ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া পরবর্তী খসড়া ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়ার অনিশ্চয়তায় ভুগছেন মতুয়ারা। প্রসঙ্গত, গত দু’দশক ধরেই মতুয়া শব্দটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিত বেশ পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মূলত ধর্মীয় নিপীড়নের কারণেই বিগত কয়েক দশক ধরে দলিত হিন্দু শরণার্থী সম্প্রদায় মতুয়ারা বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পেড়িয়ে এদেশে আসেন। এসআইআর প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর থেকে তাঁদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। রাজ্যজুড়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া খসড়া ভোটার তালিকা থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৫৮,২০,৮৯৮টি নাম বাদ পড়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার সংখ্যা ৭.৬৬ কোটি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭.০৮ কোটিতে। বিভিন্ন দলের মতুয়া নেতারা জানাচ্ছেন, এই বাদ পড়া ভোটারদের একটি বড় অংশ মতুয়া সম্প্রদায়ের। যদিও দেশভাগের পর ছত্রভঙ্গ হয়ে দুর্বল হয়ে পড়া মতুয়ারা ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সম্প্রদায়ে পুনর্গঠিত হয়েছেন। সংখ্যায় প্রায় দুই কোটি মানুষ মতুয়া মহাসংঘের অনুসারী এবং এই জনসংখ্যা ৭০টিরও বেশি নির্বাচনী এলাকার ভোটকে প্রভাবিত করতে পারে বলেই মনে করা হয়।
এই আবহে বাংলায় এলেও খারা আবহাওয়ার কারণে মতুয়া প্রভাবিত নদিয়ার তাহেরপুরের সভায় পৌঁছতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া পর্বে আশঙ্কার মধ্যে থাকা মতুয়াদের অনেকেই ভরসা খুঁজতে তাহেরপুরের সভায় এসেছিলেন, কিন্তু কিন্তু মোদী এসে পৌঁছতে না পারায়, এমনকি বিমানবন্দর থেকে ভার্চুয়াল ভাষণেও তাঁদের কোনো আশ্বাস–বাণী শোনান নি মোদী। এসআইআর নিয়ে মতুয়া এলাকায় যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার নিরসনে প্রধানমন্ত্রী বার্তা দেবেন বলে বিজেপির রাজ্য দলের সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য তাঁর নিজের ভাষণে আভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু মোদীর ভাষণে তেমন কিছুই শোনা যায়নি। মাত্র ১৬ মিনিটে তাঁকে বাংলা সফর সেরে ফেলতে হয়। রাজ্য বিজেপির পরিকল্পনা ছিল মোদীর সেদিনের সভা থেকেই ২৬-এর বিধানসভা ভোটের প্রচারের শিঙা বাজিয়ে দেওয়া হবে কিন্তু পরিস্থিতিটাই যায় এলোমেলো হয়ে। জনসভায় বিশাল ভিড় ছাড়াও সভামঞ্চে অপেক্ষা করছিলেন রাজ্য বিজেপির তাবড় নেতারা। কিন্তু মোদী পৌঁছতেই পারলেন না। এতে কেবল সভার মাঠে আসা মানুষ তথা মতুয়া সম্প্রায়ের মানুষেরাই আশাহত হননি রাজ্য বিজেপির নেতারাও যে আশাহত তা তাঁরা গোপন করেননি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘‘আবহাওয়া খারাপ থাকায় প্রধানমন্ত্রী তাহেরপুরে পৌঁছতে পারেননি। তাতে আমরা কষ্ট পেয়েছি। আমাদের কর্মীরাও আশায় ছিলেন।’’
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী মোদী যুক্তি দিয়েছেন, ভার্চুয়াল ভাষণে সব বিষয় উত্থাপন করা যায় না। তবে বাংলায় এসে সেদিন প্রদানমন্ত্রী সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলার ভুল শুধরে নিয়েছেন ‘বঙ্কিমবাবু’ এবং ঋষি বঙ্কিমবাবু বলে। বন্দে মাতরমের প্রসঙ্গের উত্থাপন করে মোদী উন্নয়ন নিয়ে বলেন, ‘‘উনিশ শতকে বন্দেমাতরম ছিল দাসত্ব থেকে মুক্তির মন্ত্র। একুশ শতকে বন্দেমাতরমকে আমাদের রাষ্ট্র নির্মাণের মন্ত্র বানাতে হবে। এখন বন্দেমাতরমকে আমাদের বিকশিত ভারতের প্রেরণা বানাতে হবে। এই গানের মাধ্যমে বিকশিত পশ্চিমবঙ্গের চেতনা জাগবে।’’ উল্লেখ্য, ভার্চুয়াল বক্তৃতার ১৬ মিনিটের মধ্যে আট মিনিট ছিল উন্নয়ন প্রসঙ্গে। কিন্তু মতুয়াদের জন্য কোনও আশ্বাসের কথা ছিল না। পরে এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘প্রত্যেক মতুয়া এবং নমঃশূদ্র পরিবারকে আশ্বস্ত করছি, আমরা তাঁদের পাশে সব সময়ে আছি। তাঁরা এখানে তৃণমূলের দয়ায় নেই। সিএএ–এর কারণে তাঁদের সম্মানের সঙ্গে ভারতে থাকার অধিকার তৈরি হয়েছে। বাংলায় বিজেপি সরকার শপথ নেওয়ার পরে মতুয়া এবং নমঃশূদ্রদের জন্য আমাদের আরও অনেক কিছু করার পরিকল্পনা আছে।’
প্রসঙ্গত, বিজেপি নাগরিকত্ব এবং জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলি ব্যবহার করে এবং জাতিগত বৈষম্যের উপর তাদের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের তাৎপর্য মুছে ফেলে মতুয়াদের ব্রাহ্মণ্যবাদের ছায়ায় আনতে চেষ্টা করেছিল। নাগরিকত্ব বিল পাস হওয়ার পর, নমঃশূদ্ররাও বিজেপি সরকারের প্রতি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। কিন্তু এখন বিজেপির প্রতি নমঃশূদ্রদের সমর্থন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলার নমঃশূদ্রদের উপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কারণ প্রচুর হিন্দু শরণার্থী নিবন্ধন থেকে বাদ পড়েছে। এর আগে অযোধ্যার রাম মন্দিরের ‘ভূমি পুজো’তে ‘ঠাকুরবাড়ি’র মাটি ও জল প্রত্যাখ্যান করা নিয়ে বিতর্কের পর মতুয়াদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তা নিয়ে স্থানীয় বিজেপি নেতাদের মতুয়াদের চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল। কিছু মতুয়া মনে করেন যে হরিচাঁদ ঠাকুর সমাজে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা এই ঘটনায় আহত হয়েছে। ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তথা মোদী সরকার মতুয়াদের যথেষ্ট গুরুত্ব দেবে? নদিয়া বৈষ্ণব আন্দোলনের পীঠস্থান। তাই ‘জয় নিতাই’ বলে মোদী ভাষণ শুরু করেছিলেন। তাঁর ভাষণে চৈতন্য মহাপ্রভুর কর্মকাণ্ডের জয়গানও শোনা গিয়েছে, জনপ্রিয় লোকগানের পঙ্ক্তি, ‘হরিনাম দিয়ে জগৎ মাতালে আমার একলা নিতাই’ বলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে মতুয়াদের যে উদ্বেগ তা নিয়ে একটি কথাও বললেন না মোদী। স্বভাবতই বেশ ভাবনায় পড়েছেন মতুয়া সম্প্রদায়। তাঁরা যে ‘রাজনীতির বোড়ে’, তা ভালোই বুঝতে পেরেছেন।
উল্লেখ্য সেদিন মোদীর সফরকালে নদিয়া জাতীয় সড়কে বেশ কিছু ‘গো ব্যাক মোদী’ লেখা ব্যানার দেখা যায়। হেলিকপ্টার বিভ্রাটে মোদীকে শেষমেশ সড়কপথে তাহেরপুর যেতে হলে সেই ব্যানার তাঁর নজরে পড়তো। চোখে না-পড়লেও ওই ব্যানারের কথা তাঁর কানে পৌঁছেছে বলেই প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, ‘‘…দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ‘গো ব্যাক মোদী’ বলা হচ্ছে। কিন্তু তারা ‘গো ব্যাক ঘুসপেটিয়া (অনুপ্রবেশকারী)’ বলতে পারছে না”। এখন বোঝা না গেলেও এসআইআরের পর ছাব্বিশের ভোটে মতুয়া গড়ের ফলাফল বলে দেবে মতুয়া এবং নমঃশূদ্রদের কে কতটা আশ্বস্ত করতে পারলো।