুদ্র উপকূলে জুলাই থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এই সাতমাস মাছ ধরার মরসুম। মরসুমের বাকি পাঁচমাস পাশাপাশি কি ভাবে আয় আরও বাড়ানো যায় ও সংসারের আর্থিক উন্নতি ঘটানো যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ও কাজলা জনকল্যাণ সমিতির সঙ্গে আলোচনা ও পরিকল্পনা করে ছাগল পালনের সিদ্ধান্ত ও সমিতির ইস্যু ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও দল ভিত্তিক ছাগল পালনের প্রশিক্ষণ নেয়। ২০২১ সালে ছাগল পালনের ঘর তৈরি করে কাজলা জনকল্যাণ সমিতি, সিএভিসি ও মাতঙ্গিনী স্বনির্ভর গোষ্ঠী যৌথভাবে ১০টি ছাগল ও ১টি পুরুষ ছাগল পালন শুরু করে। দলে ছাগল পালন ও বন্টনের নিয়মনীতি অনুসারে প্রতিবছর দল বাদে প্রতি দল সদস্যাকে একটি করে ছাগল বাচ্চা দেওয়া হবে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য প্রথম দুবছর বেশ কিছু ছাগল মারা গেলেও ছাগল পালনে স্বনির্ভর হয়ে পড়েছে মাতঙ্গিনী স্বনির্ভর গোষ্ঠী।

এক ছটাকও নিজস্ব জমি ছিলনা। একসময় অভাবী সংসারে বেশিরভাগ দিন উনুনে হাঁড়ি চড়ত না। আর এখন অন্নের স্বচ্ছলতা-ই নয়, আর্থিক ভাবেও স্বনির্ভর হয়েছেন মাতঙ্গিনী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। দারিদ্র্য সীমার একেবারে তলানিতে থাকা পরিবারের গৃহবধূরা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে তারাই একদিন ঘরোয়া সাংসারিক কাজের বাইরে পরিবারের একজন উপার্জনশীল সদস্যা হয়ে উঠবেন।
মাতঙ্গিনী স্বনির্ভর দলের দলনেত্রী রুনা ঘোড়াইয়র স্বামী আগে দিন শ্রমিকের কাজ করতেন। রুনা দল করার পর দল থেকে নেওয়া ঋণের টাকা থেকে স্বামীকে মাছ ব্যবসার জন্য ঋণ দেন। মাছ ব্যবসার লাভের টাকায় বাড়িতেও একক ভাবে ছাগল মুরগি ও হাঁস পালন করা ছাড়াও বাংলা আবাস যোজনা প্রকল্পের ও নিজের টাকায় বাড়ি করা ছাড়াও তিন মেয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা করেছেন। বড় মেয়ে গ্রাজুয়েট গ্র্যাজুয়েট হয়ে বর্তমানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেওয়া ছাড়াও মেয়ে সামনে উচ্চ মাধ্যমিক দেবে ও ছোট মেয়ে ক্লাস সেভেনে উঠেছে। এছাড়াও পরিবারের সুরক্ষার জন্য জীবনবীমা করা ছাড়াও পঞ্চাশ হাজার টাকা সঞ্চিত রেখেছেন। গোষ্ঠীর অপর সদস্যা চন্দনী ঘোড়াই জায়গা কিনে পরে বাড়ি করা ছাড়াও প্রথমে একটি ছোট খাবারের দোকান পরে বড় স্টেশনারিও খাবারের দোকান করা ছাড়াও পানীয় জলের ব্যবসা করছেন দুইমেয়ে উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক আর ছেলে ক্লাসএইটে পড়ছে। চন্দনী ঘোড়াইয়ে দোকানে এখন প্রতিদিন আয় দু-হাজারেরও বেশি। এছাড়াও দলের লক্ষ্মী পন্ডাও বাড়ি ও খাবারের দোকান করেছেন। হাজরা বিবি,সঙ্গীতা ঘোড়াই, আনোয়ারা বিবি, মিনু মাইতি সহ সব সদস্যাই ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে মাতঙ্গিনী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যারা মহিলা ক্ষমতায়নের সুফলে আজ উপার্জনশীল ও স্বনির্ভর। কাজলা জনকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন পন্ডা বলেন, — ‘একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং অগ্রগামী সমাজের জন্য মহিলাদের ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে মহিলাদের নিজস্ব পছন্দ করার, তাদের উচ্চাকাঙ্খা অনুসরণ করা এবং শিক্ষা থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান পর্যন্ত জীবনের সকল ক্ষেত্রে সমান ভাবে অংশগ্রহণের অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় কাজলা জনকল্যাণ সমিতি দুই দশক ধরে মহিলাদের দল তৈরী করে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে চলেছে। এই কাজের প্রভাবে মাতঙ্গিনী স্বনির্ভর দল বা গোষ্ঠীর গ্রহণ যোগ্যতা, অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি চোখে পড়ার মত।’