সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় বৈজ্ঞানিকের তৈরি মগজ ধোলাইয়ের যন্তর মন্তর কক্ষের কথা মনে আছে? যেখানে রাজা নির্দেশে বিদ্রোহীদের মগজ ধোলাই চলত। তবে এ ভয় দিল্লির যন্তর মন্তরে নেই। বরং জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় জয় সিং এর আন্তরিক প্রচেষ্টার এক অসাধারণ নিদর্শন। পার্লামেন্ট স্ট্রিটে অবস্থিত নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর হল জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশীয় বস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এক বিস্ময়কর মানমন্দির। এটি খালি চোখে ব্যবহারের জন্য নির্মিত, পাথরের তৈরি ১৯টি জ্যোতির্বিজ্ঞান যন্ত্রের একটি সংগ্রহ এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
মহারাজা দ্বিতীয় সওয়াই জয় সিং ১৭২৪ সালে এটি নির্মাণ করেন। যদিও মানমন্দিরের একটি ফলকে ভুলবশত ১৯১০ সাল লেখা আছে কিন্তু বিভিন্ন ইতিহাস বলে ১৭২৪ সালে এই মানমন্দির তৈরি হয়।দিল্লির যন্তর মন্তরটি ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ফলে যথেষ্ট ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পড়ে।
রাজস্থানে জন্মগ্রহণকারি জয় সিং ছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রেমিক, যিনি সমাজের যাবতীয় অন্ধবিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন। তার পিতা মির্জা রাজা বিষণ সিংহের অকাল মৃত্যুর পর মাত্র এগারো বছর বয়সেই তিনি আম্বরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। জয় সিং এর শিক্ষার এমন এক যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেখানে জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। তাঁর জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণগুলি অসাধারণভাবে নির্ভুল ছিল। তিনি “জিজ-ই-মুহাম্মদশাহী” নামে একটি টেবিল তৈরি করেছিলেন, যাতে লোকেরা জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তিনি ইউক্লিডের “জ্যামিতির উপাদান”, ত্রিকোণমিতির উপর বেশ কয়েকটি রচনা এবং লগারিদমের নির্মাণ ও ব্যবহার সম্পর্কে নেপিয়ারের (Napier’s work) কাজ সংস্কৃতে অনুবাদ করেছিলেন।
এই মানমন্দিরগুলি নির্মাণের পিছনে উদ্দেশ্য ছিল জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা এবং সৌরজগতের গ্রহ, চাঁদ, সূর্য ইত্যাদির গতিবিধি সম্পর্কে সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা। “যন্তর মন্তর” শব্দটি সংস্কৃত শব্দ “ইয়ন্ত্র” যার বাংলা অর্থ যন্ত্র এবং মন্তর শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “মন্ত্র” থেকে এসেছে, যার বাংলা অর্থ করলে দাড়ায় সূত্র। দিল্লির যন্তর মন্তরটি ছাড়া জয়পুর (সবচেয়ে বিখ্যাত এবং বৃহত্তম), উজ্জয়িনী, বারাণসী এবং মথুরায় আরও চারটি মানমন্দির আছে।

প্রায় পাঁচ একর জুড়ে বিস্তৃত এই মানমন্দিরে মোট ১৪টি বিশাল স্থাপত্যিক জ্যোতির্বিদ্যা পরিমাপ যন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে ৪টি স্বতন্ত্র যন্ত্র রয়েছে —
সম্রাট যন্ত্র, রাম যন্ত্র, জয়প্রকাশ যন্ত্র এবং মিশ্র যন্ত্র। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যন্ত্র হল মিশ্র যন্ত্র, পাঁচটি যন্ত্রের সমষ্টি যা বিশ্বের বিভিন্ন শহরে দুপুরের সময় নির্দেশ করতে পারে। বেশ আশ্চর্যজনক ব্যাপার, তাই না?
সম্রাট যন্ত্র: সম্রাট যন্ত্র বা সর্বোচ্চ যন্ত্র হলো ২৪ ঘন্টায় বিভক্ত এক বিশাল সূর্যঘড়ি। জয় সিং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির মধ্যে এটি অন্যতম। সম্রাট যন্ত্রের আক্ষরিক অর্থ ‘সর্বোচ্চ যন্ত্র’ এবং এটি প্রায় দুই সেকেন্ডের নির্ভুলতার মধ্যে সময় পরিমাপ করতে পারে।
একটি বিশাল পাথরের তৈরি ত্রিভুজ যা মূলত একটি সমান ঘন্টার সূর্যঘড়ি। এটি ৭০ ফুট উঁচু, ভিত্তি থেকে ১১৪ ফুট লম্বা এবং ১০ ফুট পুরু। এর ১২৮ ফুট লম্বা (৩৯ মিটার) কর্ণ রয়েছে যা পৃথিবীর অক্ষের সমান্তরাল এবং উত্তর মেরুর দিক নির্দেশ করে। ত্রিভুজের উভয় পাশে একটি চতুর্ভুজ রয়েছে যার ক্রমানুসারে ঘন্টা, মিনিট এবং সেকেন্ড নির্দেশ করে। সম্রাট যন্ত্র নির্মাণের সময় সূর্যঘড়ি ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল, কিন্তু সম্রাট যন্ত্র বিষুবাংশ এবং গ্রহ নক্ষত্রের সম্পর্কযুক্ত স্থানাঙ্ক পরিমাপ করার জন্য নিখুঁত এক যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। বৃহৎ সম্রাট যন্ত্র স্থানীয় সময় দুই সেকেন্ড পর্যন্ত নির্ভুলতার সাথে গণনা করতে পারে এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম সূর্যঘড়ি হিসাবে বিবেচিত হয়।
জয় প্রকাশ যন্ত্র : জয় প্রকাশ যন্ত্র দিল্লির যন্তর মন্তরের একটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের যন্ত্র যা সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
যন্ত্রটির ব্যাস প্রায় ৫.৫ মিটার এবং এটি একটি অবতল, গোলার্ধ আকৃতির বাটি যার কেন্দ্রে একটি ধাতব প্লেট বা ক্রসহেয়ার থাকে, যা ছায়া ফেলে সূর্যের অবস্থান নির্ণয়ে সাহায্য করে।
রামযন্ত্র : এটি মূলত নক্ষত্রের উচ্চতা পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই যন্ত্রটি বিশাল গোলাকার কাঠামো এবং খোলা ছাদ দিয়ে তৈরি, যা তারার উচ্চতা মাপার জন্য পৃথিবীর অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ ব্যবহার করে।

রামযন্ত্র
মিশ্র যন্ত্র : মিশ্র যন্ত্র (আক্ষরিক অর্থে মিশ্র যন্ত্র) হল ৫টি যন্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি একটি যন্ত্র যা বছরের সবচেয়ে ছোট এবং দীর্ঘতম দিন নির্ধারণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি দিল্লি থেকে তাদের দূরত্ব নির্বিশেষে বিভিন্ন শহর এবং স্থানে দুপুরের সঠিক মুহূর্ত নির্দেশ করতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। মিশ্র যন্ত্রটি বিশ্বের বিভিন্ন শহরে দুপুর কখন তা নির্দেশ করতে সক্ষম হয়েছিল এবং এটি মানমন্দিরের একমাত্র কাঠামো যা দ্বিতীয় জয় সিং আবিষ্কার করেননি ।
এই মানমন্দিরটি প্রতিদিন সকাল ৬.০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬.০০ টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। যন্ত্রগুলির কার্যকারিতা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করার জন্য দিনের আলোতে পরিদর্শন করা বাঞ্ছনীয়। সাইটে গাইড এবং অডিও ট্যুর পাওয়া যায়, যা প্রতিটি যন্ত্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করে।

রাম যন্ত্রের ভিতরের অংশ
পার্কটি কনট প্লেস থেকে ৬ মিনিটের হাঁটার দূরত্বে অবস্থিত। নিকটতম মেট্রো স্টেশনগুলি হল রবি চক মেট্রো যা নীল এবং হলুদ মেট্রো লাইনে অবস্থিত অথবা জনপথ মেট্রো স্টেশন যা ভায়োলেট লাইনে অবস্থিত।
যন্তর মন্তরে প্রবেশের টিকিটের দাম বিদেশীদের জন্য ৩০০ টাকা এবং ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ২৫ টাকা। ১৫ বছরের কম বয়সী কম শিশুদের জন্য কোন মূল্য দিতে হয় না। অনলাইনে টিকিট বুক করলে আপনাকে ২৫ টাকার জায়গায় কুড়ি টাকা দিতে হবে। ছবি তোলার জন্য কোন বাধানিষেধ নেই।
আধুনিক টেলিস্কোপ এবং ডিজিটাল সরঞ্জামগুলি এই যন্ত্রগুলির প্রয়োজনীয়তাকে মূলত প্রতিস্থাপন করেছে, তবুও যন্তর মন্তর এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। ইতিহাস উৎসাহী, বিজ্ঞান প্রেমী এবং পর্যটক সকলের জন্যই যন্তর মন্তর একটি শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা যা অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে ব্যবধান দূর করে।

হুমায়ূনের স্মৃতিসৌধ
হুমায়ুনের সমাধিসৌধ
দিল্লি এমন একটা জায়গা যেখানে ছড়িয়ে রয়েছে প্রেম ভালোবাসার বহু নিদর্শন। আগ্রার তাজমহল তৈরি করেছেন এক স্বামী তাঁর স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রদর্শন এবং স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য আর এই সমাধিসৌধ তৈরি হয়েছিল স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অনুরাগ ভালোবাসা জানাতে।
হুমায়ুন সৌধ (হুমায়ুনের সমাধি) হলো দিল্লির নিজামুদ্দিন পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন, যা ভারতের প্রথম বৃহৎ লাল বেলেপাথরের সমাধিসৌধগুলির মধ্যে একটি।
ইতিহাসে আছে যে, হুমায়ুনের অকাল মৃত্যুর পর তার প্রধান সহধর্মিণী হামিদা বানু হুমায়ুননামায় সম্রাটের জীবনী লিখতে শুরু করেন। তিনি চেয়েছিলেন সারাবিশ্ব তার প্রিয়তম স্বামী সম্পর্কে জানুক এবং সম্ভবত সে কারণেই তিনি তার সম্মানে একটি বিশাল সমাধিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তৎকালীন সুপরিচিত পারস্য স্থপতি মিরাক মির্জা গিয়াসকে সমাধিসৌধ নির্মাণের জন্য ভারতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তার মৃত্যুর নয় বছর পর, ১৫৬৫ সালে তার সমাধি এবং আশেপাশের বাগানের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
আরও সাত বছর পর, ১৫৭২ সালে, হুমায়ুনের সমাধি অবশেষে সম্পন্ন হয়। এই সমাধিসৌধটিকে ফার্সি এবং ভারতীয় স্থাপত্যের নিখুঁত মিশ্রণে প্রথম সমাধিসৌধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর জাঁকজমক মন ছুঁয়ে যায়, যা পূর্বে নির্মিত অন্য কোনও ইসলামী স্থাপত্যে পাওয়া যায়নি। এটি চারবাগের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল, একটি চার-চতুর্ভুজ ফুলের বাগান যা কোরানের চারটি নদীর প্রতিনিধিত্ব করে। সৌধটি নির্মাণ করতে সেযুগে খরচ হয়েছিল ১৫ লক্ষ টাকা।

মিশ্র যন্ত্র
এটি তাজমহলের পূর্বসূরী হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে, এটি ভারতের প্রথম “সুক্কুও” বাগান (চারটি ভাগে বিভক্ত বাগান)-এর উদাহরণ, যা পরে তাজমহলের নকশাকে প্রভাবিত করে।এখানে একসময় ১০০ জনেরও বেশি মুঘল রাজবংশের সদস্যের সমাধি ছিল।এর গম্বুজটি চকচকে সিরামিক টাইলস দিয়ে সজ্জিত ছিল, যা এখন সাদাটে হয়ে গেছে।
হুমায়ুনের মূল সমাধিসৌধটি ছাড়াও পশ্চিমের প্রধান দরজা থেকে সেই সমাধি পর্যন্ত যে পথটি গিয়েছে তার দুপাশে অনেকগুলি ছোটো ছোটো স্মারক রয়েছে। এটি হুমায়ুনের সমাধিরও ২০ বছর আগে নির্মিত হয়।
হুমায়ুনের সমাধিসৌধের ৬ মিটার মাটির নীচে নিচে একটি মিউজিয়াম তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস, মুদ্রা, জ্যোতির্বিদ্যা, স্বর্গীয় গোলক, পাথরের শিলালিপি, কাচের জিনিসপত্র এবং টেক্সটাইল সহ ৭০০ টিরও বেশি শিল্পকলা প্রদর্শন করা হয়। মিউজিয়ামে এন্ট্রি ফ্রী ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ৫০ টাকা এবং বিদেশী নাগরিকদের জন্য ৩০০ টাকা।
সময় : সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা (সোমবার বন্ধ)।
পৌঁছানো : ভায়োলেট লাইনে অবস্থিত জেএলএন স্টেডিয়াম মেট্রো স্টেশন অথবা অটো, ট্যাক্সি,ক্যাব।
দিল্লিতে বহু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। তাদের মধ্যে লাল কেল্লা, কুতুব মিনার, জামা মসজিদ, অক্ষরধাম মন্দির, লোটাস টেম্পল, লোধি গার্ডেন, কনট প্লেস এবং চাঁদনী চকের মতো জায়গাগুলোও অত্যন্ত জনপ্রিয়। আজ এই অব্ধি থাক। পরে বলবো বাকি গল্প।
কভারের ছবি : সম্রাট যন্ত্র
ভালো লাগলো।