রাণীর পূজা
অন্তত ১২৫ বছর আগের কথা। ধনে জনে মানে খ্যাতির শিখরে তখন হংসেশ্বর। একদিন বৌদি রাণীদেবী দেবরকে ডেকে বললেন, ‘হংস,তোর সব আশা পূর্ণ হয়েছে ,কিন্ত আমি কি পেলাম? সারা জীবন গেল তোর প্রতিষ্ঠার জন্য। এবার আমার ইচ্ছা পূর্ণ কর বাবা।’কথাটা মিথ্যা নয়। হংস যখন তিন বছরের তখনই তার বাবা কেনারাম দত্ত আর দাদা মারা গেল। মহামারী কলেরায় তখন গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। আগেই মারা গেছে তার মা। নাবালক সন্তানকে কে দেখবে, তাই কেনারাম দত্ত বড়ো ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। চৈতন্যপুর রায় বাড়ির কিশোরী মেয়ে রাণী এলেন বৌ হয়ে দত্ত বাড়িতে। কোলে তুলে নিলেন হংসকে। তাকেই মা বলে জানে হংস। এবার স্বামী হারিয়ে অনাথা হলেন রাণীও। ইচ্ছে করলেই বাপের বাড়ি ফিরে যেতে পারতেন, কিন্ত যাবেন কি করে! কে দেখবে তার হংসকে! নিজের সব চাওয়া পাওয়া ভুলে হংসকেই আপন সন্তানের মত লালন পালন করতে থেকে গেলেন দুর্গাগ্রামে। সামান্য জমি, সব বছর ফসল ফলে না। বড়ই দুঃখ কষ্টে কাটে দিন দুজনের। তার মধ্যেই হংসের দিদি জামাইবাবু হাজির। তারাই সংসারের দখল নিল। কুটিল ষড়যন্ত্র। রাণীকে ঘর ছাড়া করতে চায় তারা। হংস যেন বাড়ির চাকর। মাঠে গরু চরায়। মাঠের কাজ করে। আধপেটা খায় দুজন।
সব যন্ত্রনা সহ্য করেন রাণী, তবু হংসকে ত্যাগ করেননি। তাহলে ছেলেটা যে ভেসে যাবে। হংসের বাল্যবন্ধু কালীপ্রসন্ন (প্রখ্যাত ঐতিহাসিক) বন্দোপাধ্যায়। তারা একসাথে পড়ত পণ্ডিতদের পাঠশালায়। দুজনেই মেধাবী। কিন্তু হংসের পড়া হল না। কালীপ্রসন্ন গ্রামের পড়া শেষে শহরে গেল পড়তে। ছুটিতে বাড়ি এলে বন্ধুর খোঁজ নিতেন। হংসের দুর্দশার কথা শুনলেন কালীপ্রসন্নের বাবা। তিনি ছিলেন গ্রামের গন্যমান্য। গ্রামের মানুষও ছিল হংসের পিছনে। তাদের সাহায্যে একদিন হংসের দিদি গ্রাম ছাড়ল। হংসের সংসারের হাল ধরলেন বৌদি রাণী। খুব বুদ্ধিমতী রাণী। হংসকে শেখালেন কি করে তেজারতি কারবারে বিষয় বৃদ্ধি করতে হয়। তখন ব্যাঙ্ক ছিল না। দুটো টাকা থাকলেই মানুষ সুদের কারবার করত। কিন্তু হংসের পুঁজি নেই। কেলে আউশ তার কপাল খুলে দিল। হংসের চাষ দেখাশোনা করে গ্রামের গোলাম হাজরা (হাড়ি), খুব বিশ্বাসী আর সৎ মানুষ। তার কথামত হংস একবার সব জমিতে কালো আউশ ধান বুনে দিল বৈশাখ মাসে। অকাল বৃষ্টিতে আশ্চর্য ফলন হল সেবার। ধানে ভরে গেল গোলা। তার পরেই অনাবৃষ্টি। পর পর দু-বছর ফসল নাই মাঠে। দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া নামল এলাকায়। অন্নের হাহাকার। দলে দলে লোক এল হংসের বাড়ি ধান বারি (ধার) নিতে। বছরে দ্বিগুণ, দু বছরে চার গুণ হল ধান। কারো সর্বনাশ, কারো পৌষ মাস। এক ধাক্কায় হংস উঠলো আকাশে। আর তাকে কেউ ছুঁতে পারেনি। যেন মা লক্ষী ঘরে বাঁধা । কারো জমি পুকুর বাগান নিলাম হলেই হাজির হংস। এলাকার বাবুদের জুয়ো খেলার আসরে হংস বসে থাকে টাকার থলি আর হ্যান্ড নোটের খাতাখানা নিয়ে। সই কর টাকা নাও, স্ফূর্তি কর। ঘরে বৌদি, বাইরে হংস। এভাবেই লক্ষীর দুই সার্থক সাধকের সাধনায় দুর্গাগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হল দত্ত বংশ। মান মর্যাদা শিক্ষা দীক্ষা নানান অবদানে দত্তরা আজো দুর্গাগ্রামে সবার আগে।
হংসের পাঁচ ছেলে, দুই মেয়ে। নাতি পুতিতে ভরা সংসার। এদিকে রাণী দেবীর বয়স হয়েছে। ধর্মে কর্মে মন দিয়েছেন, কিন্ত মনে শান্তি নাই। জীবনের হিসাব নিকাশের খাতা যেন শূন্য। এত দিন কি তিনি জলের দাগ কেটে গেলেন, যার কোন চিহ্ন থাকবে না! অনেক ভেবে তাই আজ দেবর হংসকে ডেকেছেন।
‘হংস, আমার সাধ পূর্ণ কর বাবা। মৃত্যুর পরেও আমাকে যেন কেউ না ভোলে।’ ‘বল মা, কি তোমার সাধ ইচ্ছা, আকাঙ্খা? তোমাকে না দেওয়ার কিছুই নেই। আমি মা’কে দেখি নাই, বাবা’কেও না। তুমিই আমার সব। আজ যা করেছি, যা পেয়েছি সব তোমার জন্যই। তুমিই আমার জননী জগদ্ধাত্রী। বেশ, আমি জগদ্ধাত্রী হয়েই থাকতে চাই আজীবন এই বাড়িতে, এই গ্রামে। তুই আমার নামে জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজন কর। আমার মৃত্যুর পরেও যেন সেই পূজা বন্ধ না হয়। আমার আর একটা ইচ্ছা তোকে পূর্ণ করতে হবে। শুদ্ধ পানীয় জলের জন্য একদিন আমরা সব হারিয়েছিলাম। এমন সর্বনাশ যেন আর কারো না হয় এ গ্রামে। গ্রামের মানুষের জন্য একটা পুষ্করণী প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ‘হংস বলে,’ বেশ তাই হবে মা’।

ইংরেজি ১৯০০ সাল। পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া থানার দুর্গাগ্রামের দত্ত বাড়িতে শুরু হল রাণীর জগদ্ধাত্রী পূজা। পনের বিঘা জমি, দুটো পুকুর দেবোত্তর হিসাব লিখে দিলেন হংস। দত্ত ভিটার জমিও দেবোত্তর করে দিলেন দেবী জগদ্ধাত্রীর নামে। ভিটা বিক্রির অধিকার রইল না কারো। হংসেশ্বর আগেই গৃহে নারায়ণ শিলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জগদ্ধাত্রীকে গৃহ দেবীর আসন দিতে নারায়ণ শিলার নিত্য সেবার ভার দিলেন গ্রামের মিত্রদের। এজন্য তাদের একটি পুকুরের কিছুটা অংশ ছেড়ে দিলেন। এভাবেই দেবী জগদ্ধাত্রী হলেন দত্তদের আরাধ্যা দেবী। দেবোত্তর সম্পত্তির আয়ে আজো চলছে তার পূজা ও ভোজ। এক সময়ে এলাকার নিমন্ত্রণ থাকত ভোজে।এখন সেই রমরমা নেই। আগে ‘কাঙালী ভোজনে’ দীন দরিদ্র মানুষেরা আসত দলে দলে। এখন কাঙালীর দেখা মেলে না। পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুই।
দুর্গাগ্রামের দত্ত বাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার নানা বৈশিষ্ট্য। দুই দিনে সমাপ্ত হয় সপ্তমী অষ্টমী নবমী ও দশমীর পূজা। পূজা হয় বৈষ্ণব মতে। কোন বলির আয়োজন নেই। হয় কুমারী পূজা। ষাট কেজি আতপ চালের নৈবেদ্যের বাটা পাঠানো হত আশপাশের ব্রাহ্মণ বাড়িতে। পাঁচ পুরুষ ধরে এ পূজায় ঢোল সানাই বাজায়, মূর্তি গড়ে একই পরিবারের সদস্যরা। পূজারী নাপিত এক বংশের।
সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গ্রামের মানুষও যোগ দেন পূজার আয়োজন অনুষ্ঠানে। যেন সর্বজনীন উৎসব। এক সময়ে ভোজের বিপুল আয়োজন, রন্ধন, বিতরন সবই করতেন গ্রামের মানুষ। তাই পূজা এলে সাড়া পড়ে যেত গ্রামে। যাত্রা পালা, কৃষ্ণ যাত্রা হত। এখন ছোট খাটো অনুষ্ঠানে দায় সারা ভাব। ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে দত্ত বাড়ি। পরিবার পরিকল্পনা, জীবিকার তাড়া, অনেকেই পাড়ি দিয়েছেন অন্যত্র। তবুও পূজা চলছে। দত্ত বাড়ির সদস্যদের বিশ্বাস আপদে বিপদে দেবীই তাদের রক্ষক। অনেক অলৌকিকতার সাক্ষী আমরা।

হংসেশ্বর দত্তের একমাত্র জীবিত নাতবৌ ভারতী দত্ত।
এক সময়ে মাটির মন্দিরে পূজা হত দেবীর। এখন তা সুরম্য পাকা। সৌজন্যে ৺দুর্গাপদ দত্তের নাতজামাই অর্ধেন্দু মণ্ডল। পূজা প্রাঙ্গনে প্রবেশ পথের পাকা সিংহ দুয়ার এক সময়ে ভেঙে পড়লে তার সম্মুখে ‘হংসেশ্বর স্মৃতি তোরণ’ তৈরি করে দিয়েছেন ৺দুর্গাপদ দত্তের নাতি চন্দ্র শেখর দত্ত। পূজার সময় পুনঃমিলনের আনন্দে মেতে ওঠে দত্ত পরিবার ও তাদের আত্মীয় স্বজন। দু-দিন একত্রে খাওয়া-দাওয়া, সুখ দুঃখের গল্প, পূজার পর দিন শোভাযাত্রা করে দেবীর বিসর্জন। ভাসানের শেষে বিদায়ের বিষন্ন ‘দিগম্বরী গান’ —
“ও মা দিগম্বরী,
নাচো গো শ্যামা, রণ মাঝে।”
“ও মা এবারও এসেছ ভবে,
আবারও আসিতে হবে,
মা গো মা —
মা কে কৈলাশে পাঠায়ে দিয়ে,
কেমন করে রব ঘরে,
মা গো মা —”
সময়ের নানা ওঠা-পরা পেরিয়ে আজো অটুট পারিবারিক বন্ধন, চলমান ঐতিহ্যে সময় স্থির এখনও এখানে। কিন্ত আর কতদিন!
এবার পুজোর ১২৫ বছর। রাণীদেবী নেই , কিন্তু তিনি আছেন তাঁর পূজাতে। দেবী জগদ্ধাত্রী রূপে।গ্রামের মানুষও ভোলেনি তাকে। গ্রামের স্কুলের পাশে তার প্রতিষ্ঠিত রাণী দীঘির টলমল জলে এখনও জ্বলজ্বল করে এক মহিয়সী নারীর আত্মত্যাগের স্মৃতি।
লেখক সুব্রত দত্ত, দুর্গাগ্রাম দত্ত পরিবারের সদস্য।
আমি লেখক কিন্তু সম্পাদকের উপস্থাপনায় লেখাটি অন্য মাত্রা পেয়েছে। এজন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।