শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৪১
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সলিলে অবগাহন : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী / ৭৯৪ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫

“যখন অসহ্য হয়

শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে

মনে হয় এইবার ফেটে যাবে দম

তখন আমার হয়ে শ্বাস ফেলে আমার কলম।”

(যখন অসহ্য হয়)

আমাদের প্রত্যেকের প্রাত্যহিক জীবনে এরকম মুহূর্ত বারেবারে আসে, কিন্তু কই? আমরা সকলেই কি এভাবে বলতে পারি? বা আমাদের কলম এভাবে তরতরে ঝরঝরে ভাষায় মনের এই অসহ্য গুমরে ওঠা ভাব প্রকাশের পথ করে নিতে পারে? তিনি পারতেন। পারতেন বলেই তিনি অবলীলায় এটাও লিখতে পারেন —

“আমার সময় নেই

আজগুবি গল্প ফেঁদে

সিম্বলিক কবিত্ব সাধার

অতএব ব্রাদার

আমাকে মার্জনা কোরো

আমি কোনো কবি নই তোমাদের দলে।”

(আমি কবি নই)

নিজেদের জীবনের আশপাশ যখন দুর্বিষহ ঠেকে তখন কেউ সৃষ্টি করেন, কেউ নিজেকে সমর্পণ করেন কবিতা বা সঙ্গীতের কাছে। তিনি তাঁর অসহ্য সময়ে নিজেকে কবিতার কাছে সমর্পণ করেছেন। কবিতা তাঁকে পরম মমতায় আশ্রয় দিয়েছে। যদিও তিনি ভাবতেন তাঁর লেখা কবিতাগুলি সত্যিই কবিতা হয়ে উঠেছে কিনা। কারণ তাঁর লেখা কবিতা বড় সোজাসুজি কথা বলে, বড় সোজাসাপ্টা তার চলন। ঠিক এইখানেই আমরা অর্থাৎ পাঠকেরা তাঁর কবিতার মধ্যে আশ্রয় পেয়ে যাই। প্রেম, হতাশা, জীবনের ব্যর্থতা, যন্ত্রণা যেমন ধরা পড়ে তেমনই কঠিন বাস্তব উঠে আসে তাঁর কবিতায়।

“যে কবি বাস্তববাদী নন, তিনি মৃত। আর যে কবি শুধুই বাস্তববাদী, তিনিও ততধিক মৃত।” — পাবলো নেরুদা

ঠিক এই কারণেই সলিল চৌধুরীর কবিতা আমাদের টানে, মুগ্ধ করে, আমরা আশ্রয় খুঁজে পাই কবিতার ভিতর।

“আজও হেনে যায়, আজও মনে কেঁদে যায়

অপূর্ণ একটি আশা — আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”

মহাকাব্যের দলিলে তাঁর অনন্য লেখনী। আধুনিক কবিতা বলে বোঝার কোনো কষ্ট নেই। আপামর জনগণ এই সহজ সত্যটুকু আহরণ করতে পারেন। অথবা যেখানে তিনি লিখেছেন —

“আজও যারা কাজ করে, তারা ঢেলে গেছে

কে তার হিসেব রাখে! সম্পদের পাহাড়ের

আড়াল তৈরি হয়ে যুগ থেকে যুগান্তরে

বণিকের রাজদন্ড — হাত থেকে হস্তান্তরে

হওয়ার পিছনে সেই-ই-শ্রমজীবী মানুষের হাত।”

১৯৮২ সালে তাঁর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বাঁকে দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছেন এই কবিতা।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার রাজপুর সোনারপুর অঞ্চলের গাজীপুরে তাঁর জন্ম ১৯২৫ সালের ২৫শে নভেম্বর। কায়স্থ পরিবার। পিতা জ্ঞানেন্দ্রময় চৌধুরী অসমের লতাবাড়ি চা বাগানের ডাক্তার ছিলেন। সঙ্গীত ছিল পরিবারে জড়িয়ে। পিতার কাছেই তাঁর সঙ্গীতজীবনের হাতেখড়ি। জ্যেঠতুতো দাদা নিখিল চৌধুরীর কাছেও সঙ্গীতের তালিম নেন। মূলত নিখিল চৌধুরীর ঐক্যবাদন দল ‘মিলন পরিষদ’-এর মাধ্যমেই তাঁর সঙ্গীতের পথে যাত্রা শুরু।

তাঁর শৈশবের বেশি সময় কেটেছে অসমে। তারপর মামাবাড়ি সুভাষগ্রামে (কোদালিয়া) থেকে পড়াশোনা করেন। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। পড়াশোনায় যথেষ্ট মেধাবী ছাত্র ছিলেন। হরিনাভি বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন ও আইএসসি পাশ করেন। এরপরে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন।

১৯৪৪ সালে যখন তিনি কলেজে ভর্তি হন তখন থেকেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক দল ভারতীয় গণনাট্যসংঘ বা আইপিটিএ-তে যোগ দেন। এই সময় থেকে তিনি গণসংগীত লিখতে এবং সুর দিতে শুরু করেন। আইপিটিএ তখন শহর, গ্রাম, গঞ্জ, শহরতলিতে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছাকাছি যেত আর তার ফলে নানা মানুষের কাছে তিনি পৌঁছতে পেরেছিলেন সহজে। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’র মত সুর তৈরি করে আপামর বাঙালিকে মুগ্ধ করেছিলেন। রানার, অবাক পৃথিবী, বিচারপতি এই সবে সুর দিয়ে একটা নতুন ধারার জন্ম দিলেন সলিল চৌধুরী সেই অল্প বয়সেই।

এরপর তিনি চলচ্চিত্র জগতে পা রাখলেন। ১৯৪৯ সালে বাংলা চলচ্চিত্র ‘পরিবর্তন’ মুক্তি পায়। তাঁর সুরারোপিত ৪১টি বাংলা চলচ্চিত্রের মধ্যে সর্বশেষটি মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে (মহাভারতী)। ১৯৫৩ সালে ‘দো বিঘা জমিন’ ছবি দিয়ে তিনি মুম্বইয়ের জমিতে পদার্পণ করলেন। সলিল চৌধুরীর ছোটগল্প ‘রিক্সাওয়ালা’ অবলম্বনে এই সিনেমা তৈরি হয়। এই চলচ্চিত্রটি তাঁর জীবনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে যখন এটি ফিল্ম ফেয়ার সেরা অ্যাওয়ার্ড পেল, একই সঙ্গে কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। যিনি মাত্র কুড়ি বছর বয়সে ‘গাঁয়ের বধূ’ লিখে তাতে সুরারোপ করে একটি নতুন ধারার জন্ম দিতে পারেন তাঁর তো এই পুরস্কার পাওয়ারই কথা।

বাবার অকালমৃত্যুতে আট ভাই বোনকে নিয়ে যখন তিনি হাল ভাঙা নৌকোর মত টালমাটাল, তখন তিনি সঙ্গীতকে বেছে নিলেন জীবিকার জন্য। বিধবা মা আর নাবালক ভাই বোনদের নিয়ে যখন উপোস করে দিন কাটছে, তখনই হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের মারফত বিমল রায়ের সঙ্গে পরিচয় হল। এরমধ্যে সলিল অনেক কবিতা, গান, নাটক, গল্প লিখে ফেলেছেন। তাঁর ‘রিক্সাওয়ালা’ গল্পটি বিমল রায়ের মনে ধরল। যাওয়ার ভাড়া সমেত মুম্বই (বোম্বাই) থেকে টেলিগ্রাম এল। হৃষীকেশের কথায় এই ছবির সুরকার অনিল বিশ্বাসের বদলে হলেন সলিল চৌধুরী। ইতিহাস এভাবেই হয়ত তৈরি হয় এবং সেটাই হল। নামডাক বাড়তে লাগল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও লতা মঙ্গেশকরকে বরাবরের মতো সাথে পেলেন। ১৯৫৩ সালে রাজ কাপুর ‘একদিন রাত্রে’ ছবিটিকে হিন্দিতে ‘জাগতে রহো’ নামে তৈরি করলেন। সুর করলেন সলিল চৌধুরী। সেই গান মানুষের মনে স্থান করে নিল।

ছবি ‘মধুমতী’। মধুমতী ছবি দেখে সর্বভারতীয় ডিস্ট্রিবিউটাররা বললেন, “ছবি খুব ভালো। কিন্তু গান দুর্বল, লোকে নেবে না।” তাঁরা নৌশাদকে সুরকার হিসেবে চাইলেন। এর জন্য বাড়তি টাকাও দিতে চাইলেন। কিন্তু বিমল রায় অনড়। তিনি বললেন, “ছবি নিতে হয় নিন। ওই মিউজিকই থাকবে।” মধুমতী ছবির ‘আজা রে পরদেশি’ গানটা তারপর ইতিহাস গড়েছে। বিনাকা হিট প্যারেডে মধুমতীর সাতটি গানই সেরা নির্বাচিত হয়ে পরপর বেজেছে। এই জিনিস আগে কখনও ঘটেনি। বম্বেতে নিজের স্থান পাকা করে নিলেন সলিল চৌধুরী। তাঁর নিজের কথায়, “আমি পুরোপুরি অন্য পথে হেঁটেছিলাম। আর তা মানুষ নিয়েছেন।”

“পাম্পটা থামলে বুঝলুম, পাম্পটা চলছিলো।

কথাটা থামলে বুঝলুম, লোকটা বলছিলো।

আলোটা নিভলে বুঝলুম, আলোটা জ্বলছিলো।

ভালোবেসে শেষে বুঝলুম, কতো তার মাঝে ছল ছিলো।

রাজনীতি ছেড়ে বুঝলুম,কতো তার মাঝে খল ছিলো।

যৌবন শেষে বুঝলুম, কতখানি তার বল ছিলো।

নেশা শেষ হলে বুঝলুম, পা দুটো আমার টলছিলো।

বক্তৃতা শেষে বুঝলুম, কতখানি তাতে গুল ছিলো।

টাকমাথা হয়ে বুঝলুম, একদিন তাতে চুল ছিলো।

আর, জীবন থামলে বুঝলুম

জীবনটা বেশ চলছিলো।

সংযোজন :

দু দুটো ইনজেকশন নেবার পর বুঝলুম,

দুটোতেই শুধু জল ছিল… “

(বোঝার ছড়া)

বাঁধাধরা ছকবাঁধা গোলকধাঁধা থেকে তিনি একগুচ্ছ চাবি দিয়ে খুলে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। অথবা বলা যায় তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি ফটকের দরজার তালা খুলে দিয়েছিলেন। ছড়ার মাধ্যমে অনেক জটিল কথা অনায়াসে লিখতে পারেন একমাত্র সলিল চৌধুরী।

কবিতার মতো সুর ও ছন্দ নিয়ে করেছিলেন নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বিশেষ করে পাশ্চাত্য সিম্ফনি নিয়ে। তাঁর নিজের কথায়, “সুরসৃষ্টির কোনও বাঁধাধরা কায়দা নেই। সুরকারের নিজস্ব অনুভূতি এবং শ্রোতাদের অনুভূতির মান — এই দুটোই নির্ধারণ করবে সুর কী হবে।” তাঁর আগে ভারতীয় সঙ্গীতে ‘হারমনি’ বা বহুস্বর কেউ প্রয়োগ করেননি। আর সবথেকে আশ্চর্য ব্যাপার হল তাঁর কোনও নির্দিষ্ট ঘরানা বা গুরু ছিল না। তিনি বলেছেন,” আমার গুরু বলতে রেকর্ড, রেডিও, পরবর্তী কালে টেপ, টেলিভিশন, অনুষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সঙ্গীত এসব যা শুনেছি সে সবই আমার গুরু।”

তাঁর কন্যা অন্তরা চৌধুরী বলেছেন একটি সাক্ষাৎকারে যে সলিল চৌধুরী মজা করে বলতেন — তাঁর মধ্যেই মোজার্টের পুনর্জন্ম হয়েছে। ১৯৬১ সালের ছায়া সিনেমার গান ‘ইতনা না মুঝসে তু পেয়ার বড়া’ মোজার্টের ১৭৮৮ সালে সৃষ্ট চল্লিশ নম্বর সিম্ফনি থেকে গ্রহণ করা। তিনি নিজে নানান বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন বলে যন্ত্রশিল্পীদের কদর খুব ভালো করে বুঝতে পারতেন। বাখ, মোজার্ট, বিঠোফেন এঁদের অনুসরণ করে তিনি অনেক সুর সৃষ্টি করেছেন। একজন গিটারবাদকের সম্বন্ধে তাঁর ভবিষ্যৎবাণী ছিল ‘এ একদিন ভারতের সেরা কম্পোজার হবে।’ তাঁর অর্কেস্ট্রায় ছিলেন এই গিটারবাদক। তাঁর নাম ইল্লিয়ারাজা। এ আর রহমানের বাবা আর কে শেখর ছিলেন সলিল চৌধুরীর মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টের তত্ত্বাবধানে। রাজ কাপুরের কথায়, “সলিলদা যে কোনো ইনস্ট্রুমেন্টে হাত দিলেই সেটা যেন অপূর্বভাবে বেজে ওঠে।” জয়কিষনজি ও অন্য অনেকে তাঁকে বলতেন, ‘জিনিয়াস’। পিয়ানো, পিক্কালো (কাঠের তৈরি ছোট বাঁশি), তবলা, সরোদ সমস্তই তিনি বাজাতে পারতেন। লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “সলিল চৌধুরীর গান স্বয়ংদীপ্ত। তিনি ছাড়া কে অমন করে ‘দো বিঘা জমিন’ কে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারতেন।”

দুঃখের গানে তিনি হারমোনাইজেশন আর কর্ড প্রয়োগে যে অসাধারণ সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন তা আর কোনো সুরকার করতে সক্ষম হননি। তাঁর গানে প্রিলিউড আর ইন্টারলুডে যেসব কম্পোজিশন তিনি দেখিয়ে গেছেন তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সম্পদ। তাঁকে ‘সঙ্গীত জীবনের ঈশ্বর’ বলতেন ভি বালসারা। বালসারা লিখেছেন কিভাবে সলিল ট্যুরে গিয়ে অসামান্য সব সৃষ্টি করতেন। কিভাবে ইনরেকো কোম্পানিতে বসে লিখে ফেললেন ‘এই রোকো, পৃথিবীর গাড়িটা থামাও’ এর মতো গান। বালসারার মতে খ্রিস্ট, মহম্মদ, জরথুস্ট্র যেমন ধর্ম প্রবর্তক, সলিল চৌধুরী তেমন ‘সঙ্গীত প্রবর্তক’।

ছবির জন্য কম্পোজ করেছেন তেরোটি ভাষায়। তার মধ্যে হিন্দিতে পঁচাত্তরটি, বাংলায় একচল্লিশটি, মালয়ালামে সাতাশটি। এছাড়া মারাঠি, তামিল, তেলেগু, কন্নড়, গুজরাটি, অসমিয়া ও ওড়িয়া ভাষার ছবি। শ্যামল মিত্রকে দিয়ে গাওয়ালেন ‘ছিপ খান তিন দাঁড়’। অনুজদের বলতেন, “বটের চারা পুঁতবি, কিন্তু আগাছার জন্ম দিবি না।” তাঁর লেখা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তিনি পুরোপুরি সঙ্গীতে মনোনিবেশ করার পর প্রখ্যাত সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “বাংলা সাহিত্য একজন গল্পকারকে হারাল”।

যখনই দিশেহারা বোধ করেছেন, সৃষ্টি করেছেন একের পর এক কবিতা অথবা সঙ্গীতের।

“আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে

আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা”

এ লাইন সলিল চৌধুরী ছাড়া আর কেই বা লিখতে পারেন! জীবনে অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন। অজস্র অ্যাওয়ার্ড।

লতা মঙ্গেশকর বলেছেন, “সলিল দূরের নাম না জানা গ্রামে কাটিয়েছেন প্রাচীন সঙ্গীতের খোঁজে। একটা গানের সুর রচনার জন্য দিনের পর দিন না খেয়ে না ঘুমিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন নানারকম। শেষে নিজে ভেবে ঠিক করতেন কোন সুরটা রাখবেন। আমি সলিল চৌধুরীর মতো সুরকার আগে দেখিনি।”

কেউ দেখেছেন কী? বোধকরি না। তবে সবথেকে যে কথাটা ওঁর সম্বন্ধে একেবারে পারফেক্ট, সেটি সলিলের মৃত্যুর (৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৫) পর নৌশাদ সাহেবের কথা।

জল ভরা চোখ নিয়ে নৌশাদ বলেছিলেন সলিল চৌধুরী সম্বন্ধে — ‘one of seven notes of music had been lost!’

এরপর, প্রবাদ প্রতিম সেই ব্যক্তি সম্বন্ধে আর একটি শব্দও বলা বাহুল্য মাত্র।


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “সলিলে অবগাহন : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী”

  1. Apurbakumar.chattopadhyay@visva-bharati.ac.in says:

    Loved the story

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন