চোখের প্রদাহ (আইরাইটিস) থেকে সাবধান! শিশু ও বয়স্করা ছাড়াও যে কোনো বয়সে আইরাইটিস-এ আক্রান্ত হতে পারেন। চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়া কিংবা চিকিৎসা না করালে চোখের বড়ো ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যায়। বাংলার ছয় ঋতুর বারো মাসে প্রকৃতির আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অনেক সময় চোখের সমস্যা বা চোখের প্রদাহ দেখা দিতেই পারে। একটাই কথা চোখের সমস্যা হলেই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। বিষয় আইরাইটিস বা চোখের প্রদাহ। বিষয়টি আলোচনা করলেই পরিষ্কার হবে।
আইরাইটিস বা চোখের প্রদাহ কি?
আইরাইটিস বা চোখের প্রদাহ হল আইরিসের (চোখের রঙিন অংশ যা চোখের তারার চারপাশে থাকে এবং সর আকার নিয়ন্ত্রণ করে) প্রদাহ জনিত অবস্থা। যদি এই রোগের চিকিৎসা না করা হয় তাহলে এটি চোখের আংশিক বা সম্পূর্ণ অন্ধত্বের শত পরিণতির কারণ হতে পারে। তাই চোখের প্রদাহ হলেই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
আইরাইটিসের প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গগুলি কি কি?
মনে রাখা দরকার আইরাইটিস একপার্শ্বিক বা দ্বিপার্শ্বিক হতে পারে। এর প্রধান উপসর্গগুলি হল– চোখে ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা, দৃষ্টিশক্তি কমে মাওয়া এবং কারোর ক্ষেত্রে ফ্লোর্টার্সের সমস্যাও দেখা যেতে পারে। যা ছোট দাগ বা বিন্দু চোখের দৃষ্টিক্ষেত্রের উপর ভেসে বেড়ায়। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক থাকুন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে। জেনে রাখা ভালো এট সব বয়সেই দেখা যায়। এটি যদিও ২০ থেকে ৮০ বছরের মানুষের মধ্যে বেশী হয়।

চিকিৎসা কি?
আইরাইটিস বা চোখের প্রদাহ কমাতে স্টেরয়েড যুক্ত চোখে ড্রপ ব্যবহার করা হয়।
Dilating Eye drops : চোখের তারা প্রসারিত করার জন্য যে dilating drop ব্যবহার করা হয় তাতে আইরাইটিসের উপসর্গের অনেকটাই উপসম হয়। যদি কোনরকম ইনফেকশন-এর কারণে আইরাইটিস হয় তাহলে চিকিৎসক Antibiotic অথবা Antivircal medication-এর দ্বারা চিকিৎসা করে থাকেন।
Steroid Injection : আক্রান্ত স্থানে সরাসরি ঔষধ সরবরাহ করতে এটি ব্যবহৃত হয়।
Oral Steroid : কিছু ক্ষেত্রে আইরাইটিস যখন Posteriorly (চোখের আরও পেছন দিকে) প্রভাবিত হয় তখন Orcal Steroid এর প্রয়োজন হতে পারে।
Immunosuppressants : যেসব ক্ষেত্রে আইরাইটিস একটি auto immune অবস্থার সাথে যুক্ত, সেখানে প্রদাহ এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণে immunosuppressant ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও অন্তর্নিহিত অবস্থার চিকিৎসা: যদি আইরাইটিস কোনো অন্তর্নিহিত অটোইমিউন বা সংক্রামক রোগে কারণে হয়, তাহলে সেই অবস্থার চিকিংসা করাও খুব তাড়াতাড়ি দরকার।
আইরাইটিস থেকে সাবধানতা অবলম্বন :
চোখের সুরক্ষায় যদি আপনার আইরাইটিসের ইতিহাস থাকে, তাহলে আঘাত থেকে চোখকে রক্ষা করা অপরিহার্য। এই ক্ষেত্রে Protective Glass ব্যবহার করা উচিৎ। অন্তর্নিহিত রোগের চিকিৎসা যদি আপনার আইরাইটিস রোগের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তার চিকিৎসা ভীষণভাবে প্রয়োজন। নোংরা হাতে চোখ স্পর্শ করা এড়িয়ে চলুন এবং আপনার contact lens এর পরিচ্ছন্নতা মেনে চলুন।
আইরাইটিস সাধারণত বিভিন্ন ধরনের অস্বস্তিকর এবং কখনও কখনও উদ্বেগজনক হয়ে যায়। যার মধ্যে রয়েছে চোখব্যথা।
যার তীব্রতা হালকা থেকে তীব্র পর্যন্ত হতে পারে। এটি প্রায়শই আক্রান্ত চোখে গভীর, যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা হিসাবে বর্ণনা করা হয়।
আইরাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই আলো অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে (ফটোফোবিয়া)।
এমনকি ঘরের স্বাভাবিক আলোও বেদনাদায়ক হতে পারে। ঝাপসা দৃষ্টিতে দৃষ্টিশক্তির ব্যাঘাত ঘটায়।
মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে অসুবিধা হতে পারে। কারণ প্রদাহ চোখের প্রবেশকারী আলোর পরিমাণ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। বিচ্ছিন্নকরণ প্রদাহের প্রতি চোখের প্রতিক্রিয়ার ফলে অতিরিক্ত জল পড়া হতে পারে। আক্রান্ত চোখের মণি ছোট (সংকুচিত) হতে পারে। তাই এ থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

আইরাইটিস কি সংক্রামক না অ-সংক্রামক?
মনে রাখতে হবে আইরাইটিস ভাইরাসজনিত, ব্যাকটেরিয়াজনিত বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণের কারণে হতে পারে। এই সংক্রমণগুলি সরাসরি চোখকে প্রভাবিত করতে পারে অথবা চোখে ছড়িয়ে পড়া সিস্টেমিক সংক্রমণের ফলে হতে পারে। আবার অ-সংক্রামক কারণ বেশিরভাগ আইরাইটিস-এ শ্রেণীতে পড়ে। অ-সংক্রামক কারণগুলির মধ্যে রয়েছে অটোইমিউন রোগ (যেমন, অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস), চোখে আঘাত এবং ইডিওপ্যাথিক (অজানা) কারণ। তাছাড়া ঝুঁকির কারণেও কিছু নির্দিষ্ট আইরাইটিস বাড়াতে পারে : অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা, বিশেষ করে যারা সংযোগকারী টিস্যুকে প্রভাবিত করে, তাদের ঝুঁকি বেশি থাকে। অ-সংক্রামক কারণ বেশিরভাগ আইরাইটিস এই শ্রেণীতে পড়ে।
পরিশেষে বলব রোগ নির্ণয়ে যদি আপনার আইরাইটিসের লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে দ্রুত চিকিৎসার পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ আইরাইটিস নির্ণয়ের জন্য চোখের সামনের অংশ পরীক্ষা সহ একটি বিস্তৃত চক্ষু পরীক্ষা করবেন। অন্তর্নিহিত কারণগুলি সনাক্ত করার জন্য রক্ত পরীক্ষা বা ইমেজিংয়ের মতো অতিরিক্ত পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। আইরাইটিস চিকিৎসার লক্ষ্য হলো প্রদাহ কমানো, লক্ষণগুলি উপশম করা, জটিলতা প্রতিরোধ করা এবং যেকোনো অন্তর্নিহিত কারণ মোকাবেলা করা। এক্ষেত্রে জীবনধারা পরিবর্তন। চোখের আঘাত বা জ্বালাপোড়ার সংস্পর্শের মতো সম্ভাব্য কারণগুলি এড়িয়ে চললে রোধ করা যেতে পারে। আইরাইটিসের পুনরাবৃত্তি এবং জটিলতা প্রতিরোধে করা একবার রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা করা হয়ে গেলে, সম্ভাব্য জটিলতাগুলির জন্য নজরদারি করা গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কৌশল অবলম্বন করতে পারলে ভালো হয়। আপনার চক্ষু বিশেষজ্ঞের সাথে নিয়মিত ফলো-আপ অ্যাপয়েন্টমেন্ট নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার আইরাইটিসের লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসার পরামর্শ নিয়ে গুরুত্ব নিশ্চিত করুন।
ডা. তনুশ্রী চক্রবর্তী, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, দৃষ্টিদীপ আই ইনস্টিটিউট, ডানকুনি, হুগলি, মোবাইল : ৮০১৭৩০৯০৫৮
অনুলিখন মোহন গঙ্গোপাধ্যায়
ছবি ইন্টারনেট।
Very Good post.. Madam
খুব ভালো লাগলো ম্যাডাম।অনেক কিছু জানা গেল।