যেন একটা নাটকের দৃশ্য। ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মীরাটের কারাগারে তৎপরতা। ভোর রাতে, ৫টা ৩০ মিনিটে, ফাঁসি হবে। ফাঁসুড়ে হাজির। ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। কারাগারের কর্তারা প্রস্তুত। আর সেই রাতে তৎপর আর একজন। তিনি ইন্দিরা জয়সিং। দুঁদে আইনজীবী। আবার তিনি মানবাধিকার কর্মী। ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। তিনি ছুটে এসেছেন এইচ. এল. দাত্তুর কাছে। এই দাত্তুই দিন কুড়ি বাদে হবেন ভারতের প্রধান বিচারপতি। দাত্তুর ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ইন্দিরা জয় সিং। হঠাৎ এসেছেন। কি করে এই রাতে ঘুম ভাঙাবেন দাত্তুর? সুপ্রিম কোর্টের কোন কর্মী ফোনে দাত্তুকে জানালেন ইন্দিরা জয় সিংএর আবেদনের কথা, তাঁর বাড়ির সামনে ইন্দিরার অপেক্ষার কথা। তৎপর হলেন দাত্তু। দুই বিচারকের বেঞ্চ গঠনের জন্য পাঠিয়ে দিলেন অনিল আর. দাভেকে। মধ্য রাতে বসল বিচারসভা। সফল হল ইন্দিরা জয় সিংএর চেষ্টা। রদ হল মৃত্যুদণ্ড। খবর গেল কারাগারে। ফাঁসির একটু আগে আসামি জানলেন তাঁকে আর ম্যানিলা রজ্জুর ফাঁস পরতে হচ্ছে না।
এই আসামির নাম সুরেন্দ্র কোলি। আমাদের রাজ্যের ধনঞ্জয়ের মতো সামান্য মানুষ। কিন্তু সামান্য মানুষ হলেও অসামান্য তাঁর অপরাধ। সেই অপরাধ যখন সংবাদ মাধ্যমে বেরোতে শুরু করল, তখন সেসব পড়ে ভয়ের কাঁপন ধরল মানুষের মনে। ব্যাপারটা তিলকে তাল করা কিনা, কে জানতে চায়! লোমহর্ষক বিবরণগুলি আমাদের বিচারবুদ্ধিকে গুলিয়ে দেবার মতো। সংবাদ তখন গল্প। হরর স্টোরি। যেমন এই সেদিন আর জি কর কাণ্ডে হয়েছে। নিউজ ভিউজ হয়ে যায়, রঙচঙে গপ্পে পরিণত হয় সংবাদ।
সুরেন্দ্র কোলির জীবননাট্যের গল্পটা শুরু করা যাক গোড়া থেকে।
এ বড় অদ্ভুত, নয়ডার নিঠারীতে আতঙ্কের ভূত
২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাস। শিশু নিখোঁজ হওয়ার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল নয়ডার নিঠারীতে। নয়ডার সেক্টার-৩১-এর ডি-৫ বাড়িটার পেছনে পুরসভার জলের ট্যাঙ্কে হয়তো আছে নিখোঁজ শিশুর দেহাবশেষ, তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া যায় একটা পচা হাত। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। তাদের তেমন গা নেই। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে পুলিশের বচসা হয়। পরে পুলিশ কিছু খুলি, হাড় ও দেহের অন্যান্য অংশ আবিষ্কার করে সেখান থেকে। সন্দেহ হয় ডি-৫ বাড়ির মালিক মনিন্দর সিং আর তাঁর পরিচারক সুরেন্দ্র কোলির উপর। সুরেন্দ্রও নাকি অপরাধ স্বীকার করে নেন। পলিগ্রাফ পরীক্ষা শুরু হবার আগেই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় সুরেন্দ্র কোলির স্বীকারোক্তি। তিনি নাকি নরমাংস ভক্ষণ করতেন। তিনি নাকি আরও বলেন যে শ্বাসরোধ করে তিনি শিকারদের হত্যা করতেন, তারপর ধর্ষণ করতেন, তারপর শৌচাগারে নিয়ে গিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতেন। মালিক মনীন্দর ও পরিচারক সুরেন্দ্রকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
অপরাধ ঘাটে-বাটে, পুলিশ নামল, মাঠে মিডিয়ায় ফলাও করে ছাপা হচ্ছে খবর। মানুষের মধ্যে ছড়াচ্ছে উত্তেজনা। চাপের নাম বাপ। অতএব পুলিশ নামল মাঠে। তদন্তে। মালিক আর ভৃত্যকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল। মনীন্দরের চণ্ডীগড়ের বাড়িতে চলে গেল পুলিশ। ১৭টি লাশের মধ্যে ১৫ জনকে সনাক্ত করা হল। ১০টি মেয়ে। পুলিশের সন্দেহ এসব খুনের পেছনে আছে অঙ্গ ব্যবসা আর নরমাংসভক্ষণ। তার মানে যে সব শিশুও কিশোর-কিশোরীকে খুন করা হত, তাদের মাংস খেতেন মনীন্দর আর সুরেন্দ্র! সংবাদ পড়লে গা শিরশির করে। তাহলে এখনও আছে ক্যানিবালিজম? ব্রেন ম্যাপিং হল, পলিগ্রাফ পরীক্ষা হল, নারকো টেস্ট হল।
পুলিশ বলল, ‘বাড়ি যাই’, মাঠে নামল সিবিআই ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অভিযুক্তদের সিবিআই সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হল। তদন্তকারীরা বাড়ির বাইরের ড্রেনগুলিতে তল্লাশি চালিয়ে তিনটি খুলি, পা, হাড় ও ধড়সহ বেশ কয়েকটি শরীরের অংশ খুঁজে পায়। পুলিশের তদন্তের সমালোচনা করে সিবিআই। জানায় যে অভিযুক্তদের অবৈধ অঙ্গব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার সম্ভাবনা কম ; সুরেন্দ্র একজন মনোরোগী যাকে হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য ব্যবহার করা হত, খুনের সঙ্গে মনীন্দরের কোন ভূমিকা থাকতে পারে।
২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গাজিয়াবাদের বিশেষ দায়রা আদালত রিম্পা হালদার হত্যার অভিযোগে মনীন্দর ও সুরেন্দ্রকে দোষী সাব্যস্ত করে, ১৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে ২০০৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর এলাহবাদ হাইকোর্ট মনীন্দরকে খালাস দেয়। এরপর বারবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় সুরেন্দ্র কোলিকে। সে বড় রোমাঞ্চকর কিসসা। শুনুন তাহলে —
প্রথম মৃত্যুদণ্ড : ২০০৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেওয়া হয় প্রথম মৃত্যুদণ্ড।
দ্বিতীয় মৃত্যুদণ্ড : ৭ বছর বয়েসী আরতি প্রসাদ হত্যার (২০০৬ সালের ২৫ অক্টোবর) জন্য ২০১০ সালের ৪ মে সুরেন্দ্র কোলিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল।
তৃতীয় মৃত্যুদণ্ড : ৯ বছর বয়েসী রচনা লাল হত্যার (২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল) জন্য ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সুরেন্দ্র কোলিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল।
চতুর্থ মৃত্যুদণ্ড : ১২ বছর বয়েসী দীপালি সরকার হত্যার (২০০৬ সালের জুন মাসে) ২০১০ সালের ২২ ডিসেম্বর সুরেন্দ্র কোলিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
পঞ্চম মৃত্যুদণ্ড : ৫ বছর বয়েসী কবিতাকে হত্যার (২০০৫ সালের জুন মাসে) ২০১২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় সুরেন্দ্রকে।
২০১৪ সালের জুলাই মাসে ভারতের রাষ্ট্রপতি সুরেন্দ্র কোলির করুণার আবেদন খারিজ করে দেন, ওই সালের ৩ সেপ্টেম্বর আদালত নিঠারী মামলায় কোলির মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে। গাজিয়াবাদের দাসনা কারাগারে ফাঁসির ব্যবস্থা না থাকায় ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কোলিকে মীরাট কারাগারে নিয়ে আসা হয়। সেখানে কিভাবে ফাঁসি রদ হয়, সেকথা আমরা এই রচনার শুরুতে উল্লেখ করেছি।
তারপর — এইভাবে কেটে গেল আঠারো বছর একবার মৃত্যুদণ্ড হয়, আবার তা রদ হয়ে যায়। গোটা ব্যাপারটা ভাবুন তো একবার! বেঁচে যাচ্ছে একটা মানুষ, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে ভোগ করে যাচ্ছে মৃত্যু যন্ত্রণা। দৈহিক মৃত্যুর চেয়ে এই প্রতি মুহূর্তের মানসিক মৃত্যু কি সাংঘাতিক! এর মধ্যে বাইরের পৃথিবীতে ঘটে যাচ্ছে কত কিছু। গরিব ঘরের ছেলে সুরেন্দ্র। বিয়ে করেছিলেন। ছেলেও হয়েছিল। গ্রেপ্তার হবার আগে বউকে বলে এসেছিলেন, ‘তুমি তোমার মতো করে বাঁচো’। বউ আবার বিয়ে করে সংসার পেতেছে। ছেলে কোথায় কে জানে! মা ছিল, এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে তার। দৈবাৎ যদি বেঁচে যান সুরেন্দ্র, তাহলে জেল থেকে বেরিয়ে যাবেন কোথায়? কার কাছে যাবেন?
২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় এবং বিচারপতি পিকে এস বাঘেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ সুরেন্দ্র কোলির মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিণত করেন। কিন্তু ২০১৯ সালে দশম দোষী সাব্যস্ত করে কোলিকে আবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর এলাহবাদ হাইকোর্ট অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি ব্যতীত অন্যান্য বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের অভাবে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়।
অবশেষে মুক্তি, কিন্তু ‘মুক্তি কোথায় পাবি, মুক্তি কোথায় আছে?’
২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর। প্রধান বিচারপতি বি.আর.গাওয়াই, বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি বিক্রমনাথের বেঞ্চ রায় দিলেন : কোলির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয় নি। কেবল তাঁর দেওয়া স্বীকারোক্তি, রান্নাঘর থেকে উদ্ধার করা একখানা ছুরির উপর ভিত্তি করে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক হয় নি। কোলিকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হোক। [‘Suspicion, however grave, cannot replace proof beyond reasonable doubt. Courts cannot prefer expediency over legality . The presumption of innocence endures until guilt is proved through admissible and reliable evidence, and when the proof fails the only lawful outcome is to set aside the conviction even in a case involving horrific crimes.’]
সুপ্রিম কোর্ট বলছেন প্রমাণের অভাবের কথা। তাহলে এত তদন্ত, এত হাড়গোড়, ধর্ষণ আর নরমাংস ভক্ষণের এত জমাট প্রচার, অন্য আদালতের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা, মিডিয়ার রগরগে গল্প, — এসবের কি হবে? সুপ্রিম কোর্টের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে এঁদের তো ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। সুরেন্দ্রের জীবনের এই আঠারোটা বছর কে দেবে ফেরৎ? কে কিভাবে জোড়া লাগাবে তাঁর ভাঙা সংসার? চারপাশের মানুষের ঘৃণা আর সন্দেহ থেকে কে তাঁকে করবে উদ্ধার? আদালত তাঁকে মুক্ত করল, কিন্তু জীবন তাঁকে মুক্ত করবে কিভাবে?