বিহারের নীতীশকুমার। লোকে তাঁকে আদর করে ডাকে পল্টুরাম বলে। (পল্টুরাম বলে সত্যি কিন্তু একজন মানুষ আছেন। ৫৫ বছর বয়েসী সেই মানুষটি বিজেপির সদস্য এবং উত্তরপ্রদেশের বলরামপুরের বিধায়ক ও মন্ত্রী)। পল্টুরাম নীতীশকুমার এলেবেলে লোক নন। নরেন্দ্র মোদির মতো তিনি পোশাকবিলাসী না হতে পারেন, অমিতবাবুর মতো জুমলাবাজ না হতে পারেন, রাহুলের মতো না ফোটাতে পারেন হুল, কিন্তু তিনি শান্তভাবে রাজনীতির ক্ষমতা দখলের মাঠে পূর্ণ করতে পারেন দশম ইনিংস। এই সেদিন তিনি দশম বারের মতো শপথ নিলেন মুখ্যমন্ত্রীর পদে। আপাতভাবে চাণক্যকে ঘায়েল করে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যাঁরা দীর্ঘকাল মুখ্যমন্ত্রীর আসনটি আঁকড়ে ধরে আছেন, নীতীশ তাঁদের একজন। বিশ্বাস না হলে তালিকাটা দেখুন। সিকিমের সিকিমের সিকিম ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের পবনকুমার চামলিং -২৪ বছর ১৬৫ দিন। চামলিংবাবু এ ব্যাপারে ফার্স্ট বয়। এর পর আছেন ওড়িশার বিজু জনতা দলের নবীন পট্টনায়েক -২৪ বছর ৯৯ দিন, পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির জ্যোতি বসু –২৩ বছর ১৩৭ দিন, অরুণাচল প্রদেশের গেগং আপাং –২২ বছর ২৫০ দিন, মিজোরামের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের লাল থানহাওলা –২২ বছর ৬০ দিন, হিমাচল প্রদেশের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বীরভদ্র সিং –২১ বছর ১৩ দিন, ত্রিপুরার মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির মানিক সরকার –১৯ বছর ৩৬৩ দিন, তামিলনাড়ুর ডি এম কের এম. করুণানিধি –১৮ বছর ৩৬২ দিন, পাঞ্জাবের শিরোমণি আকালি দলের প্রকাশ সিং বাদল—১৮ বছর ৩৫০ দিন, নাগাল্যাণ্ডের নাগা পিপলস ফ্রন্টের নেইফিউ রিও—১৮ বছর ২৭৪ দিন, হিমাচল প্রদেশের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের যশোবন্ত পারমার –১৮ বছর ৮৩ দিন, বিহারের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শ্রীকৃষ্ণ সিংহ –১৭ বছর ৫১ দিন, মধ্যপ্রদেশের ভারতীয় জনতা পার্টির শিবরাজ চৌহান –১৬ বছর ২৮৪ দিন, রাজস্থানের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মোহনলাল সুখদিয়া –১৬ বছর ১৯৪ দিন, পদুচেরির অল ইণ্ডিয়া এনআর কংগ্রেসের এন রঙ্গস্বামী –১৬ বছর ১৭২ দিন, গোয়ার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতাপসিং রানে –১৫ বছর ৩২৫ দিন, নাগাল্যাণ্ডের ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের এস সি জামির — ১৫ বছর ১৫১ দিন, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলুগু দেশম পার্টির এন. চন্দ্রবাবু নাইডু – ১৫ বছর ৪৬ দিন, দিল্লির ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীলা দীক্ষিত –১৫ বছর ২৫ দিন, ছত্তিশগড়ের ভারতীয় জনতা পার্টির রমন সিং –১৫ বছর ১০ দিন, মণিপুরের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ওকরাম ইবোসি সিং –১৫ বছর ৮ দিন, অসমের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তরুণ গগৈ—১৫ বছর ৬ দিন। এই যে তালিকা, এতে আমাদের পল্টুরাম অনেক উঁচুতে আছেন। পবন চামলিংকে টপকে তিনি ফার্স্ট বয় হবার পথে।। ২০০০ সালে তিনি প্রথমবার তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেছিলেন। কিন্তু মেয়াদ ছিল মাত্র ৭ দিনের। কিন্তু ২০০৫ সালে সেই যে তিনি বসলেন মুখ্যমন্ত্রীর পদে, তারপর বসেই আছেন; ২০২৫-এর পর তিনি যদি আর ৫টা বছর কাটিয়ে দিতে পারেন, তাহলে কেল্লা ফতে। নীতীশকুমার তাহলে ফার্স্ট বয়।
নীতীশ প্রথম ভিড়েছিলেন জনতা দলকে। ১৯৮৫ সালে তিনি জনতা দলের টিকিটে বিধায়ক হন। লালুপ্রসাদ যাদবের সঙ্গে খুব মাখামাখি। ১৯৯৪ সালে চলে এলেন জর্জ ফার্নান্ডেজের জনতা দলে, পরে যার নাম হয় সমতা পার্টি। এই সমতা পার্টি ১৯৯৬ সালে জোট বাঁধল বিজেপির সঙ্গে। বাজপেয়ী সরকারের মন্ত্রীসভায় ঢুকলেন নীতীশ। ২০০০ সালে হলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। তবে মাত্র ৭ দিনের জন্য। ফিরে এলেন ২০০৫ সালে। যখন এন ডি এ জোট ক্ষমতা লাভ করল ৮৮ আসন লাভ করে। ২০১০ সালে নীতীশের দল জে ডি ইউ এককভাবে গড়ল সরকার। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে জোট চিড় খেল ২০১৩ সালে যখন বিজেপি নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করল। ২০১৫ সাল। আর জে ডির লালুপ্রসাদকে নিয়ে জোট গড়লেন নীতীশ। জয় হল। তিনি মুখ্যমন্ত্রী। লালুপুত্র তেজস্বী উপমুখ্যমন্ত্রী। চাচা-ভাতিজার হাসি হাসি মুখ দেখে মনে হল এই জোট চলবে অনেকদিন। না, চলল না। ২০১৭ সাল। আর জে ডির সঙ্গ ছাড়লেন নীতীশ। হাত মেলালেন বিজেপির সঙ্গে। ২০২৩ সালে আবার বিজেপিকে ছেড়ে ফিরলেন মহাজোটে। আবার লালুপুত্র তেজস্বীর সঙ্গে, আবার তেজস্বী উপমুখ্যমন্ত্রী। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে আবার ভোলবদল। মহাজোট ছেড়ে আবার বিজেপির সঙ্গে। ২০২৫ সালের বিধানসভার নির্বাচনে এন ডি এ জোট বাজি মাত করল। জে ডি ইউ-এর চেয়ে বিজেপি বেশি আসন পেল। কিন্তু তাতে কি! নীতীশকুমার আবার মুখ্যমন্ত্রী।
এই যে বার বার জোট বদল, কি করে পারেন নীতীশকুমার ?
কি করে পারেন, তা জানতে হলে আমাদের জীববিদ্যার সাহায্য নিতে হয়। জীববিদ্যায় অভিযোজন বা adaptation-এর প্রসঙ্গ আছে। অভিযোজন হল সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জীব পরিবেশের সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। অভিযোজন তিন ধরনের — কাঠামোগত অভিযোজন, শারীরবৃত্তিয় অভিযোজন আর আচরণগত অভিযোজন। নীতীশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এই আচরণগত অভিযোজন। তিনি জানেন কখন কোন জোটে থাকা দরকার, কিভাবে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে হয়, কিভাবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধরে রাখা যায় ক্ষমতা।
কিন্তু প্রশ্নটা শুধু নীতীশকুমারের অভিযোজন ক্ষমতার নয়। প্রশ্নটা তাঁর অপরিহার্যতারও। বিজেপি তাঁকে অপরিহার্য মনে করে, মহাজোট বা আর জে ডিও তাঁকে অপরিহার্য মনে করে। তাঁকে নিয়ে তাই দড়ি টানাটানি হয়। নিরুচ্চারে, টুকরো টুকরো নানা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নীতীশ নিজের এই অপরিহার্যতাকে বেশ একটা দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন।