| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাজারাজড়া ও বণিকের দুর্গাপূজায় নিম্নবর্গ ছিল রবাহূত : অসিত দাস প্রজনন অধিকার নিশ্চিত হলেই সুস্থ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’ কতো বড়ো বড়ো পুজোরে বাবা… : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নবপত্রিকা: দুর্গাপূজার অন্তরালে শস্যদেবী ও প্রকৃতির আরাধনা : যশোবন্ত রায় মন্ত্র ভুল বললেও কোনও অসুবিধে নেই… নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিংহবাহিনী দুর্গা মৃগবাহিনীও : শ্যামলকান্তি চক্রবর্তী দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন কেন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন-এর শব্দের ব্যুৎপত্তির ধারণা : অসিত দাস মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন : অসিত দাস পেজফোরনিউজ-এর শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ প্রকাশিত হল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি অব্যক্তিগত বয়ান : তপোধীর ভট্টাচার্য মহালয়ার প্রার্থনা : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘এক টুকরো ভোর’ আশ্বিনের শারদপ্রাতে : যশোবন্ত রায় আমার ছেলেবেলার মহালয়ার সকাল : পীযূষ কান্তি দাস পর্দার দাপুটে নায়ক, বাস্তব জীবনে মানবতাবাদী — নানা পাটেকরের জীবন ও অবিনশ্বর কীর্তি : রিঙ্কি সামন্ত
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই পিতৃ পক্ষের শেষ, মাতৃপক্ষের সূচনা শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘আদমের চোখ’

Reporter
বিশ্বজিৎ মণ্ডল / ৬৪৫ Views জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চৈতন্যপুরে খড়ি মণ্ডলের ছেলে আদমকে সবাই চিনত।

কিন্তু খুব কম মানুষই তাকে চিনত আদম হিসেবে।

বেশির ভাগের কাছে সে ছিল — “খড়ির ল্যাংড়া ছেলে”।

পাড়ার ছেলেদের দেওয়া নামটি আরও ছোট — “ল্যাংড়া আদম”।

জন্ম থেকেই তার বাঁ পা-টা অকেজো। হাঁটার সময় শরীরটা একদিকে বেঁকে যায়। ডান পায়ের ওপর সমস্ত ভার দিয়ে তাকে এগোতে হয়। এক পা রাখার আগে মাটিটাকে দেখে নিতে হয় — কোথায় গর্ত, কোথায় কাদা, কোথায় আল ভেঙে আছে।

স্বাভাবিক মানুষ হাঁটে সামনে তাকিয়ে। আদম হাঁটে মাটির দিকে তাকিয়ে।

ছোটবেলায় সে জানত না, তার হাঁটা অন্যদের কাছে অদ্ভুত। জানত না, তার শরীর নিয়ে মানুষের কৌতূহল আছে। সে শুধু জানত, অন্য ছেলেরা দৌড়ায়, সে পারে না।

প্রায়দিন পাড়ার ছেলেরা তাকে ঘিরে ধরে বলে — “এই, ল্যাংড়া!”

আদম ফিরে তাকায় কোন কোন দিন। একদিন সে ওদের জবাব দেওয়ার জন্য বলল, “কী?”

“দৌড়ে দেখ তো!”

ছেলেগুলো হেসে উঠেছিল। আদম চেষ্টা করেছিল। এক পা। আরেক পা। তারপর ব্যর্থ।

তারপর ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। হাসিটা আরও জোরে উঠেছিল।

সেদিন সে প্রথম বুঝেছিল — মানুষের হাসিরও ওজন আছে। যেটার ভার বহন করতে কখনও কখনও কষ্ট হয়।

বাড়ি ফিরলে মা তার হাঁটুর ধুলো ঝেড়ে দিয়েছিল। কিছু জিজ্ঞেস করেনি। শুধু বলেছিল, “ব্যথা পেয়েছিস?”

আদম মাথা নাড়েনি। তারপর থেকে সে পড়ে গেলে কাঁদত না। সে জেনে গেছিল, এটা তার দৈনন্দিন।

কান্না করলে মানুষ আবার হাসবে — এই ভয়টা তার মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি জন্মেছিল।

প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছিল আদম। তারপর সংসারের অভাব তাকে বই থেকে সরিয়ে মাঠে বসিয়ে দিল।

খড়ি মণ্ডলের সামান্য জমি ছিল। তার সঙ্গে অন্যের জমি চুক্তিতে নিয়ে চাষ করত। বর্ষা ভালো হলে ঘরে চাল থাকত, না হলে ধার।

চৌদ্দ বছর বয়সে একদিন বাবা তার হাতে দুটো ছাগলের দড়ি ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “এগুলো দেখবি।”

সেই থেকে মাঠই হয়ে গেল তার স্কুল। ভোরে ছাগল নিয়ে বেরিয়ে যেত। দুপুরে বটগাছের ছায়ায় বসত। বিকেলে নদীর পাড় ধরে ফিরত।

সারাদিন মানুষ দেখত। দূরে কৃষক লাঙল টানছে। কেউ আল কাটছে। কেউ ঝগড়া করছে।

মেয়েরা কলসি নিয়ে নদীর দিকে যাচ্ছে। ছেলেরা ডাংগুলি খেলছে। বৃদ্ধ মানুষটা একা আলের ওপর বসে ঘাস কাটছে।

সবাই যেন কোথাও যাচ্ছে। শুধু আদমের যাওয়াটা ধীর। প্রথমে এই ধীরতাকে সে অভিশাপ মনে করত। পরে ধীরে ধীরে তার মনে হল — ধীরে চলারও একটা আলাদা সময় আছে।

যে দ্রুত যায়, সে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। যে ধীরে যায়, সে হয়তো পথটা বেশি দেখে।

তখনও এই ভাবনাটা পুরোপুরি তার নিজের ছিল না। শুধু একটা অস্পষ্ট অনুভূতি ছিল। ছিল নিজের বাঁ পায়ের প্রতি এক ধরনের রাগ।

কখনও সে পা-টার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলত, “তুই আমাকে আটকে রেখেছিস।”

কখনও আবার মনে হত, “তুই না থাকলে কি আমি এত কিছু দেখতাম?”

দুই প্রশ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকত সে। উত্তর পেত না।

রাতে মা ফুলকুমারী তার পায়ে সরষের তেল মালিশ করত।

“আজ অনেক দূর গিয়েছিলি?”

“হুঁ।”

“ব্যথা করছে?”

“একটু।”

মায়ের হাত থেমে থেমে চলত। সেই হাতের মধ্যে এমন একটা নিশ্চিন্তি ছিল, যা পৃথিবীর আর কোথাও সে পেত না।

এক রাতে হঠাৎ আদম বলেছিল, “মা।”

“কী?”

“আমি যদি অন্যরকম হতাম?”

ফুলকুমারীর হাত থেমে গিয়েছিল।

“কেমন?”

“আমার পা যদি ভাল থাকত?”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।

তারপর তার পায়ের ওপর হাত রেখে বলেছিল, “তুই তো আমারই ছেলে।”

আদম জানত, এটা তার প্রশ্নের উত্তর নয়। কিন্তু মায়ের কাছে হয়তো এর চেয়ে বড় উত্তর ছিল না। সে আর কিছু বলেনি।

সেদিন রাতে অনেকক্ষণ নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হয়েছিল, তার শরীরের মধ্যে যেন একটা অসমাপ্ত বাক্য রয়েছে। কেউ সেই বাক্য শেষ করেনি।

মানুষ শুধু পড়ে নিয়ে নিজের মত অর্থ বানিয়ে নিয়েছে।

দুই

আদমের চোখ ছিল অন্যরকম।

চৈতন্যপুরের মানুষ ঘটনাকে যেমন দেখে, আদম সেভাবে দেখত না।

অন্যরা দেখত — দুজন মানুষ কথা বলছে।

আদম দেখত — কথা শুরু করার আগে একজন আরেকজনের দিকে কেন তাকাল।

অন্যরা শুনত — কেউ বলছে, “আমি জানি না।”

আদম দেখত — কথাটা বলার সময় লোকটা চোখ নামিয়ে ফেলেছে। অন্যরা দেখত — দোকানদার চাল মেপে দিচ্ছে। আদম দেখত — পাল্লায় চাল ওঠানোর সময় তার আঙুল একবার কোথায় ছুঁয়ে গেল।

সে জানত না, এই ক্ষমতার কোন নাম আছে কি না।

মনোবিজ্ঞান সে পড়েনি। শুধু মানুষের চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে সে বুঝেছিল — মানুষের মুখ অনেক সময় তার মুখের কথার চেয়ে বেশি কথা বলে।

সম্ভবত নিজের দিকে মানুষের চোখের অভ্যাস থেকেই সে অন্যের চোখ পড়তে শিখেছিল।

হাটের ঘটনাটা তার মনে গেঁথে গিয়েছিল। হরির মা চাল কিনছিল। দোকানদার পাল্লায় কারসাজি করছিল।

আদম বলেছিল, “আর একটু দেন। চাল কম দিছেন ক্যানে? “

দোকানদার তাকিয়েছিল, “কী?”

“ওজুনে কম।”

দোকানদার মৃদু হেসে বলল, “তুই বুঝলি?”

“দেখ্যাচি।”

“নিজের হাঁটাই ঠিক নেই, আবার অন্যের ওজন মাপতে এসেছিস?”

দোকানদার ধমকেছিল। আদমের মুখ গরম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছু বলতে পারেনি।

হরির মা বলেছিল,“থাক বাবা।”

আদম সরে এসেছিল। কিন্তু সেদিন রাতে তার ঘুম আসেনি। বারবার মনে হচ্ছিল — লোকটা কি সত্যিই ঠিক বলেছে? তার হাঁটা কি তার কথার মূল্য কমিয়ে দেয়? তার বাঁ পা কি তার চোখকেও বাঁকা করে দেয়?

কেন সে প্রতিবাদ করতে গেলেই মানুষের চোখ তার পায়ের দিকে চলে যায়?

রাতের অন্ধকারে শুয়ে সে নিজেকে প্রশ্ন করেছিল — মানুষ কি অন্যের শরীর দিয়ে তার সত্যির ওজন মাপে?

উত্তর সে পায়নি। কিন্তু প্রশ্নটা তাকে বদলাতে শুরু করেছিল।

হরেন মাস্টারের সঙ্গে তার পাড়ার সূত্র ধরে পরিচয় হয়েছিল সেই সময়েই।

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। সন্ধ্যায় বারান্দায় আজও কেরোসিনের বাতি জ্বেলে বই পড়তেন।

প্রথম দিন আদম অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। মাস্টারমশাই কে দেখছিল। তাঁর পড়া শুনছিল।

হরেন মাস্টার বই থেকে মুখ তুলে বলেছিলেন, “বসবি?”

আদম অবাক না হয়ে বলল, “হ্যাঁ।”

সে কিছুক্ষণ বসেছিল। তারপর থেকে সন্ধ্যা হলেই সেখানে যেতে শুরু করল।

মাস্টারমশাই তাকে সবসময় পড়াতেন না। কখনও বই পড়তেন। কখনও গল্প বলতেন। দুজনেই চুপ করে থাকতেন অনেকক্ষণ। পাড়ার আলোচনাও হত।

একদিন আদম বলল,“মাস্টারমশাই, মানুষ আমাকে দেখলে পায়ের দিকে তাকায়। আমাকে ঠাট্টা কোইরে ল্যাংড়া বুলে ডাকে ক্যানে?”

হরেন মাস্টার বই থেকে চোখ না তুলে বললেন,“তুই কোথায় তাকাস?”

“চোখে।”

“কেন?”

আদম উত্তর দিল না। মাস্টারমশাই এবার বই বন্ধ করলেন।

“যে মানুষ তোকে শুধু পা দিয়ে দেখে, সে তোকে পুরোটা দেখে না। কিন্তু তুই যদি তার চোখ দেখে ফেলিস, তাহলে অন্তত তার পুরোটা দেখার চেষ্টা করছিস।”

আদম কথাটার পুরো মানে সেদিন বুঝতে পারেনি। কিন্তু কিছু কথা বোঝার জন্য সঙ্গে সঙ্গে বোঝা লাগে না।

কিছু কথা মানুষের ভিতরে গিয়ে বসে থাকে। সময় হলে তাদের অর্থ খুলে যায়।

তিন

চৈতন্যপুরের জমিদারবাড়ি তখন ধ্বংসের মুখে। সেকেলে জমিদার বাড়ি।

বড় ফটকের অর্ধেক ভেঙে পড়েছে। বাগানে পুরনো কাঁঠালগাছ। পুকুরের ঘাটে শ্যাওলা। ভাঙা জানালায় বাদুড়ের বাসা।

জমিদার নেই। কিন্তু জমি আছে। জমির প্রতি কারও কারও লোভও আছে।

কেরামত আলী ছিল গ্রামের প্রভাবশালী লোক। জমিদারদের পুরনো সম্পত্তির একটা বড় অংশ বহুদিন ধরে তার দখলে। কাঁঠালবাগান, পুকুরপাড়, বাগানবাড়ির জমি। সবখানেই তার লোকজনের আনাগোনা।

খড়ি মণ্ডল তার কাছ থেকে কিছু চায়নি। সে শুধু নিজের চাষের জমিটুকু নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু এক ভোরে মাঠে গিয়ে সে দেখল — জমির মাঝখানে তিনটে নতুন বাঁশের খুঁটি। তার জমির ভিতরে।

খড়ি মণ্ডল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একটা খুঁটি ধরে টান দিল। খুঁটি নড়ল না।

পেছন থেকে একজন বলল, “ওটা ধরবেন না।”

খড়ি মণ্ডল ঘুরে দেখল, কেরামত আলীর দুজন লোক।

“ইখানে খুঁটি পুঁত্যেছো ক্যানে?”

“হুকুম আছে।”

“কার?”

লোকটা হাসল। “আপনি জানেন।”

খড়ি মণ্ডল আর কথা বাড়াল না। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে চুপ করে বসেছিল। আদম জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

“কিছু না।”

“মুখটা এমনি ক্যানে?”

“জমিতে খুঁটি পুঁত্যেছে।”

“কারা?”

“কেরামত আলীর লোক।”

“ক্যানে?”

“জানি ন্যা।”

“কাগজ তো আছে।”

খড়ি মণ্ডল হঠাৎ রেগে উঠল, “সব সুমায় কাগজ কাগজ করিস ন্যা।”

আদম চুপ করে গেল। বাবার রাগের ভিতরে যে ভয় আছে, সেটা সে বুঝেছিল।

সেই রাতেই সে একা মাঠের দিকে বেরিয়ে গেল।

হাঁটতে তার সময় লাগছিল। চাঁদ ছিল না। দূরে শিয়াল ডাকছিল। ফাঁকা মাঠ, শনশন করে বাতাস বইছে।

জমির কাছে গিয়ে সে থামল। বাঁশের খুঁটিগুলো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। একটা খুঁটির গায়ে ভেজা কাদা।

আদম হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। এরপর মাটির দিকে তাকাল। জুতোর ছাপ। দুটি আলাদা ধরনের। একটা ভারী বুটের মত। আরেকটা পাতলা চটির।

সে নিচু হয়ে ছাপগুলো দেখছিল। হঠাৎ বাগানের ভেতর শুকনো পাতার শব্দ হল।

আদম মাথা তুলল। একটা ছায়া কাঁঠালগাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

সে অনুসরণ করতে পারল না। তার পা তাকে দ্রুত যেতে দিল না। এক মুহূর্তের জন্য পুরনো রাগ ফিরে এল।

যদি সে দৌড়াতে পারত! তারপরই আরেকটা চিন্তা এল — সে দৌড়াতে পারেনি বলেই তো এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে ফেলেছে।

সে মাটির দিকে তাকাল। ছায়ার চলে যাওয়া পথের দিকে।

সেদিন প্রথমবার তার মনে হল — তার ধীর শরীর হয়ত তার চোখকে একটু বেশি সময় দিয়েছে।

চার

পরদিন আদম কাগজ নিয়ে হরেন মাস্টারের কাছে গেল।

মাস্টারমশাই কাগজ পড়লেন। “চুক্তি এখনও বৈধ।”

“তাহলে ওরা খুঁটি পুঁতল ক্যানে?”

“কারণ তারা জানে, কাগজ থাকলেই জমি রক্ষা হয় না।”

আদম তাকিয়ে রইল। “তাহালে?”

“আগে জানিস, ওরা কী চায়।”

সেই থেকে আদম লক্ষ করতে শুরু করল। দিনে কেউ আসে না। সন্ধ্যার পর আসে। কখনও দুজন। কখনও তিনজন।

একদিন সে দেখল, কেরামত আলীর ছোট ভাইপো জমির আল মাপছে।

আদম ঝোপের আড়ালে বসেছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে নিজের শরীর দিয়ে নয় — চোখ দিয়ে মাঠের মধ্যে ঘুরছে। কিন্তু এই দেখা তাকে আনন্দ দেয়নি। বরং ভয় বাড়িয়েছিল।

কারণ কিছু সত্যি আছে, যেগুলো দেখা হয়ে গেলে মানুষ আর আগের মত থাকতে পারে না।

একদিন কেরামত আলীর একজন লোক খড়ি মণ্ডলের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ঘরের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছু করল না। শুধু দেখল। আদমও তাকে দেখল। দুজনের চোখ একবার মিলল। তখন লোকটা চলে গেল।

সেদিন রাতে আদম প্রথমবার বুঝল — শিকার হওয়া মানে শুধু আক্রমণের ভয় নয়। ভেতরের খেলা করা ভয়।

কেউ তোমাকে লক্ষ্য করছে — এই অনুভূতিটাও এক ধরনের বন্দিত্ব। যেটা আদম অনুভব করেছিল।

তিন দিন পর ভোরে খড়ি মণ্ডলের চিৎকারে ঘুম ভাঙল।

“আদম!”

আদম ঘরে ঢুকে দেখল সিন্দুক খোলা।

চাষের চুক্তিপত্র নেই। টাকা আছে। পুরনো দলিল আছে। শুধু ওই কাগজটি নেই।

খড়ি মণ্ডলের মুখ সাদা,“ আমাদের সব শেষ।”

আদম কিছু বলল না। সে ঘরটা দেখতে লাগল। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। জানালার কপাট খোলা। জানালার নিচে কাদা। চটির ছাপ।

তার চোখ কাঠের জানালায় আটকে গেল। সেখানে কাদার একটা দাগ। দাগের মধ্যে আটকে আছে সরু লাল সুতো। সে সুতোটা তুলে নিল।

বাবা জিজ্ঞেস করল, “কী পেয়েছিস?”

আদম বলল, “কিছু না।”

সে জানত — সন্দেহকে তাড়াহুড়ো করে সত্যি বানালে সত্যিটাই দুর্বল হয়ে যায়।

সন্ধ্যায় সে হরেন মাস্টারের কাছে গেল। লাল সুতোটা টেবিলে রাখল। সব বলল।

মাস্টারমশাই দীর্ঘক্ষণ সুতোটা দেখলেন। “এটা প্রমাণ নয়।”

“জানি।”

“তবু?”

“যে কাগজ লিয়েছে, সে জানত কাগজটা কুথায় থাকে।”

হরেন মাস্টার তাকালেন। “তুই কী করতে চাইছিস?”

“দেখতে চাই, কে আবার আসে।”

মাস্টারমশাই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সত্যি দেখতে চাস?”

“হ্যাঁ।”

“মনে রাখিস — সত্যি দেখার পর তাকে না দেখার ভান করা যায় না।”

আদম বলল, “আমি অনেকদিন ধরেই চোখ বন্ধ করে আছি।”

পাঁচ

সেই রাতটা দীর্ঘ ছিল।

আদম জমির পাশের পুরনো কাঁঠালগাছের আড়ালে বসেছিল।

শরীরের জন্য দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কঠিন। বাঁ পায়ে টান ধরছিল। মশা কামড়াচ্ছিল। মনে হচ্ছিল উঠে চলে যায়।

তার ভিতরে একটা পুরনো কণ্ঠ বলছিল — “তুই কেন এসব করছিস?”

“তুই কি নায়ক?”

“তোর নিজের জীবনটাই তো সামলাতে পারিস না।”

এই কণ্ঠটাকে সে চিনত। এটা কেরামত আলীর নয়। এটা তার নিজের ভিতরে বহু বছর ধরে জমে থাকা অপমানের কণ্ঠ।

মানুষকে বারবার বলা হলে যে সে কম, একসময় সে নিজেই নিজের সঙ্গে সেই ভাষায় কথা বলতে শুরু করে।

আদম বুঝল — কেরামত আলী বাইরে একজন। কিন্তু তার ভিতরেও আরেকজন বসে আছে। যে তাকে প্রতিদিন বলে — তুই পারবি না। সেই মানুষটাকেও তাকে হারাতে হবে।

রাত গভীর হলে পায়ের শব্দ শোনা গেল। একজন নয়। দুজন। লণ্ঠনের আলো এগিয়ে এল।

একজনকে আদম চিনল — কেরামত আলীর লোক। অন্যজন অপরিচিত।

তারা জমির কাছে দাঁড়াল। “কাগজটা পেয়েছিস?”

“পেয়েছি।”

“কোথায়?”

“কাল দেখাব।”

“কাল নয়। আজ।”

“আমার কাছে নাই।”

“মিথ্যে বলিস না।”

আদম আরও ঝুঁকে শুনছিল।

ঠিক তখন বাঁ পায়ে তীব্র টান ধরল।

একটা শুকনো ডাল ভেঙে গেল।

টক্!

দুজনেই থেমে গেল।

“কে?”

লণ্ঠনের আলো তার দিকে ঘুরল।

আদম উঠে দাঁড়াতে গেল। পা সাড়া দিল না।

সেই মুহূর্তে তার মনে হল — তার সমস্ত জীবন যেন আবার সেই ছোটবেলার মাঠে ফিরে গেছে।

চারপাশে হাসি। সে দৌড়াতে পারছে না। সবাই তাকিয়ে আছে। শুধু এবার কেউ হাসছে না।

এবার বিপদ সত্যি। আদমের চোখ পাশের সেচের নালায় পড়ল।

সে শরীরটা গড়িয়ে ঝোপের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।

লণ্ঠনের আলো মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল।

“কেউ নেই।”

“শেয়াল হবে।”

পায়ের শব্দ দূরে সরে গেল। আদম অনেকক্ষণ নড়ল না।

তারপর উঠে বসল। হাত কাঁপছিল। সে ভয় পেয়েছিল।

ভীষণ ভয়। কিন্তু সেই ভয়ের ভিতরেই একটা অদ্ভুত উপলব্ধি হল — সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়।

ভয়ের মধ্যেও নিজের চোখ খোলা রাখা।

পরদিন ভোরে সে হরেন মাস্টারের কাছে গেল। সব ঘটনা বলল।

মাস্টারমশাই মূল কাগজ নিরাপদে সরিয়ে রেখে নকল তৈরি করলেন।

বিষয়টি গ্রামের আরও কয়েকজনের সামনে এল। পুরনো প্রতিনিধির কাছে জানানো হল।

ধীরে ধীরে মানুষ সামনে এল। কেরামত আলীর দখলের চেষ্টা থামল। কিন্তু কেরামত আলীর চোখে আদমের জন্য যে রাগ জন্মেছিল, সেটা থামল না।

আদম জানত — কোন অন্যায় একবার থামানো আর পৃথিবী থেকে অন্যায় মুছে দেওয়া এক কথা নয়।

একটা দরজা বন্ধ করা যায়। কিন্তু তার ওপারে আরেকটা দরজা থাকতে পারে। তবু দরজাটা বন্ধ করতে হয়। কারণ নীরবতা কোনদিন তালা খুলে দেয় না।

ছয়

সেদিন সন্ধ্যায় হরেন মাস্টারের বারান্দায় বসেছিল আদম।

কেরোসিনের বাতি জ্বলছিল। মাস্টারমশাই একটা বই খুললেন। “আজ তোর নামের গল্প বলব।”

আদম তাকাল। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম। মাটি থেকে সৃষ্টি। মানুষের প্রথম বিস্ময়। প্রথম ভুল। প্রথম প্রশ্ন।

আদম চুপ করে শুনছিল। তার নিজের নামটা এতদিন তার কাছে যেন একটা বিদ্রূপ ছিল।

“আদম” — বললেই কেউ না কেউ তার পায়ের কথা মনে করত।

আজ প্রথমবার সে নিজের নামটাকে তার শরীর থেকে আলাদা করে ভাবল।

আদম মানে শুধু একটি পা নয়। একজন মানুষ। একটি প্রশ্ন। একটি ভুল। একটি ভয়। একটি সিদ্ধান্ত।

হঠাৎ সে বলল — “মাস্টারমশাই?”

“হুঁ?”

“প্রথম মানুষও কি সব বুঝতোক?”

“কে জানে?”

“ভুল করতোক ?”

“মানুষ ছিল। তাহলে নিশ্চয়ই ভুল করত।”

আদম একটু চুপ করে থেকে বলল, “তাহালে মানুষের ভুলও কি শরীলের মুতো?”

মাস্টারমশাই তাকালেন। “কী বলতে চাইছিস?”

“শরীলের একটা অংশ খারাপ থাকলে সবাই দেখতে পায়। কিন্তুক মানুষের ভিতরের একটা অংশ খারাপ থাকল্যে?”

হরেন মাস্টার কিছু বললেন না।

আদম নিজেই বলল, “তখুন তো সিটা দেখা যায় না।”

“সবসময় নয়।”

“তাই তো বেশি বিপদ।”

হরেন মাস্টারের মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটল।

“তুই এখন মানুষকে শুধু দেখিস না। বুঝতেও চেষ্টা করিস।”

আদম বাইরে তাকাল। সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে এসেছে।

বাইবেলের পাতার ওপর কেরোসিনের আলো কাঁপছে।

তার মনে হল, মানুষকে দেখার চেয়েও কঠিন কাজ হলো — নিজেকে দেখা।

এতদিন সে নিজের বাঁ পা-কে দেখেছে। আজ প্রথমবার নিজের ভেতরের ভয়টাকে দেখল। তার লজ্জা। তার রাগ। তার হীনম্মন্যতা। তার পালিয়ে যেতে চাওয়া।

এমনকি সেই অদ্ভুত অহংকারও — যে অহংকার তাকে মনে মনে বলতে শেখায়, “আমি অন্যদের মত নই।”

সে বুঝল, নিজের দুর্বলতাকে ঘৃণা করাও এক ধরনের অহংকার।

কারণ তাতেও মানুষ নিজেকে পৃথিবীর কেন্দ্রেই রাখে।

হরেন মাস্টার বললেন, “কী ভাবছিস?”

আদম মৃদু হেসে বলল, “আমি ভাবছি, আমার নামটা এতদিন ভুল করে বুঝ্যেছিল্যাম।”

সাত

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার ধারে একটা ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল।

অন্য দুটি ছেলে দাঁড়িয়ে হাসছিল। আদম থামল। তার বাঁ পায়ে ব্যথা। হাঁটুতে টান। তবু সে ঝুঁকে পড়ল।

ছেলেটাকে তুলতে গিয়ে নিজের ভারসাম্যও একবার নষ্ট হয়ে গেল।

ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার পা খারাপ?”

আদম থামল। এই প্রশ্ন সে জীবনে অসংখ্যবার শুনেছে।

কখনও শব্দে। কখনও চোখে। কখনও হাসির মধ্যে।

আজও প্রশ্নটা তার ভিতরের পুরনো কোন দরজায় গিয়ে ধাক্কা দিল।

কিন্তু দরজাটা আর খুলল না।

সে বলল, “হ্যাঁ।”

ছেলেটা অবাক হয়ে বলল, “তবু তুমি আমাকে তুললে?”

আদম হাসল। “পা দিয়ে তো সব কাজ হয় না।”

ছেলেটা কথাটার মানে বুঝল কি না, জানা গেল না।

আদম তার হাঁটুর ধুলো ঝেড়ে দিল। সেই মুহূর্তে তার নিজের ছোটবেলার একটা দুপুর মনে পড়ল।

কাদায় পড়ে থাকা সে। দূরে দাঁড়িয়ে ছেলেদের হাসাহাসি। কেউ হাত বাড়ায়নি।

আজ একই রাস্তা। একই মাটি। শুধু দৃশ্যটা বদলে গেছে।

না। শুধু দৃশ্যটা নয়। দেখার মানুষটাও বদলে গেছে।

বাড়ি ফিরতেই মা জিজ্ঞেস করল, “এত দেরি হল?”

“একটা ছেলে পড়্যা গেয়েছিল। তাকে তুলিয়্যা দিলাম।

মা আর কিছু বলল না। শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ভাত বাড়তে বাড়তে বলল, “খা।”

আদম খেতে বসে জানালার বাইরে তাকাল।

জমিদারবাড়ির ভাঙা পাঁচিল। চাঁদের আলো। দূরে মাঠ।

সব আগের মত।

কেরামত আলী আছে। অন্যায় আছে। ভয় আছে। মানুষের বিচার আছে। মানুষের নিষ্ঠুরতাও আছে।

পৃথিবী বদলায়নি। কিন্তু আদমের ভিতরে একটা জিনিস বদলে গেছে।

আগে সে ভাবত — তার বাঁ পা তাকে অসম্পূর্ণ করেছে।

এখন সে জানে — শরীরের অসম্পূর্ণতা আর মানুষের অসম্পূর্ণতা এক জিনিস নয়।

তার পা তাকে ধীর করেছে। কিন্তু তার চোখকে নয়।

তার শরীর তাকে সীমা দিয়েছে। কিন্তু তার দেখাকে নয়।

সে দ্রুত দৌড়াতে পারে না। কিন্তু অপেক্ষা করতে পারে।

সে অনেক দূর একসঙ্গে যেতে পারে না। কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অনেক কিছু দেখতে পারে।

কখনও কখনও সত্যি দেখার জন্য দৌড়ের চেয়ে অপেক্ষাই বেশি দরকার।

রাতে শুয়ে আদম নিজের বাঁ পায়ের দিকে তাকাল।

ছোটবেলায় এই পা-টাকে সে ঘৃণা করত।

আজ প্রথমবার তার মনে হল, পা তো কোনদিন তাকে বলেনি — “তুই অক্ষম।”

এই কথাগুলো মানুষ বলেছে। বারবার বলেছে। এতবার বলেছে যে সে নিজেই বিশ্বাস করেছে।

আদম ধীরে ধীরে উঠে বসল। জানালার বাইরে তাকাল।

রাত গভীর। মাঠের ওপর কুয়াশা। দূরে ভাঙা জমিদারবাড়ি। চাঁদের আলোয় তার পাঁচিলটা এমন দেখাচ্ছে, যেন সময়ের গায়ে একটা পুরনো ক্ষত।

আদম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

হরেন মাস্টারের প্রশ্নটা আবার মনে পড়ল, “তুই কোথায় তাকাস?”

তার নিজের উত্তরও মনে পড়ল, “চোখে।”

কিন্তু আজ সে বুঝল, শুধু চোখ দিয়ে দেখা যায় না।

মানুষ নিজের ভয় দিয়ে দেখে। নিজের ঘৃণা দিয়ে দেখে। নিজের অহংকার দিয়ে দেখে। নিজের পূর্বধারণা দিয়ে দেখে।

কখনও কখনও সেইসবই চোখের সামনে এমন একটা পর্দা টেনে দেয় যে চোখ খোলা থেকেও মানুষ অন্ধ হয়ে যায়।

আদম দরজা খুলল। বাইরে এল। বাঁ পায়ে ব্যথা।

সে থামল। তারপর এক পা বাড়াল। ডান পা। তারপর বাঁ পা। ধীরে খুঁড়িয়ে। আগের মতই।

শুধু আজ তার হাঁটার মধ্যে লজ্জা নেই। সামনে অন্ধকার রাস্তা। রাস্তার শেষ দেখা যায় না।

সে জানে না, সেখানে কী আছে। তবু হাঁটতে শুরু করল। এক পা, তারপর আরেক পা। পেছনে রইল ঘর। মা বাবা। শৈশব, অপমান, কেরামত আলীর ভয়। সেই পুরনো হাসি, “দৌড়ে দেখ তো!”

আদম দৌড়াল না। তার দৌড়ানোর দরকারও ছিল না।

সে শুধু দেখল।

চৈতন্যপুর ঘুমিয়ে রইল। জমিদারবাড়ি ঘুমিয়ে রইল।

মাঠ, নদী, বটগাছ, সব আগের মতোই রইল। শুধু একজন মানুষ বদলে গেল। যে একদিন ভাবত, তার বাঁ পা-টাই তার সবচেয়ে বড় অক্ষমতা।

আজ সে জানে — অক্ষমতা পায়ে নয়। অক্ষমতা তখনই, যখন সত্যি সামনে এসে দাঁড়ায় আর মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়।

আদম হাঁটছিল। তার পা এখনও খুঁড়িয়ে যায়। তার হাঁটা এখনও ধীর। তার শরীর এখনও অসম্পূর্ণ। কিন্তু অন্ধকারের ভিতর তার চোখ দুটো খোলা। হয়ত মানুষের জন্য শেষ পর্যন্ত এটাই যথেষ্ট — সব পথ দ্রুত পেরিয়ে যাওয়া নয়; কখনও কখনও শুধু এতটুকুই — যেখানে অন্য সবাই চোখ নামিয়ে নেয়, সেখানে একজন মানুষ যেন তাকিয়ে থাকে।

আদম তাকিয়ে ছিল। তারপর সে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

কিন্তু তার ধীর পায়ের শব্দ কিছুক্ষণ আরও শোনা গেল — একটা পায়ের শব্দ। একটু থামল। আবার এক পা বাড়ালো। তারপর নীরবতা।

শুধু ভাঙা জমিদারবাড়ির পাঁচিলের ওপরে তখনও চাঁদের আলো ছিল। সেই আলোয়, চৈতন্যপুরের অন্ধকারের ভিতর, যেন দুটি চোখ অনেকক্ষণ জেগে রইল।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev