উদারীকরণের পর দেশের অর্থনীতিতে নগরায়নের অংশ হিসেবে নির্মাণক্ষেত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থানও কার্যত নির্মাণক্ষেত্র। এখানকার কাঁচামাল সিমেন্ট থেকে ইস্পাত, মার্বেল থেকে গ্রানাইট পাথর, কুচি পাথর থেকে বালি আসে সরাসরি প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে। ফলে নির্মাণক্ষেত্র যত বেড়েছে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রকৃতির ধ্বংস লীলা। এতে সহায়তা করেছে খোদ দেশের সরকার শিল্পপতিদের হাতে পাহাড়ে সম্পদ তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে। যেমন পরিবেশ রক্ষার লড়াইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আরাবল্লী সংরক্ষণের নামে গোটা আরাবল্লী পাহাড়কে লুটের সম্পদে পরিণত করেছে। দেশের সরকার নির্মাণ ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারকারী শিল্পপতিদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতেই আরাবলি পর্বতমালার টিলা-পাহাড়গুলিকে বাজারের পণ্য বানিয়েছে। কারণ নির্মাণক্ষেত্রের দামী সামগ্রী সিমেন্টের কাঁচামালের অন্যতম যোগানদার হয়ে উঠতে পারে আরাবল্লী। পাশাপাশি বালি, পাথরকুচি, মার্বেল পাথরের মতো লাভজনক ইমারতি পদার্থের ঢালাও জোগান দেশ-বিদেশের বাজারে নিশ্চিত করতেই শুরু হয়েছে পাহাড় বিক্রি। টেলিকম পরিষেবার ক্ষেত্রে যেমন লিজ পেয়েছিল আদানি, এয়ারটেল, ভোদাফোনের মতো কর্পোরেট শিল্প গোষ্ঠীগুলি। এবার আদানি, আম্বানিদের হাতে পাহাড় তুলে দিতে উদ্যত দেশের সরকার।
২৫০ কোটি বছর পুরনো, গুজরাতে, রাজস্থান, হরিয়ানা ও দিল্লির ২৯টি জেলা জুড়ে প্রায় ৬৭০ কিমি দীর্ঘ আরাবল্লী ভারতকে থর মরুভূমির হাত থেকে রক্ষা করে, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। আরাবল্লী না থাকলে উত্তর ভারত খরা এবং ধুলো ঝড়ে বিপন্ন হত মাটির ক্ষয় রোধ করা যেত না। আরাবল্লীর বনজঙ্গল বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শুষে নেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। আরাবল্লীর আশপাশে ৫ কোটি মানুষ, ৩১টি প্রজাতির ছোট ও বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ২০০টিরও বেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে। সরিস্কা টাইগার রিজার্ভ, অসোলা ভাট্টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, রনথম্বোর জাতীয় উদ্যান, কৈলা দেবী অভয়ারণ্য এবং ফুলওয়ারি কি নল সহ মোট ২০টির বেশি অভয়ারণ্য রয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ১০০ মিটারের বেশি হলে তবেই সেই পাহাড়কে আরাবল্লি পাহাড়শ্রেণির অংশ বলা যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নয়, বরং আশপাশের এলাকার চেয়ে ১০০ মিটার বা তার বেশি উচ্চতার ভূখণ্ডই কেবলমাত্র আরাবল্লি পাহাড় বলে গণ্য হবে যা আসলে কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের প্রস্তাবিত সংজ্ঞা। আর তাতেই সিলমোহর দিয়েছে শীর্ষ আদালত। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে আরাবল্লীর বেশির ভাগ এলাকায় সহজেই খননকাজ চালানো যাবে, নির্বিচারে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা যাবে। আরাবল্লির এই মৃত্যুদণ্ডে আন্দোলন শুরু হয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে। গ্রামবাসী থেকে রাজনীতিক কিংবা পরিবেশকর্মী সরব হয়েছেন।
প্রসঙ্গত, নির্মাণক্ষেত্রের কর্পোরেট গোষ্ঠীদের হাতে রাখতে যে পাহাড়কে সরকার বিক্রি করার ছক কষেছে তার বুক থেকে তৈরি হওয়া চম্বল, কসাবতি, বান স, গাম্ভীরির মতো নদী নালা, ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জল সম্পদকে নিয়ন্ত্রণ করে, ভূগর্ভের জল সঞ্চয় সুরক্ষিত করে। কিন্তু আরাবল্লী নিধন যজ্ঞ চলতে থাকলে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জল সংকটের কবলে পড়তে পারে। বিপন্ন হতে পারে সেই অঞ্চলের কৃষি, ফলে নিশ্চিহ্ন হতে পারে পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলের বহু প্রাচীন জনপদ। এমনকি দেশের পশ্চিমে থর মরুভূমি ছড়িয়ে পড়তে পারে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশে। যদিও সর্বোচ্চ আদালত আরাবল্লীতে নতুন খাদানের অনুমতির জন্য পরিবেশ সুরক্ষার ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক বলেছে। কিন্তু হিমালয়ের বুক চিরে যেভাবে হাইওয়ে, সেতু, হোটেল, হোমস্টের নির্মাণ যজ্ঞ চলছে তাতে পরিবেশ ছাড়পত্র যে কত ঠুনকো সে কথা বলা বাহুল্য। ফলে উত্তরকাশী থেকে যোশীমঠ, ঋষিকেশ থেকে কেদারনাথে যা যা ঘটেছে তার এক ভিন্ন সংস্করণ দেখা যাবে আরাবল্লী পর্বতমালার ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় প্রকাশিত যে রাজস্থানের ১২৮টি পাহাড়ের মধ্যে একত্রিশটি পাহাড় ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া পাহাড়ের নতুন সংজ্ঞায় আরাবল্লীর বেহাল অবস্থা কেবল সময়ের অপেক্ষা।
আশ্চর্যের বিষয় হল গোটা পৃথিবীজুড়ে যখন মানুষ উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সোচ্চার তখন আমাদের দেশের সরকার পাহাড় ধ্বংসের নতুন সংজ্ঞা বানাচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে দিয়ে। আরও আশ্চর্যের উঁচু পাহাড় কেটে কিংবা ফাটিয়ে ধ্বংস করার চেয়ে নিচু পাহাড় কিংবা টিলা ধ্বংস করা নিরাপদ- এটা কোন বিজ্ঞানে লেখা? আরাবলি অঞ্চলে নিচু পাহাড়ের সংখ্যাই বেশি, আর তা ধ্বংস করে খাদান বানালে সেই অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘ্নিত হবেনা একথা একমাত্র গেরুয়া বিজ্ঞান বলছে যা কার্যত উন্নয়নের কর্পোরেট নির্ভর মডেল। সেকারণেই উচ্চতার মাপকাঠিতে পাহাড় কিংবা টিলাকে সংরক্ষিত রাখার সরকারি নীতি প্রণয়ন করে পাহাড় ও জঙ্গল ভ্যানিশ করে ফেলার মান্যতা দেওয়া। এর ফলে পরিবেশের বিপদ বাড়লো আরও ভয়ঙ্কর ভাবে। এরপর জলাশয়, জলাভূমি কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিতে একই ফর্মুলায় মাপা হবে জলাশয়গুলির জলের গভীরতা। কম উচ্চতার পাহাড় সংরক্ষণের প্রয়োজন যেভাবে ফুরিয়ে গেল সেই একই যুক্তিতে জলাভূমিগুলিও যে কোনদিন সংরক্ষণের আওতার বাইরে চলে যাবে। ফলে তখন মান্যতা পাবে জলাভুমি বুজিয়ে নির্মাণের নতুন বিপদ। কারণ সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশেষত কেন্দ্র পরিবেশ ধ্বংসের এমন বিপজ্জনক পরিকল্পনাই করে চলেছে।