বিন্ধ্য পর্বতমালার আড়ালে রাতের অন্ধকারে শিশুসূর্য যেন লুকিয়ে কোথাও বসে ছিল!সময় হতেই পূব আকাশে রঙ নিয়ে তার ছেলেখেলা। সে রঙিন আলোর নরম স্পর্শে জেগে উঠল মান্ডুর পাহাড়-টিলা ঘেরা জনপদ। নিচে নিমাড় উপত্যকার শাল,সেগুন,মহুয়ার ঘন জঙ্গলের অন্ধকারের বুক চিরে আলোর তরবারি। এ এক নতুন সকালের শুভারম্ভ!

কুয়াশার পর্দা ভেদ করে একদল ভীলনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রামের প্রান্তে অবস্থিত প্রাচীন রেওয়া কুন্ডের দিকে। তাদের পরনে রঙিন ঘাঘরা, মাথায় ওড়না, কোমরে মাটির কলসী। পথের ক্লান্তি ভুলতে তাদের কণ্ঠে নিমাড়ি লোকগীত,
“বাজ বাজ বাজ বাহাদুর আয়ো
রূপমতী কে ঘর ভোর ভঈয়ো
চন্দা জহসন সুরত দেখ কে
দিলওয়া হমর খুশ হোঈয়ো।”
পায়ে পায়ে তারা পৌঁছে যাচ্ছে রেওয়া কুন্ডের ধারে, যেখানে জল স্বচ্ছ আয়নার মতো নিঃশব্দ।

প্রেমের প্রতিজ্ঞায় তৈরি হয়েছিল এ রেওয়া বা রেবা কুন্ড। কুন্ডের টলটলে জলে স্বয়ং নর্মদা প্রতিফলিত হন। নর্মদার ডাক নামও যে রেবা!
ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধের কোনো এক সময়ে মালবের আফগান সুলতান বাজ বাহাদুর তার প্রেয়সী রূপমতীকে উপহার দিলেন একটি মহল আর তার লাগোয়া এই জলাধার।

লোককথা বলে রূপমতী নর্মদার বরপুত্রী। মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার ধরমপুরীর পাশ দিয়ে বয়ে যায় নর্মদার অবিচল ধারা।সেই পবিত্র জলধারায় ব্রাহ্মণ সন্তান যদুরাইয়ের নিত্য অবগাহন আর প্রার্থনা, সন্তান আসুক তাঁর নিঃসন্তান স্বচ্ছল পরিবারে। মনোকামনা পূর্ণ হলে প্রথম সন্তানকে তবে ভাসিয়ে দেবেন নর্মদার জলে! সেই পূজার অর্ঘ্যেই নর্মদা সন্তুষ্ট হবেন। ভ’রে উঠবে যদুরাইয়ের শূন্য অঙ্গন শিশুদের কলকাকলিতে। দেবী নর্মদা কথা রেখেছিলেন তবে যদুরাইয়ের প্রথম সন্তানকে তিনি গ্রহণ করেন নি। ঘাটের কিনারে আটকে থাকা সেদিনের সেই নবজাত শিশুকন্যাটি আগামীতে রূপ আর গুণের আলো ছড়িয়ে ইতিহাসে, লোককথায় রূপমতী নামে ভাস্বর হয়ে রইলেন।

আজন্ম নর্মদার পূজারিণী রূপমতী কি একদিন তাঁর প্রিয় রাগ মেঘমল্হার গাইছিলেন রেবার তটে! অবরোহের কোমল গান্ধার ছুঁয়ে যাচ্ছিল তাঁর সুরেলা কণ্ঠ! এক বিধর্মী রাজকুমার গান শুনে থমকে দাঁড়ালেন। তিনিও যে সুরের উপাসক। রাজপাট তাঁর ভালো লাগে না। হয়তো সেকথা মনে করে একালের কবি গাইলেন, —
“সে দিন এমনি মেঘের ঘটা রেবানদীর তীরে,
এমনি বারি ঝরেছিল শ্যামলশৈলশিরে।
মালবিকা অনিমিখে চেয়ে ছিল পথের দিকে,
সেই চাহনি এল ভেসে কালো মেঘের ছায়ার সনে”।

সুরের বাঁধনে বাঁধা পড়ল তাঁদের দুটি প্রাণ। মালবের সংগীতপ্রেমী সুলতান বাজ বাহাদুর রূপমতীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিলেও রূপমতী মনে করতেন তিনি আর নর্মদা — দুইজনেই প্রকৃতির সন্তান। স্বাধীন, অবাধ তাঁদের গতি। বিধর্মীকে বিয়ে করে তিনি ধর্মত্যাগ করবেন না। তাঁর জীবন স্রোত, সুরের ধারা মিলে গেছে নর্মদার বহমানতায়। কেমন করে তিনি বিচ্ছিন্ন হবেন তার থেকে! মান্ডুর পার্বত্য দুর্গের কঠিন প্রাসাদের প্রাচীরে যে তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাবে! ছিন্ন হবে নর্মদার সঙ্গে ভাবের আদান প্রদান।

প্রেমিক রাজা বললেন, আমি তোমার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় এক প্রাসাদ গড়ে দেব যেখানে থেকে তুমি প্রতিদিন দেখতে পাবে নর্মদার রূপ। যেন সে তোমার সঙ্গেই থাকে, প্রতিটি প্রাতে, প্রতিটি সন্ধ্যায়। আমাদের প্রতিটি স্বপ্নে, মিলনে নর্মদা সাক্ষী থাকবে। প্রতিটি প্রহর তোমার গানে সে নীরবে সাড়া দেবে।’

বাজবাহাদুর-রূপমতীর প্রেম এই কাহিনীতে জল শুধু দৃশ্যপট নয়, বরং এক নীরব কিন্তু প্রধান চরিত্র হয়ে রয়ে গেল। মালবের এই পার্বত্য দুর্গ শহরকে ঘিরে জলের এক অসাধারণ ভূমিকা আছে, যা রূপমতীর প্রেমের মতই মহান। রূপমতীর প্রেম আর সংগীত যদি মান্ডুর প্রাণের স্পন্দন হয়, তবে জল ছিল মান্ডুর প্রধান চালিকাশক্তি। জলের ব্যবস্থাপনাই ছিল শহরটির অস্তিত্ব, প্রতিরক্ষা, কৃষি ও জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ভূগর্ভস্থ জলের অপ্রতুলতায় এখানে রেওয়া কুন্ডের মত সাগর তালাও, মুঞ্জ তালাও, কাপূর তালাও এবং অসংখ্য স্টেপ ওয়েল বা বাওলি নির্মিত হয়েছিল যা এখনো বর্তমান। মুঞ্জ তালাওটির নির্মাণ আনুমানিক দশম শতাব্দীতে। পারমার বংশের রাজা মুঞ্জের আমলে।

মান্ডুর পার্বত্য পরিবেশ এবং নিচে নিমাড় উপত্যকার গভীর অরণ্য বৃষ্টিকে সহজেই আহ্বান করে। বৃষ্টির জলকে সংগ্রহ করে রাখার এক অনন্য প্রয়াস ছিল মান্ডুর জল ব্যবস্থাপকদের।
জল পরিশোধনে ব্যবহৃত হত প্রাকৃতিক ছাঁকনি। বিভিন্ন স্তরের পাথর ও বালি ব্যবহার করে জল ছেঁকে বিশুদ্ধ করা হত।
চম্পা বাওলি-তে এমন এক ব্যবস্থা ছিল, যেখানে নিচের স্তরে খনিজ পাথরের ফিল্টার ছিল। পানীয় জল, স্নানের জল ও নিকাশি ব্যবস্থার জন্য আলাদা জলাধার ব্যবহার হত, যাতে দূষণ না ঘটে।

জল সংবাহন ব্যবস্থাতেও দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ হয়ে আছে মান্ডু। পাহাড়ের উচ্চ স্থান থেকে নিচের দিকে ঢালু নালার মাধ্যমে জল সরানো হত — কোনও পাম্প ছাড়াই। জল এক স্থান থেকে আরেক স্থানে সরানোর জন্য ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গ বা কণা তৈরি করা হত। কিছু জলাশয়ের সাথে যুক্ত ভূগর্ভস্থ পাইপ ছিল যা প্রাসাদের মধ্যে জল পৌঁছে দিত। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক শক্তি নির্ভর মান্ডুর জল ব্যবস্থা ছিল প্রতিরক্ষা, নিত্য প্রয়োজন এবং সৌন্দর্যের আধার।
জল এখানে স্মৃতি,
জল এখানে প্রেম, অশ্রুধারা
হয়তো বা কুয়াশা ঢাকা ইন্দ্রজাল।
কোনো এক সময় রাজা জল কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেছিল,
তুই এখানে আসিস না কেন রে!

তারপর থেকে মান্ডুর জলকণারা দেওয়াল বেয়ে গড়িয়ে চলে যায় না,
চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে।
পুকুরের ধারে কেউ পুরোনো গজল গুনগুন করে,
বাওলির প্রতিটি সোপানে ঘোমটা মাথায় বসে থাকে সময়।
রূপমতী মহলের আকাশে যে কালো মেঘ ঘন হয়ে আসে,

সে শুধু বৃষ্টি আনে না,
জলের পাকদন্ডী তৈরি করে।
রাগ মল্হার গুঞ্জরিত হয় হিন্দোলা মহলের অলিন্দে,
জাহাজ মহলের ঝরোকায়,
কুন্ডের শীতল জলে,
মান্ডুর প্রতিটি গলি-মহল্লায়।

তোমার লেখার সাথে মানসভ্রমণ হল। অপূর্ব। সাথের ছবিগুলো ভারি সুন্দর।
Wonder writing skill. Keep it up.
ভালো লেখা। সুন্দর ছবি।