চরম উপেক্ষা আর অবহেলায় ভারতের অন্যতম প্রাচীন খেজুরি ডাকঘর আজ ভগ্নস্তূপে পরিনত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে তৈরি প্রাচীন এই ‘কেডগিরি পোস্ট অফিস’ টিকে অনেকেই দেশের প্রথম ডাকঘর বলে। তবে সরকারি ভাবে তার স্বীকৃতি জোটেনি। সরকারি অবহেলা আর উপেক্ষায় খন্ডহরে পরিণত ডাকঘরের ধ্বংসাবশেষে কান পাতলে আজও শোনা যায় প্রাচীন খেজুরি বন্দর ও ডাকঘরের অতীতের নানান রোমাঞ্চকর গল্পগাথা।
১৬৭২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন জেমস নামে এক নাবিক সর্বপ্রথম খেজুরিতে ঘাঁটি গাড়েন। তারপর থেকেই খেজুরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম পীঠস্থান হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে খেজুরি এশিয়া,ইউরোপ-সহ বর্হিবিশ্বের সঙ্গে জলপথের অন্যতম বন্দর হিসেবে গড়ে উঠে। বন্দরকে ঘিরেই গড়ে উঠে আধুনিক বানিজ্য নগর। তৈরি হয়েছিল দেশের প্রাচীন ডাকঘর, প্রথম টেলিগ্রাফ অফিস, বাতিঘর আর ইউরোপীয়দের সমাধিক্ষেত্র। ১৮৩০ সালের ১৯ নভেম্বর রাজা রামমোহন রায় এই খেজুরি বন্দর হয়েই সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। পরে ১৮৪২ ও ১৮৪৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এই বন্দর দিয়েই বিদেশযাত্রা করেছিলেন। খেজুরি বন্দর ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম পীঠস্থান হয়ে পড়ে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বন্দরে অফিস ঘর, এজেন্টদের বসবাস করার জন্য বাসস্থান ছাড়াও জাহাজে যাতায়াতকারী যাত্রী সাধারণের জন্য বিশ্রামাগার, চার্চ পাকা ইমারত তৈরি করে। ধীরে ধীরে খেজুরি একটি সমৃদ্ধ বন্দরে পরিণত হয়। খেজুরির আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক ও কাঁথি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রেমানন্দ প্রধানের ‘হিজলীনামা’ ও মহেন্দ্রনাথ করণের ‘খেজুরি বন্দর’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, ‘বিদেশি নাবিকরা সেই সময় খেজুরিকে ‘কেডগিরি’, ‘ক্যাজুরি’, ‘কাদজেরী’ও ‘গ্যাজুরী’ প্রভৃতি নামে সম্বোধন করতেন। জাহাজে করে প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র খেজুরি বন্দরে আসত বলেই খেজুরিতেই গড়ে উঠেছিল প্রথম ডাকঘর বা কেডগিরি পোস্ট অফিস। মহেন্দ্রনাথ করণের ‘খেজুরি বন্দর ‘ও যোগেশচন্দ্র বসুর ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ সূত্রে জানা যায়, ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দের আগেই এই ডাকঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খেজুরি বন্দর থেকে কলকাতা পর্যন্ত প্রতিদিন ডাক যাতায়াতের জন্য ‘ডাকনৌকা’ নামধারী ছোট ছোট ‘ছিপ’-এ করেই ডাক পাঠানো হত।

বিলেত থেকে জাহাজ খেজুরি বন্দরে ভেড়া মাত্র কলকাতার বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা বিলাতি সংবাদ সংগ্রহ করে ডাকনৌকা দ্রুতগামী ছিপ-এ করেই কলকাতায় যেতেন। মহেন্দ্রনাথ করণ ও যোগেশচন্দ্র বসুর গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দের আগেই এই ডাকঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮১৭ সাল থেকে ১৮২ সাল পর্যন্ত কেডগিরি শিপ লেটার পোস্টার স্ট্যাম্প ও ১৮২২ সালে কেডগিরি ডাকঘরে মেটাল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হত। ১৮৩৭ সাল থেকে ১৮৪১ সাল পর্যন্ত কেডগিরি অ্যান্ড পোস্ট অফিস স্ট্যাম্প ও ১৮৯৪ সালে কেডগিরি মিডনাপুর ডিস্ট্রিক্ট স্ট্যাম্প ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। খেজুরি বা কেডগিরি পোস্ট অফিসের দোতলা থেকেই ১৮৫১-৫২ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক উইলিয়াম ওশাগনেশির আবিষ্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে কলকাতা থেকে ডায়মন্ডহারবার, ডায়মন্ডহারবার থেকে কুঁকড়াহাটি ও কুঁকড়াহাটি থেকে খেজুরি পর্যন্ত ভারতবর্ষের প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন চালু হয়। ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এই যন্ত্র পদ্ধতিতে টেলিগ্রাফ চালু থাকার পর ওই বছর বিলেত থেকে আমদানি করা মার্স সাহেবের ডট ও ড্যাসের বর্ণমালা যুক্ত টেলিগ্রাফ চালু হয়। ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত খেজুরি বন্দরের অস্তিত্ব থাকার পর ১৮৬৪ সালের সামুদ্রিক ঝঞ্ঝা আর বিধ্বংসী জলচ্ছ্বাসে খেজুরি বন্দরের বিলুপ্তি ঘটে। ধীরে ধীরে খেজুরির অতীতের সমস্ত গরিমাই মুছে যায়।
প্রাচীন ডাক ও টেলিগ্ৰাফ ভবনটি জীর্ণ অবস্থায় ১৯৪২ সালের ১৬ অক্টোবর প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যায়। সত্তরের দশকে মূল ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। বছরের পর বছর ঝড়, ঝঞ্ঝা-সহ নানা কারণে ডাকঘরের প্রাচীন ভবন এবং সংলগ্ন দ্বাদশ কক্ষ বিশিষ্ট প্রকাণ্ড ব্যারাকটি কবেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে খন্ডহরে পরিণত সিঁড়িঘরটিই সোনালী ও গৌরবময় ইতিহাসের উপেক্ষা আর অবহেলার সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ২০২২ সালে ১৪ সেপ্টেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে রাজ্যের অন্যান্য বেশ কিছু নির্দশনের সঙ্গে খেজুরির দুশো বছরের প্রাচীন ডাকঘরের ভগ্নাবশেষকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে হেরিটেজ কমিশন।
হেরিটেজ ঘোষণা হওয়ার পর প্রায় তিন বছর হতে চলল। অথচ খেজুরিতে অবস্থিত দেশের প্রথম ডাকঘরের ধ্বংসাবশেষ সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়নি। যা নিয়ে এলাকার বাসিন্দা ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষজন ক্ষুব্ধ। খেজুরি হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতির যুগ্ম সহ-সম্পাদক সুমনারায়ণ বাকরা ও সুদর্শন সেন বলেন, “সেই ১৯৭৮ সাল থেকে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটিকে রক্ষা করার জন্য নানা মহলে আবেদন করে আসা হচ্ছিল। হেরিটেজ ঘোষণা হওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম, এই নিদর্শনটি সংস্কার এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে কমিশন। কিন্তু তা হয়নি। তাছাড়া এই নিদর্শনগুলি নিয়ে আমরা পোস্টাল মিউজিয়াম গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে এসেছিলাম। এই নিদর্শনটি সংস্কার হলে খেজুরির গুরুত্ব আরও বাড়বে। আরও বেশি পর্যটক এবং ইতিহাসপ্রেমী মানুষজন খেজুরিতে আসবেন।”
যদিও প্রতিদিনই এই নিদর্শন দেখতে পর্যটক-সহ ইতিহাসপ্রেমী মানুষজন খেজুরিতে ভিড় জমান। কিন্তু ডাকঘরের এই পরিস্থিতি দেখে তাঁরা হতাশ হন। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে তা সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একদম অজানা খবর।
সমৃদ্ধ হলাম।
এত খবর জানতামই না। অনেক কথা জানলাম। খুব ভালো লাগলো।