করোনা রোগের ভয়াবহ রূপ মানুষ ভুলে যায়নি। অসংখ্য মানুষ তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আর এক রোগের প্রাদুর্ভাব মানুষকে চিন্তায় ফেলেছে। বিশেষ করে শিশু ও আজকের তরুণ প্রজন্মকে। কী সেই রোগ! তাহল ‘মস্তিষ্ক-খেকো’ অ্যামিবা (Brain-eating amoeba) প্রসূত নেগেলেরিয়া ফাউলেরি (Naegleria fowleri)। সমীক্ষায় দেখা গেছে ইতিমধ্যেই দক্ষিণ ভারতের কেরলে মারা গেছে ১৯ জন। আক্রান্ত শতাধিক। এই রোগের থাবা থেকে রেহাই পায়নি পশ্চিমবঙ্গ। ইতিমধ্যে এই রোগে আক্রান্ত কয়েকজন। চিকিৎসা চলছে। স্বাস্থ্য দপ্তরও নড়েচড়ে বসেছে। রোগটি সম্পর্কে জানতে মানুষের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আসলে ‘মস্তিষ্ক-খেকো অ্যামিবা’ নামে পরিচিত নেগেলেরিয়া ফাউলেরি, যা সাধারণত একটি তাপ-প্রেমী প্রোটোজোয়ান। যা পারকোলোজোয়া পর্বের অন্তর্গত। এই মারাত্মক জীবাণুটি প্রাথমিক অ্যামিবিক মেনিন গোয়েনসেফালাইটিস সৃষ্টি করে, যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি বিরল এবং দ্রুত সংক্রামক।

নেগেলেরিয়া ফাউলেরি সুবিধাবাদী দূষিত জল ঘটিত জীবাণু (অ্যামিবা), যা বিশেষত রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে গ্রানুলোমাটাস অ্যামিবিক এনসেফালাইটিস (Granulomatous amoebic encephalitis) সৃষ্টি করে। সেখানে নেগেলেরিয়া ফাউলেরি মূলত সুস্থ, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন শিশু ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের আক্রান্ত করে, যখন তারা দূষিত জলের সংস্পর্শে আসে। বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে বিতরণ করা, এই এন ফাউলেরি উষ্ণ স্বাদু জলে থার্মোফিলিক অ্যামিবোফ্ল্যাজেলেট হিসাবে বৃদ্ধি পায়, ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় এরা বৃদ্ধি পায়। এন. ফাউলেরি উষ্ণ মিঠা জলের পরিবেশ যেমন হ্রদ, নদী এবং দুর্বল ক্লোরিনযুক্ত পুলগুলিতে বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণত জল-সম্পর্কিত কার্যকলাপের সময় যেমন সাঁতার ও স্নান করার সময় নাসারন্ধ্রের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। নাকের পথ দিয়ে অ্যামিবা মস্তিষ্কে স্থানান্তরিত হতে পারে। এটি তীব্র প্রদাহ এবং নেক্রোসিস সৃষ্টি করে, যা নির্ণয় এবং দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের মতো অ-নির্দিষ্ট লক্ষণগুলির কারণে এই রোগ নির্ণয় করা খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। এই রোগ থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার উপায় হলো, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং অ্যাগ্রেসিভ কম্বিনেশন থেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৪৭টি প্রজাতির নেগেলেরিয়ার মধ্যে, শুধুমাত্র এন ফাউলেরিই পিএএম সৃষ্টি করে, যা একটি বিরল কিন্তু আক্রমণাত্মক সংক্রমণ যা বেশিরভাগই সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে।

দেখা যাচ্ছে এন. ফাউলেরির (N. Fowler’s) জীবনচক্র তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত — ট্রফোজয়েট (Trophozoites), ফ্ল্যাজেলেট (flagellates) এবং সিস্ট (cysts)। এর মধ্যে ট্রফোজয়েট পর্যায় হলো মানুষের সংক্রমণের জন্য দায়ী প্রজননশীল ও আক্রমণাত্মক রূপ। এটি একটি তাপপ্রেমী অণুজীব হওয়ার কারণে, গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে এবং সে সময় মানুষের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। ট্রফোজয়েটগুলো লম্বাটে ও সরু আকারের ও দৈর্ঘ্যের হয়। চলাচল ও ব্যাকটেরিয়া গ্রহনের জন্য সিউডোপোডিয়া (চলাচলের অঙ্গ) দ্বারা সজ্জিত থাকে। এন. ফাউলেরির ক্রিয়াকলাপ বলতে বোঝায় এটি একটি শক্তিশালী সহজাত রোগপ্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, এবং এর তীব্রতা একাধিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রোটিন Nfa1, নাইট্রিক অক্সাইডের উৎপাদন এবং ছিদ্র-সৃষ্টিকারী উৎসেচক। Nfa1 প্রোটিন লক্ষ্য কোষের সাথে অ্যামিবার সংযুক্তিকে সহজতর করে, অন্যদিকে বিশেষায়িত খাদ্যগ্রহণ কাঠামো অ্যামিবাকে পরিবেশ থেকে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক গ্রহণ করতে এবং সরাসরি মস্তিষ্কের কোষকে ফ্যাগোসাইটোসিস করতে সক্ষম করে। এছাড়া জীবটি সাইটোলাইটিক অণু নিঃসরণ করে টিস্যু ধ্বংসে আরও ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে রয়েছে সিস্টেইন প্রোটিয়েজ, ফসফোলিপেজ এবং ফসফোলিপোলাইটিক উৎসেচক, যা ব্যাপক নেক্রোসিস (কোষের মৃত্যু) ঘটাতে সহায়তা করে।প্রসঙ্গত, দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য কেরালার সব থেকে বড় উৎসব ওনাম। ঠিক এর আগে থেকেই এখানে ছড়িয়ে পড়েছে মস্তিষ্ক-খেকো অ্যামিবা।

প্রসঙ্গত, এই রোগের উপসর্গ হল — কয়েকদিন আগে থেকে তার শুধু মাথা ঘোরা আর উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা। ডাক্তাররা কিছু ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। শরীরের অস্বস্তি থেকে শুরু হয় জ্বর, তারপর ভয়ানক কাঁপুনি হতে থাকে। দেখা যায় অ্যামিবিক মেনিনগোয়েনসেফালাইটিস> এখন বহু মানুষের আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে এই অসুখ। এই অসুখের সবথেকে ভয়ানক দিক হল এর কোনও চিকিৎসা নেই। অ্যামিবিক মেনিনগোয়েনসেফালাইটিস (Amebic meningoencephalitis) এক ধরনের প্রোটোজোয়া সৃষ্ট অসুখ। যার উৎস মূলত জল। দেখা গিয়েছে পুকুরের জল, পুলের জল নাকে ঢুকেই পৌঁছচ্ছে সোজা মস্তিষ্কে। আর তারপরই শুরু হচ্ছে তার ভয়ংকর প্রভাব। নাক দিয়ে ওই জলের সঙ্গে শরীরে ঢোকার পর প্রোটোজোয়ান নেগেলেরিয়া ফাউলেরি (Protozoan Naegleria fowleri) সংক্রমণ ছড়ায়। প্রথমে জ্বর, মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, আলো সহ্য করতে না পারা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এর উপসর্গ। নাক দিয়ে ঢুকে পাকস্থলীতে যাওয়ার কথা থাকলেও সে নাকের মধ্যে দিয়ে অল ফ্যাক্টরি নার্ভ বা গন্ধ শোঁকার নার্ভ মারফত সোজা পৌঁছে যায় মাথার মধ্যে। দিন কয়েকের মধ্যেই কুরে কুরে খেতে শুরু করে মস্তিষ্কের অন্দর। ধ্বংস করে দেয় স্নায়ুতন্ত্রকে। চলতি বছরেই কেরলে ‘ব্রেন ইটিং অ্যামিবার’ আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে একাধিক শিশু সহ ১৯ জনের! ঘাতক রোগটি হলো ন্যাগলেরিয়া ফাওলেরি। বেড়াতে গিয়ে পুলে স্নান করেন অনেকেই। বিভিন্ন রিসোর্টে পুলে স্নানের বন্দোবস্ত আছে। সেই জলে ক্লোরিন ব্যবহার করে সংক্রমণ মুক্ত করা হয় কিনা খোঁজ নিন। সমুদ্র স্নানে এই রোগ ছড়ায় না। ঝরনার জল এক্ষেত্রে নিরাপদ। যাঁরা নাক দিয়ে জল টেনে নাক পরিষ্কার করেন, তাঁরা সতর্ক থাকুন। আপনার বাড়ির জলের উৎস নিয়ে সতর্ক থাকুন আমেরিকান সেন্টার অফ ডিজিজ কন্ট্রোল (American Center for Disease Control) বলছে সাঁতার কাটার সময় বা জলে ডুব দেওয়ার সময় এক ধরনের নোজক্লিপ ব্যবহার।

সামনে উৎসবে মরশুম অনেকে বেড়াতে যাবেন। তাই কোন জলাশয় স্নানের আগে বারবার সতর্ক হোন। কারণ এ ধরনের রোগ জল থেকে ছড়ায়। আরেকটি কথা মনে রাখতে হবে, এই অসুখের চিকিৎসা খুব জটিল নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা পদ্ধতি প্রমাণিত নয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে কয়েকটি ওষুধের উল্লেখ রয়েছে। যা নাকি এই ধরনের সংক্রমণে কাজ করে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই তবে এটি ভয়াবহ ফাউলেরি সংক্রমণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র এবং ভারতে সবচেয়ে বেশি এই রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দেশগুলিতে সারা বছর ধরে উষ্ণ জলবায়ু এবং দূষিত জলের উৎসের অ্যাক্সেসের কারণে এই সংক্রমণের ঝুঁকি। বেশি মস্তিষ্ক-খেকো অ্যামিবার সংক্রমণ প্রথম দেখা যায় ১৯৫০-এর দশকে। নেগলেরিয়া ফাউলেরি নামক এই অ্যামিবাটি উষ্ণ ও মিষ্টি জলের উৎসে পাওয়া যায় এবং মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মস্তিষ্কের মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে, যা প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনগোএনসেফালাইটিস নামে পরিচিত। সংক্রমণের কারণ নেগলেরিয়া ফাউলেরি অ্যামিবা মূলত উষ্ণ ও স্থির মিঠা জলের (যেমন হ্রদ, নদী, উষ্ণ প্রস্রবণ) মধ্যে থাকে। যখন এই অ্যামিবা নাকের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, তখন এটি মস্তিষ্কের টিস্যু ধ্বংস করে।

এই সংক্রমণের ফলে যে রোগ হয়, তার নাম হলো প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনগোএনসেফালাইটিস (Primary amoebic meningoencephalitis)।

এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে মেনিনজাইটিসের মতো উপসর্গ। যেমন জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, এবং ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া। একটি মারাত্মক রোগ যার মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সংক্রমণ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই প্রিভেনশন ইজ অলওয়েজ বেটার দেন কিওর। সতর্ক থাকুন। সুস্থ থাকুন।
অন্বেষা গঙ্গোপাধ্যায়, স্নাতকোত্তর, মাইক্রোবায়োলজি