দিনের আলোয় আমি শান্ত ও সংযত মুরলী পোস্টমাস্টার। কালো, রোগা ডিগডিগে, টাকমাথা, মাঝবয়েসী একটা অতি সাধারণ লোক। থেলাম আর এদাভাম মাসে আগুনের ডাক এলে রাত্রিতে আমিই হয়ে উঠি ফায়ার থৈয়াম, ভক্তদের কাছে দাহ ও ধ্যানের এক বিস্ময়!
নারকেল আম, সুপুরি, রাবার গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘেরা কেরালার মালাবার উপকূলে আমাদের পাট্টুয়াম গ্রাম। লাল টালি ছাওয়া আমাদের গ্রামের ছোট্ট পোস্ট অফিসে সারা দিনমানে আজকাল ক’টিই বা চিঠিপত্র আসে! তবে আমার অন্য পরিচয় আমি একজন থৈয়াম কেলান। এ সৌভাগ্য সবার হয় না। স্বয়ং ঈশ্বর আমাকে এ আশীর্বাদ দিয়েছেন!

গ্রীষ্ম-বর্ষায় আমার নিস্তরঙ্গ জীবন নিতান্তই সাধারণ। ছন্দহীন। ঘাড় গুঁজে আমি কাজ করে যাই আমার ছোট্ট পোস্ট অফিসে। বর্ষা শেষে প্রকৃতির কথকতার পালা শেষ হলে আমার সম্বৎসরের সাধনা ঋতুর প্রারম্ভ। ছেন্দা তালবাদ্যে কাঠি পড়লেই আমি আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারি না। আমার শরীরের অন্দরে তখন এক অন্য আমি।
আপ্পা বলতেন, “মন্দির প্রাঙ্গনে ভক্তদের সামনে তুমি শুধু এক সাধারণ শিল্পী বা কেলান নও। থৈয়াম (দৈবম্) মানে তোমার শরীরে তখন ঈশ্বরের অধিষ্ঠান হবে। এ যে সে কথা নয়! এর জন্যে সাধনা আর অনুশীলন দরকার। শরীরকে মন্দিরের মত শক্তপোক্ত করে তুলতে হবে। মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।”

আপ্পা কোন ছোটোবেলা থেকে আমাকে যত্ন করে কালারিপায়াট্টু অভ্যাস করিয়েছেন যাতে আমার শরীর সচল, স্বচ্ছন্দ থাকে। নারকেল গাছের পাতা দিয়ে আমি আপ্পার কাছে থৈয়াম শিল্পীর পোশাক বানাতে শিখেছি। চালের গুঁড়োতে লাল গেরিমাটি, কাজল, হলুদ, দিয়ে যত্ন করে সাজসজ্জার অলংকরণের তালিম আপ্পাই দিয়েছেন। আপ্পার থৈয়াম দেখতে দূর দূর থেকে ভক্তরা আসতেন। ভক্তজনের কাছে আমার আপ্পা ছিলেন কেলান গোপীবাবু। গোটা শীতকাল, বসন্ত কাল ধরে আপ্পা গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেবতার রূপে আবির্ভূত হতেন। আমি তখন তালে তালে ছেন্দা বাজাতাম। আমার ভাই উন্নি কুজালে ফুঁ দিত। মন্দিরে সারি সারি দীপ জ্বলে উঠত। আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমশঃ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। অন্ধকার রাত, খোলা আকাশ আর আগুনের স্ফুলিঙ্গে তখন মন্দির প্রাঙ্গনে এক দৈবিক পরিবেশ। আপ্পা সেই আগুনের মধ্যে লম্বা লম্বা লাফ দিতেন। গায়ে তাঁর আঁচটি লাগত না। সমস্ত ভক্তজন জোড় হাতে, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে কান্দানার কেলানকে দেখত। থৈয়াম শেষে আপ্পার আশীর্বাদ পেয়ে সবাই ধন্য হত।

থৈয়াম ছিল আপ্পার কৃচ্ছসাধনের সময়। আমিষভক্ষণ, টোডি থেকে তখন তিনি শতহস্ত দূরে। উপবাস, ধ্যান, পূজায় তাঁর দিন কাটত। আমাদের প্রতিটি থৈয়ামের কাহিনী ব্যাখ্যা করতেন। কোন দেবতা ফসল কাটার পর আসেন, কোন ভগবান ভালো কাজ করলে বর দেন সেসব গল্প আপ্পার কাছেই শুনেছি। দেবী চামুন্ডী ও দুর্জনকে শাস্তি দিতে থৈয়াম কেলানরূপে আবির্ভূত হন। আপ্পা বলেছিলেন “কেরালার উচ্চবর্ণের মানুষ একসময় আমাদের মত নীচজাতের মানুষের ছায়া মাড়াত না। দীনহীন, সংকুচিত, অপমানিত ছিল আমাদের জীবন। তারই জ্বলন্ত প্রতিবাদ হয়ে উঠেছিল থৈয়াম। সমাজের যত অন্যায়, অবিচারের যন্ত্রণা একজন থৈয়াম কেলানের মধ্যেই প্রকাশিত হয়। তিনিই পাপের বিনাশ করে ঈশ্বরের প্রতিভূ হয়ে ওঠেন।”
আপ্পার এ উপলব্ধি আমাকে সাধারণ করেও অসাধারণ করে রেখেছে। ধমনীতে আমার বাপ পিতামহের রক্ত বইছে। আমার ভাবনায়, দর্শনে থৈয়ামের ঐতিহ্য। এ আমার আত্মার আরাধনা। আমার ভাই উন্নি এই পরম্পরা ধরে রাখতে পারেনি। টাকার মোহে গাল্ফের চাকরি নিয়ে চলে গেছে। সংসারে সে মোটা টাকা পাঠায়। আমাদের এই ছোট্ট গ্রামে তার প্রাসাদের মত বাড়ি, বিদেশী গাড়ি জমিজমা। আমার বৌ পুমণির এসব দেখে চোখ টাটায়।

সে আমাকে খোঁটা দেয়, “গ্রামের পোস্টমাস্টার হয়ে থৈয়াম কেলান সেজে তুমি কি করলে জীবনে! তোমার ভাইকে দেখে শেখো জীবনে কি ভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়”!
আমি বৌকে কোনো জবাব দিই না। থৈয়াম আমার সব নীরবতার উত্তর। আজকাল দুনিয়া বড় দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা থৈয়ামের খোঁজে গ্রামে আসছে। সামনে মোটা টাকার প্রলোভন, বড় শহরে থৈয়াম পরিবেশনের ডাক। কিন্তু মাটির গন্ধে, আগুনের তাপে আর লোকবিশ্বাসের গভীরতায় জন্ম নেওয়া এই থৈয়ামকে আমি বাজারের আলোঝলমলে দরকষাকষির হাতে তুলে দিতে পারি না।
এই নৃত্য আমার জীবিকার পণ্য নয় — এ আমার আত্মার আরাধনা।

মনোরঞ্জনের সীমা অতিক্রম করে ঈশ্বরের আপন দেশে এই পবিত্র কলা যুগ যুগ ধরে কখনো আশীর্বাদ, কখনো পাপের পথে অভিশাপ, আবার কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্বলন্ত প্রতিবাদ হয়ে উঠেছে। যে নৃত্যে দেবতার আশীর্বাদ আলো হয়ে বয়ে আসে, তাকে যদি কেবল প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত করা হয়, তবে তার পবিত্রতা ক্ষয় হয়। থৈয়াম যেন যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে মানুষের বিশ্বাসে, স্মৃতিতে আর সাধনায়।
অপর্ব লেখা।
ধন্যবাদ 🙏
sadhanachatterjee002@gmail.com
অসাধারণ লাগলো নন্দিনী দি 👌👌
Thank you.ভালোবাসা জেনো
Ek nimeshe ami o jeno kerala r sei gram e pouche dekhte pachhilam sei thyam shilpi ke .
Bismillah movie ta dekhar somoy jemon moner obostha chilo golpo ta Porte Porte thik temon e mone hochhilo.