শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৪:৩৭
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অন্ধকারের ইতিবৃত্ত : সায়র ব্যানার্জী

সায়র ব্যানার্জী / ৭২৪ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২২ জুন, ২০২৫

ভূমিকা

অন্ধকার — সমাস করলে দাঁড়ায় অন্ধ করে যে, অর্থাৎ আলোর অনুপস্থিতি। মনুষ্য প্রজাতির জন্মলগ্ন থেকেই অন্ধকার একটি ভীতির উৎস্য — তা সে চোখে রড কোষের অনুপস্থিতির কারণেই হোক বা হিংস্র শ্বাপদের শিকারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই হোক। আদিম কাল থেকেই অন্ধকারের সাথে জীবনের সমাপ্তি এবং অশুভ শক্তির রূপক ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে গড়ে ওঠা সমস্ত সভ্যতার কাছেই তাই অন্ধকারের তাৎপর্য একই রকম এবং সভ্যতার এই ধারা চলে আসছে আবহমান কাল ধরে।

এতৎসত্ত্বেও, অন্ধকারের প্রতি ভীতির সাথে সাথে মানুষের যে এক অমোঘ আকর্ষণের সম্পর্ক রয়েছে তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। বিভিন্ন সভ্যতার সাহিত্য এবং চিত্রকলায় এই আকর্ষণ কখনো প্রচ্ছন্ন ভাবে, কখনো বা নগ্ন ভাবে উঠে এসেছে। মধ্যযুগের অবসানের পর (প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে মধ্যযুগ অন্ধকার যুগ বা Dark Age হিসেবে অনেক ঐতিহাসিকই উল্লেখ করে থাকেন) যখন ইউরোপে নবজাগরণের (Renaissance) সূচনা হলো তখন তার সাথে এল এক নতুন ধারার বাস্তববাদী (Realist) নান্দনিকতা (Aesthetics) যার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ল চিত্রকলায়। এই সময়ে, এক বিশেষ ধরণের পদ্ধতি (Technique) ব্যবহার করা শুরু করলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (Leonardo da Vinci), কারাভাজিও (Caravaggio), এবং রেম্ব্রান্টের (Rembrandt) মতো শিল্পীরা যে পদ্ধতিটি কিয়ারোস্কুরো (Chiaroscuro) নামে পরিচিত। আক্ষরিক অর্থে এই ইটালিয়ান শব্দটির মানে হলো “আলো-আঁধার”। সর্বপ্রথম এই নামকরণ কে করেছিলেন তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও এই নিয়ে কারোর সন্দেহের অবকাশ নেই যে ভিঞ্চির ১৪৮১ সালে আঁকা ছবি “Adoration of the Magi” তে সর্বপ্রথম এই নান্দনিক ধারার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।

কিয়ারোস্কুরোর প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো যে এখানে আলো ও আঁধারের পারস্পরিক সহাবস্থানে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের (Contrast) সৃষ্টি হয় যা এই ধরণের ছবিকে একটি নতুন মাত্রা দেয়। এই বৈপরীত্যের সাথে সাথে অন্ধকার এবং আলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবেও কাজ করে এখানে। আলো ছাড়া যে অন্ধকারের অস্তিত্ব নেই ও অপরপক্ষে অন্ধকার ছাড়াও যে আলো থাকতে পারে না, তা তুলে ধরাই কিয়ারোস্কুরো পেইন্টিং-এর মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করা হয়।

The Cabinet of Dr. Caligari.

এখনো পর্যন্ত অন্ধকার নিয়ে এত কথা বললেও অন্ধকারের বৈজ্ঞানিক অথবা দার্শনিক বিশ্লেষণ কিন্তু এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। আমার আলোচনার বিষয়বস্তু হলো এক বিশেষ ধরণের চলচ্চিত্র যেখানে অন্ধকার এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ একটি অপরিহার্য অঙ্গ — হ্যাঁ, আমার আলোচনার বিষয় হলো নোয়ার ছবি বা Film Noir। যারা চলচ্চিত্র সম্পর্কে কিছুটা অবগত তাদের কাছে এই শব্দগুচ্ছটি খুব একটা অপরিচিত ঠেকবে না। এমন কি কেউ কেউ এর সাথে বেশ কিছু বিখ্যাত মার্কিনী ছবির নামও মনে করতে পারবেন। এই ফরাসী শব্দগুচ্ছটি (ফরাসী ভাষায় নোয়ার শব্দের অর্থ হলো কালো) বহু মানুষ শুনে থাকলেও এর সঠিক সংজ্ঞা সম্পর্কে অনেকেরই সম্যক ধারণার অভাব আছে। এই প্রবন্ধটিতে তাই ফিল্ম নোয়ার এবং তার উত্তরসূরী নিও নোয়ার সম্পর্কে আমি কিছু কথা বলব এবং এই ধরণের ছবি সম্পর্কে যেসব বহুলপ্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে তা নিবারণের চেষ্টা করব।

নোয়ার ছবির পূর্বসূরী

আমরা জানি যে সিনেমা এবং পেইন্টিং দু’টিই দৃশ্য মাধ্যম (Visual Medium) এবং ১৮৯৫ সালে সিনেমার জন্মলগ্ন থেকে তা বিভিন্ন ভাবে পেইন্টিং-এর কাছে ঋণী। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ফিল্ম নোয়ারের পূর্বসূরী যে হবে কোনও বিশেষ ধরণের চিত্রকলা তা অনুধাবন করা একেবারেই কঠিন নয়। তবে এক্ষেত্রে নবজাগরণের সময়কার Chiaroscuro Painting-কে ফিল্ম নোয়ারের প্রত্যক্ষ পূর্বসূরী ধরা হলে ভুল হবে — কারণ বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় মূলতঃ জার্মানি এবং ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া (Scandinavia) অঞ্চলের এক চিত্রকলার ধারা সেই ভূমিকা পালন করেছে। সেই ধারার নাম হল এক্সপ্রেশনিসম (Expressionism)।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮) শোচনীয় পরাজয়ের পর ১৯১৯ সালের ২৮ জুন জার্মানি ভারসাই সন্ধির চুক্তিতে (The Treaty of Versailles) স্বাক্ষর করে এবং চুক্তির নিয়মানুসারে যুদ্ধের যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতির অর্থনৈতিক দায়ভার বহন করতে বাধ্য হয়। এর ফলস্বরূপ, জার্মানির নিজস্ব অর্থনীতি এবং সামাজিক গঠন এমন এক অভূতপূর্ব সংকটের সম্মুখীন হয় যে তার থেকে মুক্তির কোনও উপায় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। বেকারত্ব, অরাজকতা, এবং তৎকালীন জার্মান রাজনীতিবিদদের সার্বিক অক্ষমতা দেশের অভ্যন্তরীণ অন্ধকারাচ্ছন্নতার জীবন্ত প্রতীক হয়ে ওঠে। সেই সময়কার জার্মান পেইন্টিং এবং চলচ্চিত্রে এই হতাশা এবং ক্রোধের অন্ধকারই ফুটে ওঠে Expressionism-এর মাধ্যমে।

Still from Nosferatu-eine Symphonie des-Grauens 1922 by FW-Murnau

নৃশংস হত্যা, জটিল মানসিক ব্যাধি, রক্তচোষা দানব (Vampire) এই সবকিছুই তৎকালীন অধিকাংশ জার্মান ছবির মূল বিষয়বস্তু ছিল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, ভীতি প্রদর্শনকারী চলচ্চিত্র বা যাকে আমরা সবাই Horror Films বলে জানি তার জন্মও কিন্তু এই Expressionism থেকেই — Friedrich Wilhelm Murnau-এর সুবিখ্যাত ছবি “Nosferatu — Eine Symphonie des Grauens” যা প্রকৃতপক্ষে ব্র্যাম স্টোকার প্রণীত ড্রাকুলা (Dracula) উপন্যাসের চিত্রায়ণ (Adaptation) যে পৃথিবীর প্রথম নির্বাক (Silent) হরর ছবি এই নিয়ে অধিকাংশ ফিল্ম ঐতিহাসিকদের মনেই কোনও সন্দেহ নেই। Renaissance যুগের কিয়ারোস্কুরো ধারার সুদক্ষ ব্যবহার এই ধরণের ছবির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট ছিল। তবে এর সাথে Expressionist ছবির সেটের অভিনব অলংকরণ এবং ছবির গ্রন্থণার (Editing) চেয়ে Mise-en-scène (ফিল্ম সেটের সমস্ত খুঁটিনাটি জিনিস যা ক্যামেরায় শুট করা হয়) এ বেশি গুরুত্ব প্রদান করার কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রধানতঃ হলিউড ছবির প্রচলিত গ্রন্থণাধর্মী ছবির থেকে কিছুটা আলাদা নান্দনিকতার স্বাদ জার্মান দর্শককে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই নতুন স্টাইল বেছে নিয়েছিলেন রবার্ট ভিনে (Robert Wiene) এবং ফ্রিৎস লাং (Fritz Lang)-এর মতো প্রক্ষ্যাত পরিচালকবর্গ। ভিনের ১৯২০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি “The Cabinet of Dr. Caligari” কে শুধুমাত্র German Expressionist ছবি হিসেবেই নয়, সারা বিশ্বের সিনেমার ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি হিসেবে গণ্য করা হয়। লাং-এর Metropolis-ও একটি বহুল প্রশংসিত Expressionist ছবি যা সিনেমার জগতে Dystopian Science Fiction-এর সূচনা করেছিল। বলা বাহুল্য এই সবকটি ছবিই ছিল নির্বাক ছবি (পৃথিবীর প্রথম সাউন্ড ছবির নাম The Jazz Singer যা ১৯২৭ সালে আমেরিকায় মুক্তি পায়)।

যে কারণে এই Expressionism-এর জন্ম, সেই সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবক্ষয় কে হাতিয়ার করে তিরিশের দশকে ক্ষমতায় এল এডলফ হিটলারের National Sozialismus বা National Socialist (সংক্ষেপে নাৎসি) পার্টি। হিটলারের রোষানল থেকে বাঁচতে তাই এই সময় থেকে অস্ট্রিয়ান পরিচালক বিলি ভাইল্ডার (Billy Wilder), ফ্রিৎস লাং এবং আরও অনেকে স্বদেশ পরিত্যাগ করে চলে এলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে তাদের Expressionist ছবি ততদিনে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ফলতঃ, মার্কিনী ছবিতে Expressionism-এর প্রভাব পড়তে খুব একটা দেরী হল না। সিনেমা সমাজের দর্পণ। তাই, অনেকটা জার্মানির মতোই আমেরিকাতেও Great Depression এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে ভারাক্রান্ত এক দেশের অব্যক্ত এক হতাশা এবং দুশ্চিন্তা রূপালী পর্দায় জন্ম দিল ফিল্ম নোয়ারের।

Maltese Falcon Poster

ফিল্ম নোয়ারঃ জঁর না স্টাইল

ফিল্ম নোয়ারের জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হলেও এর নামকরণ কিন্তু করেছেন ফরাসী চিত্র সমালোচকেরা। ১৯৪১ সালে অরসন ওয়েলেসের (Orson Welles) বিখ্যাত ছবি “Citizen Kane” মুক্তি পাওয়ার পর উক্ত ছবিটির দুটি বৈশিষ্ট্য বিশ্বব্যাপী, বিশেষতঃ ইউরোপের তাত্ত্বিক এবং সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে – এক, ছবিটির নন-লিনিয়ার (Non-linear) গল্প বলার ধরণ যা সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল অভূতপূর্ব এবং দুই, ছবির আলোকগ্রহণ যার মধ্যে German Expressionism-এর ছাপ স্পষ্ট ফুটে ওঠে। অনেক তাত্ত্বিকই এই ছবিকে ফিল্ম নোয়ার ঘরানার পথপ্রদর্শক মনে করেন। এই ছবিতে কোনও প্রত্যক্ষ হিংসার (Explicit Violence) প্রকাশ না থাকলেও ছবিটির বিষয়বস্তু নির্মমভাবে হতাশাবাদী। Citizen Kane-এর পরে মুক্তি পাওয়া অধিকাংশ ছবিরই বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে অপরাধ এবং অপরাধীর পিছনে ছোটা এক পোড় খাওয়া সত্যান্বেষী। Humphrey Bogart অভিনীত “Maltese Falcon” (১৯৪১) এই ধরণের ছবির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তবে সাধারণ গোয়েন্দা গল্পের চিত্রায়ণের থেকে এই ধরণের ছবিগুলির বেশ কিছু তফাৎ লক্ষ্য করা যায় — প্রথমতঃ, ছবিতে ব্যবহৃত হওয়া আলো আঁধারের বৈপরীত্যের খেলা বা কিয়ারোস্কুরো লাইটিং যার কথা এর আগেই বলেছি এবং যার জন্য সেই সময়কার জার্মান চলচ্চিত্রকারদের অবদান অনস্বীকার্য এবং দ্বিতীয়তঃ, একটি সুনির্মিত নোয়ার ছবির গোয়েন্দা কিন্তু কোনও Sherlock Holmes বা ফেলুদা বা ব্যোমকেশ নন, বরং কখনো কখনো অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি দেবার জন্য সেই গোয়েন্দাকে এমন সব পন্থার শরণাপন্ন হতে হয় যাকে অপরাধীর ক্রূরতার সাথে তুলনা করা চলে। সেই কারণে, অনেক তাত্ত্বিকই এই ধরণের ছবির সঠিক বিশ্লেষণের জন্য ফ্রয়েডিয় মনবিজ্ঞানতত্ত্বের (Freudian Psychoanalysis) ব্যবহার করে থাকেন।

Leonardo da Vinci_- Adorazione dei Magi Google Art Project

নোয়ার ছবিকে জঁর (Genre) না স্টাইল (Style) বলা হবে তা নিয়ে সিনেমার সমালোচক ও গবেষকদের মধ্যে গত পাঁচ দশক ধরে বিতর্ক লেগে রয়েছে যার মূল কারণ হিসেবে সময়ের সাপেক্ষে নোয়ার ছবির বিস্তার, বহুরূপতা, এবং সার্বিক অভিযোজনকে দায়ী করা যেতে পারে। Steve Neale-এর মতো তাত্ত্বিকরা আবার নোয়ার ছবির অস্তিত্ত্ব স্বীকারেই অনিচ্ছুক কারণ তাঁরা নোয়ার ছবির সাথে আর পাঁচটা সাধারণ গোয়েন্দা ছবির বিশেষ কোনও তফাৎ খুঁজে পান না। অন্য দিকে পল শ্রেডারের (Paul Schrader) মতো প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার এবং চিত্রপরিচালক (ইনি Taxi Driver-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন) নোয়ার ছবিকে স্টাইল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন কারণ চল্লিশের এবং পঞ্চাশের দশকের সব ছবি কিন্তু কোনও পোড় খাওয়া গোয়েন্দার সত্যান্বেষণ নয়। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি The Lost Weekend (১৯৪৫) ছবিটির কথা যেখানে এক মদ্যপ ব্যক্তির তার নেশার সাথে হতে থাকা অহরহ লড়াই ছবির মূল বিষয়বস্তু। শ্রেডার কিন্তু উপরোক্ত ছবির মধ্যেও কিয়ারোস্কুরো লাইটিং-এর ব্যবহার লক্ষ্য করেছেন যা এই ধরণের ছবিকে একটি স্টাইল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

উইলিয়াম পার্ক এই দুই পরস্পরবিরোধী মতবাদের সংশ্লেষের চেষ্টা করেছেন তাঁর লেখায়। পার্ক মনে করেন ফিল্ম নোয়ার একই সাথে একটি জঁর (যেমন ওয়েস্টার্ন বা রোম্যান্টিক কমেডি একটি জঁর) এবং স্টাইল (যেমন Impressionism বা Expressionism একটি স্টাইল)। পার্ক তাঁর পুঙ্খাণুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটাও দেখিয়েছেন যে সময়ের সাথে সাথে ফিল্ম নোয়ার বিবর্তিত হয়েছে নিও-নোয়ারে (Neo-Noir) যার মধ্যে ফিল্ম নোয়ার স্টাইলের আর কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া না গেলেও (প্রধানতঃ সাদা কালো থেকে রঙিন ছবিতে চলচ্চিত্রের পরিবর্তন ঘটায়) নোয়ার জঁর হিসেবে এখনো সমহিমায় বিরাজমান।

Humphrey Bogart in The Maltese Falcon

এক কথায় বলতে গেলে, সাদা-কালো হোক বা রঙিন-ই হোক, নোয়ার ছবি আজও একই রকমভাবে দর্শক থেকে সমালোচক সবার মনে জায়গা করে রেখেছে। যদিও, এই ছবির সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণে এখনও বিশেষজ্ঞরা অপারগ।

নোয়ার এবং ভারতীয় ছবি

ভারতীয় ছবিতে নোয়ারের প্রবেশ পঞ্চাশের দশকে, অর্থাৎ স্বাধীনতার ঠিক পরেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত Psyche-তে যেরকম প্রভাব ফেলেছিল, ভারতের ক্ষেত্রে সেটা ছিল বেশ কিছুটা আলাদা। বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে ভারতে একশ নব্বই বছরের ঔপনিবেশিক শোষণ এবং দেশভাগ ও দাঙ্গার ক্ষত ছিল অনেক বেশি গাঢ়। স্বভাবতঃই, এদেশে নোয়ার ছবির জনপ্রিয়তা লাভে দেরী হয়নি। তবে মার্কিনি ফিল্ম নোয়ারের সাথে ভারতীয় নোয়ারের গঠনগত (Formal) বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। এই বিষয়ে প্রখ্যাত তাত্ত্বিক মাধব প্রসাদের নাম না নিলে নয়। মাধব প্রসাদ ভারতীয় ছবির গঠনকে ব্যাখ্যা করেছেন Bricolage হিসেবে, যার অর্থ হল বিভিন্ন উপাদানের এক বিষম কিন্তু উপাদেয় সংমিশ্রণ। স্বাধীনতার পর থেকেই এই মিশ্র ফর্মের ছবি ভারতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যেখানে মেলোড্রামায় পরিপূর্ণ নাচ, গান, এবং সংলাপের সাথে সাথে হাস্যকৌতুক, অ্যাকশন, এবং ভায়োলেন্সও পাওয়া যাবে। ভারতীয় নোয়ার ছবিও তার ব্যাতিক্রম নয়।

অধিকাংশ ফিল্ম স্কলারের মতে “নীচা নগর” (১৯৪৬) ছবিটি ভারতে নোয়ার ছবির সূচনা করছে। এছাড়াও দেব আনন্দ অভিনিত “জাল” (১৯৫২) এবং C.I.D (১৯৫৬) কে উল্লেখযোগ্য নোয়ার ছবি হিসেবে ধরা হয়। প্রথমটির পরিচালক ছিলেন গুরু দত্ত এবং দ্বিতীয়টির রাজ খোসলা। মার্কিনী ফিল্ম নোয়ারের মতোই উপরোক্ত ছবিগুলিতে কিয়ারোস্কুরো লাইটিং-এর সুদক্ষ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, এই ধরণের লাইটিং-এর জন্য “মধুমতী” (১৯৫৮)-র মতো ছবিও (বিমল রায় পরিচালিত এবং ঋত্বিক ঘটক প্রণীত) ফিল্ম নোয়ার হিসেবে গণ্য হতে পারে। ভারতীয় ছবির মিশ্র চরিত্রের জন্য এইসব ছবিকে নোয়ার জঁরের অন্তর্ভুক্ত করা না গেলেও এখানে নোয়ার স্টাইলের সুদক্ষ প্রয়োগ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Citizen Kane 1941.

নব্বইের দশকের শেষ থেকে ভারতে এক নতুন ধরণের নোয়ার ছবির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় যাদের বাস্তববাদ (Realism) এবং পর্দায় নির্মম হিংস্রতার প্রকাশ প্রায় তৎকালীন হলিউডের সমকক্ষ হয়ে ওঠে। এই ধরণের ছবির নির্মাণের পিছনে অনুরাগ কাশ্যপের মতো চিত্রপরিচালকের কাছে ভারতীয় সিনেমার ঋণ অনস্বীকার্য। তাঁর Dystopian Science Fiction ছবি “No Smoking” (২০০৭) থেকে “রমন রাঘব ২.০” (২০১৬) প্রায় সব ছবিতেই আধুনিক নিও-নোয়ারের প্রভাব সুস্পষ্ট। কাশ্যপ ছাড়াও রামগোপাল ভার্মার নাম একজন নোয়ার ফিল্মমেকার হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ললিতা গোপালন এই নতুন ধরণের বলিউড ছবিকে “বম্বে নোয়ার” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

শেষ কথা

আগেই বলেছি সিনেমা হল সমাজের দর্পণ। তাই সমাজ যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয় তখন তার প্রতিফলনও যে সিনেমায় দেখা যাবে তা স্বাভাবিক। German Expressionism-এর জন্ম হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মানির ভয়াবহ অবস্থার প্রতিফলনস্বরূপ। একই ভাবে, আমেরিকায় ফিল্ম নোয়ার প্রতিফলিত করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সার্বিক Paranoia এবং পরমাণু বোমার চাপা আতঙ্ক। পৃথিবীর সমস্ত দেশে গল্পটা একই রকম। বর্তমান পৃথিবীতেও হিংসা, হানাহানির কোন অভাব নেই এবং সেই কারণে উইলিয়াম পার্কের মতো তাত্ত্বিকরা মনে করছেন যে নোয়ার ছবির ভবিষ্যৎ গোটা বিশ্বেই বেশ উজ্জ্বল।

আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এবং বর্তমানে Hays Code-এর মতো সেনসরশিপের অভাবে নোয়ার ছবিতে যে হিংসা এবং নির্মমতার যে অত্যন্ত বাস্তববাদী প্রদর্শন করা হয় তা পর্দার দুনিয়া এবং আমাদের পার্থিব দুনিয়ার মধ্যে দূরত্ব দিনে দিনে কমিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং, যতদিন সমাজে অন্ধকার থাকবে, অন্ধকারের ছবিও থাকবে তার প্রতিফলন হিসেবে।

কভারের ছবি : Double-Indemnity-1944

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন