বহুদিন ধরেই দেশের শিল্প মালিকেরা প্রচলিত শ্রম আইনগুলির পরিবর্তন চাইছিল। অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকার ১৯৯৯ সালে বিজয় ভার্মার নেতৃত্বে যে দ্বিতীয় জাতীয় শ্রম কমিশন গঠন করে, ২০০২ সালে সেই কমিশন দেশের শ্রম আইনগুলিকে কোডে রূপান্তরিত করার প্রস্তাব পেশ করে। ২০২০ সালে (করোনাকালে) নরেন্দ্র মোদী সরকার পার্লামেন্টে কোনও আলোচনার সুযোগ না দিয়ে সেই শ্রম কোড পাশ করিয়ে নেয়। চলতি বছর ২১ নভেম্বর কেন্দ্র ৪৪টি শ্রম আইন বাতিল করে ৪টি শ্রম কোড চালু করেছে। শ্রম আইনের ক্ষেত্রে নিয়ম হল প্রথমে লোকসভা, পরে রাজ্যসভায় আইন পাশ করিয়ে, তার পর ওই আইনের কেন্দ্রীয় রুলসকে গেজেট-বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কার্যকর করা। কিন্তু কেন্দ্র সরকার সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে গেজেট-বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে শ্রমকোড চালু করে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, সংবিধানে শ্রম আইন কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কেন্দ্র গেজেট-বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার পর রাজ্যগুলি নিজস্ব রুলস তৈরি করবে। তা ছাড়া আইন কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়। এর আগে কেন্দ্র সরকার ২০২০ সালে ড্রাফট-রুল তৈরি করে জনসমক্ষে এনেছিল, কিন্তু প্রবল শ্রমিক বিক্ষোভে গেজেট-বিজ্ঞপ্তি হিসাবে প্রকাশ করতে পারেনি। কিন্তু এবার কেন্দ্র নিয়ম ভেঙে শ্রমকোড চালু করছে। তবে একাধিক কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামে। অন্যদিকে কেন্দ্র এই শ্রম কোড শ্রমিকদের কত ধরনের সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও অধিকার দেবে তা প্রচার করতে বহু টাকা খরচ করেছে।
যারা এই শ্রম কোডকে চূড়ান্ত শ্রমিকস্বার্থ বিরোধী বলছেন তাঁদের মতে এতে শ্রমিকদের প্রায় সব অধিকার হরণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারণ এই কোডের ৭৭(১), ৭৮, ৭৯, ৮০ ধারা অনুযায়ী যে কারখানায় ২৯৯ জন পর্যন্ত শ্রমিক কাজ করে সেখানে লে-অফ, ছাঁটাই এবং ক্লোজার করার জন্য মালিকদের সরকারের কাছ থেকে উপযুক্ত অনুমতি নেওয়ার দরকার হবে না। কিন্তু আগের আইন অনুসারে ১০০ বা তার বেশি শ্রমিক কাজ করা কারখানায় ওই সব পদক্ষেপের জন্য সরকারের অনুমতি ছিল বাধ্যতামূলক। আগের শ্রম আইনে বিদ্যুৎ চালিত কারখানায় ১০ জন ও বিদ্যুৎ হীন কারখানায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করলে সেটি ফ্যাক্টরি এবং তার শ্রমিকরা ফ্যাক্টরি আইনের সমস্ত সুযোগ পাবে। শ্রম কোডে কেন্দ্র কারখানা বলছে যেখানে বিদ্যুৎ-নির্ভর ক্ষেত্রে ২০ জন ও বিদ্যুৎহীন ক্ষেত্রে ৪০ জন শ্রমিক কাজ করে তাকে। এর ফলে বহু মালিক ১৯ বা ৩৯ জন শ্রমিক দিয়ে কারখানা চালিয়ে শ্রমিকদের সমস্ত আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে। অন্যদিকে ঠিকা শ্রমিকদের সংখ্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ জন এবং পরিযায়ী শ্রমিক ৫ জন থেকে বাড়িয়ে ১০ জন করা হয়েছে। এর ফলে শ্রমিকরা ব্যাপকহারে কাজ হারাবে। নতুন শ্রম কোডে ফ্যাক্টরির সংজ্ঞার বদল ঘটায় মালিকরা অবাধে ছাঁটাই ও নানাভাবে শ্রমিক খাটানোর অধিকার পেল।
আগে ছিল তিন ধরনের মজুরি — মিনিমাম ওয়েজ, ফেয়ার ওয়েজ আর লিভিং ওয়েজ। শ্রম কোডে হয়েছে ফ্লোর ওয়েজ ব্যবস্থা যা প্রচলিত ন্যূনতম মজুরির থেকে কম। ১৯৫৭ সাল থেকে শ্রমিকদের মিনিমাম ওয়েজ দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। মালিক ন্যূনতম মজুরির কম দিলে আইনভঙ্গকারী হিসাবে চিহ্নিত হওয়া ও শাস্তি পাওয়ার সম্ভবনা ছিল। কিন্তু শ্রম কোডের ফ্লোর ওয়েজে চূড়ান্ত মূল্যবৃদ্ধির বাজারে ন্যূনতম মজুরির থেকে কম মজুরি দেওয়ার ব্যবস্থা হল। নতুন শ্রম কোডে ‘ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট’ তথা চুক্তিভিত্তিক কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। চুক্তিতে কর্মীদের কাজের কোনো স্থায়িত্ব থাকবে না। মালিক মেয়াদ পূরণের আগে শ্রমিকদের ছাটাই করতে পারবে। অর্থাৎ চাকরি হারানোর ভয়ে শ্রমিকরা শঙ্কিত থাকবে, মালিকদের কোনো বঞ্চনার় প্রতিবাদও করতে পারবে না তারা। তার মানে শ্রম কোডের মাধ্যমে স্থায়ী কাজে স্থায়ী কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা ধ্বংস করা হল।
শ্রম আইনে জরুরি পরিষেবা ছাড়া আর কোথাও ধর্মঘট করার জন্য শ্রমিকদের নোটিস দেওয়ার আইনি বাধ্যতা নেই। কিন্তু শ্রম কোডে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের ধর্মঘটে যাওয়ার ১৪ দিন আগে নোটিস দিতে হবে। তাছাড়া শিল্প বিরোধ নিয়ে সরকারের শ্রম দপ্তরের পক্ষ থেকে আলোচনা শুরু হলে যতদিন আলোচনা চলবে ততদিন শ্রমিকেরা ধর্মঘট করতে পারবে না। তার মানে মালিকপক্ষ ও আর সরকার এই অবসরে যতদিন পারবে আলোচনা চালিয়ে যাবে। আরও বলা হয়েছে যে, অর্ধেকের বেশি শ্রমিক একসঙ্গে ছুটি নিলে তা ধর্মঘট হিসেবে বিবেচিত হবে এবং মালিক তার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। শ্রম কোডে যেমন প্রচুর ঠিকা শ্রমিক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিষেবা ক্ষেত্র যেমন ব্যাঙ্ক, ইনসিওরেন্স ইত্যাদিও আছে। বাদ দেওয়া হয়েছে পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কাজের পরিবেশ এবং স্থায়ী কাজের ধারণা। আর ঠিকা শ্রমিক মানে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বলে কিছু থাকবে না এবং মজুরিও কমে যাবে। শ্রম কোডে পিএফ, পেনশন এবং ইএসআই-এর গুরুত্ব কমানো হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কোড অনুযায়ী প্রফিডেন্ট ফান্ডে কর্মচারী এবং মালিক উভয়ের দেওয়া মজুরির অংশ মূল বেতনের ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে কর্মচারীর পিএফ অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে ৪ শতাংশ করে কম টাকা জমা পড়বে। কমে যাবে পেনশনের টাকাও।
কেন্দ্র সরকার দাবি করেছে স্বাধীন ভারতে এতবড় শ্রম সংস্কার আগে হয়নি। কথাটা খুব ঠিক, প্রশ্ন হল এই শ্রম সংস্কারে শ্রমিকদের অধিকার আরও সংকুচিত হল না মালিকের স্বাধীনতা আরও অবাধ হল? প্রচলিত শ্রম আইনে শ্রমিকের যেটুকু অধিকার বা সুযোগ সুবিধা ছিল শ্রম কোড তা নানা কায়দা কানুনে বাদ দিয়েছে। নব্বই দশকের গোড়া থেকে শিল্পপতিরা যে ধরনের শ্রম আইন সংস্কার চেয়ে এসেছে তাকেই কেন্দ্র মান্যতা দিল। এতে আগামীদিন শ্রমিকের উপর খুব সহজেই মালিকের সাঁড়াশি আক্রমণ নামবে কারণ, শ্রমের উপর পুঁজির আধিপত্যের লক্ষ্যেই এই শ্রম কোড। কিন্তু সেই আক্রমণ রুখতে শ্রমিক সংগঠনগুলি কী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে প্রস্তুত?