ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে মাইলস্টোন ফলক ‘শোলে’। রমেশ সিপ্পির পরিচালিত এই সিনেমা আজকের দিনে ৫০ বছর পূর্ণ করল। মাঝের পাঁচ দশকে বদলে গেছে অনেক কিছু কিন্তু এখনও গব্বর সিংয়ের ভয়াবহ চরিত্র থেকে শুরু করে ‘বাসন্তী’, মৌসি, সুরমা ভুপালি, ঠাকুর, রাধা, জয়-বীরুর বন্ধুত্ব পর্যন্ত, ‘ইন কুত্তো কে সামনে মত নাচনা, বাসন্তী!’,” কিতনে আদমি থে? ” কিংবা ‘যো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া’,…অকিঞ্চিৎতম ডায়লগ, গান এবং গল্প এখনও মানুষের মুখে মুখে।বলিউডের সিনেমাগুলির ব্যবসা থেকে অভিনেতাদের পারিশ্রমীক, নানান তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা, মাঝেমধ্যেই উঠে আসে আলোচনায়।শোলের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে এই সিনেমা সৃষ্টির নেপথ্যে গল্প, সংগ্রাম এবং বিভিন্ন ঘটনার গল্প বলবো আজকের লেখায়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, “শোলে” ভারতীয় থিয়েটারগুলিকে এমনভাবে আলোকিত করে তুলেছিল, যা আজও উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে। কিন্তু শোলের যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিলো না। রামগড়ের শুকনো, ধূসর পাথুরে পাহাড়ি প্রান্তরের মতোই দুর্গম ছিলো সেই পথ।১৯৭৫ সালে বোম্বে এক অপ্রত্যাশিত স্বপ্ন নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল। রমেশ সিপ্পি এবং তার পরিবারের সিপ্পি ফিল্মস শোলেতে ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল, সেই যুগে এটি ছিলো বিশাল এক সিনেমাটিক জুয়া।

সিনেমা লেখক ছিলেন সেলিম খান আর জাভেদ আখতার। নতুন এই জুটি তখন নতুন মাস মাইনে চাকরিতে বহাল হয়েছেন সিপ্পি ফ্লিমসে।নতুন এক ধরনের গল্পের খোঁজ করছিলেন রমেশ এবং জি পি সিপ্পি। জুটি অনেকদিন আগে খেরো খাতার পাতায় লেখা এই গল্পের পটভূমিকা শুনালেন সিপ্পিদের।ছবিটির মূল ধারণাটি ছিল একজন সেনা কর্মকর্তার সাথে, যিনি তার পরিবারের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দুজন প্রাক্তন সৈন্যকে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন। সেনা কর্মকর্তাকে পরে পুলিশে পরিবর্তন করা হয় কারণ সিপ্পি মনে করেছিলেন যে সেনাবাহিনীর কার্যকলাপ চিত্রিত করার দৃশ্যের শুটিংয়ের অনুমতি পাওয়া কঠিন হবে।
সেলিম-জাভেদ এক মাসের মধ্যে চিত্রনাট্যটি সম্পূর্ণ করেন, তাদের বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিতদের নাম এবং ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত করে। সেলিমের বাবা ছিলেন ইন্দোর শহরের পুলিশের বড়কর্তা, তার কাছ থেকেই গল্প শুনে তৈরি করা হয়েছিল গব্বরের চরিত্র। সেনানায়ক পরিবর্তিত হয় পুলিশ অফিসার ঠাকুর বালদেবসিংহে আর দুই সাহসী অফিসারের চরিত্র পরিবর্তিত হয় জয় ও বীরু নামক দুই জেল ফেরত আসামিতে। বাকিটা ছিল ইতিহাস।

বেঙ্গালুরু থেকে মাত্র ৪০ কিমি দূরের ‘রামানগরম’ জায়গাটি একসময় ‘সিপ্পি নগর’ নামে পরিচিত ছিল, কারণ এখানেই শোলে-র শুটিং চলেছিল টানা কয়েক বছর। শিল্পনির্দেশক রাম ইয়েদকার জায়গাটি আবিষ্কার করেছিলেন। প্রায় একশজন মানুষকে কাজে লাগিয়েছিলেন এই জায়গাটিকে সেটে পরিণত করতে। বাড়ি ঘরদোর, বাজার, মসজিদ, ঠাকুর বলদেব সিং এর বাড়ি, রাস্তা, ডাকু গব্বরের ডেরা,গাড়ি, ঘোড়া মেকআপ রুম, বিশ্রামের জায়গা, গুদামঘর, প্রচুর যন্ত্রপাতি, খাবার দাবার, উন্মুক্ত জায়গায় সবকিছু পরিবেশন করতে সময় লেগেছিল প্রায় দু’বছর শুধু তাই নয় তার সঙ্গে বিপুল খরচাও হয়েছিল।
ছবিতে আপনারা যে কুঁড়েঘরগুলি দেখছেন, সেগুলি সবই ছিল শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত। ভেতরে ছিল সুন্দর আসবাবপত্র সাজানো মেকআপ রুম, শৌচাগার সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা।
রামগড় একসময় গমগম করত বন্দুকের গর্জন, ঘোড়ার টগবগ আওয়াজ, আর প্রতিধ্বনিত হত গব্বর সিংয়ের ভয়ঙ্কর সংলাপে। যদিও আজ তা শান্ত, সবুজে মোড়া ‘রামদেবরা বেত্তা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’, যেখানে বসবাস বিপন্ন প্রজাতির শকুনের।
শোলে ছিল প্রথম ভারতীয় ফিল্ম যেখানে স্টেরিওফোনিক সাউন্ডট্র্যাক ছিল এবং ৭০ মিমি ওয়াইডস্ক্রিন ফর্ম্যাট ব্যবহার করা হয়েছিল। যাইহোক, যেহেতু প্রকৃত ৭০ মিমি ক্যামেরা সে সময় ব্যয়বহুল ছিল, ফিল্মটি প্রথাগত ৩৫ মিমি ফিল্মে শ্যুট করা হয়েছিল এবং ৪:৩ ছবিকে পরবর্তীতে ২.২:১ ফ্রেমে রূপান্তরিত করা হয়েছিল।

শোলের কাস্টিং এর ঘটনাও বেশ মজার। রমেশ সিপ্পির কাছে অভিনেতা ড্যানি ডেনজংপা ছিলেন গব্বর সিংয়ের জন্য প্রথম পছন্দ, কিন্তু তিনি আফগানিস্তানে ধর্মাত্মা ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত, এই চরিত্রে অভিনয় করতে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। দিলীপ কুমার ঠাকুর বলদেব সিংয়ের ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ধর্মেন্দ্র প্রথমে ঠাকুরের চরিত্রে অভিনয় করতে চেয়েছিলেন, এবং সঞ্জীব কুমার গব্বরের চরিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী ছিলেন।
শোলেতে প্রেমের সম্পর্ক থাকা অভিনেতারা পর্দার বাইরেও জুটি ছিলেন। ১৯৭৩ সালে অমিতাভ বচ্চন জয়া ভাদুড়ির বিয়ে হয়। শুটিংয়ের সময় জয়া তিন মাসের গর্ভবতী ছিলেন। ব্যাঙ্গালোরের একটি হোটেল থেকে অমিতাভ নিজে গাড়ি চালিয়ে জয়াকে নিয়ে আসতেন শুটিং ফ্লোরে। গর্ভাবস্থায় থাকাকালীন জয় বচ্চনের প্রায় সময় শখ হতো বিরিয়ানি খাওয়ার। একবার তো অমিতাভ, জয়া আর ধর্মেন্দ্র বিরায়ানি খেতে গিয়ে মাঝরাতে গাড়ি খারাপ হয়ে যায়।অবশেষে তিনজন মিলে অটোরিক্সা চেপে হোটেলে ফিরেছিলেন।তাদের মেয়ে শ্বেতা বচ্চনের জন্ম ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে।

সেই সময়কার অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ধর্মেন্দ্র-হেমা মালিনী এই ছবিতে সিলেকশন ছিল আগে থেকেই।
ধর্মেন্দ্র শোলের আলো সহকারীদের হাত করেছিলেন যাতে হেমা মালিনীর সাথে তার রোমান্টিক দৃশ্যের বেশ কয়েকটি রিটেক করা যায় যাতে তিনি তার সাথে আরও বেশি সময় কাটাতে পারেন। তারা ১৯৮০ সালে বিয়ে করেছিলেন, যদিও ধর্মেন্দ্র ইতিমধ্যেই বিবাহিত ছিলেন এবং তার প্রথম স্ত্রীর সন্তানও ছিল। শোলের শুটিং এর সময় সঞ্জীব কুমার হেমামালিনিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন যদিও সেটি প্রত্যাখাত হয়।
চলচ্চিত্রের প্রথম অ্যাকশন দৃশ্যে, যেখানে দস্যুরা চলন্ত ট্রেনে আক্রমণ করে, সেখানে তিনজন ব্রিটিশ স্টান্টম্যান ছিলেন। তাদের প্রত্যেককে ৫০,০০০ টাকা (১৯৭৫ সালে ৫,৭০০ ডলারেরও বেশি) ফি এবং জীবন বীমা কভারেজ দেওয়া হয়েছিল। চলমান ট্রেন থেকে লাফ দেওয়ার পর অবতরণ করার সময় তিনবার সামারসল্ট করা স্টান্টের মধ্যে ছিল।
ছবিটি মূলত ঠাকুর বলদেব সিংহের লাথি মেরে গব্বর সিংহকে হত্যা করার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল, কিন্তু ভারতীয় সেন্সর বোর্ড এই সহিংস সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ঠাকুর একজন বন্দী গব্বরকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

মনে পড়ে সুরমা ভোপালি আর জেলের নাপিত হরিনাম কে? এরা কিন্তু দুজনেই সেলিমের পরিচিত দুই চরিত্র। সবচেয়ে অবাক কান্ড হলো বাস্তব জীবনে ঠাকুর বলদেব সিং এর চরিত্রটি ছিলেন সেলিমের শ্বশুরমশাই। এক বজ্ঞা মানুষটি মেয়ের সঙ্গে মুসলিম ছেলের বিয়ে কোনদিন মেনে নিতে পারেনি। তাই তাদের সঙ্গে প্রায় ৭ বছর এই ফ্যামিলির কোন যোগাযোগ ছিল না।
‘আংরেজ জামানে কি জেলার’ এর জন্য ডাক পড়েছিল আসরানির । পুণে ফ্লিম ইনস্টিটিউটে পড়বার সময় জাভেদ শুনেছিলেন হিটলারের গলার আওয়াজ, দেখেছিলেন তাঁর নানা ভঙ্গিমার ছবি। এই চরিত্রে তাই তিনি জুড়ে দিলেন দ্য গ্রেট রেস ছবির অভিনেতা জ্যাকলিনের “হা হা!”।
ছবিটি তৈরি করতে আড়াই বছর সময় লেগেছিল এবং বাজেটের চেয়েও বেশি খরচ হয়েছিল। এর ব্যয় বেশি হওয়ার একটি কারণ ছিল সিপ্পি তার পছন্দসই প্রভাব অর্জনের জন্য অনেকবার দৃশ্যগুলি পুনরায় চিত্রায়িত করেছিলেন। “ইয়ে দোস্তি”, একটি ৫ মিনিটের গানের দৃশ্য, যার শুটিং করতে সময় লেগেছিল ২১ দিন। আলোর সমস্যার কারণে রাধা প্রদীপ জ্বালানোর দুটি ছোট দৃশ্যের শুটিং করতে সময় লেগেছিল ২০ দিন, এবং গব্বর ইমামের ছেলেকে হত্যা করার দৃশ্যের শুটিং ১৯ দিন স্থায়ী হয়েছিল।

রেলগাড়ি একশন সিকোয়েন্স তোলা হয়েছিল বম্বের কাছে পানভিল উড়ান লাইন ধরে। যেখানে সারাদিন স্টিম ইঞ্জিন লাগিয়ে চলাচল করতে মাত্র দুটি ট্রেন। রেলপথে ট্রেন ডাকাতির দৃশ্যটি চিত্রায়িত করতে ৭ সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল।
“মেহবুবা মেহবুবা” গানটি গেয়েছিলেন এর সুরকার আরডি বর্মণ, যিনি তার অদম্য প্রচেষ্টার জন্য প্লেব্যাক গাওয়ার জন্য একমাত্র ফিল্মফেয়ার পুরষ্কারের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। গানটি ধর্মীয়, লোকজ এবং ধ্রুপদী সঙ্গীতের একটি অনন্য মিশ্রণ এই গানটি গ্রীক গায়ক ডেমিস রুসোসের “সে ইউ লাভ মি” গানের উপর ভিত্তি করে তৈরি তৈরি হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট, মিনার্ভা থিয়েটারের বাতাস ছিল ঘন, আশায় ভরপুর। পর্দায় গর্জে উঠল শোলে– জয় আর বীরুর রামগড়ে চড়ে আসা, ঠাকুরের বাহুবিহীন প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা, গব্বরের কণ্ঠস্বর। ৭০ মিমির দৃশ্যগুলো চমকে উঠল, বর্মণের সুর গর্জে উঠল, তবুও দর্শকরা এক অদ্ভুত নীরবতায় বসে রইল। না তালি, না সিটি।মিনার্ভা যেন নিস্তব্ধ শোকার্তদের শ্মশানে ভরা থিয়েটারে পরিণত হলো।স্টলগুলোতে ফিসফিসানি ভেসে আসছিল ফ্লপ, বিপর্যয়।

বাঁদিক থেকে আমজাদ খান, অমিতাভ বচ্চন, সঞ্জীবকুমার, পরিচালক রমেশ সিপ্পি, ধর্মেন্দ্র এবং সিনেমাটোগ্রাফার দ্বারকা দিভিচ্চা। ফটো কার্সি সিপ্পি ফিল্মস
তারপর…. একটা স্ফুলিঙ্গ। দ্বিতীয় সপ্তাহে, বোম্বের গলিতে আশার আলো জ্বলে উঠল। মাতুঙ্গায়, পরিবারগুলিতে “ইয়ে দোস্তি” গুনগুনিয়ে উঠল। দাদারের চায়ের দোকানগুলিতে “কিতনে আদমি থে?” প্রতিধ্বনিত হল। কলেজের ছাত্ররা জয়ের কয়েন টস, বাসন্তীর বকবক অনুকরণ করল। সেলিম-জাভেদের তীক্ষ্ণ সংলাপ ভারতের শিরা-উপশিরায় মিশে গেল, দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ভিড় মিনার্ভায় ফিরে এল, তারপর বেড়েও গেল। টিকিট উধাও; কালোবাজারের দাম চড়তে লাগলো। এই সিনেমা হলেই দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে শোলে চলেছিল।
ভারতজুড়ে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে গেল। কলকাতা শোলে ভক্তদের দুর্গে পরিণত হল। অস্থায়ী এবং ধুলোময় গ্রামীণ পর্দায় “জো ডার গয়া, সমঝো মার গয়া” ধ্বনি ভেসে উঠল। বর্মণের সুর — “মেহবুবা মেহবুবা”, “হান জব তক হ্যায় জান” — রেডিও থেকে বেজে উঠল, শহরগুলিকে গ্রামাঞ্চলে একত্রিত করে। গব্বর যাকে ব্যঙ্গ চরিত্র হিসেবে উপহাস করা হয়েছিল, ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ খলনায়ক হিসেবে উঠে এল তার সংলাপ। শোলে ব্যর্থ হয়নি — যা আজ ৫০ পেরিয়েও থেকে গেছে স্বমহিমায়।
অসাধারণ একটি পুরনো সিনেমা নিয়ে লেখা
অসাধারণ একটি পুরনো সিনেমা নিয়ে লেখা। খুব ভালো লাগলো লেখাটি
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে