ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট (আই এস আই)-র বিজ্ঞানী ও অধ্যাপকদের উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের আই এস আই-এর নয়া বিল নিয়ে সোচ্চার দাবিতে সরব হল দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ। রবিবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে পূর্ণেন্দু বসু বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আনা আইএসআই নয়া বিল একদিকে বাংলাকে বঞ্চনা, অপরদিকে দেশের স্বনামধন্য বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে ধ্বংস করার পরবর্তী পদক্ষেপ। এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। তারই সোচ্চার দাবিতে একজোট হয়েছেন আইএসআইয়ের বিজ্ঞানী ও আধ্যাপকরা।
এদিন আইএসআইয়ের অধ্যাপক ড. রজত কুমার দে বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের ভ্রান্ত নীতিকে সমর্থন করা যায় না। ১৯৫৯ সালে নেহরুর হাতে গড়া আইএসআই আইনকে বাতিল করার প্রস্তাব দিয়েছে যে নয়া বিল, তাতে আইএসআইয়ের স্বাধিকার কেড়ে নিয়ে এই সংস্থার মানের অবনতি ঘটাতে বদ্ধপরিকর মোদী সরকার। ছাত্রদের আসন বিক্রি করে, রাজ্য সরকারের সোসাইটি আইনের অধীনে থাকা আইএসআই-কে সরাসরি কেন্দ্রের মনোনীত অনির্বাচিত আমলার হাতে তুলে দিতে চাইছে এই বিল। এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না।
প্রসঙ্গত, প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের এই প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে আইএসআই কর্মী, অধ্যাপক ও গবেষকদের লড়াইকে সংহতি জানাচ্ছে দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ।
অধ্যাপক ড. অনুপম বসু বলেন, নয়া আইএসআই বিল অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। গ্লোবাল এক্সসেলেন্সের পীঠস্থান ও প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশের আইএসআই। যেখানে দ্বিতীয় প্ল্যানিং কমিশনের ভিত্তিভূমি এবং রবীন্দ্রনাথের ”জন গণ মন অধিনায়ক” যে বাড়িতে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব আসে সেই আই এস আই, জে বি এস হ্যালডেনের মত বিশ্বের তাবড় বিজ্ঞানীদের পুণ্যভূমি ও ভারতকে দুনিয়ার দরবারে চিনিয়েছেন যাঁরা তাদের মধ্যে অন্যতম এই সংস্থা আইএসআই। আজ তাকেই ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে মোদী সরকার। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি কেন্দ্র, বিশেষত বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণাগারগুলো বিজেপি ও আরএসএসের চক্ষুশূল।

অধ্যাপক অরিজিৎ বিষ্ণু ও অধ্যাপক কুন্তল ঘোষ বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার এই সংস্থার উপর তাদের জাত ক্রোধের অন্যতম কারণ পরিসংখ্যান চর্চা। দারিদ্র্য সীমা নিয়ে মোদীবাবু কারসাজি করলে আইএসআই – র বিজ্ঞানীরা আপত্তি তোলেন। আইএসআই-এর পপুলেশন স্টাডিজ এর গবেষণা ও অনুপ্রবেশ নিয়ে বিজেপির মিথ্যাচারের মুখোশ খুলে দেয়। যে এআই নিয়ে আজ এত চর্চা তা নিয়ে অর্ধশতক আগেই আইএসআই গবেষণা শুরু করে। হেরিডেটি অ্যান্ড ইভিউলেশন অধ্যায় থেকে ইভিউলেশন শব্দ বাদ দিলে আইএসআই -এর হিউম্যান জেনেটিক্স অ্যানথ্রোপোলজি আর সোসিওলজি বিভাগ আপত্তি তুলবে। তার উপর জহরলাল নেহরুর দূরদর্শিতার ফলে কেন্দ্রীয় স্বশাসিত সংস্থা হলেও আইএসআই আজও রাজ্য সরকারের সোসাইটি আইনের অধীন। ফলে রাজ্য সরকারকে লুকিয়ে আইএসআই – এর জমি জায়গা সম্পত্তি ইচ্ছামত লুটপাট চালানো মুশকিল বিজেপির পক্ষে। তাই আইএসআই ধ্বংস করতে বিজেপি নয়া বিল এনেছে। এটা আইএসআই মেনে নেবে না।
এছাড়া উপস্থিত অধ্যাপক শশীভূষণ শ্রীবাস্তব, অধ্যাপক অয়েন্দ্রনাথ বসু , প্রাক্তন অধ্যাপক ড. দেবরূপ চক্রবর্তী, অধ্যাপক ড. অরিজিৎ চক্রবর্তীদের মতে নেহরুর ১৯৫৯ সালের আইন বাতিল করে নয়া বিল ওরা আইন বানাতে চায়। এটা যেমন মানা যায় না, তাছাড়া আইএসআই-এর আর একটা বড় সমস্যা হল এর অন্তর্নিহিত গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো। এই সংস্থা পরিচালিত হয় গবেষক, কর্মী, অধ্যাপকদের দ্বারা নির্বাচিত পরিচালক মন্ডলীর মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় সরকারের আইন মেনে, সরকারকে জবাবদিহি অবশ্যই করে এই সংস্থা, কিন্তু সরকারের প্রতিনিধিদের নির্দেশ এই নির্বাচিত সংস্থার মাধ্যমেই নেমে আসে। জো – হুজুরি ব্যবস্থা নেই এখানে। এমনকি চেয়ারম্যানকে নির্বাচিত করারও বিধান আছে ব্যবস্থাপনায়। সবচেয়ে বড় কথা এই পরিচালন কমিটিতে যারা ভূমিকা রাখেন তারা এ কাজের জন্য কোনো বিশেষ ভাতা পান না, ফলে তাদের কিনে নেওয়াও মুশকিল। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত, পার্থ ব্যানার্জী, অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর নাসরিন, অধ্যাপক শামিম আহমেদ, অধ্যাপক নাজমূল হক, ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী, সুশান রায়, সুমন ভট্টাচার্য, বর্ণালী মুখার্জি ও অমিত কালি প্রমুখ। এদিনে এঁদের বক্তৃতায় যে কথাগুলো উঠে আসে তাহল — আইএসআই সরকারি টাকার বাজে খরচ করে না, মহালানবিশের জমানো টাকা আমলাদের মাইনে দিতে খরচ করে না, করে মেধাবীদের বিনা পয়সায় পড়াতে, তাদের স্কলারশিপ দিতে। বিজেপি এখন ছাত্রদের ভর্তির আসন বিক্রি করতে চায়, মেধা নয় এখন আইএসআই এর ভর্তি পরীক্ষাকেও তারা নিট মডেলে করতে চায়। ছাত্রদের টাকায় আর পুকুর-জমি বিক্রি করে আদানি বা দদীনদয়াল উপাধ্যায়ের মূর্তি বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর মহলানবিশের মূর্তি ঢাকতে চায় তারা। আজ তারা আইএসআই জেনারেল বডির কাছে জবাবদিহি করতে রাজি নয়। এখন বিজেপির টার্গেট বাংলা। বাংলাকে বঞ্চিত করা আর এই রাজ্য থেকে সব কেন্দ্রীয় সংস্থার হেড কোয়ার্টার সরিয়ে নিয়ে যাওয়া এখন ওদের নীতি। ইতিমধ্যেই তাদের নয়া বিল আইএসআই কলকাতার হেড কোয়ার্টার স্ট্যাটাসকে নস্যাৎ করেছে। ফলে অন্যান্য রাজ্যের আইএসআই শাখাগুলোকে দুর্বল করে শেষ পর্যন্ত সংস্থাটিকে হত্যা করাই ওদের উদ্দেশ্য।