গুরু দত্ত যখন কলকাতায় ছিলেন তখন মাঝেমধ্যেই চলে যেতেন গঙ্গার ধারে। কত রকমের মানুষের আনাগোনা লেগে থাকত সেখানে। নানান সময় তারাই তাঁর গল্পের চরিত্র হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে একজন ছিলেন মালিশ বাবা, আব্দুল সাত্তার। লোকটার কাছে নানা রকমের তেল থাকতো।তিল, রেড়ি, মেথি দিয়ে ফোটানো সরষের তেল, নারকেল তেল, নানান জরিবুটির রস। যিনি মালিশ করাতে চান, তার পছন্দমতো একাধিক তেল মিশিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দলাইমালাই চলত ঘাটের চাতালে পাতা খাটিয়ার ওপর শুইয়ে দিয়ে। মালিশের আরামে লোকটা ঘুমিয়ে পড়তো।
একদিন গুরু প্রানের বন্ধু জনিকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে বললেন,’মালিশ বাবার রোলটা ভাবছি তোমাকে দেবো’, জনি হেসে বললেন ‘ও তো পালোয়ান লোক আমাকে কি মানাবে?’ ‘ওইটুকু না হয় বদলে দেওয়া যাবে।’
সেই নিয়েই পিয়াসা ছবিতে রফির কন্ঠে গান হল, ‘সর জো তেরা টাকরায়ে, ইয়া দিল ডুবা যায়ে, আজা পেয়ারে পাস হামারে, কাহে ঘাবরায়ে, কাহে ঘাবরায়ে’।
আব্দুল সাত্তারের চরিত্রে জনি ওয়াকার একবারে ফাটিয়ে দিলেন। গুরু তার সব ছবিতেই জনিকে রাখতেন, প্রাণের বন্ধু বলে কথা।
ইতিমধ্যে সিআইডি ছবির জন্য গুরু দক্ষিণ ভারত থেকে খুজে এনেছিলেন এক নতুন মুখ ওয়ায়িদা রহমানকে। পিয়াসা ছবিতে নায়ক গুরুদত্ত সঙ্গে নিলেন দুই নায়িকা-মালা সিনহা এবং ওয়ায়িদা রহমানকে। পিয়াসা ছবির শুটিং কিছুটা এগিয়ে যেতেই ওয়ায়িদাকে নিয়ে কথা শুরু হয়ে গেল গোটা ইউনিটে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত যারা বলতেন এই মেয়েটাকে দিয়ে কিছু হবে না, এখন তারাই বলতে শুরু করলেন সিআইডির ওয়ায়িদা আর পিয়াসির ওয়ায়িদা এক নয়। এই অসাধ্য সাধনটি করেছিলেন গুরু দত্ত। অভিজ্ঞ চোখেরা জানতো গুরু কতটা সময় দিয়েছেন ওয়ায়িদার জন্য। ওয়ায়িদা মারাত্মক হয়ে উঠল এবার পর্দায়, এ যেন ‘রুমাল হয়ে গেল বিড়াল’।

নারীসঙ্গে দুর্বল গুরু এবার বাঁধা পড়লেন ওয়ায়িদার আঁচলে। গীতা দত্তের কন্ঠে ওয়ায়িদার লিপে গান ছিল, ‘জানে কেয়া তুনে কাহি, জানে কেয়া মাইনে শুনি, বাত কুছ বন হি গয়ি’… যেন সত্যি হয়ে গেল কথাগুলো। চোখের হালকা ইশারায়, ঠোঁটের থরথরো কম্পনে ওয়ায়িদা কি গল্পের চরিত্র বিজয়কে কিছু বলেছেন? নাকি বলেছেন বিজয়ের চরিত্রে থাকা গুরুকে। গীতা দত্তের কন্ঠে এই গানে প্রেম উপচে পড়ছিল গুরুর প্রতি অথচ ওয়ায়িদার লিপে এই গানই তার ঘর ভাঙছিলো ।
পিয়াসা ছবির সুপার হিট গানগুলি স্থান করে নিল ক্লাসিক ছবির তালিকায়। গীতা ভাববেন তিনি তো কত ছবিতেই গান করেন, তবু গুরুর ছবির গানগুলি কেন এত বেশি জনপ্রিয় হয়ে যায়! পরে অনেকের মুখে গীতা শুনেছিলেন, গানকে সিনেমার সঙ্গে গুরু যেভাবে মিলিয়ে দিতে পারেন, রাজ কাপুর ছাড়া হিন্দি ছবিতে আর কেউই তা পারেন না। হিন্দি ছবির ছক ভেঙ্গে গানকেই কাহিনীর অবিচ্ছেদ অঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন গুরুদত্ত। তাই তো তিনি অনন্য।
গুরুর সঙ্গে ওয়ায়িদার সম্পর্ক নিয়ে কাগজপত্রের লেখালিখি নতুন কিছু নয়। প্রথমে গীতা ভেবেছিলেন আর পাঁচটা মশলা খবরের মত এটাও একটা মসলা, কিছুদিন পরে ঠিক হয়ে যাবে। একটা কাগজে সেদিন লিখেছে, গুরু আর ওয়ায়িদাকে একসঙ্গে কোনো এক পাঁচতারা হোটেলে ঢুকতে দেখা গেছে। খবরটা পড়ে হেসেছিলেন গীতা, কারণ ওই দিন ছিল জামাইষষ্ঠী। গুরু তাদের নিয়ে গিয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ি।
তবে অনেক মিথ্যার মধ্যেও সত্য লুকিয়ে থাকে কখনো কখনো। ‘কাগজ কি ফুল’ গল্পটাও তাই তার মনে হয়েছিল গুরুর লেখা আর পাঁচটা গল্পের মতো। শচীন কর্তা যখন, ‘ওয়াক্ত নে কিয়া কেয়া হাসিন সিতম’, গানের জন্য গীতাকে ডেকেছিলেন, গীতা তখন অরাজি হননি। মন প্রাণ ঢেলে গিয়েছিলেন গানটা। তখন কি গীতা একবারও ভেবেছিলেন বিষয়টা এমন নিদারুণ সত্যি হয়ে তার নিজের জীবনে ফিরে আসবে।

১৯৫৯ সালে দারুণ ফ্লপ হলো গুরু স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘কাগজ কি ফুল’, বক্স অফিসে অনেক ছবি চলে না কিন্তু তাই বলে একটা ছবি নিয়ে বিলকুল কথা হবে না এও কি সম্ভব!
অভিনেতা হিসেবে গুরুদত্তের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ছবি ছিল ‘সৌতেলা ভাই’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ অবলম্বন হিন্দি চলচ্চিত্র। এছাড়াও ‘আর পার’, ‘মিস্টার এন্ড মিসেস ৫৫’, ‘চৌধভি কা চাঁদ’ ছবিতে ওয়ায়িদা রহমানের বিপরীতে গুরুর অভিনয় ভারতীয় সিনেমায় আজও মাস্টারপিস।
১৯৬২ সালের ২৯ জুলাই মুক্তি পায় ‘সাহেব বিবি অউর গোলাম’। যদিও এটি বাণিজ্যিকভাবে ৮.৪ মিলিয়ন (৯৯,০০০ মার্কিন ডলার) আয় করে। সিনেমাটি প্রশংসা পেয়েছিলো অভিনেতাদের অভিনয়ের জন্য, বিশেষ করে মীনা কুমারী এবং ভি কে মূর্তির চিত্রগ্রহণের জন্য। সাহিব বিবি অউর গোলাম চারটি ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার জিতে বলিউডের একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে এবং দত্তের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়।
বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালে এই সিনেমা প্রবেশাধিকার পেল। গীতার গুরুর সঙ্গে বার্লিন গেলেন ওয়ায়িদা। ততদিনে ওয়ায়িদার সঙ্গে গীতার সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। গুরুর প্রোডাকশনের বাইরে ওয়ায়িদার লিপে গীতা গান গাইতেন না, তার জায়গায় দখল করে নিল লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে।
গীতা-গুরুর সংসারে ভাঙ্গনের জন্য শুধুমাত্র ওয়ায়িদা রহমানকে দোষী করা যায় না। কারণ গুরু সর্বদা ভুল নারীসঙ্গে বাস করতেন। বহুগামিতা ছিল তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ওয়ায়িদা তার ক্যারিয়ারের জন্য সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন গুরুকে।
গুরুর প্রাণের বন্ধু ছিলেন ডিরেক্টর আব্রার খান। তার স্বভাব ছিল কিছুটা মন্থরার মত, বন্ধু সেজে গুরু আর গীতার কানে বিষ ঢালতেন।
গুরুদত্তের জীবনে একটা একটা করে আশার আলো নিভে যেতে শুরু করে। গীতা দত্তের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর মুম্বাইয়ের পেডার রোডের ফ্ল্যাটে একাকীত্বে দিন কাটাতে শুরু করেন গুরু, সঙ্গী হয় মদের গ্লাস আর ঘুমের ওষুধ।

একদিন রাত্রে প্রচুর মদ্যপান করে গীতা দত্তকে ফোন করে বললেন বাচ্চাদের পাঠাতে। গীতা বললেন, বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে কাল সকালে ওরা যাবে। কিন্তু রাগ আর অভিমানে গুরুদত্ত তাকে বললেন, ‘বাচ্চাদের না পাঠালে আমার মরা মুখ দেখবে!’ যদিও এই কথাটার খুব পরিচিত ছিল গীতা, তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। সে রাতে গীতা আর বাচ্চাদের পাঠায়নি।
ফোন ছেড়ে আকণ্ঠ মদ্যপান করেন, ঘুম না আসায় অত্যাধিক ঘুমের ওষুধও খায়। ১০ অক্টোবর ১৯৬৪ ভোর রাতেই মদ আর ওষুধ কেড়ে নেয় গুরুর জীবন। সকালে গীতা বারে বারে গুরুকে ফোনে না পেয়ে চাকর রতনকে দরজা ভাঙতে বলেন। সকালে মৃত অবস্থায় গুরুকে দেখেন বন্ধু পরিচালক আব্রার আলভী। খবর পেয়ে ছুটে আসেন গীতা, সেদিন তাকে কেউ আর ধরে রাখতে পারেনি। হতাশা আর বুক ভাঙা কান্নায় ভেঙ্গে পরেন গীতা।
গুরুর রহস্য মৃত্যু সারাদেশে আলোড়ন তুলেছিল যদিও এর আগে দুবার আত্মহননের চেষ্টা করেন গুরু।
নায়ক ও প্রযোজক হিসাবে গুরুর শেষ বই ছিল ‘বাহারে ফিরভি আয়েগি’। বইটির শুটিং শেষ করা যায়নি। তার মৃত্যুর পর তার জায়গায় কোন নায়কই সহজে অভিনয় করতে চাইনি। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেছিল নতুন স্ট্রাগেলিং নায়ক ধর্মেন্দ্রকে। নায়িকা ছিলেন মালা সিনহা আর তনুজা। তিনজনকে অপূর্ব সুন্দর লাগছিল ছবিটিতে।

‘কাগজকে ফুল’ বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হওয়ায় পরই বিষাদের সুর থাকত গুরুর কথাবার্তায়। প্রতিকূল পরিস্থিতির চাপে এক জাত শিল্পীর কি এতটা বিষাদ মানায়? জানা নেই! ওয়ায়িদা রহমান ছেড়ে যাওয়ার পর গুরু ক্রমশ ভেঙে পড়তে থাকেন মানসিকভাবে। অতিরিক্ত মদ্যপান, সাংসারিক অশান্তির জেরে তিন সন্তানকে নিয়ে গীতাও আলাদা থাকতে শুরু করেন। প্রশংসা এবং ধিক্কার, সাফল্য এবং প্রাণঘাতী হতাশা, বিভ্রান্তিকর অনিশ্চিতার মধ্যে গুরু নিজেকে শেষ করে দেন।
গতানুগতিক ফর্মুলা জর্জরিত ফিল্ম দুনিয়ার ছকের বাইরে যেতে গেলে তাকে মূল্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। গুরু কি সেটা ভুলে গিয়েছিলেন? জানা নেই! আজও তার মৃত্যু রহস্যই থেকে গেছে!