শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৪:৩৭
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শেষ বসন্তের অরণ্যে : কমল ব্যানার্জী

কমল ব্যানার্জী / ৬০৭ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫

প্রত্যেক বছরের মতন এবারের জঙ্গল যাত্রা যাকে বলে। সুপরিকল্পিত তা ঠিক হতে পারল না। বাধ সাধলো ছেলের ছুটি আর আমার পেসমেকার। যাই হোক সব মিলিয়ে বেরোতে বেরোতে শীতের শেষে না হয়ে প্রায় বসন্তের শেষ হয়ে গেলো। এই পিছিয়ে যাওয়াটা অবশ্য একদিকে শাপে বর হয়েছিল, সে কথায় পরে আসছি। এবারের এজেন্ডাটা একটু অন্য রকম। এই সফরের প্রধান আকর্ষণ ছিল করবেট অরণ্যের শতাব্দী প্রাচীন বন বাংলো গুলোতে রাত কাটানো সাথে শেষ বসন্তের পাতাঝরা অরন্যকে একেবারে কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখা। সেই বনপথ দিয়ে যেতে যেতে অজান্তেই মন বলে উঠছিল ‘ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে’। নিশ্চয় ভাবছেন এত আয়োজন করে যাবেন আর বাঘ দেখবেন না? মনের দিক থেকে সে টা কে এবার আমরা উপরি পাওনা হিসাবেই দেখেছিলাম। একটা ছোট উদাহরন দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে যাচ্ছি। আমরা তখন রামনগর থেকে ধানগড়ি গেটে এসে পৌঁছেছি। সেখানে রেঞ্জার সাহেবের কাছে দিকালা যাওয়ার পরিচয় পত্র দেখাচ্ছি। শুনলাম ভারতরত্ন সচিন তেন্ডুলকর একটু আগেই পৌঁছেছেন আর গন্তব্য একই। কাগজপত্র দেখিয়ে আমরাও সেই পথে দিকালা বনবাংলোর দিকে এগোলাম। দিকালার একটু আগে কিরনানলি বলে এক যায়গায় ভি ভি আই পি দের জন্য যে বনভবন আছে তেন্ডুলকর সেখানেই উঠেছেন। বললে বিশ্বাস করবেন না, তার পরের দু-দিন বনবিভাগের সর্বোচ্চ কর্তারা ওনাকে নিয়ে জঙ্গল তোলপার করে ফেললেন। মাঝে মাঝে আমাদের সাথে দেখাও হয়ে গিয়েছে। অতন্ত্য সজ্জন মানুষ। গাড়ী থামিয়ে সেলফি তুলতে বিন্দুমাত্র বিরক্ত হননি। কিন্তু বনের কর্তা উধাও! শেষে মান রাখতে কোন বিশেষ যায়গাতে নিয়ে গিয়ে দেখাতে হলো। আর ঠিক তার পরের দিন সকালে এক ছাপোসা টুরিস্ট পরিবারকে তিনি সপরিবারে রাস্তার উপর দর্শন দিলেন। যাকে বলে একেবারে রোড শো! আবার ফিরে আসি বন বাংলোর কথায়। এবার আমাদের তিনদিনের ঠিকানা ‘লগ হাউজ’। এখন আর কাঠের নেই, তবে সব নিয়ে একেবারে খাসা ব্যবস্থা। সন্ধ্যার পর এখানে জঙ্গলের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে আড্ডা দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছুই করার থাকে না। এমন সময় দেখি রেঞ্জার সাহেব আসছেন। উমেশজী আমার পুর্ব পরিচিত। সব ঠিক আছে কিনা সেই খবর নিতে নিজেই চলে এসেছেন।তারপর যা হয়, একথা সেকথার পর শুরু হলো নির্ভেজাল আড্ডা। অল্প আলোয় এখানকার সুবিধা অসুবিধার কথা আলোচনা থেকে কখন যে আমরা পার্কের আদিকান্ডে পৌছে গিয়েছিলাম তা কে জানে।

উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই তরাই এর জঙ্গলে সাহেবদের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহর পর ব্রিটিশ রাজতন্ত্র দেশ জুড়ে রেললাইন বসাতে শুরু করে। লাইনে পাতার জন্য চাই কাঠের স্লিপার আর তার জোগানের জন্য তরাই এর বিপুল বন সম্পদ যাকে গাছ না বলে বনস্পতি বলাই ভাল, কেটে সমতলে নিয়ে আসার কর্মযোগ্য শুরু হয়েছিল। সেই সঙ্গে দেশ জুড়ে নতুন যুগের ঘরবাড়ির দরজা জালনা আর সাহেবী আসবাবপত্র তৈরীর জন্য কাঠেরা যোগান দিতে এই জঙ্গলই হয়ে উঠেছিল অন্যতম উৎস। সাহেবরা প্রথম প্রথম তাঁবুতে থাকলেও পরবর্তী সময়ে স্থায়ী ভাবে থাকার জন্য বাড়ী বানানো প্রয়োজন হয়ে পরলো। আজকের বন বাংলোর এই হলো শুরুর শুরু। আজও উত্তরাখণ্ডে বন বাংলোর বিপুল সংখ্যা একসময়ে এই এলাকায় ব্রিটিশদের প্রবল উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়। বনগুলি ছিল ব্রিটিশ রাজস্বের এক বড় উৎস। ব্যবসা ঠিক ঠিক ভাবে চালাতে হলে যে সেখানে থাকতে হবে তা সাহেবরা ভালই বুঝেছিলেন। যে সব সাহেবদের চাকরির সুবাদে বনের গহনে এইসব পান্ডব বর্জিত যায়গাতে আসতে হতো তাদের জীবনের একটা বড় অংশ এই জঙ্গলেই কেটে যেতো। তাদের সেই দীর্ঘ প্রবাসী জীবনে বৈচিত্র আনতে তারা সেই সব যায়গাতে একটা স্বভুমির আভাস আনবার চেষ্টা করতেন। আজও এই বাংলোগুলোতে থাকলে সেই পরিবেশের কিছুটা অনুভব করা যায়।

কেমন হতো এই সব বন বাংলো গুলো? আসছি সে কথায়। অনেক ভেবে চিন্তে এই সব যায়গাগুলো বাছা হতে। সাধারনত উঁচু যায়গা যেখান থেকে চারপাশটা ভাল ভাবে দেখতে পাওয়া যায় সেইরকম যায়গাতেই এগুলি তৈরী হতো। কাছাকাছি পানীয় জলের উৎস এই যায়গা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক বিশেষ ভুমিকা নিতো। সাধারনত একটি থেকে অন্যটির মধ্যে আট মাইল দুরত্ব রাখা হতো। সরকারী ডাক যাতে একদিনে একটি থেকে অন্যটিতে পৌঁছতে পারে তার জন্যই এই ব্যবস্থা। এ কাজের জন্য ডাক রানার থাকতেন। সেই বিখ্যাত ‘রানার ছুটেছে রানার’ গানের লাইভ সংস্করণ আর কি।

ব্রিটিশদের তৈরী চোখ ধাঁধানো শহুরে স্থাপত্যর বিপরীতে এই বিশ্রাম গৃহ গুলি ছিল একেবারেই আলাদা। গথিক বিল্ডিং এর বদলে এগুলি তৈরী হয়েছিল পাথর আর চুন সুড়কির মর্টার ব্যবহার করে। ছাদ ঢাকার জন্য প্রথম দিকে খড়, স্লেট আর পরে টিনের চাদর ব্যবহার করা হতো। ব্রিটিশ কটেজের মতো এই সব বাড়ীর কেন্দ্রে থাকতো একটি ড্রয়িং ও একটি ডাইনিং রুম আর দুপাশে দুটি বেডরুম। কয়েকটিতে আবার সামনে টানা ঢাকা বারান্দা আর পিছনে সার সার ঘর। বিগ গেম বা শিকারের জন্য এই সব বাহুল্য বর্জিত বনভবনে ইংরেজ রাজ কর্মচারী আর ভাইসরয়দের আনাগোনা লেগেই থাকতো।এই বনবাংলোগুলোতে এলে আপনার মনে একটা পরিবর্তন আসতে বাধ্য। অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে দরজার উপরের খিলান, বড় মাপের ভেন্টিলেটর, টানা বারান্দা, প্রশস্ত দরজা, পোর্টিকো, দরজার ত্রিভুজ ফ্রেম। দেওয়ালের অনেক উপরে স্কাই লাইট, ফায়ারপ্লেস আর কাঠের মেঝে। শতবর্ষ পার করেও এর মধ্যে অনেকগুলিই আজও কর্মক্ষম। এই বাংলোগুলি তৈরীর কাজে শাল বা দেওদার কাঁঠের বীম ব্যবহার করা হতো। কয়েকটির তৈরী হয়েছিল ব্যতিক্রমী গঠনশৈলীতে যেমন ষড়ভুজ বা অষ্টভুজাকৃতি। পরবর্তী সময়ে ফ্লোর প্ল্যানে বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছিল আর ফলস সিলিং যোগ করা হয়েছিল। যদিও কাঠামোর নকশা একই ছিল। মজবুত কাঠের তৈরী এই বাংলোগুলি আজও প্রায় একই রকম আছে। বিস্তীর্ণ বারান্দাগুলি মূলত সকাল বিকেল বাইরে বসে প্রকৃতি উপভোগ করার জন্য তৈরী হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সাহেবদের লেখা বিভিন্ন চিঠিতে তুষারপাতের পর এই বারান্দাগুলো ঝলমলে হয়ে ওঠার কথা রয়েছে। বেশিরভাগ বন বাংলোতে যে ফায়ার প্লেস দেখতে পাওয়া যায় তার একটি সার্বজনীন নকশা ছিল যাতে ধোঁয়ামুক্ত ওম সারারাত ঘরটিকে গরম রাখতে পারে। ডানকান নামে একজন বন বিভাগের অফিসার এটি আরও নিখুঁত করেন। পরবর্তী কালে এটি ডানকান প্যাটার্ন চিমনি নামে পরিচিত হয়। রান্নাঘর সবসময় আলাদা থাকতো। ডাইনিং রুমের সংলগ্ন একটি সার্ভিস রুমে প্রথম রান্না করা খাবার এনে রাখা হতো তারপর পরিবেশনের আগে গরম করে পরিবেশন করা হতো।

আসবাবপত্র স্থানীয় শাল কাঠের তৈরি হতো। তার মধ্যে ছিল ড্রেসিং টেবিল, আলমারি, তোয়ালে টানানোর হ্যাঙ্গার, ডিম্বাকৃতি ডাইনিং টেবিল, ইজি চেয়ার, বাগানে বসার চেয়ার। এগুলি প্রায় সব বন বিশ্রাম গৃহে আজও দেখতে পাওয়া যায়। কাজের লোকেদের থাকার জন্য একটি আউটহাউস বা ডরমিটরি অবশ্যই থাকতো। আর দুপুরের খাওয়ার পর একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য ইজি চেয়ার সেই সঙ্গে বিশাল টয়লেট ও আস্তাবল। একাকিত্ব কাটাতে শিকার অবশ্যই ছিল এর জন্য শুটিং ব্লক নির্দিষ্ট করা থাকতো। সাহেবদের সাথে কুলিদের একটি দল অবশ্যই থাকতো যা তাদের সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন, ক্যাম্পিং কট, সূর্যের টুপি, মল, মগ, চায়ের কেটলি এবং মাছ ধরার রড এবং অবশ্যই, একটি পশ্চিমী কমোড এবং একটি হাত ধোঁয়ার বেসিন সহ তাঁবু বয়ে নিয়ে যেতো। জীম করবেট মিউজিয়ামে এর কিছু কিছু সংরক্ষিত হয়েছে।মাদক দ্রব্য নিয়ে যাওয়া নিয়ে কোন রকম বাধা নিষেধ ছিল না। মজার ব্যাপার হল বিশ্রামগৃহ তৈরীর পরও বহুক্ষেত্রেই সাহেবরা যেখানে বিস্তৃত পরিস্কার খোলা যায়গা থাকতো তারা সীমানার মধ্যে তাঁবুতে থাকতে পছন্দ করতেন। গল্প করতে করতে কখন যে দু ঘন্টা কেটে গিয়েছে টেরও পাইনি। রাতের খাওয়ার ডাক শুনে সবাই চললাম ডাইনেং হলের দিকে।

এবার আসি করবেট অরন্যের অন্যতম সুন্দর বনবাংলো দিকালার কথায়। শেষ বসন্তে এই প্রায় তিরিশ কিলোমিটার বনপথ যা ধানগাড়ি গেট থেকে দিকালা বনবাংলো পর্যন্ত গিয়েছে তার সৌন্দর্য যে কতটা সুন্দর হতে পারে তা এক কথায় অবর্ননীয়।

পাটলি দুন উপত্যকার প্রান্তে, রামগঙ্গার ধারে কান্দা পাহাড়ের পটভূমিতে দিকালা তার অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। ১৯৩৩-র মে মাসে কান্দার মানুষখেকো বাঘ মারতে জিম করবেট এই কান্দার বাংলোতেই ছিলেন। এখন এই রিজের নিচের রাস্তা দিয়ে সাফারী জিপ যায়। আগে থেকে গল্প পড়া থাকলে এ যায়গা আপনার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠতে বাধ্য। এখন এটি অন্য রেঞ্জের মধ্যে পরে। পথে জিপে করে নদী পার হওয়া আর সেই নদীতেই শেষ বিকেলের সূর্যাস্ত দেখা সত্যই সারা জীবনের সঞ্চয়।

বাকি অংশটা শোনার জন্য পরের দিন বিকেলে উমেশজীকে আবার ধরে এনেছিলাম। তার কাছেই জানলাম যে ১৯৭০ সালে নতুনকরে বানানো পুরানো বনবাংলোটি পার্কের ভিতরে তৈরী প্রথম আবাসন। তখন ম্যালেরিয়ায় প্রবল প্রতাপ। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত কর্মীরা এখানে বসবাস করতে পারেন নি। তখন নিচতলাতে ডিএফও অফিস আর উপরের তলাতে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের থাকার ব্যবস্থা এই ছিল ব্যবস্থা। এইখানেই ভারতের প্রথম সরকারী ভাবে বাঘ বাঁচাও বা “প্রজেক্ট টাইগার” শুরু হয়েছিল। ১৯৭৫ এর পর, এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। পরবরতী সময়ে পর্যটক বৃদ্ধির কারণে বেশ কিছু নতুন আবাসন এতে যুক্ত করা হয়েছে। সব নিয়ে দিকালা আজ এক স্বয়ং সম্পূর্ণ সত্তা।যেখানে আছে রেস্তোরাঁ, জীপ সাফারি, ভাল লাইব্রেরি, আর সন্ধ্যায় সিনেমা শো সেইসঙ্গে নিরাপদ হাঁটার ট্র্যাক।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত এখানে একটি পোস্ট অফিস ছিল যেখান থেকে জন্তু জানোয়ারের ছবি সহ বিশেষ সিলমোহর করা চিঠি আর সাথে পার্কের অভিজ্ঞতা লিখে পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল। আর ছিল হাতিতে চড়ে জঙ্গলে ঘোরার ব্যবস্থা। অবশ্য এখন তা বন্ধ আছে। তবে সেই সিঁড়ি দিয়ে হাতির পিঠে চড়ার যায়গাটি এখনও সেই রাজসিক অভিঙগতা কথা মনে করিয়ে দেয়।এই বনভবনের হাতায় আছে একটি অনবদ্য ভিউ পয়েন্ট যেখান থেকে রামগঙ্গা নদী আর অন্য পারের বিস্তীর্ণ ঘাসের জঙ্গলের চমৎকার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।

উমেশজী দুঃখ করে বলছিলেন আজকাল শুধুই বাঘ দেখবো বাঘ দেখবো এমন একটা ক্রেজ হয়েছে, দর্শকদের ভাল করে জঙ্গল দেখার মানসিকতাই হারিয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছেয় হোক আর অনিচ্ছায়ই হোক আমরা সবাই কিন্তু সেই পথেই হাঁটছি। তবে আশার কথা এখন পার্কে গাড়ীর স্পিডের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী হওয়াতে দর্শক ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছায়ই হোক জঙ্গল দেখতে বাধ্য হচ্ছে। আমি তো মনে মনে ভাবছিলাম না হলে কি এই সব ঝরা পাতায় মোড়া মাইলের পর মাইল বনপথ এভাবে নিবিড় ভাবে উপভোগ করতে পারতাম। যাই হোক ফেরার আগের দিন প্রায় শেষ বিকেলে তিনি অভিসার শেষে আমাদের রাজকীয় দর্শন দিলেন, অবশ্যই জোড়ায়। আর তার আগের মুহুর্মুহু হাড় হিম করা হুঙ্কার আমার বেশী মনে থাকবে। আলো কমে আসছিল তাই সেই দুই বাঘের আবেগ ঘন মুহুর্ত ততটা ভালভাবে ছবিতে ধরে রাখা গেল না। তবে যা দেখিলাম জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিতে পারিব না। তিন দিন এখানে কাটিয়ে দিকালাকে বাই বাই বলে আমরা এবার বেড়িয়ে পরলাম পরের গন্তব্য বিজরানি বনবাংলোর পথে। আবার সেই মন ভাল করে দেওয়া বনপথ। ধানগড়ি গেটে পৌছে এগজিট বুকে এন্ট্রি করে বেরিয়ে পরলাম। এবার গন্তব্য আমডান্ডা গেট। সেখান থেকেই আমরা নয় কিমি দুরের বিজরানি বনবাংলোর পথ ধরবো। বন্যজন্তুর সহজলভ্যতার কারনে ১৯২৮ সালে তৈরী এই বাংলো শুরুতে বিগ গেম বা শিকারের জন্য সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কাছেই আরেক অপুর্ব বন বাংলো মালানি। জিম করবেটের স্মৃতিধন্য এই বন আবাসে রাত্রিবাস প্রকৃতি প্রেমীদের কাজে এক স্বর্গীয় অভিঙগতা। পথে দেখা হলো বন বিভাগের ফুট পেট্রোলিং টিমের সদস্যদের সাথে। ভীষন বিপদসঙকুল এই কাজ। সম্ভ্রম জাগলো। চোরাশিকারীদের হাত থেকে এরাই রক্ষা করছে বন্যপ্রান। বনবাংলোর ভিতরের ওয়াচ টাওয়ার থেকে রাতের আকাশ প্রায় ছুয়ে ফেলব মনে হলো। অতীন্দ্রিয় অনুভুতি কাকে বলে আমি জানিনা। বার বার বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপান্যাসের সেই বিখ্যাত উক্তি “লবটুলিয়া গিয়াছে, নাঢ়া ও ফুলকিয়া বইহার গিয়াছে — কিন্তু মহালিঘারূপের পাহাড় রহিল, ভানমতীদের ধানঝাড়ি পাহাড়ের বনভূমি রহিল। এমন সময় আসিবে হয়ত দেশে যখন মানুষ অরণ‍্য দেখিতে পাইবে না — শুধু চাষের ক্ষেত, পাটের কল, কাপড়ের কলের চিমনি চোখে পড়িবে, তখন আসিবে সেই নিভৃত অরণ‍্যপ্রদেশ, যেমন লোকে তীর্থে আসে। সেইসব অনাগত দিনের মানুষদের জন‍্য এই বন অক্ষুন্ন থাকুক।” একসময় বিজরানি বাসের মেয়াদ ফুরিয়ে এলো। রেঞ্জার সাহেবকে আবার আসবো বলে বেড়িয়ে পরলাম পরের গন্তব‍্যে ঢেলা বনবাংলোর পথে। ১৯২৬ সালে তৈরী ঢেলা বন বাংলো পর্যটন মানচিত্রে নব সংযোজন। দু কামরার এই বনবাংলো আজ আর গভীর অরণ্যের অংশ নয়। মূল অরণ্যর বাইরে বাফার এলাকায় এর অবস্থান। নগরায়নের প্রবল চাপ এখানে বেশ পরিষ্কার। বনবাংলোর কাছাকাছি কয়েকটি রিসর্ট গড়ে উঠেছে।রেঞ্জের সদর দপ্তরও এখানেই। বিজরানির মতন এটিও সৌর বিদ্যুৎ পরিচালিত বন বাংলো। আকাশ সুর্য না ঊঠলে নো হট ওয়াটার। অবশ্য অনুরোধে কাঠের আগুন জ্বালিয়ে গরম জল করে দেয়। ফাটো বন বাংলোতেও একই জিনিস দেখেছি। দু-কামরার বন বাংলোর একটিতে আমরা ছিলাম। এটির শতবার্ষিকী হতে আর দু-বছর বাকী, কুড়ি ফুট উচু ঘর আর অনেক উঁচুতে স্কাই লাইট এই দুই মিলিয়ে এপ্রিলের শুরুতেও সেরকম গরম মনে হচ্ছিল না। ফায়ারপ্লেস দেখে মনে হয় এই নেভানো হলো। ঘরের বাইরে ডাইনিং টেবিল পাতা সেখানে খাওয়ার আযোজন। বাংলোর হাতায় বহু প্রাচীন বটগাছ। অগুনতি পাখির কিচির মিচির। আওয়াজ আছে কিন্তু শব্দ দুষন নেই। আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল এখানে কোনও রেস্তোরাঁ নেই তবে রান্নাঘরের সমস্ত বাসনপাত্র আর সরঞ্জাম সহ রান্নাঘর রয়েছে।আর রয়েছে কেয়ারটেকার কাম কুক। আপনার নিজের লঞ্চ, ডিনার এবং প্রাতঃরাশের জন্য আপনার নিজস্ব জিনিসপত্র নিয়েও যেতে পারেন বা ওকে বললে ও ব্যবস্থা করেও দিতে পারে। বন্যপশুদের নিরাপত্তার কারনে সব বনবাংলোতেই আমিষ খাওয়া নিষিদ্ধ। বাটারফ্লাই পার্ক এখানকার নতুন সংযোজন।

পরের দিন আমাদের বুকিং ছিল ঝিরনাতে। বেড়িয়ে পরলাম ঝিরনা বনবাংলোর পথে। করবেট জাতীয় উদ্যানের দক্ষিণ সীমানায় কালাগড় গেট দিয়ে আমরা ঝিরনাতে পৌছে গেলাম। আসতে আসতে দেখলাম এখানে বড় গাছের সংখ্যা বেশ কম। বেশিরভাগটাই ঝোপঝাড়। পরে সাফারী করতে গিয়ে মনে হলো পুরো যায়গাটাই শিবালিক ল্যান্ডস্কেপের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া অসংখ্য ছোট নালা আর সরু গিরিখাত নিয়ে তৈরী। ১৯০৮ সালে গভীর বনের মাঝে যে বাংলো তৈরী হয়েছিল নগরায়নের চাপে ধীরেধীরে এক সময় তা সংকুচিত হয়ে পরেছিল। কোর এলাকার মধ্য দিয়ে রামনগর পর্যন্ত বাস চলতে শুরু করে। বিপর্যস্ত হয়ে পরেছিল বন্যপ্রান।অবশেষে ১৯৯৪ সালে প্রজেক্ট টাইগারের অধীনে কাছাকাছি গ্রামগুলিকে স্থানান্তরিত করা হয়। মানুষ এ পশুর সংহাত বন্ধ করতে পাঁচিল দেওয়া হয়।এইসব ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে ধীরে ধীরে এলাকায় ব্যাপক পরিবেশগত পুনরুদ্ধার হয়।

এর সুফল কিছুটা আমরাও দেখে এলাম। বনবাংলোর সীমানার বাইরেই ওয়াটার হোল আর সেখানে এখন সারাদিন বন্যজন্তুর নিশ্চিন্ত যাতায়াত। সেদিনকার সাফারী শেষ করে সবে সৌর বিদ্যুৎ চালিত নিরাপত্তা বেস্টনীর ভিতরে ঢুকেছি, অন্যান্য জন্তুজানোয়াররাও ঘরে ফিরছে। সমস্থ জঙ্গল জুড়ে ব্যাপক কোলাহল আর ব্যস্ততা। হটাত কাছেই আবার সেই গগনবিদারী হাড় হিম করা হুহুঙ্কার।মুহুর্তের মধ্যে সবাই যে যার মতন করে নিজেকে বাঁচতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। অসংখ্য বাঁদরের মুহুর্তের মধ্যে সবথেকে উপরের ডালে তীব্রগতিতে প্রস্থান। নিরাপত্তা কর্মীরা সবাইকে ঘরে যেতে বললেন। একটু পরেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এলো। কিছুক্ষন পর আবার সেই ডাক। ব্যাস, এইটুকুই। রাতের খাওয়া ঘরেই হলো। পরদিন সকালে কাছের জঙ্গলে পাওয়া গেলো কিছু হরিনের হাড়গোড়। বন্য নাট্যমঞ্চে এ রোজকার গল্প। আর হাতীর বিদ্যুৎ চালিত নিরাপত্তা বেস্টনী ভাঙা সে তো প্রায় রোজকার গল্প বললেন নতুন জয়েন করা মহিলা ফরেস্টার। নিরাপত্তার কারনে সেদিন আমাদের আর রাতের আকাশ দেখা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। চরৈবতী। পরদিন সকালের সাফারীর পর আমাদের এবারের শেষ বনবাংলো ফাটোর উদ্দোশ্যে বেড়িয়ে পরলাম। আসলে ঝিরনা-ঢেলা-ফাটো বনবাংলো একটা ত্রিভুজের তিন বাহুতে রয়েছে। ঝিরনা থেকে যাওয়ার পুরোনো রাস্থা এখন বন্ধ। বেশ খানিকটা ঘুরপথে যেতে হলো। করবেটের এটি নবতম সংযোজন। ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী এটি উদ্বোধন করেন। এখানকার জঙ্গল গভীর আর প্রচুর জলের যায়গা আছে, ফলে বন্যজন্তুর আনাগোনা আর দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেশী।এখানে পুরোনো বাড়ীগুলিকেই সুসংকৃত করে নবরুপ দেওয়া হয়েছে।শতবর্ষ প্রাচীন প্রধান বনবাংলোটি ১৯১২ সালে তৈরী। তৈরী হয়েছে ট্রী হাউজ আমাদের রাতের ঠিকানা এটিই হবে এরকমই ঠিক ছিল, কিন্তু বাঁধ সাধলো জল। উচ্চতার কারনে উপরে যে ট্যাঙ্ক বসানো হয়েছে তার পাম্প ঠিকঠাক না চলার কারনে আমাদের অন্য একটি বাংলো দেওয়া হয়েছিল। একটু পরেই ঝুপ করে সন্ধা নামলো। চোখ পরলো সীমানার বাইরে। সেখানে বহু জোড়া চোখের উজ্জ্বল দৃষ্টি জোনাকীর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।বনকর্মীরা জানালেন হরিণ জল খেতে এসেছে। মানুষের সাথে থাকতে থাকতে হরিণরা এটা বুঝেছে যে তারের বেড়ার ভিতরে থাকলে সে রাতের মতন বাঘের পেটে যেতে হবে না। তাই দিকালা ছাড়া আর সব বনবাংলোতেই রাতের দিকে বহু হরিণ ঢুকে আসে আবার সকাল হলেই বের হয়ে যায়। পরের দিনের সকালের সাফারীতে দেখা হয়ে গেলো উল্কার গতিতে এক বাঘ রাস্তার এদিক থেকে এক লাফে রাস্তার ওপারের এক হরিণের উপর ঝাঁপিয় পরে সামনের জঙ্গলে মহানন্দে খেয়ে শেষ করলো। সমস্তটা এত দ্রুত ঘটে গেলো যে সেভাবে ছবি নেওয়া গেলো না।এখানের ওয়াটার হোলগুলোর কোনটার জল লাল আবার কোনটা বা সবুজ। জলের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে নানারকম ভেষজ দেওয়া হয়, তার কারনেই এই রং জানালেন রেঞ্জার সাহেব।

এবার ফেরার পালা।

এবারের শেষ সাফারী থেকে ফিরে সকালের ব্রেকফাস্ট খেয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে নিতেই দেখি ফেরার জীপ এসে গিয়েছে। এবার সোজা রামনগর হয়ে পথে জিম করবেট মিউজিয়াম দেখে কাঠগুদাম স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেনে দিল্লি স্টেশন হয়ে এয়ারপোর্ট — তারপর মাঝে দু-ঘণ্টার আকাশপথ হয়ে কোলকাতা আর উবের ধরে হোম সুইট হোম।… আসছে বছর আবার হবে।

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “শেষ বসন্তের অরণ্যে : কমল ব্যানার্জী”

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন