ঠাকুর মা ভবতারিণীকে বলতেন, “আমাকে রসেবশে রাখিস মা।” শুষ্ক কাষ্ঠের মতো জ্ঞানী হতে আমাদের ঠাকুর যেমন চাইতেন না, তেমনি আমাদের মা’ও আনন্দে কৌতুকে অন্দরমহলে আনন্দের প্রবাহ সর্বদা বহমান রাখতেন। আনন্দস্বরূপিনী মা কখনও দুঃখকে প্রশ্রয় দেন নি। যদিও তাঁর জীবনে দুঃখ কষ্ট কিছু কম ছিল না। তবু মা সর্বদা আনন্দে থাকতেন, তাঁর আশেপাশে যারা থাকতেন তাদের আনন্দে রাখতেন।
একটা ছোট ঘটনার কথা বলি। ১৯১২ সালের নভেম্বর মাস। মা তখন আড়াই মাসের জন্য কাশীধামে বাস করছেন। মায়ের সঙ্গে রয়েছেন গোলাপ মা ও আরও কয়েক জন স্ত্রী ভক্ত। কথামৃতকার শ্রীম ও কয়েকজন পুরুষ ভক্তও সেখানে ছিলেন। কাশীর লক্ষ্মীনিবাস তখন সদ্য তৈরি হয়েছে। মা তাঁর ভক্তদের নিয়ে দোতলায় থাকতেন, আর একতলায় শ্রীম ও পুরুষ ভক্তরা থাকতেন। একদিন এক স্ত্রী ভক্ত মাকে দর্শনের আশায় এসেছেন। তিনি আগে কোনো দিন মাকে দেখেন নি। লক্ষ্মীনিবাসের উপরের প্রশস্ত বারান্দায় শ্রীশ্রীমা ও গোলাপ মা বসে আছেন। ওই মহিলা ভক্ত এসে গোলাপ মা যেখানে বসে আছেন, সেখানে এগিয়ে গেছেন ‘মা ঠাকরুন’কে প্রণাম করবেন বলে।
মায়ের দুই সখী অর্থাৎ জয়া এবং বিজয়া হলেন গোলাপ মা ও যোগীন মা। এই দুজন হলেন নিত্যসিদ্ধা, এঁরাই মায়ের জয়া ও বিজয়া। জয়রামবাটির জগদ্ধাত্রীর পাশেও থাকেন জয়া আর বিজয়া। মা নিজমুখে তাই গোলাপ মা ও যোগীন মা’কে নিজের দুই সখী জয়া বিজয়া বলেছেন। যাই হোক, বিকেলে মা এবং তাঁর সখীরা আনন্দের মুডেই ছিলেন। গোলাপ মা অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন এবং বোধকরি মায়ের চেয়ে বেশি ফিটফাট ছিলেন। মহিলা ভক্তটি গোলাপ মাকে ‘মা ঠাকুরানী’ ভেবে নিয়ে প্রণাম করলেন এবং শ্রীমা ভেবেই কথা বলতে লাগলেন।
একটু কথা বলেই গোলাপ মা ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে শ্রীশ্রীমাকে ইশারায় দেখিয়ে বললেন, “আমি নই, উনিই মা ঠাকরুন।” মুশকিল হল ওই মহিলা ভক্তটির তখন গোলাপ মাকেই ‘মা ঠাকরুন’ মনে হচ্ছে। পাশের অতি সাদাসিধে চেহারার মাকে তার ‘মা ঠাকরুন’ বলে মোটেই মনে হচ্ছে না। তাই মহিলা গোলাপ মায়ের কাছ থেকে নড়ার কোনো আগ্রহ দেখালেন না। বসেই রইলেন। গোলাপ মা তখন আবার বললেন, “আমি না। উনিই আসল মা ঠাকরুন।” তখন মহিলাটি আর কি করেন। অত্যন্ত অনিচ্ছুকভাবে মায়ের দিকে গেলেন। আমাদের কৌতুকপ্রিয়া মা ততক্ষণে পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছেন। আনন্দময়ী মা এবার রসিকতা শুরু করলেন। যেই মহিলা মায়ের দিকে গেছেন অমনি মা বলে উঠলেন, “না না। উনিই মা ঠাকরুন।”
ওই মহিলাটি তো তাই বিশ্বাস করেই আছেন। মায়ের রসিকতা ধরার ক্ষমতা তার নেই। তিনি তৎক্ষণাৎ আবার গোলাপ মায়ের দিকে চললেন। গোলাপ মা আবার তাকে মায়ের দিকে যাবার নির্দেশ দিলেন। সে বেচারি আবার মায়ের কাছে আসতে মা আবার গোলাপ মায়ের দিকে পাঠালেন। এরকম রগড় বারকয়েক হবার পর গোলাপ মা সেই মহিলা ভক্তের বোকামিতে বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোমার কি কোনো বুদ্ধি বিবেচনা নেই? দেখছ না মানুষের মুখ কি দেবতার মুখ? মানুষের চেহারা কি অমন হয়?” গোলাপ মায়ের বকুনি খেয়ে মহিলা ভক্তটির জ্ঞানচক্ষু খুলল। তিনি মায়ের পদতলে এসে ঠাঁই নিলেন।
কলকাতায় থাকাকালীন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার সময় শ্রীশ্রীমা বিশ্রামের জন্য একটু শুতেন। কিন্তু যেই স্ত্রী ভক্তদের আগমন হত তিনি উঠে বসতেন। কারণ স্ত্রী ভক্তদের চারটে সাড়ে চারটের মধ্যে বাড়ি ফিরে যেতে হবে। শ্রীমা এরকম অনেক সময় শুয়ে শুয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। সাড়ে তিনটের সময় উঠে ঠাকুরের বৈকালী ভোগ দিতেন। তারপর জপের মালা নিয়ে বসতেন। একটুও সময় নষ্ট করতেন না। কেউ সময় অযথা নষ্ট করুক এও চাইতেন না। তিনি তাই অন্তরঙ্গ ভক্তদের নিয়ে জপে বসতেন। বলতেন, “ভগবান কর দিয়েছেন, সর্বদা জপ করে ‘করের’ সার্থক কর মা – – সার্থক কর!”
সন্ধ্যায় ঠাকুরকে ধূপ-ধুনো দেখিয়ে আবার জপে বসতেন। গৃহের কাজ করার সময়ও অন্তরে জপ চলত। জপ কোনও সময় বন্ধ হত না। তাঁর পায়ে ব্যথা হত। তাই নবাসনের বৌ তেল মালিশ করে দিতেন। তারপর রাতে আহারে বসতেন। খুব অল্প আহার করতেন। নিজেই বলতেন, “রাতের খাবার যেন জলখাবার।” জয়রামবাটিতে সকলকে খাইয়ে তবে মা নিজে কিছু মুখে দিতেন।
মায়ের আহারের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি টক টক মিষ্টি মিষ্টি আম বেশি পছন্দ করতেন। বাঁকুড়ার মেয়ে ছিলেন যে। কোনও ভক্ত টক আম দিলে ‘বেশ টক আম’ বলে খুশি হয়ে খেতেন। আমরুল শাক মায়ের বিশেষ প্রিয় ছিল। বেলুড় মঠ হতে কেউ উদ্বোধনে গেলে বাবুরাম মহারাজ বা মহাপুরুষ মহারাজ তাকে দিয়ে মায়ের জন্য ওই শাক পাঠিয়ে দিতেন।
মা যখন জয়রামবাটিতে থাকতেন তখন সকালে এক দেড় ঘন্টা শুধু কুটনো কুটতেন। সেই সময় ভক্ত মেয়েরা তাঁর পাশে বসে অন্তরঙ্গভাবে নানা কথাবার্তা বলতে পারতেন। তিনি বলতেন, “সর্বদা কাজ করতে হয়। কাজে দেহমন ভালো থাকে।” মায়ের কাছে যাঁরা একদিন গেছেন তাঁরাই জানেন মায়ের স্নেহ কত গভীর। ভক্ত সন্তানদের খাওয়া দাওয়া থাকার ব্যবস্থা সব মা নিজে হাতে করতেন। তাঁর রান্নারও কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি তরকারিতে নুন, ঝাল, মশলাদি একটু কম দিতেন। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের জন্য যেমন রাঁধতেন, তেমনি।
একবার মা কলকাতা থেকে জয়রামবাটি যাচ্ছেন। বিষ্ণুপুরে দু’দিন বিশ্রাম। আট মাইল দূরে জয়পুর চটিতে দুপুরের রান্নার আয়োজন করা হয়েছে। উনুন থেকে মাটির হাঁড়ি নামাতে গিয়ে হাঁড়ি ভেঙে ভাত ছত্রাকার। সকলেই হতবুদ্ধি। মা কিন্তু শান্ত ভাবে ভাত আলগা করে তুলে নিয়ে তাই শালপাতাতে নিয়ে ঠাকুরকে ভোগ দিলেন। বললেন, “আজ এইরূপেই মেপেছ, শিগ্গির শিগ্গির গরম গরম দুটি খেয়ে নাও।” মায়ের সঙ্গীরা সকলে খুব হাসতে লাগলেন। তা দেখে তিনি অমনি বললেন, “যখন যেমন তখন তেমন তো করতে হবে। নাও, তোমরা সকলে এখন বসে যাও দেখি।” তা শুনে সকলে বসে গেল। মা সকলকে ওই ভাত পরিবেশন করলেন, নিজেও খেলেন। আবার বললেন, “বেশ রান্না হয়েছে।” কোনো বিরক্তি নেই, কোনো ক্ষোভ নেই। কেমন শান্ত স্নিগ্ধ ভাবটি। ঠাকুরের উপদেশ মা নিজের জীবন দিয়ে সকলকে শিখিয়ে গেছেন- “যখন যেমন তখন তেমন, যার সঙ্গে যেমন, তার সঙ্গে তেমন।”
মা তীর্থ দর্শনে চলেছেন। খুরদা রোডের কিছু পরেই চিলকা হ্রদ দেখা গেল। গাড়ি লেকের ধার ধরে চলেছে। হ্রদের বুকে নানা পাখি, হ্রদের ঢেউ দেখে মা বালিকার মতো আনন্দ করতে লাগলেন। নীলকন্ঠ পাখি দেখে করজোড়ে প্রণাম করতে লাগলেন। স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের ব্যবস্থা মত ‘কেলনার’ কোম্পানির বাঙালি ম্যানেজার বেরহামপুর থেকে মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
ওয়ালটেয়ারে পাহাড়ের গায়ে স্তরে স্তরে সাজানো বাড়ি দেখে মা খুব আনন্দ প্রকাশ করছিলেন। বললেন, “দেখ, দেখ, ঠিক যেন ছবির মতো।” মাকে দর্শন করার জন্য দক্ষিণে মহিলা ভক্তদের সংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছিল। মহিলারা তামিল-তেলেগু ভাষায় মাকে গান শোনাতেন। মা খুব আনন্দ প্রকাশ করতেন শুনে। মাদ্রাজে বহু ভক্ত মায়ের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন। অন্য কারো সাহায্য ছাড়া শ্রীশ্রীমা দীক্ষার্থীদের মন্ত্র, জপের প্রণালী, ধ্যানের প্রক্রিয়া সব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। তবে দীক্ষা ছাড়া অন্য সময় ভক্তদের সঙ্গে কথা বলার সময় দোভাষীর সাহায্য নিতে হত। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভাষার অসুবিধা মা বোধ করতেন না। তিনি যে জগজ্জননী মা সারদা। তিনি যদি ভক্তদের ভাষা না বোঝেন কে বুঝবে তাহলে?
তাঁর মাতৃভাব ঐশীভাবকে ছাড়িয়ে গেছিল। তিনি তাই আগে ‘মা’ পরে গুরুমা। মায়ের অসুখ বেড়ে চলেছে। বারবার থার্মোমিটার লাগানো বিরক্তিকর। সরলাদেবীকে সেবিকার স্থান থেকে সরিয়ে নবাসনের বৌ মায়ের সব কাজের ভার পেলেন। শ্রীশ্রীমা দেখলেন সরলাদেবী তেমন কাছে আসে না। তিনি সেবিকার খোঁজ করতে লাগলেন। দ্বিতীয় দিন সেবিকাকে ডেকে তার মাথাটি বুকের উপর নিয়ে বললেন, “তুই আমার উপর রাগ করেছিস মা? আমি যদি কিছু বলে থাকি, কিছু মনে করিস না মা।” সরলাদেবী কিছু বলতে পারলেন না, শুধু কাঁদতে লাগলেন। আবার মায়ের সেবা করতে লাগলেন।
দেহত্যাগের মাত্র পাঁচ দিন বাকি। ভক্ত কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “মা আমাদের কি হবে?” অভয় দিলেন সারদা সরস্বতী। করুণা বিগলিত ক্ষীণ কন্ঠে বললেন, “ভয় কি? তুমি ঠাকুরকে দেখেছ, তোমার আবার ভয় কি?… তবে একটা কথা বলি — যদি শান্তি চাও, মা, অপরের দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখ। কেউ পর নয় মা, জগৎ তোমার।”
শ্রীমায়ের এই বলে যাওয়া কথাগুলি যদি কিছুটা মেনে চলা যায় তাতেই পরম শান্তি পাওয়া সম্ভব। তাঁর দেখানো রাস্তায় চলাফেরা করলে নিজে ভালো থাকা যায় অপরকে ভালো রাখা যায়। সকলের কল্যাণ কামনা করতে পারলে এক বিশেষ আত্মপ্রত্যয় আসে। হেরে যেতে যেতে আমরা তাঁর কথাতে বিশ্বাস রাখি। তিনি আছেন। আমাদের মা। পাতানো মা নয়, একেবারে আসল মা।
জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদ্ গুরুম্
পাদপদ্মে তয়োঃ শ্রিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ।।
খুব ভালো লাগলো।
অনেক ধন্যবাদ
অপূর্ব লেখা। জয় মা 🙏
ধন্যবাদ