গত পর্বে এবারের কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের বিভিন্ন কালজয়ী শিল্পীদের শতবর্ষের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, পোলিশ সিনেমার প্রতি বিশেষ ফোকাস প্রদান এবং উৎসবে প্রদর্শিত আমার পছন্দের দু’টি ছবি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এই পর্বে আরও তিনটি বিশেষ ছবি নিয়ে কথা বলব। আগের পর্বের মতোই এই তিনটি ছবিরও বিশেষ কিছু নান্দনিক বৈশিষ্ট্য যা আমার নজর কেড়েছে সেই বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করব যাতে আমার সিনেফিল পাঠকরা ভবিষ্যতে এই ছবিগুলি নিজের মতো করে উপভোগ করতে পারেন। এই ছবিগুলির কপালেও এবারের চলচ্চিত্র উৎসবে কোনও পুরষ্কার জোটেনি কিন্তু তাদের স্বকীয়তায় তারা একপ্রকার অনন্যই বলা চলে – বিশেষ করে শেষ ছবিটি।

আ ল্যান্ড উইদিন (A Land Within/Zweitland)
পরিচালকঃ মাইকেল কফলার (Michael Kofler)
অভিনয়েঃ থমাস প্রেন (Thomas Prenn), লরেন্স রুপ (Laurence Rupp), অ্যান শোয়ারৎস (Aenne Schwartz)
সময়টা ১৯৬১ সাল। ইটালির উত্তরে আল্পস পর্বতের কোলে অবস্থিত প্রদেশ দক্ষিণ টাইরলের (South Tyrol) সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এককথায় অগ্নিগর্ভ। এই প্রদেশটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রিয়া ইটালির কাছে সমর্পণ করে এবং সেই থেকেই এই প্রদেশের জার্মান অধিবাসী এবং ইটালি রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই রয়েছে। ১৯৬১ সালে যখন এখানকার বিপ্লবীরা পরপর বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতে শুরু করে তখন এই সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করে এবং সেই পরিস্থিতিই অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ভাবে এই ছবিতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন পরিচালক মাইকেল কফলার।
ছবির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে টাইরলে বসবাসকারি একটি জার্মান পরিবার যার Patriarch একজন বিপ্লবী এবং এক স্বাধীন ও সার্বভৌম টাইরলের দাবীতে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সামিল। এই Patriarch-এর স্ত্রী একজন শিক্ষিকা ও যুদ্ধবিরোধী। একটি দ্বিভাষী টাইরল প্রদেশের জন্য তিনি লড়াই করে চলেছেন এবং স্বামীর মতাদর্শের সাথে তাঁর অহরহ সংঘর্ষ বাঁধে। তবে গল্পের মূল চরিত্র হল এই Patriarch-এর ভাই যে একজন প্রতিভাবান শিল্পী এবং এই সংঘর্ষ থেকে অনেক দূরে কোনও আর্ট কলেজে পড়তে যাওয়াই তার লক্ষ্য। কিন্তু বিধি বাধ সাদেন তার এই লক্ষ্য পূরণে কারণ ঘটনাক্রমে এই জার্মান-ইটালীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সে এবং সমসাময়িক Identity ও Existential Crisis-এ ভুগতে থাকে।
পুরো ছবিটিতে এই জার্মান-ইটালীয় Identity Crisis-এর অন্তর্দ্বন্দ অহরহ চোখে পড়ে যা ক্ষণে ক্ষণে আমাদের কাশ্মীর সমস্যার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এহেন হিংসাত্মক পরিস্থিতিতে কে যে বিপ্লবী আর কে যে উগ্রপন্থী তা মাঝে মাঝেই গুলিয়ে যায় এবং সেখানেই এই ছবির অনন্যতা। একটি সাধারণ মানের ছবির মতো কোনও একটি পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে, পরিচালক কফলার বারবার চোখের সামনে তুলে ধরেন এই সংঘর্ষের বীভৎসতা এবং কিভাবে এটি একটি পরিবারকে তছনছ করে দিতে পারে মুহূর্তের মধ্যে। ছবির গল্প বলার ধরণে Auteurism-এর ছাপ স্পষ্ট। এছাড়াও ছবিটির অসাধারণ চিত্রগ্রহণ (Cinematography) ছবিটিকে অন্য মাত্রা দেয়।

লেট ফেম (Late Fame)
পরিচালকঃ কেন্ট জোন্স (Kent Jones)
অভিনয়েঃ উইলেম ড্যাফো (Willem Dafoe), গ্রেটা লি (Greta Lee)
কেন্ট জোন্স বর্তমান মার্কিনী পরিচালকদের মধ্যে একজন খাঁটি Auteur — দুর্ভাগ্যবশতঃ যে ধরণের ফিল্মমেকাররা এখন প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। জোন্সের ফিল্মমেকার হয়ে ওঠার পথটাও অনেকটা ষাটের দশকে Nouvelle Vague-এর প্রবর্তকদের মতো কারণ গোদার বা ত্রুফোর মতো তিনিও প্রথম জীবনে ছিলেন একজন সমালোচক এবং একই পত্রিকার হয়ে (ঠিকই ধরেছেন, জনপ্রিয় ফরাসী ফিল্ম পত্রিকা Cahiers du Cinema-র হয়ে)। জোন্সের ছবিতেও তাঁর ব্যক্তিগত Artistic সত্ত্বার প্রকাশ ঘটে যা তাঁর ছবিকে আর পাঁচটা ছবির থেকে আলাদা করে।
লেট ফেম ছবিটির গল্পটি খুবই চেনা ও Predictable। একজন প্রাক্তন কবি তাঁর বার্ধক্যে এসে হঠাৎ করে তাঁর তিন দশক আগে লেখা কবিতার জন্য, যা সেই সময়ে বিশেষ পাত্তা পায়নি, খ্যাতির মুখ দেখেন এবং সেই সুবাদে একদল তরুণ সংস্কৃতিমনস্ক পাঠকের সাথে বন্ধুত্ব পাতান। সেই দলের একমাত্র মহিলা সদস্য গ্লোরিয়ার সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এই সুবাদে সেই কবি তাঁর পুরাতন Philistine বন্ধুদের ত্যাগ করেন। আগেই বলেছি গল্পের মধ্যে সেরকম নতুনত্ব কিছু নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও ছবিটি Unique হয়ে ওঠে তার অনন্য Cinematic Language এবং মূল চরিত্রে উইলেম ড্যাফোর অভিনয়ের জন্য। আমার যেসব পাঠকরা ষাট বা সত্তরের দশকের ছবিতে প্যারিসের রাস্তা দেখার অনুভূতির জন্য Nostalgia বোধ করেন এই ডিজিটাল ছবি এবং CGI-এর যুগে, তাঁরা এই ছবি খুবই উপভোগ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। আর আপনি যদি উইলেম ড্যাফোর ভক্ত হন তাহলে তো কথাই নেই। প্রধান নারী চরিত্রে গ্রেটা লির অভিনয়ও নজর কাড়ে।

গোস্ট এলিফ্যান্টস (Ghost Elephants)
পরিচালকঃ ভার্নার হারৎসগ (Werner Herzog)
এখনও পর্যন্ত দুই পর্ব মিলিয়ে যে চারটি ছবি নিয়ে আলোচনা করেছি তাদের সব ক’টিই Fiction ছবি। হারৎসগও মূলতঃ Fiction ছবি করার জন্য বিখ্যাত হলেও তাঁর এই ছবিটি কিন্তু একটি ডকুমেন্টারি। বলা বাহুল্য, চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনের দিন থেকে এই ছবিটি দেখার জন্য আমি মুখিয়ে ছিলাম। তার কারণ দু’টি – প্রথমতঃ হারৎসগ সেইসব পরিচালকদের একজন যাঁর New German Cinema বা Das Neue Kino আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল এবং দ্বিতীয়তঃ এই ছবির বিষয়বস্তু আমার অতি প্রিয় একটি প্রাণী — আফ্রিকান হাতি।
আমরা সকলেই অল্পবিস্তর অবগত যে মানুষের লোভ এবং অজ্ঞানতার প্রভাবে এই অসম্ভব সুন্দর প্রাণীটি আমাদের নিজেদের দেশে এবং আফ্রিকায় যারপরনাই বিপন্ন। তবে হারৎসগের এই ছবি সেই দিকে প্রত্যক্ষ ভাবে নজর দেয় না, বরং ছবিটি অনুসরণ করে একজন অর্ধউন্মাদ জীববিদকে যিনি অ্যাঙ্গোলায়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির (অথবা উপপ্রজাতির) হাতির সন্ধান করেন যা হয়তো এখনকার স্থলভাগে বসবাসকারী প্রাণীদের মধ্যে বৃহত্তম এবং ওজনে ১১ টন পর্যন্ত যেতে পারে (ভারতীয় হাতির গড় ওজন ৫ থেকে ৫.৫ টন এবং আফ্রিকান হাতির গড় ওজন ৭ থেকে ৭.৫ টন)। হারৎসগ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ভালো জিনিসের পাশাপাশি Poaching বা Trophy Hunting-এর মতো অত্যন্ত কদর্য দিকগুলি দেখাতেও পিছপা হননি এই ছবিতে। পিছপা হননি আফ্রিকার Bushman গোষ্ঠীর সামাজিক রীতিনীতি তুলে ধরতেও। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যেখানে আমরা অহরহ পৃথিবীব্যাপী বন ও বন্যপ্রাণের ধ্বংস দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, সেই সময়ে এইরকম একটি ছবি সিনেফিলদের তো বটেই, সকলেরই দেখা উচিৎ বলে আমি মনে করি। আগামি বছর বিভিন্ন OTT Platform-এ ছবিটি দেখার সুযোগ মিলবে।
হারৎসগের ছবিটি দিয়েই এবছর আমি আমার ছবি পরিক্রমা শেষ করি। লেখাটি সম্পূর্ণ করার আগে উৎসব সম্পর্কে কয়েকটি কথা না বললেই নয়। প্রথমতঃ প্রেক্ষাগৃহে মোবাইল ফোন ব্যবহার করার বদাভ্যাসটি যে কলকাতার দর্শকের কবে যাবে তা বলতে পারি না — বড়ই বিরক্তিকর ব্যাপার এটি। তার সাথে রয়েছে ছবি দেখতে দেখতে নাসিকা গর্জন – অন্তত দু’টি ছবিতে যা বড়ই সমস্যার সৃষ্টি করে। এত ভালো ভালো ছবির Selection সত্ত্বেও এই Professionalism এর অভাব কিঞ্চিৎ পীড়াদায়ক বইকি! আগামি বছরগুলিতে ভালো ছবির সাথে সাথে ছবি দেখার সংস্কৃতিতে এই পরিবর্তনগুলি আনা সম্ভব হয়, তাহলে কলকাতার এই Modest চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্বের যেকোনো চলচ্চিত্র উৎসবের সাথে পাল্লা দিতে পারে বলেই আমার বিশ্বাস — শুধু প্রয়োজন একটু বাড়তি সচেতনতার।
ভালো লাগলো