| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপাধন্য গৌরীমা : প্রণবেশ চক্রবর্তী

Reporter
প্রণবেশ চক্রবর্তী / ১০৪৮ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৪ মার্চ, ২০২২

অবতার বরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে দক্ষিণেশ্বরে তখন নিত্যই আনন্দসভা। একদিন দক্ষিণেশ্বরের সেই আনন্দসভায় সেকালের জ্ঞানীগুণী এবং তরুণ যুবা অনেকেই উপস্থিত হয়েছেন, উপস্থিত হয়েছেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও (রাখাল মহারাজ) সেদিন হঠাৎই রাখালের খুব ক্ষুধা পেয়েছে। অনেকক্ষণ কিছু খাননি। সে কথা অকপট তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে বলেও ফেললেন।

প্রিয় শিষ্য ক্ষুধার্ত, অথচ ঘরে তেমন কিছু খাবার নেই। শ্রীরামকৃষ্ণ খুব বিব্রত হয়ে পড়লেন। তিনি গঙ্গার দিকে মুখ করে গলা চড়িযে বলতে শুরু করলেন, ও গৌরী, আমার রাখাল খুবই ক্ষুধার্ত। এতে রাখাল খুব লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘এ কি করছেন, সবাইকে একথা শোনাচ্ছেন কেন?’ এই স্বামী ব্রহ্মানন্দ ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র।

এরকম যখন কথাবার্তা হচ্ছে, তখন দেখা গেল, গৌরীমা নৌকা করে কলকাতা থেকে দক্ষিণেশ্বরে আসছেন। শুধু আসছেন না সঙ্গে নিয়ে আসছেন এক গামলা রসগোল্লা। কী বিস্ময়কর যোগাযোগ। ঠিক যেন আগে থেকেই ব্যবস্থা ছিল।

এই দৃশ্য দেখে সেদিন সকলেই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। রাখালও হয়েছিলেন বিস্মিত। গীরীশ ছিলেন দামোদর। পূজারিণী গৌরাঙ্গ-গত প্রাণ, কিন্তু তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছিলেন পূর্ণ অবতারকে। একদিন তিনি জনৈক গৌরাঙ্গ ভক্তকে বলেছিলেন— ‘আমার গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণ যিনি, শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি, এই দু’য়ে অভেদ।’ গৌরীমার এই কথা সেই গৌরাঙ্গ-ভক্তের যে পছন্দ হয়নি, সেটা বুঝতে পেরে গৌরীমা বেশ জোর দিয়ে আবার বললেন— ‘সেই রাম, সেই কৃষ্ণ, সেই হবে রামকৃষ্ণ।’ একথা বলেই তিনি সেই জায়গা থেকে চলে এলেন।

শ্রীরামকৃষ্ণের লীলা সংবরণের সময় (ইংরেজি ১৮৮৬ সাল) গৌরীমা বৃন্দাবনে ছিলেন। তখনও তাঁর তপস্যার কিছু বাকী ছিল। সাধনার সমাপ্তির ঠিক পরেই তিনি তাঁর গুরুদেবের সমাধিলাভের সংবাদ পেলেন। তত্ত্বজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা সন্ন্যাসিনী তিনি, তবু তাঁর গুরুর বিরহে পিতৃহারা কন্যার মতো বিচলিত হয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত শোকে কাতর হয়ে ভৃগুপাতে নিজেও দেহত্যাগে উদ্যত হলে শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁকে দর্শন দিয়ে নিরস্ত্র করেননি।

তার কারণ, শ্রীরামকৃষ্ণ যে, গৌরীমার উপর এক গুরুভার অর্পন করেছিলেন। সেই মহান দায়িত্ব পালন না করে গৌরীমা এই সংসার থেকে প্রস্থান করবেন কীভাবে?

একদিন প্রভাতে দক্ষিণেশ্বরে ঊষার আলোতে দাঁড়িয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ গৌরীমাকে বললেন, ‘দেখ, গৌরী, আমি জল ঢালছি, তুই কাদা চটকা।’ গৌরীমা তখন নহবৎখানার সামনেই বাগানে ফুল তুলছিলেন। তিনি ঠাকুরের কথা শুনে অবাক হয়ে বললেন এখানে কাদা কোথায় যে চটকাব? সবই যে কাঁকর। ঠাকুর হেসে বললেন, আমি কী বললুম, আর তুই কি বুঝলি? এদেশের মেয়েদের বড় দুঃখ, তোকে তাদের মধ্যে কাজ করতে হবে।

গুরু-শিষ্যার মধ্যে যখন এরকম কথাবার্তা হচ্ছিল, তখন নহবৎখানার ছোট ফাঁক দিয়ে জননী সারদামণি মৃদু মৃদু হাসছিলেন, এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে যে, দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গণে ওই নহবৎখানার ছোট কুঠুরিতেই জননী সারদামণি ও স্ত্রী ভক্তরা অবস্থান করতেন।

এরপরই শ্রীরামকৃষ্ণ যেন গৌরীমার জ্ঞাননেত্র উন্মুক্ত করে দিলেন। গৌরীমা মানস নেত্রে দেখতে পেলেন অজ্ঞতা ও অবিবেক পুঞ্জীভূত হয়ে মূক ও ম্রিয়মান নারী হৃদয়ের উপর পাষাণ ভারের মত চেপে বসে আছে। তাঁর মাতৃহৃদয় এই করুণ দৃশ্য দেখে চঞ্চল হয়ে উঠল, তিনি ভাবলেন, সত্যি তো। নারীর ব্যথা যদি নারীই না দূর করে, তবে কে করবে?

কিন্তু এত বড় দায়িত্ব বহন করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? তাই তিনি তাঁর নিজের অক্ষমতার কথা গুরুকে জানিয়ে বললেন, সংসারী লোকের সাথে আমার পোষাবে না। হইহই আমার ধাতে সয় না। আমার সাথে কতগুলি মেয়ে দাও, আমি তাদের হিমালয়ে নিয়ে গিয়ে মানুষ গড়ে দিচ্ছি।

ঠাকুর হাত নেড়ে বললেন, না গো, না, এই টাউনে বসে কাজ করতে হবে। সাধন ভজন ঢের হয়েছে। এবার এই তপস্যাপূত জীবনটা মায়েদের সেবায় লাগবে। ওদের বড় কষ্ট।

এক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণ এই টাউনে বলতে শহর কলকাতাকেই বুঝিয়েছেন। কারণ, তিনি দেখেছিলেন একদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে তৎকালীন কলকাতার নারী সমাজে চরম বিকৃতি ও বিভ্রান্তি অন্যদিকে, ঘোরতর অশিক্ষা ও কুসংস্কাররে কবলে পড়ে নারীজাতির চূড়ান্ত অসহায় অবস্থা। তাই তিনি গৌরীমাকে গ্রামে বা দূরে কোথাও যেতে বললেন না, হিমালয়ে যেতেও নিষেধ করলেন। বরং তিনি গৌরীমার সামনে কলকাতাকেই কর্মক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করে দিলেন, অর্থাৎ তপস্বিনী গৌরীমাকে শ্রীরামকৃষ্ণ এক বিরাট চ্যালেঞ্জের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন, দেখিয়ে দিলেন এক নতুন তপস্যার পথ।

দুই

শ্রীরামকৃষ্ণের অপ্রতিরোধ্য টানে এবং আকর্ষণে যেমন একে একে অনেকেই এসে হাজির হয়েছিলেন তাঁর সমীপে তপস্বিনী গৌরীমাও একদিন সেই অনাদি অনন্তকালের টান এবং আকর্ষণেই ঠাকুরের পদপ্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।

সেদিন তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন বলরাম বসু — যাঁর বাগবাজারের বাড়ি ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের দ্বিতীয় কেল্লা। প্রথম কেল্লা অবশ্যই দক্ষিণেশ্বর মন্দির। এই ‘বলরাম বসু’র ভবনই এখন বাগবাজারের ‘বলরাম মন্দির’ রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যতম শাখাকেন্দ্র।

সেদিন গৌরীমা অসীম অনন্তের আকর্ষণে ঠাকুরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আচ্ছনের মতো প্রণতা হলেন তাঁর পদপ্রান্তে। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে দেখে যেমন প্রসন্ন হলেন, গৌরীমা তেমনি হলেন বিস্মিতা। প্রথম দর্শনেই যেন ঠাকুরকে তিনি চিনতে পেরেছেন, দেখেছেন, একেই তো তিনি আগে দেখেছেন। কী এক বিস্ময়কর যোগাযোগ।

তিন

পূর্বাশ্রমে তাঁর নাম ছিল ‘মুড়ানী।’ আরেকটা নাম ছিল রুদ্রানী। আদর করে কেউ কেউ মান্তু বা মেজ বলেও ডাকতেন। পিতা ছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ — নাম পার্বতীচরণ চট্টোপাধ্যায় — খিদিরপুরে এক সওদাগরি অফিসে কাজ করতেন। মায়ের নাম গিরিবালা দেবী। পার্বতীচরণের বাড়ী ছিল হাওড়ার শিবপুরে। আর গিরিবালা দেবীর পৈত্রিক নিবাস ছিল নদীয়া জেলার রাণাঘাট।

গিরিবালা দেবী যথার্থই ‘দেবী’ ছিলেন, ছিলেন বিদূষী। তিনি যেমন দীন-দুঃখী আশ্রিতের পরম সহায় ছিলেন, তেমনি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় তাঁর বিশেষ অধিকার ছিল। এমনকি সেই যুগে ইংরেজি ও পারসি ভাষাও তিনি কিছু কিছু শিখেছিলেন তিনি ভালো গান করতে পারতেন। আবার তাঁর ব্যক্তিত্বও সকলকে মোহিত করেছিল।

তাঁর প্রথম সন্তান নবকুমার শৈশবেই ইহলোক ত্যাগ করেন। তারপর অয়োধ্যা থেকে আগত এক অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন যোগী পুরুষের আশীর্বাদে তাঁর পরপর দু-পুত্র সন্তান হয় — নাম অবিনাশ চন্দ্র এবং বিপিনকালী।

এভাবেই সুখে শান্তিতে এবং নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে তাঁদের দিন কাটছিল। এরই মধ্যে একদিন যথারীতি রাত্রে গিরিবালা দেবী জপধ্যানে মগ্ন হয়ে আছেন। এমন সময় দেখলেন, সেই নীরব নিস্তব্ধ রাত্রির গভীর অন্ধকার ভেদ করে এক জ্যোতিরশ্মি বেরিয়ে এল, বিশ্ব চরাচর হয়ে উঠল আলোকিত। তারপর সেই জ্যোতি এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়ে মহামায়ার অপরূপ মূর্তি ধারণ করল, তিনি যেন ভুবন আলো করা হাসিতে উদ্ভাসিতা, আর তাঁর দুই হাতের উপর শায়িত রয়েছে এক দিব্য শিশুকন্যা, এই শিশুটিকে দেখে গিরিবালা দেবীও উতলা হয়ে উঠলেন, একবার, অন্তত একবার শিশুটিকে নিজের কোলে নেওয়ার তীব্র বাসনা হল তাঁর। মহামায়াও বুঝলেন গিরিবালার মনোভাব। তাই তিনি দু-হাত প্রসারিত করে সেই শিশু তুলে দিলেন গিরিবালা দেবীর কোলে। এই পরম প্রাপ্তির আনন্দে তিনি ভুলে গেলেন জগৎ সংসার।

এরপরই বাংলা ১২৬৪ সালে জন্ম নিলেন মুড়ানী। সেই মুড়ানী যখন বলরাম বসুর সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে এসে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করলেন, তখনই তিনি চিনতে পারলেন এই মহাপুরুষকে। তাঁর তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল অতীতের এক অপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা।

পার্বতীচরণ তখন ভবানীপুরে থাকতেন। মুড়ানী তখন দশ বছরের মেয়ে। তখন শরৎকাল। মহামায়ার মহাবোধনের মঙ্গল শঙ্খ দিকে দিকে বেজে উঠেছে। কনক চাঁপার মত গায়ের রং চোখ দুটি যেন সদাই ভাবে বিভোর — মুড়ানী প্রকৃতির অভিনব সৌন্দর্যে তখন তন্ময়।

হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল পথের দিকে। একজন পথিক — বাহুদ্বয় আজানুলম্বিত, গলায় ধবধবে সাদা পৈতে, দৃষ্টি উদার। সেই পথিক তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছেন, দেখে মনে হয় যেন আপনার জন, যেন জন্মান্তরের চেনা। মুড়ানী আবিষ্টের মতো, পথিককে প্রণাম করলেন। পথিক আশীর্বাদ করলেন ‘কৃষ্ণে ভক্তি হোক’। পথিক চলে গেলেন।

এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই দক্ষিণেশ্বরের নিকটবর্তী নিমতাঘোলার এক মাঠে কৃষকরা চাষ করছিল। মুড়ানী গিয়ে সেখানে উপস্থিত। প্রশ্ন করলেন কৃষকদের আচ্ছা, এখানে এক কলাবনে ঠাকুরমশাই আছেন, তাঁকে জান? কৃষকরা হাত তুলে এক কুটির দেখিয়ে দিল। বালিকা ভয়ে ভয়ে সেই কুটিরে ঢুকেই দেখতে পেলেন, এই তো সেই পথিক। সেখানেই থেকে গেলেন বালিকা। তারপর যখন ফিরে আসবেন, তখন পথিক বললেন, যাও মা এখন। আবার দেখা হবে গঙ্গাতীরে। বিদায়ের আগে মুড়ানীকে মন্ত্র দীক্ষা দিয়ে ছিলেন তিনি।

সেই মন্ত্রদীক্ষার পনেরো বছর পরে, বলরাম বসুর সঙ্গে সেই গঙ্গাতীরে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে এসে মুড়ানী দেখা পেলেন সেই পথিকের। তিনি কথা রেখেছেন, দেখা দিয়েছেন।

প্রথম দর্শনেই মুড়ানী চিনতে পেরেছিলেন, তিনি নিশ্চিত বুঝেছিলেন, এই মহাপুরুষই সেই সাধক, সেই পথিক। ইনি তার দীক্ষাগুরু — ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ।

এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন ইংরেজি ১৮৬৭-৬৮ সাল, রানী রাসমণির জামাতা মথুরনাথ বিশ্বাস বেঁচে আছেন। মথুরবাবু শ্রীরামকৃষ্ণকে ঠিক তাঁর প্রয়াতা শাশুড়ির মতোই ঈশ্বরজ্ঞানে পূজা করতেন। সেই সময় শ্রীরামকৃষ্ণ নিমতা বা ঘোলার কোনও সাধন কুটীরে অবস্থান করেছিলেন — এমন তথ্য অন্য কোনও আকারগ্রন্থে পাওয়া যায় না। এই তথ্য পেয়েছি শ্রীদুর্গাপুরী দেবী রচিত ‘গৌরীমা’ গ্রন্থে। এ সারদেশ্বরী আশ্রম থেকেই প্রকাশিত। তাই সেই গ্রন্থটিকেই প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করেছি। তাছাড়া গৌরীমার ওই ধারণার কথা শ্রীরামকৃষ্ণও জানতেন কিন্তু কোনওদিন সেই ধারণা ভেঙ্গে দিতে প্রয়াসী হননি।

চার

শ্রীরামকৃষ্ণ গৌরীমা সম্পর্কে বলতেন, কৃপাসিদ্ধা গোপী ব্রজের গোপী। এরকম বলার পিছনে একটা কারণও ছিল। গৌরীমা তার কিশোরী জীবনেই জনৈকা ব্রজনারীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন একটা নারায়ণ শীলা। এই নারায়ণ শিলার নাম ছিল দামোদর। তিনি সেই কিশোরী অবস্থা থেকেই এই দামোদরকে ভক্তি ও প্রেম নিবেদন করে পূজা করতেন। দক্ষিণেশ্বরে এসে প্রথম যেদিন তিনি রামকৃষ্ণকে দর্শন করলেন, ঠিক তার আগের দিন গৌরীমা তাঁর নিত্যপূজ্য দামোদরের সিংহাসনে দু-খানি জীবন্ত চরণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেই দর্শন ঘটেছিল একাধিকবার। ভগবান দামোদরের উদ্দেশে নিবেদিত তুলসী সেদিন আকস্মিকভাবে আবির্ভূত সেই চরণযুগলে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

পরদিন যখন তিনি দক্ষিণেশ্বরে এসে শ্রীরামকৃষ্ণের চরণে প্রণতা হলেন, তখনই তিনি বুঝতে পারলেন, আগের দিন দামোদরের সিংহাসনে তিনি যে চরণ যুগল প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা এই মহাপুরুষেরই। তারই গুরুদেবের। গুরুই ছিলেন তাঁর জীবনে সাক্ষাৎ ভগবান তাঁর একমাত্র ইষ্ট।

শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর একটানা দশবছর ধরে তীর্থ পর্যটন করার ব্রত শেষ করেন গৌরীমা। গুরু নির্দেশিত পথে দৃঢ় পদক্ষেপে অগ্রসর হলেন। তিনি নতমস্তকে তুলে নিলেন গুরুর আদেশ। বারাকপুরের কাছে গঙ্গাতীরে তিনি এক আশ্রম প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেন এবং এ সম্পর্কে তিনি জননী সারদামণির সঙ্গে আলোচনাও করেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের অনুমতি পাওয়ার পর তিনি একাজে হাত লাগান।

বাংলা ১৩০১ সালে এক শুভদিনে জননী সারদামণির নামেই গৌরীমা আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। সেই আশ্রমের নাম হল শ্রীশ্রী সারদেশ্বরী আশ্রম। সেদিনের সেই প্রতিষ্ঠা উৎসবে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত এসে উপস্থিত হন। তারপর একে একে পঁচিশজন কুমারী, সধবা ও বিধবা এসে এখানে আশ্রমবাসিনী হয়েছিলেন।

প্রথম দিকে তীব্র অর্থ সঙ্কটের মধ্য দিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল এবং আশেপাশের গ্রাম থেকে ভিক্ষা করে এনে আহারের ব্যবস্থা হত। এত দুঃখ কষ্টের মধ্যেও সেই আশ্রম জীবন আশ্রমিকদের কাছে হয়ে উঠেছিল স্বর্গসমান।

কিন্তু ঠাকুর যে আদেশ দিয়েছিলেন, এই টাউনে বসে কাজ করতে, সে কথা গৌরীমা কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না। অর্থাৎ, কলকাতায় নিজের সেবাক্ষেত্র তৈরী করার পরিকল্পনা।

তাই, বাংলা ১৩১৮ সালের প্রথম ভাগে উত্তর কলকাতার ১০ নম্বর গোয়াবাগান লেনে একটা ভাড়া বাড়িতে তিনি কলকাতা আশ্রমের কাজ শুরু করলেন। এই ঘটনায় জননী সারদামণিও খুব আনন্দিত হলেন। তবে কলকাতায় আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হলেও বারাকপুরের শান্ত পরিবেশের আশ্রম গৌরীমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত। পলতা জলকলের উত্তরদিকে এখনও আশ্রমের সেই স্থান দেখা যায়।

ধীরে ধীরে কলকাতা আশ্রমের কাজ বাড়তে থাকে, আশ্রমবাসিনীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তাই বাংলা ১৩২০ সালের শেষভাগে ৯৭/৩, শ্যামবাজার স্ট্রীট-এর প্রশস্ততর বাড়িতে আশ্রম উঠে আসে, এভাবে প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়ি আশ্রম বদল করতে হয় আরও দু-একবার তারপর বিডন রোডে চলে আসে।

আশ্রমে জননী সারদামণি নিজের হাতে তাঁর এক প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিলেন। এখনও সেই প্রতিকৃতিরি পূজা হয়। মা সারদা সময় এবং সুযোগ পেলেই এই আশ্রমে আসতেন। তিনি এলে আশ্রমে আনন্দের হাট বসে যেত।

ধীরে ধীরে আশ্রমের কাজ বাড়তে থাকায় গৌরীমা সারদা মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে আশ্রমের জন্য একটা জমি কেনার উদ্যোগ নিলেন। সেই জমি উত্তর কলকাতার ২৬ নম্বর মহারানী গৌরীমাতা সরণী। নারী মুক্তি আন্দোলনে এবং নারী শিক্ষার প্রসারে সেই যুগে এই আশ্রম এক নতুন পথের বার্তা বহন করে নিয়ে এল।

চরম অর্থ সঙ্কট মধ্যেও অপ্রত্যাশিতভাবে বিভিন্ন সূত্র থেকে টাকাপয়সা পেয়ে আশ্রমের নিজস্ব ভবন তৈরীর কাজও শুরু হয়ে গেল। আর সেই সঙ্গে কলকাতার তৎকালীন সুধী সমাজ এবং বিদূষী মহিলারা এই আশ্রমের অনন্য সাধারণ কাজে আকৃষ্ট হয়ে আশ্রম দর্শন করতে আসতে থাকেন। অনেকেই বাড়িয়ে দেন সহযোগীতার হাত। বাংলা ১৩৩০ থেকে ১৩৩৩ সালের মধ্যে এই আশ্রমে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য, পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখ যেমন আসেন, তেমনি কলকাতার মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী এবং সচেতন করে তোলার জন্য বাংলা ১৩৩২ সালে গৌরীমার নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘মহিলা সমিতি।’

এদেশে নারী মুক্তি আন্দোলনের মহান তপস্বিনী এবং শ্রীরামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলনের প্রধান সেবিকা গৌরীমা ১৯৩৭ সালের ১ মার্চ (বাংলা ১৩৪৪ সালের ১৭ ফাল্গুন) কলকাতায দেহত্যাগ করেন। আজও তাঁর সাধনা এবং স্বপ্ন নতুন নতুন দিগন্তে প্রসারিত শ্রীশ্রীসারদেশ্বরী আশ্রমের যুগান্তকারী কর্মধারায়।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev