চলতি বছরেই বিহারে নির্বাচন এবং তারপর ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু এবং বাংলার মতো গুরু্ত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে বিধানসভা নির্বাচন। রাজ্যে রাজ্যে এই নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই নরেন্দ্র মোদী ও শাসকদল দেশের ভয়াবহ বেকারত্বের খরা কাটিয়ে কর্মসংস্থানের জোয়ার আনতে একটি প্রকল্প চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটির পোশাকি নাম এমপ্লয়মেন্ট লিঙ্ক ও ইনসেনটিভ বাংলায় কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রণোদনা এবং সংক্ষেপে ইএলআই। কিন্তু প্রকল্পটিকে নতুন বলা যাচ্ছে না কারণ, গত ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন জিতে তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে জুলাই মাসে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের যে পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হয়েছিল তাতে কর্মংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্যাকেজের মধ্যে এই প্রকল্পটির উল্লেখ ছিল। সেই বাবদ দু’লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দও করা হয়েছিল। কিন্তু ওই অর্থবর্ষে প্রকল্পটি আর চালু করা হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের আগে ২০১৯-২০ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে ঘোষিত হয়েছিল প্রোডাকশন লিংকড ইনসেনটিভ স্কিম (পিএলআই)। তাতে বরাদ্দ ছিল ১.৯৭ লক্ষ কোটি টাকা। বলা হয়েছিল পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে পরিকল্পনা অনুসারে ১৪ টি কোম্পানিতে কর্মসংস্থান হবে। সেই প্রকল্পই ২০২৪-২৫ কেন্দ্রীয় বাজেটে বড় আকারে ১৬টি কোম্পানির জন্য নির্ধারিত হয়। এবং পরিকল্পনা অনুসারে প্রকল্পের ভিত্তিবর্ষের নিরিখে কোম্পানিগুলির ক্রমবর্ধমান বার্ষিক মোট যোগানের মাত্রার উপরে নির্ভর করে ৩ থেকে ২০ শতাংশ অবধি ইনসেনটিভ দেওয়া হবে। এবং যুক্তি দেওয়া হয়েছিল এতে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে উৎসাহের যোগান আসবে, আমদানি কমিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে, ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্র বাবদ জাতীয় জিডিপিতে অন্তত ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটবে। দেখা গেল চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন সংস্থা হিসাবে এতে সুযোগ পেল আইফোন-উইস্ট্রন (বর্তমানে টিআইএসএস টাটার অন্তর্ভুক্ত), ফক্সকন, পেগাট্রন এবং স্যামসাং। গাড়ি নির্মাণ সংস্থা সুজুকি, টয়োটা, টাটা মোটর্স, কেআইএ, অশোক লেল্যান্ড, মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা, মিৎসুবিশি, এলচার ইত্যাদি। অটো কম্পার্টমেন্ট সংস্থা বশ, টয়োটা গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রি সহ আরও কিছু। এছাড়া ছিল এলবিট (হার্মিস ৯০০ ড্রোন মিসাইল ম্যানুফ্যাকচারার), এদের দেশীয় পার্টনার হিসাবে আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড এরোস্পেস কোম্পানি যাদের সাথে আরও দশটি কোম্পানি যারা বিভিন্ন যন্ত্রাংশের যোগান দিত। এলবিট কোম্পানির নির্মিত সেই ড্রোনই ইজরায়েল গাজায় বোমা ফেলার জন্য ব্যবহার করে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনও একে ব্যবহার করেছে।
এবারও বলা হচ্ছে এই প্রকল্পের লক্ষ্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, যে কারণে মালিকদের জন্য বিশেষ আর্থিক উৎসাহভাতা দেওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছে। একইভাবে যে নতুন কাজ পাবে তার জন্যেও টাকার ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে দেশে কোনো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। মজুরিও বাড়ছে না। অথচ বেকারের সংখ্যা হুহু করে বেড়ে চলেছে। মানুষের রোজগার বলতে কিছু নেই। ফলে তাদের কেনার ক্ষমতা নেই। ফলে বাজারে পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বাড়ছে না। চাহিদা না তৈরি হওয়াতে উৎপাদনও বাড়ছে না। অন্যদিকে উৎপাদন বাড়ছে না বলে তৈরি হচ্ছে না নতুন কর্মসংস্থান। মোদী জমানায় দেশের অর্থনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে এমনই এক স্থবিরতায়। কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা বলে এই সরকার মেক ইন ইন্ডিয়া, স্কিল ইন্ডিয়া, উৎপাদনভিত্তিক আর্থিক সাহায্য, অ্যাপ্রেন্টিস প্রকল্প ঘোষণা করলেও কর্মসংস্থানের ফলাফল শূন্য কিন্তু সরকারের তহবিল থেকে বিপুল অর্থ চালান হয়ে পকেট ভর্তি হচ্ছে কর্পোরেটদের। শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে একের পর এক আইন ও বিধি শিথিল হয়েছে। অন্যদিকে কর্মীদের মজুরি খাতে যাতে মালিকরা যাতে ব্যয় সর্বনিম্ন করতে পারে তার জন্য সমস্ত শ্রম আইন বদলে শ্রমিকদের অধিকারগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। স্থায়ী কাজ তুলে ঠিকা-চুক্তির কাজ চালু করে মালিকদের সামাজিক নিরাপত্তা থেকে দায়মুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে কর্মীদের কাজের সময়সীমা বলেও প্রায় কিছু নেই। তারমানে কম টাকা দিয়ে কর্মীদের বেশি খাটিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। অর্থাৎ এই ব্যবস্থাটি হল সমপরিমাণ উৎপাদন কিন্তু আগের থেকে অর্ধেক কর্মী। অর্থাৎ সমপরিমাণ উৎপাদনে মালিকদের মুনাফা বেড়েছে দ্বিগুণ, তিনগুণ।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গোটা বিশ্বের ব্যবসা বাণিজ্য সংক্রান্ত যে পরিসংখ্যান বা ট্রেড আউটলুক অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের মোট রপ্তানির মাত্র ১.৮ শতাংশ হয় ভারত থেকে। এই হিসাব অনুযায়ী ২০২৩ সালেই ভারতের রপ্তানী কমেছে ৪.৭ শতাংশ। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ জানাচ্ছে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ভারতের আমদানি রপ্তানির মোট হার কমেছে ২.৬ শতাংশ। ২০১০ সালে দেশের জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর বাবদ যোগান ছিল ১৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে সেই হার নেমে দাড়িয়েছে ১৩ শতাংশে। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে উৎপাদন শিল্পে শ্রমশক্তির আনুপাতিক অংশগ্রহণ ছিল ১২.১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে তা কমে হয়েছে ১১.৪ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতীয় কলকারখানায় উৎপাদনের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২২- ২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী মজুরির অংশ ছিল ১৫.৯৭ শতাংশ কিন্তু মুনাফার হার ৫১.৯২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতে কর্মহীন যুবক-যুবতীদের বেকারত্বের সমস্যা সমাধানের জন্য ৭৮.৫ মিলিয়ন (এক মিলিয়ন = ১০ লক্ষ) কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত করতে হবে।
কর্মসংস্থানের অবস্থা হতাশাজনক হওয়ার কারণ চুক্তিভিত্তিক আমদানি-রপ্তানী হ্রাস, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ খাতে পুঁজি কমতে থাকা, জিডিপি’তে উৎপাদনী শিল্পের আনুপাতিক অংশগ্রহণ কমে যাওয়া। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে পিএলআই, ডিএলআই ও ক্যাপেক্সের মতো ইনসেনটিভ ভিত্তিক প্রকল্প আমাদের দেশে অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো হেরফের ঘটাতে পারেনি।অথচ মালিকের মুনাফা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা ঘটছে না।এই অবস্থায় বেকার কর্মপ্রার্থীদের জন্য ইএলআই প্রকল্পকে কি বলা যায়? সরকার ঘর থেকে নতুন কর্মীদের বেতন এবং মালিকদের বকশিস দেবে। কিন্তু কতদিন? কাজ তো স্থায়ী নয়, দু’বছর বড়জোর তিন বছর। ততদিন মোদী বক্তৃতায় বলবেন, তিন কোটি চাকরি হয়েছে, আমাদের ভোট দিন। মাঝখান থেকে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য কর্পোরেটদের উৎসাহ দেওয়ার নাম করে মোদী সরকার কর্পোরেটের হাতে বিপুল অর্থের যোগান যাবে কর্পোরেটের পকেটে। আসলে এমপ্লয়মেন্ট লিঙ্ক ও ইনসেনটিভ বা কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রণোদনা কর্পোরেট পুঁজি ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গাঁটছড়া বন্ধন। মুখে যতই বলা হোক ইএলআই প্রকল্পে কর্মসংস্থান হবে কার্যত সরকারি অর্থে ভর্তুকি দিয়ে বাজারে দক্ষ শ্রমিকদের বিশাল বেকারবাহিনী তৈরি করা হবে এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলি সরকারি কোষাগার থেকে বরাদ্দকে কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত মূল্যের মালিক হয়ে উঠবে।