বাংলার দুর্গাপুজো যে আর কেবল উৎসব নয়, এটি যে বাংলার অর্থনীতির উপরও প্রভাব ফেলেছে, সেটি অনেককাল আগেই টের পাওয়া গিয়েছিল এবং তা যে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং কর্মসংস্থানেও অবদান রেখেছে তা নিয়েও গভীর আলোচনা শুরু হয়েছে। স্পষ্টত দুর্গাপূজা একটি শক্তিশালী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ, এবং তা গ্রাম ও শহর দুই জায়গার অর্থনীতিকে একটি পর্বে চাঙ্গা করে তোলে। আসলে যখন থেকে দুর্গাপুজো একটি বিশাল বাণিজ্যিক মেলার রূপ নেয় তখন থেকেই পোশাক থেকে শুরু করে গয়না, নানা রকম সাজসজ্জা, খাদ্যসামগ্রী, পরিবহন এমনকি নির্মাণ শিল্পের ব্যবসাও যে যথেষ্ট বৃদ্ধি পায় সেটি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। দেখা গিয়েছে উৎসব আসার আগে থেকেই কয়েক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের যেমন কারিগর, শিল্পী, শ্রমিক এবং অন্যান্য কাজের মানুষদের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। এই সময়ে অন্যান্য রাজ্য এবং বিদেশ থেকে বহু পর্যটক বাংলায় আসে, ফলে বাংলার পর্যটন শিল্পেও তার একটি বড় প্রভাব পড়ে। পর্যটকদের আনাগোনায় পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁগুলির আয় বাড়ে।
বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালে উৎসব ঘিরে অর্থনীতির পরিমাণ ১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা রাজ্য জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। বণিকসভাগুলির তথ্য অনুসারে, শুধু বাংলা নয়, অন্য রাজ্যেরও কয়েক লক্ষ মানুষ বাংলার দুর্গোৎসব থেকে লাভবান হয়েছে। মৃৎশিল্পী থেকে শুরু করে দুর্গা পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ডেকরেটর, আলো ও বিজ্ঞাপন জগতের মানুষেরাও বছরের অন্য সময়ের চেয়ে বেশি কাজের বরাত পান। ভিন রাজ্য থেকে এবং বিদেশ থেকে আসা পর্যটক বাংলায় এসে কারিগর ও শিল্পীদের দৃষ্টিনন্দন সৃষ্টি দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রচুর শিল্পসামগ্রী সংগ্রহ করেন এবং কাজের বরাত দেন। বণিকসভাগুলির বক্তব্য, এই বছর বাংলার পোশাক-আশাক ও খাদ্যশিল্প সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। তারা এও জানাচ্ছে, শুধু কলকাতা কেন্দ্রিক নয়, দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি, আসানসোল, পুরুলিয়া, বহরমপুর, মালদহ-কোচাবিহারের মতো জেলাতেও পুজোকেন্দ্রিক ব্যবসা আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বছর পুজো থেকে বাংলার ৪ কোটি ৯০ লক্ষের বেশি মানুষের আয় বেড়েছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমান ব্যবসা বানিজ্যের জেরে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারও জিএসটি থেকে প্রচুর আয় করেছে।
বাংলা বা বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব বলেই পুজোর আগে থেকেই সাধারণ মানুষের খরচের বহর বাড়ে । ফলে লেনদেন বাড়ে। চাহিদা প্রায় মাস দুয়েক আগে থেকেই তুঙ্গে ওঠে সেটা জামাকাপড় থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স পণ্য সবকিছুরই। এমনকি বড় শহরের রেস্তোরাঁ ও বারগুলোর আয়ও বেড়ে যায় হুহু করে। পুজোর দিন এগিয়ে এলে সব থেকে আগে ব্যস্ততা বাড়ে কুমোরপাড়ার মৃৎশিল্পীদের এবং তাদের কাজে যারা সাহায্য করে তাদের, কুমোরপাড়ার সঙ্গেই কাজে হাত লাগাতে প্রতিমার গয়না বা সাজসজ্জার শিল্পীদের, এরপর প্যান্ডেলের কাজ যারা করেন, একে একে ইলেকট্রিশিয়ান থেকে ঢাকি; প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পুজোকে কেন্দ্র করে কয়েক লক্ষ অস্থায়ী কর্মীদের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। আর এখান থেকেই তারা সারা বছর গোটা পরিবারের বেঁচে থাকার রসদ জোগাড় করে। তবে গত কয়েক বছরে থিমের প্রভাবে ছবিটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এখন প্রতিমার গায়ে শোলা বা ডাকের সাজের পরিবর্তন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। আগে শুধুমাত্র খড়-বাঁশ-মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি হত, মণ্ডপ তৈরি করত ডেকরেটর্স এবং তার কাজের লোকজন। এখন সেই কাজের ক্ষেত্রে বেশিটাই করেন আর্ট কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। তাদের সঙ্গে কাজের সুযোগ ঘটে মুর্শিদাবাদ থেকে মেদিনীপুরের বিভিন্ন ক্ষেত্রের শিল্পী বা কারিগরদের। এইভাবে গত বছর (২০২৪) যেখানে পুজোকেন্দ্রিক অর্থনীতি ছিল ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটির মধ্যে, সেখানে তা এই বছর এক লক্ষ কোটি ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গাপুজো-নির্ভর অর্থনীতি রাজ্যের মোট জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ জুড়ে আছে। কলকাতার অবদান প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ, বাকি অংশ রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসে। এই উৎসবেই রাজ্যজুড়ে কয়েক লাখ অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
সেই রিপোর্ট অনুসারেই দেখা যায় পুজোর অর্থনীতিতেও সবচেয়ে বেশি অবদান থাকে খুচরো বা রিটেল সেক্টরের। পুজোর মরসুমে নানা অফার, ডিসকাউন্ট, সেলের পণ্য বিক্রি, সাহিত্য প্রকাশনা, ফিল্ম রিলিজ এই সবকিছুই পুজোর অর্থনীতির অংশ। তাই আর্থিক দিক থেকেও যে দুর্গাপুজোর অর্থনীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় এই থেকেই।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের রিপোর্ট বলেছে, শুধু প্রতিমা প্রস্তুতিতেই ২৬০-২৮০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়৷ বিজ্ঞাপন বাবদ ৫০৪ কোটি টাকা এবং খাওয়াদাওয়া তথা বাজার ইত্যাদিতে ব্যবসা হয় প্রায় ২৮৫৪ কোটির। আলো, স্পনসরশিপ, পাবলিকেশনের মতো ক্ষেত্রের ব্যবসার তথ্যও জানানো হয়েছে রিপোর্টে। উল্লেখ করা হয়েছে দুর্গাপুজোর সময় পর্যটন বাবদ ব্যবসার তথ্য। ফি বছর মা-দুর্গার আরাধনাতেই রাজ্যে লক্ষ্মীর বাড়বাড়ন্ত হয়।
প্রচুর বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছে ,হচ্ছে, হবে শারদোৎসবে লাগামহীন খরচের যথার্থতার প্রশ্ন নিয়ে। দেশের অর্থনীতি নিম্নগতি কিন্তু শারদবাণিজ্য ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্ববাজারে টাকার দাম কমা, পেট্রল ডিজেলের দাম লাগাম ছাড়া, মুদ্রস্ফীতি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বড়ো বড়ো শিল্প বাণিজ্য সংস্থা বাঙালীর শারদোৎসবকে পাখির চোখ করে। Associated Chamber of Commerce and Industry of India (ASSOCHAM)-র সাম্প্রতিক সমীক্ষা মতে শারদোৎসবের বাণিজ্যিক বাজার বার্ষিক যৌগিক ৩৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুজো উপলক্ষে যথেচ্ছ খরচ যদি নিয়ন্ত্রিত করা হয় তাহলে বাংলার সর্বস্তরের ব্যবসা বাণিজ্যের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। বাংলার অর্থনীতির বেশ কয়েকটি বিভাগ শারদোৎসবের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। যদি সব কিছু ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে অনুসারী শিল্পের উপরেও পড়বে ঋণাত্মক প্রভাব। তাছাড়া শারদোৎসবের সাথে পেশাগতভাবে যুক্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবার ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলার অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে প্রচুর বেকারত্বের সৃষ্টি হবে।
কয়েক বছরে পুজো কমিটিকে সরকারি অনুদানের অঙ্ক তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই উৎসবের অর্থনীতির কিন্তু যদি রাজ্যের পোশাক-আশাক শিল্পের কথা ধরে সারা বছরের বিক্রির সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে দেখা যাচ্ছে পুজোর সময়ে এই খাতে বিক্রি গড়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। আয় বেড়েছে ১০ হাজার কোটিরও বেশি। এর ফলে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের পোশাক শিল্পে বিগত পাঁচ বছরে ৪২ শতাংশের বেশি নতুন শাখা খোলা হয়েছে। কোনও সংস্থার ব্যবসা বন্ধ হয়নি। বরং অধিকাংশ সংস্থা সম্প্রসারণের জায়গা খুঁজছে। কলকাতার মেটিয়াবুরুজে মুর্শিদাবাদ থেকে আসা মুসলিম কারিগররা পুজোর ছ-মাস আগে থেকেই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন জামা প্যান্ট তৈরির কাজে। বিগত দু-তিন দশক আগেও আপামর বাঙালী অপেক্ষায় থাকতো তাদের প্রিয় শিল্পীর পুজোর গানের অ্যালবামের জন্য, সেই স্মৃতিও এখন ধুসর কিন্তু নদিয়ার শান্তিপুর, ধনেখালিতে পুজো এগিয়ে এলেই তাঁতের খটাখট শব্দ হয় সারারাত। মালদা, মুর্শিদাবাদের রেশম শিল্পীরা রাতে ঘুমোনোর অবসর পান না। জঙ্গলমহলের আদিবাসিরা কেন্দুপাতা থেকে থালা বাটি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পুজো মরসুমেই তারা বাড়তি রোজগারের সুযোগ পান। চন্দননগরের আলোক শিল্পের বাজার দুর্গাপুজো থেকেই শুরু হয়ে যায়। তাই শারদোৎসব যে বাংলার অর্থনীতির মানদণ্ডের অন্যতম সূচক তা অস্বীকার করা কঠিন। বরং বলা ভাল শারদোৎসব এখন সর্বজনীন শারদ-বাণিজ্য।