ভগ্নস্তূপে পরিণত অতীত খেজুরির ইতিহাস জড়িত নীলকুঠি। ভগ্নস্তূপেই চাপা পড়ে হারাছে খেজুরিতে নীল চাষের অতীত ইতিহাস। ভগ্নস্তূপ থেকেই ইতিহাসের চুপ কথা জানান দেয়, হিজলি সংলগ্ন খেজুরির ইতিহাস কয়েকশো বছরের পুরনো। সেই সময় খেজুরির নাম ছিল কেডিগিরি। হিজলিতে ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ নাবিকদের জাহাজ এসে পৌঁছায়। তারপর হিজলিতে ডাচ ওলন্দাজ ও পর্তুগিজ বণিকেরা বহু সময় ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য করে এসেছে। ১৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে মুঘলরা পর্তুগিজদের হিজলি থেকে বহিষ্কৃত করেন। ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে ক্যাপ্টেন জেমস মেরিনার নেতৃত্বে রেবেকা নামক একটি পালতোলা জাহাজ খেজুরি পোতাশ্রোয়ে আসে। সেই থেকে শুরু হয় খেজুরি বন্দর। এরও প্রায় একশো বছর পর ইংরেজরা ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে খেজুরি বন্দর গড়ে তোলে। দ্রুতই খেজুরি বন্দরের নাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৭শ ও ১৮শ শতকে খেজুরি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র, যেখানে ইউরোপীয় ও অন্যান্য ব্যবসায়ীদের নানান বাণিজ্যিক ভবন ও ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ বণিকদের ইন্ডিয়া কোম্পানির খবর আদান প্রদানের জন্য খেজুরিতে প্রথম ডাকঘর স্থাপিত হয়। যা ভারতের প্রথম ডাকঘর। ইতিহাসের চুপ কথা জানান দেয়, ব্রিটিশ বণিক লুইস বোনার্ড বাংলায় ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম নীল চাষ শুরু করেন।

উনিশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে বস্ত্র শিল্পে নীলের চাহিদা যথেষ্ট বেড়ে যায়। ইউরোপের বাজারে উচ্চ চাহিদা থাকার কারণে কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে খাদ্যশস্যের পরিবর্তে নীল চাষ করতে বাধ্য করত ব্রিটিশ নীলকররা। কৃষকদের ঋণ ও শোষণের একটি চক্রের মধ্যে আটকে রাখত। নীলচাষের চাষিরা অগ্রিম অর্থ পেত, যা পরে তাদের শোষণের কারণ হয়ে দাঁড়াত। এরই প্রতিবাদে ১৮৫৯ সালে বাংলার নদীয়া জেলায় কৃষকরা নীল চাষ করতে অস্বীকার করে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে, যা ইতিহাসে ‘নীল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। নীলচাষিদের এই বিদ্রোহের ফলে নীল চাষের প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং কৃষকদের দুর্দশার কথা সকলের নজরে আসে। এই নীল বিদ্রোহের উপর ভিত্তি করেই বাংলার সাহিত্যিক দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণ কালজয়ী নাটকটি রচনা করেছিলেন।

১৮৫৯ সালের নীলবিদ্রোহের ফলে বাংলায় তখন একসময়ের জোরদার নীলচাষ প্রায় বন্ধ করে ব্রিটিশ নীলকর সাহেবের দল ইংল্যান্ডে ফেরতের দিকে তখন ১৮৬১ সালে বড়লাট লর্ড ক্যানিংয়ের সময় খেজুরিতে খেজুরি-হিজলি-কাঁথির নিমকমহলে কর্মহীন ও উদ্বৃত্ত ‘মলঙ্গী’ (লবণ শ্রমিক)-দের দিয়ে নীল চাষ শুরু হয়। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে ধ্বংস হয়ে যাওয়া খেজুরী বন্দরের কাছে খেজুরি বালিবস্তি এলাকায় নীলচাষের জন্য নীলকুঠি গড়ে তোলে। চারটি বড় বড় কুঠরিওয়ালা বাড়ি বানিয়ে শুরু হলো নীল তৈরির কারখানা,আড়ত ও কুঠিয়ালের আবাস।।তৈরি হয় নীলচাষের ভ্যাট,কাটা হয় নীল প্রসেসিং জন্য তিনটে পুকুর। পরিত্যক্ত খেজুরি বন্দরের কাছে বালিবস্তির নীলকুঠির আশেপাশের বেশ কয়েক একর জায়গা জুড়ে নীলচাষ শুরু হয়। নীলচাষ শুরু হলেও নীল বিদ্রোহের জের আর বাজারে কৃত্রিম নীল চলে আসায় খেজুরিতে নীলচাষ বাংলার নদীয়া সহ অন্যান্য জায়গার মতো তেমন জোরদার হতে পারেনি। ১৮৬৪ সালে ভয়ংকর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ে খেজুরি বন্দর ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেজুরির নীলকুঠিও। ১৮৬৪ সালেই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ও নীলচাষে তেমন লাভ না পেয়ে নীলকররা নীলচাষের পাততাড়ি গুটিয়ে খেজুরির নীলকুঠি ছেড়ে দেশে ফিরে যান।

বর্তমানে আগাছার ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ ভগ্নস্তূপে পরিনত নীলকুঠি আজও বালিবস্তিতে খেজুরির নীলচাষের অতীতের সাক্ষী বহন করে চলেছে। খেজুরি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও ইতিহাস সংরক্ষণ সমিতির সভাপতি অসীম কুমার মান্না ও অন্যতম যুগ্ম সহ সম্পাদক সুদর্শন সেন জানান, “সমিতির পক্ষ থেকে বহুদিন ধরে হেরিটেজ কমিশন ও জেলা প্রশাসনের কাছে খেজুরির নীলকুঠি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। আজও পর্যন্ত কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।” খেজুরির স্থানীয় তরুণ আইন পড়ুয়া ও খেজুরির জোনাকি চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অন্যতম কর্মকর্তা সেক আসমত বলেন, প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ খেজুরির নীলকুঠি দেখতে আজও দূর দূরান্তের অনেক পর্যটক খেজুরি ঘুরতে এসে কৌতুহলবশত ভগ্নস্তূপে পরিণত নীলকুঠি দেখতে আসেন। খেজুরির বালিবস্তিতে নীলকুঠির মত ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে অনেক পর্যটক ই জানেনা। হেরিটেজ কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বালিবস্তির নীলকুঠি, খেজুরি তে ভারতের প্রথম ডাকঘর ও ইউরোপীয় সমাধিক্ষেত্রের অতীত ঐতিহ্যের তথ্য সম্বলিত সুদৃশ্য বোর্ড টাঙানোর ব্যবস্থা করলে খেজুরি ঘুরতে আসা পর্যটকরা যেমন খেজুরির ইতিহাস সম্পর্কে সমৃদ্ধ হবেন তেমনই খেজুরিও পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পর্যটকদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পাবে।”