| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (পঞ্চম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার হাসানের ইতিহাস ও বর্তমান ছুঁয়ে : নন্দিনী অধিকারী গান্ধীজী : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কবরের ইতিহাস : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (চতুর্থ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার ছেলে বেলার পুজো : সুব্রত দত্ত SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (তৃতীয় কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার শাশ্বত বোস-এর গল্প ‘সর্বভূক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (দ্বিতীয় কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার শত সুরের সারস্বত সাধক — নলিনীকান্ত সরকার : রিঙ্কি সামন্ত পীযূষ কান্তি দাস-এর ছোটগল্প ‘ঝন্টু মামা ও তাঁর শিকারের গল্প’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (প্রথম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরা — বর্তমান পরিস্থিতিতে একট চ্যালেঞ্জ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘আদমের চোখ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার পার্থ সারথি পাত্র-র ছোটগল্প ‘টাইম-ব্যাঙ্ক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সার্ধশতবর্ষে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শতবর্ষে সুরসম্রাট ভূপেন হাজারিকার স্মরণে : যশোবন্ত রায় মাটির নিচের ইন্টারনেট — অণুজীব ও উদ্ভিদের এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক : অন্বেষা গাঙ্গুলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্রম্পটনে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের সমাধি : অসিত দাস শৌনক দত্ত-র ছোটগল্প ‘হোয়েন আই ওয়াজ ডেড’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ডোকরা শিল্পীদের কাহিনি : স্বর্ণাভা কাঁড়ার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কবরের ইতিহাস : সসীমকুমার বাড়ৈ

Reporter
সসীমকুমার বাড়ৈ / ১৪৪ Views জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভয়ঙ্কর বিষ এখনও নীল শিরায় প্রাবাহিত হয় র‍্যাডক্লিপ লাইন ধরে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সীমান্তে। এই বিষাক্ত নীল শিরাটি আমাদের বিষণ্ণ করে রেখেছে দীর্ঘ ৭৯ বছর ধরে। তা কিছুতেই নিরাময় হচ্ছে না। পৃথিবীতে অনেক দেশ বিভাজিত হয়েছে আবার জার্মানি, ভিয়েতনাম, ইয়েমেনের মতো বিভাজিত দেশ সংযুক্তও হয়েছে। কিন্তু দ্বিজাতির ক্ষত ভারত বাংলাদেশের মেটেনি বরঞ্চ তৈরি হচ্ছে পুঁজ রক্তের নালী ঘা। দেশভাগ এককালীন ঘটনায় থামেনি, তা ঘটমান। আর সীমান্তরেখায় আছড়ে পড়ছে দ্বিজাতি তত্ত্বের বিষাক্ত অভিঘাত। দেশভাগ কিছু মানুষের স্বার্থ চরিতার্থ করতে হয়েছিল, ফল স্বরূপ র‍্যাডক্লিফ লাইন বেদনফাঁস তৈরি হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে। সেই রেখা মৃত্যুকেও ছাড় দেয় না। আমরা সীমান্তে অসংখ্য খুন, ধর্ষণের কথা জানি, রাষ্ট্রীয় হত্যার কথাও কিছুটা জানি কিন্তু সে মানুষগুলোর সমাধি কবর কোথায় হয় তার খবর খুব একটা রাখি না। তেমনি যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের কবর যে আটকে আছে সেই বিষাক্ত নীল শিরায়, আমরা আদৌ তার খবর রাখি? বিশেষ করে ভারতীয় সীমান্তে অনেক মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭১ থেকে ঘুমিয়ে আছে আমাদের অজান্তে, সীমান্ত চর্চায় সে সব কবরের ইতিহাসও উঠে আসা উচিত।

দেশভাগের পর আমরা প্রায়শই দেখি উদ্বস্তুরা ‘দ্যাশ’ হারিয়ে ফেলায় জন্য, পাশাপাশি স্বজনদের চিতা, সমাধি, কবর ফেলা আসার জন্য মনোবেদনায় ভোগে। এপার ওপারে মানুষ ছুটে চলে শুধুমাত্র পূর্বপুরুষের ভিটা, চিতা, সমাধি, কবরের মাটি ছোঁয়ার জন্য। কিন্তু সেই আবেগ ক্রমশ স্থিমিত হয়ে আসছে র‍্যাডক্লিফ লাইন, পাসপোর্ট-ভিসার জন্য। ১৯৫৩ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পাসপোর্ট ভিসা চালু হয়। স্বাভাবিকভাবে আবেগ রুখে কাঁটাতার মাথাচাড়া দিয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে যুদ্ধে নিহত অসংখ্য যোদ্ধাকে ভারতের মাটিতে কবর দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে আমরা খুব একটা খোঁজ খবর নেইনি। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী খান সেনারা কোনো রকম যুদ্ধকালীন নিয়ম কানুন তোয়াক্কা করেনি। তারা গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, নির্বিচারে সংখ্যালঘু হত্যা ও দেশ থেকে বিতারিত করেছিল। এসবের আংশিক ইতিহাস আছে কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে কেমন বর্বরোচিত কাজ করেছিল পাকা সেনা তার খতিয়ান খুব কম আছে। খান সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে মৃতদেহ বিকৃত করে দিত। কবর থেকে তুলেও পাশবিক অত্যাচার করত। মৃত গেরিলাদের আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে খুঁজে হত্যা করত। ফলে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার দেহ, আহত গেরিলাকে ভারতের বিভিন্ন শিবিরে নিয়ে আসা হত। সেখানে ধর্ম অনুসারে মৃতদের কবর, সমাধি দেওয়া ছিল একটি জরুরি কাজ। আহতরা অনেক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যেত, তাদেরও কবর দিতে হত ভারতের মাটিতে। অধিকাংশের কবরই হয়েছিল সীমান্তবর্তী এলাকায় বা র‍্যাডক্লিফ লাইনের এপারে নো ম্যানস ল্যান্ডে। নিহত যোদ্ধাদের সকলেরই ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশের মাটিতে যেন তাদের দাফন হয়। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন সীমান্ত কবরের সংখ্যাটি কত? না সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বেসরকারি উদ্যোগে ক্ষেত্রসমীক্ষার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে ব্যক্তি বিশেষের পরিসংখ্যান মতে ৩০০০র বেশি।

ভারত-বাংলাদেশের সীমানা প্রায় ৪০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। সীমান্তবর্তী রাজ্য তথা এলাকায় ১৯৭১ সালে কমবেশি যুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল। প্রায় এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। সল্টলেকে সবচেয়ে বড়ো শরণার্থী ক্যাম্প তৈরি হয়েছিল, সীমান্তবর্তী রাজ্যেও অনেক শরণার্থী ক্যাম্প বসেছিল। অনেক শরণার্থীকে দণ্ডকারণ্যের মানা ট্রানজিট ক্যাম্পেও পাঠানো হয়েছিল। অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের শিবির তৈরি করা হয়েছিল সীমান্তবর্তী এলাকায়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধের পোশাক এবং যাবতীয় যুদ্ধ সহায়তা দিয়েছিল ভারত। গোটা বর্ডার জুড়েই এমন কর্মকাণ্ড চলেছিল। মুখ্যত ১২টি সেক্টরে যুদ্ধ হয়েছিল। পাশাপাশি ভারতীয় সেনা বাহিনী তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা মাফিক যুদ্ধ করেছে এবং ১৪ দিনের যুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করেছে।কথিত ভারতের প্রায় ১৬৬০-৩০০০ সৈন্য শহীদ হয়েছিল। তাদের কোথায় সমাহিত করা হয়েছিল? যতদূর জানা যায় তাদের দেহ বা দেহাবশেষ দেশেই ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। আমাদের আলোচ্য বিষয় সীমান্ত কবর। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে গেরিলা যোদ্ধারা সাধারণত যোদ্ধাদের দেহ পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে ফেলে আসত না। নিয়ে আসত সীমান্তবর্তী শিবিরে। দেহ সংরক্ষণের কোনো সুযোগ ছিল না। ফলত কবর বা সমাহিত করা হত আসেপাশে। মানুষগুলো তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কিন্তু কবর হত ভারতের মাটিটে। যোদ্ধাদের ইচ্ছা থাকত মৃত্যুর পর তাদের যেন নিজের দেশেই মাটি দেওয়া হয়। সহযোদ্ধারা ভাবত দেশ স্বাধীন হলে মৃত যোদ্ধাদের দেহাংশ দেশে ফিরানো হবে। কিন্তু তা কোনোদিন হয়ে ওঠেনি। যোদ্ধারা অতৃপ্ত হৃদয়ে শুয়ে আছে সীমান্ত কবরে।

পুর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে আনুমানিক তিন হাজারের মতো শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে,তা সামান্য কয়েকটি জায়গা বাদে অন্য তেমন চিহ্নিত জায়গা নেই। মুক্তযোদ্ধাদের ক্যাম্প থাকত মোটামুটি সীমানার কাছেই, সংলগ্ন স্থানে অস্থায়ী হাসপাতালও থাকত। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত, চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মৃত যোদ্ধাদের আশেপাশের কবরে বা গহিন কোনো পাহাড়ি এলাকায় সমাহিত করা হত। কবরগুলো প্রায়শই থেকে যেত অগচরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জয়ের আনন্দে এই সব মৃত যোদ্ধাদের কেউ মনে রাখেনি। ভারতের ভূ-খণ্ডেই অবহেলিত থেকে যায় তাদের কবর। কোথাও কোথাও স্থানীয় মানুষজন কিছুটা রক্ষণাবেক্ষণ করে রেখেছে কিছু কবর, বাকি প্রায় সবই চাপা পড়েছে সময় ও স্মৃতির অন্তরালে। দুই দশক আগে মুক্তিযোদ্ধা তথা গবেষক লে. কর্নেল সাজ্জাদ আলি বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর অনুসন্ধান মতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে তিন হাজারের মতো কবর আছে। অধিকাংশই ভারতের নো ম্যানস ল্যান্ডে। কারণ পাকিস্তানি সেনা সেখানে আসত না। যদিও তেমন কোনো  সরকারি পরিসংখ্যান মেলেনি।

১৯৭১ সালে মেঘালয়ের শিলংয়ের এক নারী তিন হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। মেঘালয় বর্ডারের পাশে শিলং ডিফেন্স হাসপাতালেও অনেকের চিকিৎসা করা হয়েছিল। সেখানকার কবর কমিটির মূল দায়িত্বে ছিলেন আহমদ হোসেন, তার ছোটভাই ছিলেন বেওয়ারিশ লাশ দাফন কমিটির চেয়ারম্যান। স্থানীয় মসজিদের পাশের জঙ্গলে ৫১টি সারিবদ্ধ কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। আহমদ হোসেন জানিয়েছেন, আর্মি তাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থ করার আদেশ দিয়েছিল। কিন্তু আর্মির গাড়ি ব্যবহার করার অনুমতি ছিল না। রাতের অন্ধকারে সমাহিত করা হত মৃতযোদ্ধাদের। তেমনি ভারতের আমপাতি নামে একটি জায়গায় ভারত-বাংলাদেশের রাজশাহী সীমান্তে ৪২টি কবর ছিল। তা নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে পদ্মার জলে। পাশে শরণার্থী ক্যাম্পও ছিল, সেখানেও অনেক মানুষ মারা গেছে। তাদের সমাধি, কবর সীমান্তবর্তী এলাকায় হত। ত্রিপুরার ধর্মনগর মহকুমার কদমতালা ব্লকের চল্লিশদ্রোন গ্রামে কমতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কবরের সন্ধান মিলেছে। সেখানে ৫জন মুক্তিযোদ্ধার কবর আছে, তাদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট এস এম ইমদাদুল হক-সহ পাঁচজন শহীদ শুয়ে আছে। এস এম ইমদাদুল হক-সহ সিপাই মোকমেদ আলী, মো. জামাল উদ্দিনের পরিচয় জানা গেছে, বাকি দুই জনের নাম জানা যায়নি। নাম ও ফলক ভেঙে যাওয়ায় তারা হারিয়ে গেছে। ত্রিপুরার সীমান্ত এলাকায় এমন অসংখ্য কবর অনাদরে অবহেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ত্রিপুরার বিশ্রামগঞ্জে হাবুল ব্যানার্জির বাগানবাড়িতে তিনি যুদ্ধের সময় হাসপাতাল বানাতে দিয়েছিলেন। রাখাল দাস নামে বারো-তেরো বছরের এক বালক সেই হাসপাতালে তখন আহত যোদ্ধাদের সেবা শুশ্রুষা করতেন। ক্যাম্পের আশেপাশে অনেক কবর আছে, প্রবীণ রাখাল দাস এখনও সেই সব কবর আগলান পরম মমতায়। তেমন কবর আছে সীমান্তবর্তী রামনগর, গোলচক্কর এলাকায়।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় গঙ্গারামপুরের হামজাপুর গ্রামে প্রায় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দুই গ্রামে দুইটি কবর আছে। হামজাপুরে পনেরটি, দাউয়িয়াপুরে ছয়টি কবর সীমান্ত পার হয়ে ভারতে ঢোকা পুনর্ভাবা নদীর তীরে। হামজাপুর গ্রামের শহীদ স্মৃতি ফলকে একটি রঙ চটা নামের তালিকা আছে। তা থেকে ক্যাপ্টেন ইদ্রিস আলি, নাইক ফজলুল হক, সিপাই মেজান আলিদের নাম পড়া যায়। মুক্তিফৌজদের কবর প্রায় সারা বছর ঢাকা থাকে লতাগুল্মে কিন্তু গ্রামের মানুষজন শবে বরাতের আগে কবর দুইটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে চিরাগ জ্বালায়, জিয়ারত করে। ১৯৭১এ ক্যাম্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল মনসুর মিয়াঁ, জর্জিস মিয়াঁ, ভাসা মিয়াঁরা। বাদকুল্লা সরকারের জমিতে টাইগার বাহিনীর ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। এই অখ্যাত ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী। কলকাতায় ছিল হেডকোয়াটার্স। ১৯৭৫এ মুজিব হত্যার পর তাঁকে জেলের মধ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল বাংলাদেশের ঘাতক জুন্তা। গঙ্গারামপুরের শিবাবাড়িতে অন্য একটি ইয়ুথ ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল জর্জ জে এম দাশের নেতৃত্বে। তিনি বিভিন্ন শরণার্থী শিবির থেকে যুবকদের উৎসাহিত করতেন যুদ্ধে যোগ দানে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সবাই ছিল তার বাহিনীর সদস্য। জর্জের বাহিনীতে ছিল সাঁওতাল, মুণ্ডা, কড়া, ওঁড়াও, মাহালী, তুরিসহ অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যও। তাদের মধ্যে ভিনসেন্ট মার্ডি, সাবিস্তান মার্ডি উল্লেখযোগ্য। তিনি আড়াই হাজারের একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেনএবং প্রশিক্ষণ দিতেন। এই বাহিনী জর্জ বাহিনী নামে পরিচত ছিল। এখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তি যোদ্ধাদের ক্যাপ্টেন ইদ্রিস আলির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা হামজাপুর ক্যাম্পে পাঠানো হত যুদ্ধের জন্য।

গবেষক লে. কর্নেল সাজ্জাদ আলি জাহির শুধু কবর অনুসন্ধানই করেন না, মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ সম্ভব হলে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেন। তিনি বলেছেন-‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আকুতি ছিল, তাঁদের মরাদেহ যেন বাংলাদেশের মাটিতে সমাধিস্থ করা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশে পাকিস্তানি সেনার যখনই কোনো মুক্তিযোদ্ধার মৃতদেহ পেত, সেগুলো বিকৃত করত। কবরগুলোর অসম্মান করত। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের নো-ম্যানস ল্যান্ডে বা ভারতের কবরস্থানে কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরের আশেপাশে কবরস্থ করতাম।’ তিনি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর-এর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়েছেন। ত্রিপুরার তদানিন্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। আসম ত্রিপুরা সংলগ্ন আমবাসা নামক স্থান থেকে কবর ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কবরখোদকরা বেঁকে বসে, তারা নিদ্রিত মানুষের ঘুম ভাঙাতে চায় না। তারা লাশ কবরে নামায়, কবর থেকে উঠায় না। পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক, সরকারের ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতিবন্ধকতা আছে একাজে। ধর্মীয় ও দুইদেশের নানা নিয়ম কানুনের কারণে সাধারণত দেহাবশেষ স্থানান্তর করা সম্ভব হয় না। বহু স্থানে কবরের উপর বাড়িঘর, বাজার নির্মিত হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিষয়টি খানিকটা এগিয়েছিল। ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা অবস্থান কালে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় দু’দেশের কূটনৈতিক প্রোটোকলে মুক্তিযোদ্ধাদের মরদেহ সসম্মানে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত করার ইস্যুটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১২ সালে জুন মাসে বাংলাদেশের কর্নেল সাজ্জাত আলি-সহ চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ভারতের পররাষ্ট্র, স্বারাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং ঠিক হয় পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের সিনিয়র নোডাল অফিসার নিয়োগ হবে এবং দেহাবশেষ স্থানান্তরিত করণে সহযোগিতা করবে। ত্রিপুরা সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে একটি স্মৃতি সৌধ এবং পার্ক নির্মাণ করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কবর সংরক্ষণ, দেহাবশেষ স্থানান্তর করণের কাজ খুব একটি এগোয়নি। বর্তমানে হাসিনা সরকারের পতনে ও রাজাকারদের উত্থানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই অস্তমিত। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশে বিষয়টি গুরুত্ব হারিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশ, ভারতে অনেক লেখালেখি হয়েছে কিন্তু সীমান্ত কবর নিয়ে কতটা কাজ হয়েছে আমার জানা নেই। আমার নো-ম্যানস ল্যান্ড নিয়ে ‘দেড়শো গজে জীবন’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর সীমান্ত চর্চায় গতি এসেছে। এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আলোচনায় এসেছে। ওই উপন্যাসে সীমান্ত কবর অনেকটা গুরত্ব পেয়েছে একটি অধ্যায়ে। আর ‘সীমান্ত কবরে রাত’ নামে সীমান্ত কবর নিয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণে লিখেছি একটি গল্প। বাংলাদেশের উত্থান পতন চলতেই থাকে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ, সীমান্ত কবর, দেশভাগের চর্চাটি জিইয়ে রাখা ভারতীয়দের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev