শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৪:৩৬
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

প্রেমের গুরু, গুরুর প্রেম : সন্দীপন বিশ্বাস

সন্দীপন বিশ্বাস / ১০৮১ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০২৫

সেই নরম হলুদ রোদের দিনগুলো বুঝি আমরা হারিয়ে ফেলেছি! আশ্চর্য মন কেমন করা দিন! সকালে আকাশবাণীর বাঁশির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙত। সকাল ন’টায় সাইরেনের শব্দে ঘড়ি মিলিয়ে নেওয়া, রবিবারের দুপুরের অনুরোধের আসরের সেই মনমাতানো গান, রাত সাড়ে ন’টায় ছায়াছবির গান। শুক্রবারে রাত আটটায় বেতার নাটক। তার সঙ্গে ছিল, বাজারের উত্তাপ, রাজনৈতিক ডামাডোল। ছিল চীনের আক্রমণ, পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ছিল নকশালদের বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা এবং দিনবদলের স্বপ্ন। এই সব কিছুর মধ্যে বাঙালি জীবন পেয়েছিল এক পূর্ণতা। অভাবের মধ্যেও বাঙালি খুঁজে পেত প্রাপ্তির আনন্দ। বাঙালির ছিল এক নিজস্ব জীবনদর্শন। এক নিজস্ব সংস্কৃতি. আজকের মতো পাঁচফোড়ন সংস্কৃতির গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দিতে চায়নি। নাটক, সিনেমা, সঙ্গীত, নৃত্যের নিজস্ব জগৎ ছিল তার।

সেই সময় বাঙালির নিজস্ব অনেক আইকন ছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম সেরা ছিলেন উত্তমকুমার। তিনি ছিলেন এক স্বপ্নের ব্যক্তিত্ব। দূর গ্রহের অধরা স্বপ্নের পুরুষ হলেও তিনি ছিলেন যেন প্রতিটি পরিবারেরই সদস্য। নিত্যদিন তাঁকে নিয়ে চলত আলোচনা। কলকাতার দুপুরের কমলা রোদে মহিলারা দল বেঁধে দুপুরের খাওয়া সেরে মুখে পানের খিলি দিয়ে ম্যাটিনি শো দেখতে যেতেন। কলেজের ছেলেরা ক্লাস কেটে পঁয়ষট্টি পয়সার টিকিটের লাইনে দাঁড়াতেন। বড় বড় পোস্টারে উত্তমকুমার আর সুচিত্রার মুখ। কখনও ছবির নাম ‘পথে হল দেরি’, ‘সবার উপরে’, ‘সাগরিকা’ অথবা ‘গৃহদাহ’। প্রেক্ষাগৃহের বাইরে প্রচণ্ড ভিড়। উত্তমকুমারের ছবির একটা টিকিট চাই। ব্ল্যাকারদের পোয়াবারো। এক টাকা চল্লিশ পয়সার টিকিট বিক্রি হচ্ছে এক টাকা আশি পয়সায়, দু’টাকার টিকিট বিক্রি হচ্ছে আড়াই টাকায়। সারাদিনে তিন শো মিলিয়ে পকেটে এল সাড়ে আট থেকে দশ টাকা। ব্ল্যাকাররা কাঁধের রুমাল খুলে মুখের ঘাম মুছে উত্তমকুমারের পোস্টারের দিকে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার আগে বলত, ‘গুরু তুমি যুগ যুগ জিও।’

‘উত্তমকুমারের ছবি’ বলতে মেয়েরা তখন পাগল। পর্দায় প্রথম উত্তমকুমারের উপস্থিতি মানেই বহু মেয়ের বুকের ভেতর এক ঝাঁক পায়রা উড়ে যাওয়া। অ্যাড্রিনালিন গ্রন্থিতে ছলকে উঠত রক্ত। তাঁদের বইয়ের পাতায় কিংবা গানের খাতার ভিতরে থাকত খবরের কাগজ থেকে কাটা উত্তমকুমারের ছবি। পরিযায়ী সময় নিউজপ্রিন্টে ছাপা ছবিকে আজ বিবর্ণ করে দিয়েছে কিংবা সেই ছবি কোথায় হারিয়ে গিয়েছে, কে তার খোঁজ রাখে। সেই মানুষটিও বিদায় নিয়েছেন কতদিন হয়ে গেল। কিন্তু বিবর্ণ হয়নি তাঁর জনপ্রিয়তা, বিবর্ণ হয়নি তাঁর গ্ল্যামার, বিবর্ণ হয়নি সেলুলয়েডের ফ্রেম টু ফ্রেম ধরে রাখা তাঁর অভিনয়। যেন ফ্রেমবাঁধানো প্রেম। আজও যেন তাঁকে পর্দায় দেখলে বাঙালি অন্তর গেয়ে ওঠে, ‘আমার পরাণ যাহা চায় তুমি তাই, তুমি তাই গো!’ অন্তত তিনটে প্রজন্ম তাঁকে ঘিরে এমনই অবসেসড হয়ে আছে।

সময় বড় নির্মম! সে যে কাকে রাখবে, আর কাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে, কেউ জানে না। কিন্তু সময় জানে, কোন ধ্রুপদী শিল্পী ও শিল্পকে মানুষের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সুতরাং প্রশ্ন জাগে, কেন এই জনপ্রিয়তা, কেন এই ভালো লাগা, কেন মৃত্যুর এতদিন পরেও বর্ণিল হয়ে রয়েছে তাঁর অমৃতময় উপস্থিতি?

আসলে এক অদৃশ্য চৌম্বক শক্তি ছিল তাঁর মধ্যে। কী অসাধারণ তাঁর সম্মোহন শক্তি! সেটা কেউ বলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব, কেউ বলেন রূপ, কেউ বলেন তাঁর হাসির টান, কেউ বলেন কী গভীর প্রেমের দৃষ্টি, আবার কেউবা বলেন অমন অসাধারণ অভিনয় করতে কাউকে দেখিনি। আসলে উত্তমকুমার হলেন এই সমস্ত কিছুর নিরিখে বাঁধা একজন পুরুষ। এক সম্মোহন বৃত্ত, যাঁকে দেখে দেখে আঁখি না ফেরে।

মার্কিন এক অধ্যাপক প্রেমের উন্মেষ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি ভালোবাসার উন্মেষের কারণ হিসাবে পাঁচটি সূত্র দিয়েছেন। প্রথমত, দৈহিক আকর্ষণ, দ্বিতীয়ত, দেখলেই বা নাম শুনলেই অন্তরে এক সাড়া অনুভব তৃতীয়ত, ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইচ্ছা, চতুর্থত, গভীরভাবে আবেগপ্রবণ হয় পড়া এবং পঞ্চমত ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা। তিনি বললেন, ভালোবাসা হল এক আবেগ, এক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা। প্রিয় সেই প্রেমিক বা প্রেমিকাকে কেন্দ্র করে সুখানুভূতির তীব্র আবেগ তৈরি হয়। মন জানে, সবক্ষেত্রে প্রেম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। তবুও আবেগ থাকে অদম্য। তাঁকে একটু চোখে দেখার আবেগ নিয়েই বাঙালি উজ্জীবিত ছিল।

অবাক করা ব্যাপার হল, সাধারণ দর্শকদের থেকে উত্তমকুমার ছিলেন অনেক দূর গ্রহের এক তারকা। তা সত্ত্বেও আবেগের কাছে মুছে যেত বাধা সম্পর্কিত যাবতীয় বাস্তবতা। তাঁর সম্পর্কে দর্শকদের কমবেশি এক প্রেমের অনুভূতি জাগত। মনে হতো, নাই বা পেলাম কাছে। তবু তিনি আমার আত্মার আত্মীয়। আমার ঘরেরই বোধহয় এক সদস্য। প্রতিনিয়ত তাঁকে নিয়ে তাঁর অভিননয় নিয়ে তাঁর রোমান্টিক ইমেজ নিয়ে বাঙালি আলোচনায় মশগুল থাকত। উচ্চবিত্তের ড্রয়িং রুম, বস্তির ছাদ ছুঁইয়ে জল পড়া ঘর, কলেজ ক্যান্টিন, পাড়ার রোয়াক অথবা সাট্টার ঠেক, সর্বত্রই বিরাজমান উত্তমকুমার।

তাই সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রেমের দেবতা। সেলুলয়েডে বাঙালি সম্ভবত এমন কন্দর্পদেবকে আগে কিংবা পরে অনুভব করেনি। ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবির সেই দৃশ্যটা তো সুপার হিট! সেই যে দৃশ্যে চিন্মর রায় তাঁর প্রেমিকা শিবানী বসুকে বলছেন, ‘তুমি একবার আমাকে বল না উত্তমকুমার।’ এই আকুতি ছিল তখনকার প্রতিটি পুরুষের মধ্যে। তাঁরা প্রত্যেকেই প্রেমিক হিসাবে উত্তমকুমার হয়ে উঠতে চাইতেন। ঠিক উল্টোদিক থেকে দেখলে আমরা দেখি বহু মেয়েই তাঁর প্রেমিক বা স্বামীর মধ্যে উত্তমকুমারকে খুঁজতেন। আমাদের চেনা জীবন, পারিপার্শ্বিক চলমান পরিবেশ, অন্দরমহল সর্বত্রই বাঙালি তাঁকে খুঁজত। কী খুঁজত তারা? বাঙালি মেয়েরা চাইতেন মূলত এমন একজন ব্যক্তিত্ববান, দায়িত্বশীল, কিছুটা উদাসীন এবং রোমান্টিক এক পুরুষ, যাঁর আদল উত্তমকুমারের মতো। ছবিতে যেভাবে তাঁকে তৈরি করা হয়েছে, সে এক আদর্শ পুরুষ। স্মার্ট, সুশ্রী, রুচিশীল, সহানুভূতিশীল, সহমর্মী, সৃজনশীল, উদার দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন, বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ইত্যাদি গুণগুলি সাধারণ দর্শকদের কাছে তাঁকে এক আদর্শ পুরুষ হিসাবে সৃষ্টি করেছে।

প্রশ্ন জাগতে পারে, তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু সেললুলয়েডে আঁকা? না, আসলে রক্তমাংসের উত্তমকুমারের মধ্যেও কমবেশি এই গুণগুলি ছিল। তাঁর প্রতিটি নায়িকার ভাষ্যে দেখা গিয়েছে, কী অসম্ভব সহানুভূতিশীল ছিলেন তিনি। সহশিল্পীদের প্রতি কতটা যত্নশীল মনোভাব ছিল তাঁর। আর তাঁর দয়ালু হৃদয়ের পরিচয় তো ইন্ডাস্ট্রির ছোট বড় শিল্পী থেকে সেটের কলাকুশলী কারও অজানা নয়। যখন যেমনভাবে পেরেছেন, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমন একটা মন তাঁর গ্ল্যামারের ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল।

পর্দার উত্তমকুমারের কোথায় অনন্যতা? সেটা কি শুধুই গ্ল্যামার? ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই মাপের গ্ল্যামার ক’জনের ছিল, তা বিচার করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু উত্তমকুমারের চোখের দৃষ্টিতে কিংবা হাসিতে ঝরে পড়ছে প্রেমের চোরাটান। তার টানে আকৃষ্ট হননি, এমন মহিলা বোধহয় ছিলেন না। মা-ও উত্তম বলতে পাগল, মেয়েও উত্তমের জন্য একেবারে অন্ধ! এমনটি কি এর আগে কখনও দেখা গিয়েছে?

কেন এই উত্তম-ম্যা঩জিক! কেন তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রেমের কেষ্ট ঠাকুর? সেটাকে বিচার করার জন্য তাঁর প্রতিটি ছবির বিচার করা দরকার। প্রতিটি ছবি জুড়েই তাঁর প্রেমের অনন্য বিন্যাস। মুগ্ধতার রেশ আজও কাটেনি। এক শাশ্বত প্রেমের প্রতীক হয়ে তিনি রয়ে গিয়েছেন মৃত্যুর এতদিন পরেও। সেই সঙ্গে জীবন জুড়ে রয়েছে অজস্র কাহিনি, অজস্র কামনা বাসনার আলো আঁধারি গল্প। কিছুটা বাস্তব, কিছুটা রহস্য। আজও অনেক কিছুর তল পাওয়া যায় না।

উত্তমকুমারের প্রতিটি ছবি বিশ্লেষণ করলে প্রেমের একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রাপ্তি, ভালোবাসার নিটোল বাঙালি ঘরানা উঠে আসে। মধ্যবিত্ত প্রেমের এই ভিন্ন ডায়মেনশনটাকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এক একটা ছবিতে তাঁর প্রেমের এক একটা শেড। তাঁর ছবির অন্যতম উপাদান রোমান্স। ভালোবাসার চালচিত্রের মতো সারা ছবিতে তা ছড়িয়ে থাকত। সেই রোমান্সের মূল শক্তি যদি হয় তাঁর অভিনয়, তাহলে অন্যটি ছিল তাঁর হাসি ও গ্ল্যামার। একবার জহর রায় মজা করে বলেছিলেন, ‘অমন ভুবনমোহিনী হাসি দেখলে মেয়েরা প্রেমে পড়বেই। আমি তো পুরুষ হয়েও প্রেমে পড়েছি।’ কথাটা শুধু কৌতুক বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। তাঁর রোমান্স ও প্রেম, তাঁর অভিনয় ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ ছিলেন পুরুষ দর্শকরাও। তাঁরাও প্রেমিক হিসাবে উত্তমকুমার হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন।

তাঁর ছবিতে শুধু প্রেম বললে হয়তো সবটা বলা হয় না। কেননা সব ছবিতে তাঁর প্রেমের প্রকাশ এক নয়। বিভিন্ন ছবিতে প্রেমের বিভিন্ন সত্তা ও স্তরকে তিনি ধীরে ধীরে নানা রূপে উন্মোচিত করেছেন। সারা জীবনে তিনি ৪৬ জন নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করেছেন। এক এক করে বিচার করলে দেখা যাবে। এক একজন নায়িকার সঙ্গে তাঁর অনস্ক্রিন প্রেমের বন্ডিংটা এক এক রকম। আবার ছবি হিসাবে, গল্পের দাবি হিসাবে প্রেমের সূক্ষ্ম ফারাকটাকে কী মহাকাব্যিক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

একটু খোলা চোখে বিচার করলেই আমরা দেখি, ‘সাগরিকা’র প্রেম আর ‘সপ্তপদী’র প্রেম এক নয়। ‘হারানো সুর’ এবং ‘পৃথিবী আমারে চায়’ ছবির প্রেম এক নয়, ‘সবার উপরে’ কিংবা ‘শাপমোচন’ ছবির রোমান্স এক নয়, ‘লালপাথর’ আর ‘স্ত্রী’ ছবির প্রেমও ভিন্ন। ‘বিপাশা’র প্রেম এবং ‘দেয়া নেয়া’র প্রেমও আলাদা। ‘পথে হল দেরি’ ছবিতে প্রেম যেখানে ত্যাগের মধ্য দিয়ে মিলনের পথে এগোয়, ‘ইন্দ্রাণী’ ছবির প্রেম সেখানে পৃথক মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘মেমসাহেব’ ছবিতে উত্তমকুমারের প্রেমের যে নাব্যতা, ‘শুন বরনারী’ ছবির প্রেমের সাম্পান সেই নদীতে ভাসে না। ‘বিকেলে ভোরের ফুল’ কিংবা ‘আমি সে ও সখা’ ছবির প্রেমও ভিন্নমুখী। আবার ‘সোনার খাঁচা’ ছবির প্রেম যেন দমবন্ধ করা এক অত্যাচার হয়ে ওঠে। ‘শেষ অঙ্ক’ ছবির প্রেমের রূপ যখন সত্যিই প্রকাশ পায়, তখন দর্শক চমকে ওঠেন। খ্যাতির মধ্যগগনে থেকেও এমন অ্যান্টিহিরোর অভিনয় করা মুখের কথা নয়। বলতে হয় ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবির কথা। প্রেমিক হিসাবে নিজেকে ভেঙেছেন দ্বৈত সত্তায়। এইসব ছবিতে দ্বিমাত্রিক ব্যঞ্জনার ভিতরে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের জটিলতা উঁকি মারে। প্রেমের বহুমুখী নির্যাস তাঁর ছবিতে ভরপুর। সেই প্রেম কিংবা প্রেমহীনতাকে স্থায়ী এবং সুষ্ঠুভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। তিন দশক ধরে তিনি ছিলেন ‘কিং অব রোমান্স’।

উত্তমকুমারের এই যে একচ্ছত্রভাবে কিং অব রোমান্স হয়ে ওঠা, এর পিছনে কারণ কী? শুধুই দর্শনধারী, শুধুই অভিনয়, নাকি আরও অন্যকিছু! যা কেবল অনুভব করা যায়, উপলব্ধি করা যায়! উত্তমকুমারের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু যদি তাঁর রূপ বলে মনে করা যায়, তাহলে সেটা মস্ত ভুল হবে। কী অন্তরঙ্গে, কী বহিরঙ্গে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক পুরুষ। সেই আকর্ষণকে আরও গভীরতর করে তুলেছিল তাঁর অভিনয়। তিনি এসে বাংলা ছবির প্রেমের আবহটাকেই একেবারে বদলে দিলেন। উত্তমকুমার যুগের আগে প্রমথেশ বডুয়া এবং কানন দেবীর যুগের ছবিতে প্রেম মানে ছিল স্টুডিও গাছের ডাল ধরে দোল খাওয়া, পুকুরে জলে চাঁদের আলো আর দু’কলি গান, ‘কে রং লাগাল বনে বনে’।

অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রমথেশ বড়ুয়া ও কাননদেবীর জুটি ছিল সুপার ডুপার হিট। ‘মুক্তি’র জোয়ারে ভেসে যাওয়া সেই জুটির পরে উত্তমকুমার এবং সুচিত্রা সেনের জুটির প্রতিষ্ঠা। যত দিন গিয়েছে, ততই তাঁরা অনিবার্য জুটি হিসাবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। প্রেমকে প্রথম বাংলা ছবিতে এই জুটি নিয়ে এল মানবীয় সত্তায়। প্রেম উঠে এল চলন্ত বাইকের ছন্দোময় গতিতে। সেই গতির সঙ্গে মিশে গেল সুর। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলতো, তুমি বলো।’ বাইকে উত্তম-সুচিত্রা, ব্যাকগ্রাউন্ডে হেমন্ত-সন্ধ্যা। আমাদের ভালো লাগা আবেগকে যেন কোন অধরা সুদূর স্বপ্নের দেশে তা উড়িয়ে নিয়ে যায়। এক অধরা কল্পনার জগৎ, যেন এক রূপকথার জগৎও। আমাদের ভালোলাগাকে আরও উস্কে দিয়ে যায় সাহসী, সাবালক চিত্রায়ন। উত্তমকুমারের বাইকের পিছনে তাঁকে আঁকড়ে ধরে বসে আছেন প্রেমিকা সুচিত্রা সেন। এখনকার দর্শকদের ভাবা মোটেই সম্ভব নয়, কী দুঃসাহসী ছিল অজয় করের সেই চিত্রায়ন। কী সামাজিক দিক থেকে, কী টেকনিক্যাল দিক থেকে! গানের সঙ্গে, বাইকের গতির তালে দু’জনের শরীর পরস্পরকে হাল্কাভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রিত, পরিশীলিত অনুচ্চারিত যৌনতা আমাদের অজান্তেই আমাদের ভিতরে ভালোলাগার রেণু ছড়িয়ে দিয়ে যায়। দর্শক তখন নিজেই যেন প্রেমিকা হয়ে ওঠেন। তাঁর মন যেন বলে ওঠে, ‘তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম।’

কিংবা দু’জনের অভিনয়ের মধ্য দিয়ে যে সংলাপ, সেখানে চোখের একটা বিশাল ভূমিকা দেখা যায়। সেই দৃষ্টিবিভঙ্গে প্রেমের উপস্থিতি দর্শকদের নজর এড়ায় না। ‘ইন্দ্রাণী’ ছবিতে যখন উত্তম বলেন, ‘গান শুনবে অন্যলোকে আর নোট বইব আমি?’ এই সংলাপের মধ্যে যে অনুযোগের সুর, তার ভেতরে কী অসাধারণ ভাবে রোমান্সের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। উত্তরে সুচিত্রা সেন তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘গান সবাই শুনেছে, কিন্তু গেয়েছি একজনের জন্য। ’ একটা হাস্কি ভয়েস, তাতে মিশে আছে প্রশ্রয়। অসাধারণ অথচ নিরুচ্চার এক আত্মসমর্পণ আমরা প্রত্যক্ষ করি। উত্তমকুমারের প্রতিটি ছবির ভিতরেই রয়ে গিয়েছে এমনই দুরন্ত সব সংলাপ। ‘আমি তোমায় ভালোবাসি।’এমন বিজ্ঞাপনের মতো প্রেম জাহির তাঁর কোনও ছবির মধ্যে সেভাবে নেই। প্রত্যেক চিত্রনাট্যকার জানতেন। উত্তমকুমারের দৃষ্টি যত কথা বলে দেয়, তা তাঁর সংলাপে বলার দরকার লাগে না। তাই প্রেমের সংলাপ হয়ে ওঠে প্রেমের কবিতার মতো।

উত্তম সুচিত্রার ‘চাওয়া পাওয়া’ ছবিটা এক নিরুচ্চার প্রেমের গল্প। এখানে রোমান হলিডের একটা ছায়া আমরা দেখি। বড়লোক বাড়ির মেয়ে সুচিত্রা বাড়ি থেকে পালিয়ে আসেন। ছবিতে উত্তম তাঁকে নির্ভরতা দিয়ে যান। এক অত্যন্ত সাধারণ যুবক, অথচ তাঁর ভিতরের মূল্যবোধ, রুচিবোধ, সাংস্কৃতিক মনন, উদারতা আকৃষ্ট করে সুচিত্রাকে। দু’জনের অজান্তেই বোধহয় শুরু হয় এক ভালো লাগা। কিন্তু উত্তম জানেন তাঁর অবস্থান, তাই তিনি সেই প্রেমকে প্রশ্রয় দিতে চান না। গানের মধ্য দিয়ে যেন সেই সঙ্কুচিত মনের প্রকাশ ঘটে। ‘যদি ভাবো, এতো খেলা নয়,/ভুলি সেতো শুরুতেই/না ফুটিতে ফুল যদি ঝরে যায়/কাঁদুক শ্রাবণ এই ফাগুনেই।’ এই যে ধীরে ধীরে প্রেমের বিন্যাস, ক্রমে তা যেন মরীচিকা হয়ে উঠতে যায়, সেই রোমান্স রহস্য বুঁদ করে রাখে দর্শককে। অবশেষে একেবারে অন্তিমে কাহিনি আমাদের নিয়ে যায় এক স্বপ্নপূরণের গন্তব্যে। প্রেমের এই বাঁধুনিটা উত্তমের অভিনয়ের মধ্যে এক সংযত মাত্রায় আবর্তিত হয়। এই সংযত প্রকাশটুকুই অভিনয়ের চূড়ান্ত দক্ষতাকে প্রকাশ করে। অবশ্য সুচিত্রা সেন ছাড়া বোধহয় এমন রসায়ন সম্ভব ছিল না।

উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখলে মনে হতে পারে, তাঁরা সত্যিকারের প্রেমিক প্রেমিকা। বিভিন্ন সময়ে দু’জনেই স্বীকার করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রেমের কোনও সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তাঁরা খুব ভালো বন্ধু। আমাদের মনে অনিবার্যভাবে প্রশ্ন জাগে, এই বন্ধুত্বের মধ্যে ভগ্নাংশও কি প্রেম ছিল না? অনস্ক্রিনে ওই হাসি, ওই প্রেম, ওই দৃষ্টির মধ্যে পরস্পরের প্রতি তীব্র অনুরাগ, পরম আকুতি নিয়ে নায়ক নায়িকার আলিঙ্গন— তা কি শুধুই অভিনয়? নাকি দু’জনের অবচেতন মনের গভীরে জমে ছিল কোন সুপ্ত প্রেম, যার দরজাটা তাঁরা কোনওদিনই খোলেননি। তার পিছনে ছিল কি তাঁদের ছবির বাজার সংক্রান্ত কোনও সমীকরণ? সেটা অবশ্যই এক গবেষণার বিষয়!

‘হারানো সুর’ ছবিতে সুচিত্রার মধ্যে এই প্রেমের আকুতি কী তীব্রতর! তাঁর স্বামী তাঁকে ভুলে গিয়েছেন। প্রেম থেকে শূন্যতা হয়ে আবার প্রেমের মধ্যে প্রত্যাবর্তন। একটা সুরের অনুরণন ফিরিয়ে দেয় প্রেমের হারানো জগৎ।

উত্তমকুমারের নায়িকা হিসাবে সুচিত্রা সেন মোট তিরিশটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সবগুলিই প্রেমের ছবি। কিন্তু তার কতরকমের বিন্যাস। ‘আলো আমার আলো’, ‘কমললতা’, ‘নবরাগ’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘পথে হল দেরি’, ‘শিল্পী’, ‘সাগরিকা’ ইত্যাদি। এসব ছবি বাঙালি বার বার দেখেছে। তাই এইসব রোমান্সের মুগ্ধতা শাশ্বত।

আবার আমরা কী অসাধারণ বৈপরীত্য দেখি। প্রেমের মধ্যে একজন প্রেমিকার অন্তরে ফুটে ওঠে মাতৃভাব। ফ্রয়েড তাঁর প্রেমতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, একজন পুরুষ তাঁর প্রেমিকার মধ্যে মায়ের প্রচ্ছায়া দেখেন। সুচিত্রা সেনের বেশ কয়েকটি ছবিতে যেন সেই ভাবই ফুটে ওঠে। যেমন ‘বিপাশা’, ‘শাপমোচন’, ‘শিল্পী’ ইত্যাদি। অসহায়, জীবনযুদ্ধে বিভ্রান্ত উত্তমের পাশে প্রেমের যে অনুভূতি নিয়ে সুচিত্রা সেন এসে দাঁড়ান, তা যেন সহানুভূতির জারকে সিক্ত এক মমত্ববোধ। অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অদ্ভুত তার প্রকাশ।

দক্ষিণ কলকাতার ‘ঘটি’ উত্তমকুমার ছিলেন মোহনবাগানের ভক্ত। সেই উত্তমকুমারকে সিনেমার শ্যুটিংয়ের জন্য ইস্ট বেঙ্গলের জার্সি পড়তে হয়েছিল। ঘটনাটা বেশ মজার। ‘সপ্তপদী’ ছবির শ্যুটিং চলছে। ওই ছবিতে একটা ফুটবল খেলার দৃশ্য ছিল। শ্যুটিংটা হয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল মাঠে। তখন ইস্ট বেঙ্গলের কর্মকর্তা ছিলেন বসুশ্রী সিনেমা হলের মালিক মন্টু বসু। তিনি ইস্ট বেঙ্গলের জার্সিটা উত্তমকুমারের হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার মতো একজন মোহনবাগান সমর্থককে দেওয়া এটাই আমার সেরা উপহার।’ উত্তমকুমার হেসে বলেছিলেন, ‘যা বাবা, মোহনবাগানের সমর্থক হয়ে ইস্ট বেঙ্গলের জার্সি পরতে হবে? অন্য কোনও জার্সির ব্যবস্থা করলে হয় না।’ কথাটা কানে গেল ইস্টবেঙ্গলের ফ্যান সুচিত্রা সেনের। তিনি একেবারে ঝগড়ার ঢংয়ে এসে হুমকি দিয়ে বললেন, ‘তুমি যদি লাল হলুদ জার্সি না পর, তবে আমি এই সিনেমা করবই না।’ ‘ও কে রমা’ বলে উত্তমকুমার মেক আপ রুমে চলে যান। আজও সেই ছবি, সেই ফুটবল খেলার দৃশ্য বাঙালি ভুলতে পারে না। দু’জনের সম্পর্কে এই মধুরতম সুপ্ত উল্লাস দু’জনের মধ্যে শেষ দিন পর্যন্ত ছিল। ১৯৭৫ সালে সুচিত্রা সেন উত্তমকুমারের সঙ্গে শেষ ছবি করেছিলেন হীরেন নাগের ‘প্রিয় বান্ধবী’। তারপর আর দু’জনে একসঙ্গে কখনও অভিনয় করেননি।

ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তমকুমার যেমন ছিল দিলখোলা মিশুকে, সুচিত্রা সেন তেমনটি ছিলেন না। সবাই তাঁকে বেশ ভয় করতেন। তাঁকে ম্যাডাম বলে ডাকতেন সকলে। একটু রাশভারী ভাব নিয়ে থাকতেন। তিনিও একসময় বুঝতে পেরেছিলেন, উত্তমকুমার অভিনয়ের শক্তি দিয়ে অনেকদূর চলে গিয়েছেন, সেই স্তরে পৌঁছে তাঁকে ছোঁয়া প্রায় অসম্ভব। সেজন্য সুচিত্রা সেনের কোনও ক্ষোভ বা গ্লানি বা ঈর্ষা ছিল না। ভালোবাসা ছিল বলেই উত্তমকুমারের এই উত্তরণ তিনি উপভোগ করতেন।

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে উত্তমকুমারের প্রেমের যে ভঙ্গি বা রসায়ন বা প্রত্যাশা, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের থেকে তা একেবারে আলাদা। সাবিত্রীর সঙ্গে উত্তমের ছবিতে হাই ভোল্টেজ রোমান্স কম। বরং দু’জনের টানটান অভিনয়ে দমটা বেশি। সাবিত্রীর অভিনয় বাস্তবতার অনেক কাছাকাছি। তাই উত্তমকুমারের অভিনয়ও ঠিক সেই ক্যাটিগরির হয়ে উঠত। দু’জনের প্রেমের মধ্যে একটা আপাত মজা, মধ্যবিত্ত প্রেমের মতো হলুদ বাটা গন্ধ। ‘অবাক পৃথিবী’, ‘কুহক’, ‘রাজা সাজা’, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’, ‘দুই ভাই’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘মৌচাক’ ইত্যাদি। কমেডি অভিনয়ে দু’জনেই যেন একটা খেলোয়াড়সুলভ রেষারেষি ছিল। উত্তমকুমার বলতেন, সাবিত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে অভিনয় করা খুব কঠিন। আবার সাবিত্রী বলতেন, উত্তমকুমারের চোখের দিকে তাকিয়ে অভিনয় করা মোটেই সহজ নয়।

বাস্তব জীবনে কিন্তু দু’জনের প্রেম ছিল গভীর। সাবিত্রী নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, সেই ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরার বয়স থেকেই তিনি উত্তমকুমারের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। উত্তমকুমারও জড়িয়ে পড়েছিলেন তাঁর প্রেমে। তিনি চেয়েছিলেন, সাবিত্রীকে বিয়ে করতে। কিন্তু ভালোবেসেও সাবিত্রী পিছিয়ে এসেছেন। প্রেম করা সত্ত্বেও সাবিত্রী উত্তমকুমারকে বিয়ে করতে রাজি হননি। কেননা সাবিত্রী বিশ্বাস করতেন, কারও ক্ষতি করে সুখী হওয়া যায় না। তাই উত্তমকুমারের বিবাহিত জীবনে কোনও অশনি সংকেত ছড়িয়ে দিতে তিনি চাননি। ঘরের দরজা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন উত্তমকুমারকে। বুক ফেটেছে, তবু তা মেনে নিয়েছেন। সেই ক্ষত যেমন সাবিত্রী পেয়েছেন, সেভাবে পেয়েছেন উত্তমকুমারও।

সাবিত্রী তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর উত্তমকুমার তাঁর যন্ত্রণাক্ষুব্ধ মন নিয়ে কড়া নেড়েছিলেন ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে। তখন তিনি চেয়েছিলেন একটা মানসিক আশ্রয়। অশান্ত সময়ে তাঁকে সেই আশ্রয় দিয়েছিলেন সুপ্রিয়া চৌধুরী।

সুপ্রিয়া চৌধুরীর সঙ্গে বেশ কয়েকটি ছবিতে উত্তমকুমারের প্রেম স্বাভাবিক ধারার থেকে কিছুটা ভিন্ন হিসাবে দেখা গিয়েছে। যেমন ‘শুন বরনারী’ ছবিটি। একটা অনুচ্চারিত, সঙ্কুচিত, ভীরু প্রেম। তাকে স্বীকার করতে পারেন না বলেই উত্তম রাতে নিঃশব্দে পালাতে চান। কিন্তু ‘উদাসিনীর মেয়ে’ সুপ্রিয়া আভিজাত্যের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে এসে দাঁড়ান উত্তমকুমারের সেই ভাঙা ঘরে। প্রেম যেন অধিষ্ঠিত হয় এক শ্রদ্ধার আসনে। এছাড়া ‘লাল পাথর’, ‘জীবন মৃত্যু’, ‘চিরদিনের’, ‘বিলম্বিত লয়’, ‘মন নিয়ে’ ছবিগুলিতে রোমান্স নয়, প্রেমের মানবিক টানকে বড় করে দেখানো হয়েছে। রয়েছে প্রেমের জটিল আভাসও।

অপর্ণা সেনের সঙ্গে তাঁর যে প্রেম, সেখানে নাগরিক স্টাইলটাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। ‘মেমসাহেব’, ‘অপরিচিত’, ‘কলঙ্কিত নায়ক’, ‘সোনার খাঁচা’ ইত্যাদি ছবিগুলিতে দু’জনের প্রেমের সম্পর্ক একটু পৃথক ধরনের।

শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে ‘শেষ অঙ্ক’ ছবিতে প্রেম এবং প্রেমের অভিনয় যেন একসঙ্গে মিশে যায়। এক প্রেমিক পুরুষের নেগেটিভ চরিত্রে অসামান্য অভিনয় কোনওদিন ভোলার নয়। এছাড়া ‘অমানুষ’ ও ‘আনন্দ আশ্রম’ ছবির কথা বলা যায়। তখন উত্তমকুমারের বয়স হয়েছে। কিন্তু ছবিতে রঙিন ক্লোজ শটেও যে অভিব্যক্তি, তা দর্শকমনে উপহার দিয়ে যায় একরাশ বিমুগ্ধতা।

আর এক শক্তিশালী শিল্পী মাধবী মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ‘ছদ্মবেশী’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘অগ্নিশ্বর’, ‘শঙ্খবেলা’ ছবিগুলি সুপারহিট। ‘অগ্নিশ্বর’ ছবিতে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি উপলব্ধি করলেন প্রেম আসলে কী এবং তাঁর স্ত্রী তাঁকে কতটা ভালোবাসতেন! মানসিক অহংবোধ তাঁর দূর হয়। এক নিরুচ্চার যন্ত্রণা নিয়ে প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি নতুন ভালোবাসায় ঋদ্ধ হয়ে ওঠেন তিনি। সেই প্রেম তখন শ্রদ্ধায় পরিণত হয়। তাই ভালোবাসার প্রতি অবিচারের শাস্তি হিসাবে অগ্নিশ্বর চলে যান এক সাধারণ জীবনে, সেটা তো প্রায়শ্চিত্তেরই নামান্তর। কেননা অবহেলায় যে প্রেমকে তিনি হারিয়েছেন, তার জন্য প্রয়োজন জীবন দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করা।

‘শঙ্খবেলা’ ছবিতে নৌকার উপরে পাশাপাশি শুয়ে ক্লোজ শটে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ গানটি কি সত্যিই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে নিঃশব্দে লিবিডো সঞ্চার করে না? যেন অতর্কিতে মগজে হাইপোথ্যালামাস এবং ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটে যায় নিঃশব্দে।

কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। সেটা হল উত্তমকুমারের সমস্ত ছবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর প্রেমের মূলে কোথাও যৌনতা নেই। হয়তো সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু তৎকালীন মধ্যবিত্ত জীবনে রোমান্সের সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক খুব গভীর ছিল না। যৌথ পরিবারের সকলে মিলে একসঙ্গে সিনেমা দেখার রেওয়াজ চালু ছিল, তাই প্রেম করলে প্রেমিকার হাত ধরতেই তিন রিল খরচ হয়ে যেত। তাই এইসব ছবির প্রেমের দম ছিল তার সংলাপে ও অভিনয়ে। কী অসাধারণ সব সংলাপ। কবিতা অনুরাগী বাঙালি ছেলেদের খুব প্রিয় ছিল সেইসব সংলাপ বা ছবির গান। এইসব গান ও সংলাপ ব্যবহার করে বাঙালি ছেলেরা কাঁপা কাঁপা হাতে ভীরু ভীরু আখরে প্রেমপত্র লিখত।

আমার বার বার মনে হয়েছে অঞ্জনা ভৌমিকের সঙ্গে উত্তমকুমারের অনস্ক্রিন প্রেমের একটা গভীর মাত্রা রয়েছে। ‘নায়িকা সংবাদ’ ছবিতে দু’জন অচেনা নারী পুরুষের কাছাকাছি আসা। কীভাবে সেই সাধারণ অথচ রসিক এক অন্তর্মুখীন মানুষের প্রেমে পড়ে গেলেন ফিল্মস্টার অঞ্জনা ভৌমিক, সেটাই গল্পের বিষয়। খুব অনিবার্য কাহিনি, কিন্তু কখনওই তা জোর করে পরিণতির দিকে নিয়ে যায় না। একটু একটু করে কুরুশে করে বোনা হয় ভালোবাসার ঝালর। মনের দ্বন্দ্ব যেন ঘন হয়ে ছড়িয়ে থাকে রাতের আকাশে। সেই পূর্ণিমায় ফিনিক দিয়ে ছড়িয়ে পড়া জ্যোৎস্নার মধ্যে উত্তমকুমার নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। মনে তাঁর অজস্র ভাঙাচোরা ছবি। সেই দ্বন্দ্বই যেন গান হয়ে ফিরে আসে। ‘এই পূর্ণিমা রাত/ কিছু সুর কিছুটা আবেশ / একি শুরু না শেষ। /কেন জানি না যে মন আজ বাঁশি হয়ে বাজে / ভুলে যেতে চাই, তবু থাকে কেন রেশ।’

অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে উত্তমকুমারের প্রেমের ছবিতে একটা স্বাভাবিক ভাবগাম্ভীর্য এবং প্রেমের ওজস্বিতা আছে। সেটা বোধহয় অরুন্ধতীর ছরিত্রের সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। উত্তমকুমার সেটার সুরেই ছবিতে বাঁধলেন প্রেমের সুর। ‘বিচারক’, ‘জতুগৃহ’, ‘ঝিন্দের বন্দী’ ইত্যাদি।

তনুজার সঙ্গে সবক’টি ছবিতেই মনে হতো, ‘পথ বেঁধে দিল রন্ধনহীন গ্রন্থি।’ ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘দেয়া নেয়া’, ‘রাজকুমারী’ ছবিগুলি দেখলে মনে হয় ইয়ে জোড়ি টুটেগা নেহি।

উত্তমকুমারের প্রেম সত্তা নিয়ে তদন্তে নামলে ‘বিকেলে ভোরের ফুল’ ছবির কথা বলতেই হয়। জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে যাওয়া এক লেখকের প্রতি এক তরুণীর আকর্ষণের কাহিনি। তরুণীর সান্নিধ্য তাঁর ভালো লাগে। কিন্তু তাঁর মনে হয়, একটা গণ্ডি টানা দরকার। প্রেম সেখানে কখনওই নীতিবোধকে অতিক্রম করে না। এতো চিত্রনাট্যের কথা। কিন্তু সেটাকে যে দক্ষতার সঙ্গে উত্তমকুমার তুলে ধরেছেন, যে দ্বন্দ্বকে নানা অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন, বিশ্ব চলচ্চিত্রে সেই অভিনয় ক’জন করতে পারবেন সন্দেহ আছে। শুধু আঞ্চলিক ফিল্মে অভিনয় করে, নিজের ক্ষমতার সবটুকু দিয়েও বিশ্বের দরবারে সেভাবে পৌঁছতে পারেননি। তা সত্ত্বেও মার্লন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, আল পাচিনোর থেকে তিনি কম কিসে?

তিনি জানতেন পরিবর্তিত সময়ে যখন দেশ ও ইতিহাস বদলাচ্ছে, মানুষের অস্তিত্বের বোধ পলকা হয়ে যাচ্ছে। দেশভাগ, বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মানুষের সমাজে এল নানা পরিবর্তন। সেই মধ্যবিত্তের সঙ্গে আগের মধ্যবিত্তের কোনও মিল নেই। সেই নতুন যুগে সেই নব মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে তিনি জুগিয়ে দিলেন বিনোদনের সুস্বাদু পানীয়। এই জোগানটা দিতে পেরেছিলেন বলেই উত্তমকুমার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন একটা যুগ। উত্তম-সুচিত্রাকে ঘিরে এক নতুন ফেনোমেনন। সবটাই ঘটেছিল যুগের দাবি মেনে। যেভাবে সাতের দশকে যুগের দাবি মেনে সারা ভারতে উঠে এসেছিলেন অ্যাংরি হিরো অমিতাভ বচ্চন, তেমনই যুগের দাবি মেনে তৈরি হয়েছিল নতুন জুটি। উত্তম ও সুচিত্রা।

উত্তমকুমার তাই ছিলেন বাঙালির কাছে এক আদর্শ পুরুষের মতো। তিনি ধুতি, পাঞ্জাবিতেই প্রেমের বিশ্ব জয় করতে পারেন। তাই তাঁর রোমান্স কখনওই তথাকথিত যৌনতার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। যৌনতা মানে অবশ্য যৌনদৃশ্য নয়। যৌনতার ইঙ্গিতকে বোঝানো হচ্ছে। তারও কোনও সস্তা পথ তাঁকে ধরতে হয়নি। তবুও দুই সুন্দর অনুভবী সত্তার প্রেম এসেন্সের মতো ছড়িয়ে পড়ে দর্শকদের মধ্যে। আমাদের ভিতরেও সুন্দরবোধকে, আদর্শ এক প্রেমসত্তাকে জাগিয়ে তোলে। আমাদের প্রেমিক ও প্রেমিকা হতে সাহসী করে তোলে।

প্রেমের এমন বহুমুখী নির্যাসে ভরপুর হয়ে আছে তার প্রতিটি ছবি। তবে একটাই কথা এমন প্রেমিক পুরুষ বারবার ব্যক্তিগত জীবনে যন্ত্রণা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। পরিবারের কাছ থেকে, ইন্ডাস্ট্রির কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন বহু আঘাত। কিন্তু সেই দুঃখ ছিল অন্তঃসলিলার মতো। সেই কষ্টকে তিনি বাইরে কখনও আনেননি। সেই আঘাতে নিজের সৃষ্টিকে নষ্ট হতে দেননি। কেননা তিনি জানতেন, তিনি নিজেই একজন বিনোদনের ফেরিওয়ালা। সবাইকে বিনোদন বিলিয়েই গিয়েছেন। ‘নায়ক’ ছবির অরিন্দম হয়েই তিনি বাস্তবে বেঁচে ছিলেন। নিজের যন্ত্রণা ইন্ডাস্ট্রির ঈর্ষার ঢেকুর উড়িয়ে দিয়ে তিনি যেন অরিন্দমের মতোই বলেছেন, ‘আই উইল বি দ্য টপ অ্যান্ড টপ অ্যান্ড টপ’। এই ছবিতে যেন উত্তমকুমার এবং অরিন্দম একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। এভাবেই বহু যুগ পেরিয়ে জন্ম নেন একজন মহানায়ক।

বিভিন্ন ছবিতে তাঁর গানের অংশগুলি জুড়ে কুয়াশার মতো জড়িয়ে আছে একরাশ রোমান্টিসিজম। শুধু গানের নিখুঁত লিপ দেওয়াই নয়, সেই সব গানের কথা ও মেজাজের সঙ্গে তাঁর যে অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে, তা আগে কখনও দেখা যায়নি। বাংলা ছবিতে এভাবে বহু ব্যাপারে তিনি পথিকৃৎ হয়ে আছেন। ‘ইন্দ্রাণী’ ছবির ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়’ গানটি সুপার হিট এই গানের উত্তম কুমারের প্রোফাইলটা আমাদের চমকে দেয়। ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এক অনিবার্য লিবিডোর স্রোতে ভেসে যাই কিংবা ‘চৌরঙ্গী’র ‘মেঘের খেলা আকাশ পারে’ গানের চিত্রায়ন দেখতে দেখতে আমাদের বুকেও মেঘ জমে। এক নিঃসঙ্গতার ছায়া সরণি জুড়ে পড়ে থাকে মহানায়কের শাশ্বত অস্তিত্ব-চিহ্ন। আবার ‘সাগরিকা’র ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে’ গানটি আমাদের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক স্বপ্নের নায়িকার মুখকে উজ্জ্বল করে তোলে।

‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’র ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’ গানের মধ্যে যেন জীবনের সমস্ত সুধারসকে এক অঞ্জলিতে ধরে ফেলা যায়। ‘দেয়া নেয়া’র ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন আর ওই চোখে সাগরের নীল’ গানটি যেন আমাদের উজ্জ্বল এক সমুদ্র তরঙ্গের মাথায় সাম্পানে ভেসে যাওয়ার আনন্দকে মনে করিয়ে দেয়। এসব গান একটা যুগের প্রেমের আইকন হয়ে থাকে? যুগ হারিয়ে যায়, কিন্তু গানগুলি ইতিহাস ও সময়ের এক একটা মাইলস্টোন হয়ে থাকে। যেগুলি আমাদের মুগ্ধতাকে এক অনিঃশেষ অনুভবে ভরিয়ে তোলে। এই প্রেম, এই জনপ্রিয়তা আমাদের মধ্যে এক শাশ্বত অভিবাসনা তৈরি করে। সেই বাসনা আমাদের ক্রমান্বয়ে চুম্বকের মতো টানতেই থাকে। সেই টানেই তাঁর অন্তহীন অভিযাত্রা। আজও আমাদের মন তাঁর দিকে তাকিয়ে গেয়ে ওঠে, ‘আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস, / দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস।’


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন