নভেম্বর মাসের ২৮ তারিখ ডলারের তুলনায় টাকার দাম রেকর্ড হারে পড়ে যাওয়ার পরেই দেশের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ৮.২ শতাংশ বৃদ্ধি সোচ্চারে প্রচার করতে লেগে পড়ে। বলা হয় এটি গত বছরের ৫.৬ শতাংশের তুলনায় বেশি। লক্ষ্যনীয় টিভি চ্যানেলগুলি মোদী ও তাঁর সরকারের কল্পনানির্ভর অবাস্তব কথাগুলিকেই সম্প্রচারিত করে চলেছে, কারণ তাঁরা মনে করে তাঁদের জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধের সঙ্গে ফোরেক্স বাজারে ভারতের টাকা সমানুপাতিক। কিন্তু তাদের ধারনা অর্থনীতির পক্ষে যতটা অনুপযুক্ত ততটাই ভিত্তিহীন, বাস্তবতা হল টাকা এখন ধুঁকছে বিপজ্জনক মাত্রায়। মোদীর ১০০ দিনের মধ্যে কালো টাকা দেশে ফেরানো থেকে শুরু করে তরুণদের জন্য বছরে দু-কোটি কর্মসংস্থান, ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের অঙ্ক হবে কৃষকদের উৎপাদনমূল্যের দেড়গুণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং আর যা কিছু দেশবাসীকে ফেরি করেছিলেন সেই বেলুন ফুটো হয়ে চাকরির প্রকট অভাব, রপ্তানি, মোট মূলধনী সম্পদ গঠন, উৎপাদনশিল্পে ঋণ বৃদ্ধি… সবকিছুই বিপর্যয়ের দিকে যখন দ্রুত ধাবমান তখন মোদী, তাঁর সরকার ও গোদি মিডিয়ার ধারাবাহিক মিথ্যা প্রচার ফাঁস করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার তার ‘Article 1v consultation report of india’ প্রতিবেদনে। যেখানে IMF কেবল ভারত সরকারের দেওয়া জিডিপি বৃদ্ধি হারের তথ্যতে সন্দেহ প্রকাশ করেনি, তারা তথ্যের গুণগত মানকে ‘C’ দিয়েছে অর্থাৎ IMF-এর বার্ষিক পর্যালোচনায় ভারতের জাতীয় অ্যাকাউন্টের পরিসংখ্যানের মূল্যায়ন একদম শেষের সারির এক ধাপ আগে। কারণ হিসাবের জন্য দেওয়া তথ্য সঠিক নয়। তাহলে কী দেশের অর্থনীতির প্রকৃত ছবি ফুটে ওঠে? বাজারে জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামে মানুষ দিশেহারা কিন্তু কেন্দ্র প্রচার করছে মূল্যবৃদ্ধি কমছে। আইএমএফের রিপোর্টেও যদি মোদী, তাঁর সরকার ও মিডিয়ার লজ্জা বোধ না হলেও ভারতে বিদেশি লগ্নির ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। কিন্তু লজ্জা বা ঘেন্নার মাথা খেয়ে মোদী ও তাঁর সরকার এটাকেই অর্থনীতির বিপুল সাফল্য বলে দাবি করছে, এমনকি বোঝাতে চাইছে শ্রম আইন তুলে দিয়ে শ্রমকোড চালু করার মতো আর্থিক সংস্কার এই জিডিপি-র হার বৃদ্ধির পথ খুলে দিয়েছে।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা এ দেশের জিডিপি পরিসংখ্যান নিয়ে বহুদিন আগে থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক অরুণ কুমার, প্রাক্তন মুখ্য পরিসংখ্যানবিদ প্রণবেশ সেন প্রমুখের বক্তব্য, বিগত কয়েকটি বছর দেশের উপর যত রকম ধাক্কা এসে পড়েছে; ২০১৬ সালের নোটবন্দি, ২০১৮-তে নন-ব্যাঙ্কিং ফাইনান্সিয়াল কোম্পানির দুর্নীতি, তার উপর ২০২০ সালের অতিমারি অর্থনীতির আগাগোড়া ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু ভারত সরকার সরকারি তথ্যে সেই বাস্তবতা না দেখিয়ে জিডিপি-র হার বৃদ্ধির যে প্রচার করে তা কী বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে? কোনোভাবেই নয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের কাছে কোনো ত্রৈমাসিক তথ্য নেই, ফলে অধিকাংশ সময়েই তা দেওয়া হয় অনুমান অথবা গড় হিসাব করে। ভারত সরকার বলে থাকে কৃষি পণ্যের দাম কমেছে তাহলে কৃষি বৃদ্ধির হার কিভাবে ৩.৫ থেকে ৩.৬ শতাংশ হয়ে রয়েছে। তাছাড়া সরকার যতই ভারতকে ৩.৮ ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলারের দেশ বলে ঘোষণা করুক আসলে ভারত খুব বেশি হলে ২.৫ আমেরিকান ডলারের অর্থনীতির দেশ। আইএমএফ-এর মূল্যায়ন কোথায় ভারতের ফাঁকি দেখিয়ে দিয়ে জানিয়েছে, ভারত এখনও ২০১১–১২ সালের ভিত্তিবর্ষ ব্যবহার করে এবং উৎপাদক মূল্য সূচক (Producer Price Index) না নিয়ে পাইকারি মূল্য সূচক (Wholesale Price Index) ব্যবহার করে। ২০১১–১২ সালের ভিত্তিবর্ষ ব্যবহার এখন মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। আর সেই কারণে আসল হিসাবের থেকে পার্থক্য তৈরি হতেই পারে। তাছাড়া অতিমারির বিরাট ধাক্কায় বহু সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও জিডিপির হিসাব সেই ক্ষয়ক্ষতি ধরে নিয়ে হয়নি। বহু সংস্থার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলেও তার প্রতিফলন জিডিপিতে ধরা হয়নি। পরিষেবা খাতের সমীক্ষাতে বহু তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিস্ক্রিয় হয়ে গেলেও সেই তথ্য হিসাবের বাইরে রয়ে গিয়েছে, ফলে তথ্য ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ভারতের জিডিপি বৃদ্ধি অতিরঞ্জন বলে বিতর্ক আছে। অনেকেই এই অতিরঞ্জনের জন্য তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং অ-কৃষি খাতে কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যা প্রকৃত বৃদ্ধির হার ৪-৫% হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেয়। তাদের অতিরঞ্জনের পক্ষে আরও যুক্তি- জিডিপি হিসাবের জন্য ব্যবহৃত তথ্য নির্ভরযোগ্য নয় এবং তাতে পরিসংখ্যানগত ত্রুটি রয়েছে। কৃষি ও কৃষিখাতে কর্মসংস্থান ক্রমশ কমে যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। প্রসঙ্গত, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ বিজনেস স্কুলের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর অনেক আগেই জানিয়েছিলেন, সরকারিভাবে জিডিপি ৮ থেকে ৮.৫ শতাংশ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ৬ থেকে ৬.৫ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে। বলেই জানিয়েছেন তিনি। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ বিজনেস স্কুলের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছিলেন, ভারতের মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি দেখলে এই ফাঁকটা ধরা যায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন ভারতের মুদ্রাস্ফীতির ছবি জিডিপি বৃদ্ধির উপর প্রতিফলিত হয় না। তিনি নিজেই তার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, যখন বৃদ্ধি দ্রুত হয় কিন্তু জোগান কম থাকে তখনই এই রকম মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতি হয়। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারতে তা হচ্ছে না। দেশে কৃষিক্ষেত্রেই কাজ পাচ্ছেন মানুষ, কারণ, সেখানে উৎপাদন কম। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে কাজ পাচ্ছে না। এই বিষোয়টি দেশের প্রকৃত উন্নয়নের পক্ষে ভালো সংকেত নয় বলে জানিয়েছিলেন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ। পরিসংখ্যান কারচুপি বা সঠিক তথ্যকে দেশের মানুষের কাছে বাড়িয়ে বলে দেশের প্রকৃত অবস্থা সাময়িক ভাবে আড়াল করা যায় কিন্তু সেটা সাময়িক, দীর্ঘদিন কঙ্কাল লুকিয়ে রাখা যায় না। তাছাড়া দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ও পরিকল্পনার জন্য সঠিক তথ্য সবসময় জরুরি।
মদ মাংসের দোকানে ভীড়, ঘরে ঘরে মোটরবাইক, হাতে হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল কি জন্য?