ঊনআশিতম স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী যে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মিশন বা জনবিন্যাস মিশন ঘোষণা করেন তারপর কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে — এই মিশন কী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অসহায় মানুষের জীবনযাপনের মানোন্নয়নের কথা ভেবে নাকি দেশের মানুষের মধ্যে ধর্ম ও জাত নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করার সরকারি পরিকল্পনা, নাকি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করে দেশ থেকে তাড়ানোর নামে অসহায় শরণার্থী ও সংখ্যালঘু মানুষের উপর নিপীড়ন নামিয়ে আনার সরকারি প্রচেষ্টা। হতে পারে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের খাওয়া-পড়া-থাকা বা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কাজের সংস্থানের মতো অত্যন্ত জরুরি বিষয়গুলিকে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। এই সব প্রশ্ন তৈরি হওয়ার কারণ হল, আগামী পনেরো বছর পর্যন্ত এই দেশে কাজের যোগ্য মানুষের সংখ্যা বছরে প্রায় ১.২ কোটি করে বাড়বে। এত সংখ্যক কাজের উপযোগী মানুষকে যদি সঠি জায়গায় ঠিকঠিকভাবে কাজে লাগাতে হয় তাহলে দেশে প্রতিবছর ৮৫ থেকে ৯০ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে, একথা বিশেষঙ্গরাই বলছেন। কিন্তু সরকারি তথ্য জানাচ্ছে, গত চার দশকের মধ্যে গ্রাম শহর মিলিয়ে গড় বেকারত্বের হার যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তা সর্বোচ্চ এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধির এটিও একটি অন্যতম কারণ। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে আমরা রয়েছি একেবারে নীচের দিকে। তার উপর দু’বেলা দু’মুঠো খেতে না পাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। এসব দেখেশুনেও মোদী সরকার বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্ট দেখিয়ে দেখিয়ে ধেই ধেই করে নাচছে, কেননা ওই রিপোর্টে নাকি লেখা আছ দেশে বৈষম্য কমেছে, দারিদ্রও কমেছে অনেকটা। অর্থাৎ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকা নিয়ে এর থেকে বড় ঠাট্টা আর কি হতে পারে?
সাধারণভাবেও যদি আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থাটি বুঝবার চেষ্টা করি তাহলেও প্রশ্ন থাকে যে জিডিপি দেখে কী দেশের মানুষের জীবনমানের আসল চেহারাটি আন্দাজ করা সম্ভব? এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে দেশের জিডিপি বাড়ছে। কিন্তু পাল্লা দিয়ে দেশের মানুষের আয় বৈষম্য এবং সম্পদ বণ্টনের অসমতাও যে ভীষণভাবে বাড়ছে সেকথাও তো মনে রাখতে হবে। আয় ও সম্পদ বণ্টনের অসাম্য সমাজে কেবল আর্থিক বৈষম্য তৈরি করে না পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়, সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা যার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হন। কয়েকদিন আগেই তবু বিশ্ব ব্যাঙ্কের একটি রিপোর্ট নিয়ে সরকার হইচই পাকিয়ে দিল। কেননা সেই রিপোর্ট নাকি বলছে, ঠিক এই সময়ে ভারতে বৈষম্যের হার ক্রমশই নাকি নীচের দিকে নামছে ফলে দারিদ্রও কমেছে পাল্লা দিয়ে। আসলে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার এই ধরনের কলাকৌশল তো আছেই পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাঙ্কের উল্লেখিত রিপোর্ট মোদী সরকারকে লম্ফঝম্ফ করার যথেষ্ট অক্সিজেন জুগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে যখন সেটি প্রচার করা হচ্ছে তখন একবারের জন্য একবারও উল্লেখ করা হল না যে, বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট হলেও তার সত্যতা নিয়ে কেবল আমাদের দেশের নয় বরং গোটা বিশ্বের বহু অর্থনীতিবিদ ও গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন। বিতর্কের ঝড় উঠেছে, ওঠাটাই তো স্বাভাবিক কারণ, বিশ্বব্যাংকের ওই রিপোর্টের সঙ্গে ভারতের প্রকৃত অর্থ সামাজিক চিত্র সঙ্গে একেবারেই মেলে না। উল্লেখ্য, ভারতে রীতিনীতি মেনে নিয়ম করে সম্পদ শুমারি হয় না, তাই এই ধরনের সমীক্ষার ক্ষেত্রে সম্পদের কেন্দ্রীকরণের প্রকৃত চিত্র তাই প্রতিফলিত হয় না। তাছাড়া, শুধু আয় দেখলেই তো চলে না, এদেশে সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য, ভোগের বৈষম্য, সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তো বৈষম্য রয়েছে, তাহলে সঠিক পরিমাপ ছাড়া ‘দেশে বৈষম্য কমেছে’ — এমন একটা মন্তব্য কী করে দেওয়া যায় না সেটা যুক্তিযুক্ত।
আসল কথা মোদী তাঁর ভাষণেই বলেছেন, “আজ, আমি জাতির জনসংখ্যা পরিবর্তনের একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতিকে সতর্ক করতে চাই, যার বীজ ইতিমধ্যেই বপন করা হয়েছে”। এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ঘোষণা যে আসলে জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার নামে সংখ্যালঘুদের ওপর নজরদারি ও জরিপ চালানোর পদক্ষেপ তা বলাই বাহুল্য। মোদী তাঁর বক্তৃতায় আরও বলেছেন, অবৈধ অভিবাসীরা দেশের নিরাপত্তার জন্য ভয়ঙ্কর সমস্যা হয়ে উঠেছে। অনেকেই জাল নথিপত্র ব্যবহার করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, যাদের অনেককে বাংলাদেশি বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ‘এই অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের বোন ও কন্যাদের লক্ষ্যবস্তু করছে, আদিবাসীদের বিভ্রান্ত করছে এবং তাদের জমি দখল করছে। এটি সহ্য করা উচিত নয়।’ মোদীর এই জনবিন্যাস মিশন আগামী দিনের জন্য কেবল বিপজ্জনক নয়, এ দেশের জনবিন্যাসগত বিন্যাসকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে ফেলবে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বা জনবিন্যাস মিশন সব দিক থেকেই বিজেপি, আরএসএসের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বছরের পর বছর ধরে, বিজেপি এবং আরএসএস জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে অনুপ্রবেশ, ধর্মীয় ধর্মান্তর এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্যমূলক প্রজনন হারের সাথে যুক্ত করে এসেছে- এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক মাত্রার সঙ্গে একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে উপস্থাপন করছে। তারা কখনই জনবিন্যাসকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, এ দেশের সার্বিক বিকাশ অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রগতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর অন্তর্ভুক্তির সুযোগের কথা বলছে না। বরং বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার দেশের সংবিধানের মূল মর্মবস্তুকে মান্যতা দেওয়ার বদলে অস্বীকার করে চলেছে। তাই নতুন আঙ্গিকের জনবিন্যাস মিশন গড়ে তোলার অর্থ মানুষে মানুষে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি।